সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৯-১২): আল্লাহর রাস্তায় হিজরত

Photo credit: Churl, via flickr[dot]com/photos/churl/528717338

Photo credit: Churl, via flickr[dot]com/photos/churl/528717338

আগের আলোচনা: আয়াত ১-৬ | ৭-৮   

৯। তুমি কি মনে কর গুহা ও রাকীমবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে (বেশি) বিস্ময়কর ছিল?

১০। এটা সেই সময়ের কথা, যখন যুবক দলটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল এবং (আল্লাহর কাছে দু’আ করে) বলেছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি আপনার নিকট থেকে বিশেষ রহমত নাযিল করুন এবং আমাদের এ পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য কল্যাণকর পথের ব্যবস্থা করে দিন।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

(হে মুহাম্মাদ, ﷺ!) আপনি কি মনে করেন, অর্থাৎ ধারণা করেন যে, গুহা ও রাকীমবাসীরা স্বীয় ঘটনার দিক দিয়ে আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে (বেশি) বিস্ময়কর ছিল? ‘কাহফ’ হলো পাহাড়ের গুহা, আর ‘রাকীম’ হলো ওই ফলক যাতে সেখানে আশ্রয় নেওয়া এই যুবকদের নাম ও তাদের বংশধারা লেখা ছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)–এর কাছে তাদের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। (এরই জবাবে ওহির মাধ্যমে আল্লাহ জানিয়ে দেন যে, হে নবী, ﷺ!) ওই সময়কে স্মরণ করুন যখন যুবক দলটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। কাফির সম্প্রদায়ের অত্যাচারে পিষ্ট হয়ে তারা নিজেদের ঈমানের জন্য আশঙ্কাবোধ করছিল। তখন তারা (আল্লাহর কাছে দু’আ করে) বলেছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি আপনার পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত নাযিল করুন এবং আমাদের এ পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য কল্যাণকর (কোনো) পথের ব্যবস্থা করে দিন। [তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

একজন প্রকৃত ঈমানদারের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। আল্লাহ ছাড়া ইবাদাত বা উপাসনার যোগ্য আর কেউ নেই, আল্লাহ ছাড়া চুড়ান্ত বিধানদাতা আর কেউ নয়, আল্লাহ ছাড়া নিরঙ্কুশ আনুগত্যের অধিকারী আর কেউ নয়, আল্লাহর চাইতে বেশি ভালোবাসা পাওয়ার অধিকারী আর কেউ নয়, আল্লাহর চাইতে বেশি ভয় আর কাউকে করা যায় না, আল্লাহর চাইতে বেশি আশাভরসা আর কারও কাছ থেকে করা যায় না — এই বিশ্বাসের নামই হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। প্রথম নবী আদাম (عليه السلام) থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত সব নবী-রাসুলই এই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর দিকে মানুষকে আহ্বান করে গেছেন। এটি অন্তরের মধ্যে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল এমন একটি বিশ্বাস যা একজন অস্বীকারকারী (কাফির) বা একজন ভন্ড (মুনাফিক) থেকে একজন প্রকৃত ঈমানদারকে পৃথক করে ফেলে। অন্তরের মধ্যে লালিত এই দৃঢ় বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটে আমাদের কথাবার্তা ও কাজকর্মের মধ্য দিয়ে। আর এরই ওপর নির্ভর করছে আমাদের পরকালীন জীবনের চুড়ান্ত সাফল্য বা ব্যর্থতা।

সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুকূলে থাকলে তো ভালো। অন্যথায়, আমাদের কারও কারও জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একের পর এক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করার পিছনেই অতিবাহিত হয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি যদি এমন থাকে যে, এই প্রতিকূলতার মধ্যেও কেউ চাইলে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বা সামষ্টিক পরিমন্ডলে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর ওপর বিশ্বাসের দাবী অনুযায়ী তার নিজের জীবনকে পরিচালিত করতে পারে, তাহলে সে সেই পরিবেশে থেকেই লড়াই করে হলেও টিকে থাকতে পারে।

কিন্তু, কারও জন্য পরিস্থিতি যদি এতই প্রতিকূল হয়ে দাঁড়ায় যে, সেখানে অবস্থান করে নিজের ঈমানকে আকড়ে ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে – যেমনটি এখানে বর্ণিত যুবক দলটির ক্ষেত্রে হয়েছিল – তাহলে নিজের ঈমানকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখার স্বার্থে এমন কোনো স্থানে হিজরত করার জন্য সর্বাত্নক চেষ্টা করে যেতে হবে যেখানে ইসলাম পালন করা অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ। আর কারও পক্ষে সেটিও সম্ভব না হলে পঙ্কিলতায় পরিপূর্ণ সেই সমাজের নেতিবাচক সব দিক থেকে নিজেকে যথাযম্ভব গুটিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে। এর ফলে যদি ‘নাগরিক সভ্যতার’ কিছু আরামআয়েশ ত্যাগ করতে হয়, তবে তা-ই করতে হবে। সেইসাথে, মহান আল্লাহর কাছে নিয়মিত দু’আ করে যেতে হবে যেন আমাদের পরিবেশকে তিনি ইসলাম পালনের জন্য অনুকূল করে দেন।

