সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১-৬): কুরআন — সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এক কিতাব

Photo credit: Adel Z, via flickr[dot]com/photos/adel_z/4382305550/

Photo credit: Adel Z, via flickr[dot]com/photos/adel_z/4382305550/

সূরা কাহফ থেকে পাওয়া কিছু দিকনির্দেশনার ওপর ধারাবাহিক আলোচনার প্রথম কিস্তি

আল্লাহর নামে শুরু, যিনি সকলের প্রতি দয়াবান, পরম দয়ালু।

১। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি নিজ বান্দার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে কোনও রকমের ত্রুটি রাখেননি।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত, যিনি নিজ বান্দা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি কিতাব আল-কুরআন নাযিল করেছেন এবং তাতে শাব্দিক বিরোধ ও অভিব্যক্তির দিক দিয়ে কোনও রকমের ত্রুটি রাখেননি। [তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা: 

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর, যিনি নিতান্তই দয়া করে আমাদেরকে শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উম্মতের সদস্য হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন এবং তাঁর প্রতি সর্বশেষ আসমানী কিতাব কুরআন নাযিল করে আমাদের জন্য সঠিক পথের দিশা দেখিয়েছেন। নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) ছিলেন এক ‘জীবন্ত কুরআন’। তাঁর প্রতি নাযিল হওয়া কিতাব কুরআন তিনি তাঁর উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কুরআনের সঠিক ব্যাখ্যা তিনি শিখিয়েছেন। কুরআন অনুযায়ী কিভাবে জীবন গড়তে হবে তা তিনি হাতেকলমে দেখিয়ে গিয়েছেন। সেই কুরআন আজও আমাদের কাছে আছে। নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সেই শিক্ষাও আছে। এগুলোই হলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে ও আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনে প্রকৃত সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি।

প্রথম নবী আদাম (عليه السلام) থেকে শুরু করে নবী ঈসা (عليه السلام) পর্যন্ত যত নবী-রাসুল এসেছিলেন তাঁদের সবাইকে আল্লাহর তরফ থেকে কিছু মু’জিযা বা অলৌকিক নিদর্শন প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু, তাঁদের মৃত্যুর পর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এসব মু’জিযা হয়ে পড়েছিল গল্পের বিষয়বস্তু। যেহেতু নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পর আর কোনো নবী বা রাসুল আসবেন না তাই তাঁকে এমন অসাধারণ একটি মু’জিযা দেওয়া হয়েছে যা কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। এই মু’জিযাটি হলো আরবি ভাষায় নাযিল হওয়া কিতাব কুরআন।

কুরআনের শুরু থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সূরাসমূহের ক্রম, একেকটি সূরার মধ্যে আয়াতসমূহের বিন্যাস, শব্দচয়ন – এগুলো গভীরভাবে খেয়াল করলে আমরা দেখব যে, ‘অক্ষরজ্ঞানহীন’ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষে দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে কেবলমাত্র মুখনিসৃত বাণীর মাধ্যমে এমন সুসামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কিতাব রচনা করা একেবারেই অসম্ভব। এখানে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, কুরআন মূলত একটি মৌখিক ‘সাহিত্য’। বই আকারে একে প্রথমবারের মতো পরিপূর্ণভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর আস-সিদ্দীক (رضي الله عنه)-এর শাসনামলে, নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মৃত্যুর পরে।

আরবি সাহিত্যের সমঝদার মাত্রই স্বীকার করেন যে, কুরআন একটি অলৌকিক ‘সাহিত্য’। কোনো প্রকার পূর্ব অনুমান ও ধারণাকে দূরে সরিয়ে রেখে খোলা মন নিয়ে এই কিতাব অধ্যয়ন করলে প্রতিটি মানুষই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হবেন যে, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে সভ্যতার ছোঁয়া বঞ্চিত অনুন্নত আরবের অধিবাসী একজন ‘অক্ষরজ্ঞানহীন’ মানুষের পক্ষে এমন অলৌকিক একটি ‘সাহিত্য’ রচনা করা আসলেই অসম্ভব। এই কিতাব অবশ্যই উর্ধতন কোনো স্বত্বার কাছ থেকে এসেছে। সৃষ্টিরহস্য, অতীত ইতিহাস, ভবিষ্যদ্বাণী ইত্যাদি বিষয়সমূহ যেভাবে কুরআনে এসেছে তা যাবতীয় সৃষ্টির স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহ ছাড়া আর কারও পক্ষে এভাবে বলা সম্ভব নয়।

২। এক সরল-সোজা কিতাব, যা তিনি নাযিল করেছেন মানুষকে নিজের পক্ষ থেকে এক কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার (জন্য); এবং যে সকল মুমিন সৎকর্ম করে, তাদেরকে এই এই সুসংবাদ দেওয়ার জন্য যে, তাদের জন্য রয়েছে উৎকৃষ্ট প্রতিদান –

৩। যাতে তারা সর্বদা থাকবে।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

(কুরআন হলো) এক সরল-সোজা কিতাব, যা আল্লাহ তাঁর নিজের পক্ষ থেকে নাযিল করেছেন কাফিরদেরকে ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে এক কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য; এবং যে সকল মুমিন সৎকর্ম করে, তাদেরকে এই এই সুসংবাদ দেওয়ার জন্য যে, তাদের জন্য রয়েছে উৎকৃষ্ট প্রতিদান — যাতে তারা সর্বদা থাকবে, আর উত্তম পুরষ্কারটি হলো জান্নাত। [তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা: 