১১। সুতরাং আমি তাদের কানে চাপড় দিয়ে তাদেরকে কয়েক বছর গুহার ভেতর ঘুম পাড়িয়ে রাখলাম।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সুতরাং আমি তাদের কানে পর্দা আচ্ছাদিত করে তাদেরকে কয়েক বছর (একটি) গুহার ভেতর ঘুম পাড়িয়ে রাখলাম। অর্থাৎ, তাদেরক গভীর নিদ্রায় মগ্ন রাখলাম। [তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা: 

হিজরতের পরের জীবনটা বৈষয়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে কষ্টের হলেও হতে পারে। তবে, একজন প্রকৃত ঈমানদার আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এসব কষ্ট স্বীকার করতে পিছপা হয় না। এই কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আল্লাহই তাকে দান করেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য সব উপায়ে তিনি তাকে সাহায্য করেন, যেমনটি এই আয়াতে বর্ণিত ঈমানদার যুবকদের দলটির ক্ষেত্রে লোকালয় থেকে দূরে একটি গুহার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে গভীর নিদ্রায় মগ্ন রাখার মাধ্যমে হয়েছিল।

১২। তারপর তাদেরকে জাগিয়ে দিলাম, এটা লক্ষ্য করার জন্য যে, তাদের দুই দলের মধ্যে কোন দল নিজেদের ঘুমে থাকার মেয়াদকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

তারপর (অর্থাৎ, অনেক দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর) তাদেরকে জাগিয়ে দিলাম, এটা লক্ষ্য করার জন্য যে, (সেই গুহার ভেতর) তাদের অবস্থানকাল নির্ণয় সম্পর্কে (তাদেরই মধ্যে) মতবিরোধকারী দু’দলের মধ্যে কোন দল নিজেদের ঘুমে থাকার মেয়াদকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে। [তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা: 

দুনিয়ার এই জীবনের পরীক্ষাক্ষেত্রে কখনও ‘ভালো সময়’ দিয়ে আবার কখনও ‘খারাপ সময়’ দিয়ে, কখনও ‘শক্তিশালী’ করে আবার কখনও ‘শক্তিহীন’ করে আমাদের সবাইকে আল্লাহ পরীক্ষা করেন। ঈমানদাররাও এর ব্যতিক্রম নয়। এই পরীক্ষায় ভালো ফল করলে আল্লাহ আমাদেরকে আখিরাতে তো পুরস্কৃত করবেনই, সেই সাথে তিনি চাইলে কোনো এক সময়ে এই দুনিয়াতেও আমাদের জন্য আমাদের পরিবেশকে তিনি অনুকূল করে দেবেন। দীর্ঘ নিদ্রা শেষে নির্জন গুহার ভেতর আশ্রয় নেওয়া ঈমানদার যুবকদের দলটিকে জাগিয়ে দেওয়া সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ১লা আগস্ট, ২০১৬    

Advertisements

16 thoughts on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৯-১২): আল্লাহর রাস্তায় হিজরত

  1. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৩-১৪): যেভাবে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে হবে | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৫-১৬): সমাজ যখন শিরকে নিমজ্জিত | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৭-১৮): আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার পূর্বশর্ত | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৯-২০): সাবধানী হতে হবে | আমার স্পন্দন

  5. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২১): নিরাশ হওয়া যাবে না | আমার স্পন্দন

  6. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২২): সঠিক জ্ঞান আহরণ করতে শিখতে হবে | আমার স্পন্দন

  7. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৩-২৪): আল্লাহ না চাইলে আমাদের চাওয়ায় কিছু হয় না | আমার স্পন্দন

  8. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৫-২৬): সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করে যেতে হবে | আমার স্পন্দন

  9. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৭): কুরআনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা যাবে না | আমার স্পন্দন

  10. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৮): সৎ সঙ্গী বেঁছে নিতে হবে | আমার স্পন্দন

  11. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৯-৩১): ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না | আমার স্পন্দন

  12. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩২-৩৬): প্রাচুর্যের পরীক্ষা | আমার স্পন্দন

  13. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩৭-৪১): সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় | আমার স্পন্দন

  14. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৪২-৪৪): জীবনে হঠাত নেমে আসা বিপদ যখন বিপথে যাওয়া থেকে আমাদেরকে বাঁচায়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s