দুনিয়ার এই জীবনই একমাত্র জীবন নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত কিতাব কুরআন বলছে যে, মৃত্যুর পরে এই জীবনের বিশ্বাস ও কাজের জন্য আমাদের সবাইকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে জান্নাতের অনাবিল শান্তি ও বিনোদন। আর যারা অবিশ্বাস করেছে ও সৎকর্ম করেনি তাদের ঠিকানা হবে ভয়ানক সব শাস্তিতে পরিপূর্ণ স্থান জাহান্নাম। হয় জান্নাত, নতুবা জাহান্নাম। পরকালীন জীবনে তৃতীয় কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। এখন আমাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমরা শান্তির রাস্তায় হাঁটব, নাকি শাস্তির পথ বেছে নেব। প্রকৃত বুদ্ধিমান তো সেই যে চিরস্থায়ী জীবনের আরামের জন্য ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে সবসময় তৈরি থাকে।

৪। এবং সেই সকল লোককে সতর্ক করার জন্য, যারা বলে, আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেছেন।

৫। এ বিষয়ের কোনো জ্ঞানগত প্রমাণ না তাদের নিজেদের কাছে আছে আর না তাদের বাপ-দাদাদের কাছে ছিল। অতি গুরুতর কথা, যা তাদের মুখ থেকে বের হচ্ছে। তারা যা বলছে তা মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

এবং কাফির দলের মধ্যে সেই সকল কাফিরদেরকে সতর্ক করার জন্য (এই কিতাব, কুরআন নাযিল করা হয়েছে), যারা বলে, আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেছেন। এই কথার কোনো জ্ঞানগত প্রমাণ না তাদের নিজেদের কাছে আছে আর না তাদের বাপ-দাদাদের কাছে ছিল, যারা তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে এবং তারাও সে কথার প্রবক্তা ছিল। অতি গুরুতর মন্দ কথা, যা তাদের মুখ থেকে বের হচ্ছে। তারা যা বলছে তা মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়। [তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা: 

মহান আল্লাহ তাঁরই নাযিল করা কিতাব কুরআনে তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি এক। তিনি কোনো সন্তান জন্ম দেননি, তিনি নিজেও জন্ম নেননি। তাঁর কোনো শুরু নেই, তাঁর কোনো শেষ নেই। তিনিই একমাত্র চিরঞ্জীব। যারা আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে নিয়েছে তারা আসলে মনগড়া কথা ছাড়া আর কিছুই বলে না।

৬। (হে নবী! অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়) তারা (কুরআনের) এ বাণীর প্রতি ঈমান না আনলে যেন তুমি আক্ষেপ করে করে তাদের পেছনে নিজের প্রাণনাশ করে বসবে।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

(হে নবী! অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়) তারা আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর (কুরআনের) এ বাণীর প্রতি ঈমান না আনলে তাদের ঈমান আনয়নের প্রতি আপনার লোভ থাকার কারণে রাগে ও চিন্তায় যেন আপনি আক্ষেপ করে করে তাদের পেছনে নিজের প্রাণনাশ করে বসবেন। [তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা: 

প্রতিটি মুসলিমেরই আন্তরিক কামনা থাকা উচিৎ যেন তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, সহকর্মী – এরা সবাই  আল্লাহর একত্ববাদ ও পরকালীন জীবনের প্রতি ঈমান এনে সেই অনুযায়ী তাদের নিজেদের জীবনকে সাজায়। এজন্য ইসলামের শাশ্বত বাণীকে তাদের কাছে সুন্দর করে উপস্থাপন করতে হবে। সেইসাথে একথাটিও মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেবেন শুধু সেই সঠিক পথের দিশা পাবে। অতএব, কেউ আমাদের দাওয়াত গ্রহণ না করলে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। আমাদের কর্মফল আমরা ভোগ করব, তাদের কর্মফল তারা ভোগ করবে। আমরা তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হব না।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ১লা এপ্রিল, ২০১৬      

Advertisements

16 thoughts on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১-৬): কুরআন — সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এক কিতাব

  1. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৭-৮): দুনিয়ার যাবতীয় সৌন্দর্য আমাদের জন্য একেকটি পরীক্ষা | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৯-১২): আল্লাহর রাস্তায় হিজরত | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৩-১৪): যেভাবে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে হবে | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৫-১৬): সমাজ যখন শিরকে নিমজ্জিত | আমার স্পন্দন

  5. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৭-১৮): আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার পূর্বশর্ত | আমার স্পন্দন

  6. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৯-২০): সাবধানী হতে হবে | আমার স্পন্দন

  7. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২১): নিরাশ হওয়া যাবে না | আমার স্পন্দন

  8. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২২): সঠিক জ্ঞান আহরণ করতে শিখতে হবে | আমার স্পন্দন

  9. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৩-২৪): আল্লাহ না চাইলে আমাদের চাওয়ায় কিছু হয় না | আমার স্পন্দন

  10. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৫-২৬): সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করে যেতে হবে | আমার স্পন্দন

  11. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৭): কুরআনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা যাবে না | আমার স্পন্দন

  12. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৮): সৎ সঙ্গী বেঁছে নিতে হবে | আমার স্পন্দন

  13. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৯-৩১): ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না | আমার স্পন্দন

  14. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩২-৩৬): প্রাচুর্যের পরীক্ষা | আমার স্পন্দন

  15. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩৭-৪১): সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় | আমার স্পন্দন

  16. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৪২-৪৪): জীবনে হঠাত নেমে আসা বিপদ যখন বিপথে যাওয়া থেকে আমাদেরকে বাঁচায়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s