সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৩-১৪): যেভাবে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে হবে

Early spring sun

আগের আলোচনা: আয়াত ১-৬ | ৭-৮ | ৯-১২    

18:13

18:14

১৩। আমি তোমার কাছে তাদের ঘটনা যথাযথভাবে বর্ণনা করছি। তারা ছিল একদল যুবক, যারা নিজ প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদেরকে হিদায়াতে প্রভূত উৎকর্ষ দান করেছিলাম।

১৪। আমি তাদের অন্তর সুদৃঢ় করে দিয়েছিলাম। এটা সেই সময়ের কথা, যখন তারা উঠল এবং বলল, আমাদের প্রতিপালক তিনিই, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মালিক। আমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে মা’বুদ বানিয়ে কখনই ডাকব না। আমরা যদি সেরকম করি, তবে নিঃসন্দেহে আমরা চরম অবাস্তব কথা বলব।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

(হে মুহাম্মাদ, ﷺ!) আমি আপনার কাছে তাদের ঘটনা সঠিকভাবে সত্য সহকারে বর্ণনা করছি। তারা ছিল একদল যুবক, যারা নিজ প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদেরকে হিদায়াতে প্রভূত উৎকর্ষ দান করেছিলাম। আমি তাদের অন্তর সুদৃঢ় করে দিয়েছিলাম, অর্থাৎ সত্য কথা বলার জন্য তাদের অন্তর শক্তিশালী করেছিলাম। এটা সেই সময়ের কথা, যখন তারা উঠে দাঁড়াল তাদের সেই রাজার সামনে যে রাজা তাদেরকে মুর্তির সামনে সিজদা করতে বলেছিল।

ইবনে কাছীর (রহ.)-এর একটি বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, রাজা যখন তাদের আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে পারল তখন তাদেরকে নিজ দরবারে ডেকে পাঠাল এবং তাদেরকে তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তারা নির্ভিকচিত্তে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাওহীদের আকীদা তুলে ধরল, যার বিবরণ সামনে আসছে। তাদের অন্তরের সেই দৃঢ়তা ও অবিচলতার প্রতিই এই আয়াতে ইশারা করা হয়েছে।

তারা বলল, আমাদের প্রতিপালক তো তিনিই, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মালিক। আমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য বানিয়ে কখনই ডাকব না। আমরা যদি সেরকম করি, তবে নিঃসন্দেহে আমরা চরম অবাস্তব কথা বলব। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য বানিয়ে তাকে ডাকলে আমরা তো কুফরির দোষে দুষ্ট হয়ে সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে যাব। [তাফসির আল-জালালাইন ও তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

সত্য ও মিথ্যা, ভালো ও মন্দ, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারার ক্ষমতা দিয়ে সুস্থ মস্তিষ্কের প্রতিটি মানুষকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। আমাদের জন্মগত স্বভাবজাত এই বৈশিষ্ট্যটি ইসলামের পরিভাষায় ফিতরত নামে পরিচিত। প্রতিটি মানবশিশু ফিতরতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু, পরিবার, সমাজ ও পরিবেশের কুপ্রভাবে নিজের অজান্তেই অনেক মানুষ তার স্বাভাবিক ফিতরত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। সত্য, ভালো ও ন্যায় যা কিছু আছে তার সবই হলো ফিতরত। আর মিথ্যা, মন্দ ও অন্যায় যা কিছু আছে তার সবই হলো ফিতরত থেকে বিচ্যুতি।

সকল সত্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় সত্য হলো আল্লাহ এক, যার কোনো শরীক বা অংশীদার নেই, যিনি মানুষকে পথ দেখানোর জন্য যুগে যুগে মানুষের মধ্য থেকেই নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন এবং তাঁদের ওপর সঠিক পথের দিশা হিসেবে কিতাব নাযিল করেছেন। পরিবেশ ও পরিস্থিতি যতই অন্ধকারাচ্ছন্ন হোক না কেন, কোনো মানুষ প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বেরিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত ফিতরতের ওপর চলতে চাইলে আল্লাহর ইচ্ছায় একসময় না একসময় সে সত্যের সন্ধান পেয়েই যাবে। সে তার প্রকৃত প্রভু আল্লাহকে চেনার মতো করে চিনতে পারবে। তার প্রতিটি কথা, কাজ ও চিন্তার দ্বারা সে তার মহান প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য উদগ্রীব থাকবে। আপাতদৃষ্টিতে আল্লাহকে চেনার ও তাঁকে পাওয়ার এই পথটিকে কঠিন বলে মনে হতে পারে, কিন্তু যারা আন্তরিকভাবেই তাঁকে পেতে চায় তাদের জন্য আল্লাহ তা সহজ করে দেন।

একবার যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর অন্তর্নিহত মর্ম আত্মস্থ করে ফেলে তারা শত প্রতিকূলতা স্বত্বেও এই বিশ্বাসের ওপর অটল থাকার জন্য আমৃত্যু চেষ্টা করে যায়। এতে করে যদি তাদের এতদিনকার লালিত দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনধারাকে আমূল পাল্টে ফেলতে হয়, তবে তারা নির্দ্বিধায় তাই করে। এতে করে যদি স্রোতের বিপরীতেও চলতে হয়, তবে তারা নিঃসঙ্কোচে সেই রাস্তাই ধরে। নিন্দুকের নিন্দা, সমালোচকের সমালোচনা, পার্থিব ক্ষতি – এসবের কোনো পরোয়া তারা করে না।

উদাহরণস্বরূপ, তারা তাদের সারাটা দিন ক্রিকেট খেলা দেখে নষ্ট করে না। তারা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করে, তাই নামাযের সময় হলে তারা প্রস্তুত হয়ে মনোযোগ সহকারে নামাযে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারা শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশকেই চূড়ান্ত শিরোধার্য করে, তাই তারা খেলা চলাকালীন সময়ে কোনো আপত্তিকর বিজ্ঞাপন বা দৃশ্য দেখা থেকে সচেতনভাবে নিজেদেরকে বিরত রাখে। তারা আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তাই খেলা সংক্রান্ত বিভিন্ন আজেবাজে কথাবার্তায় লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে তারা তাদের জিহ্বাকে সবসময় আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত রাখে। তারা আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে, তাই তারা কাজে ফাঁকি দিয়ে খেলা দেখে হারাম উপার্জন করে না।

এভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, যিনি সত্যিকার অর্থেই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর ওপর চলতে চেষ্টা করছেন তাঁর অনেক আচরণই হয়ত সমাজে প্রচলিত আচরণের চাইতে খানিকটা আলাদা। ফলে, তিনি মুখে কিছু না বললেও সমাজের বাকী লোকেরা একসময় না একসময় ঠিকই বুঝে ফেলবে যে, তাঁর জীবনদর্শন অন্যদের থেকে ভিন্ন। অনেকেই অধীর হয়ে এর কারণ জানতে কৌতুহলী হয়ে পড়বে। এই কৌতুহলী লোকদেরকে আল্লাহমুখী করার জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ।

কোনো কৌতুহলী শ্রোতাকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর দিকে ডাকতে হলে সবার আগে তাকে বোঝাতে হবে আল্লাহ কে, কী তাঁর ক্ষমতা, কী তাঁর গুণাবলী। তার একজন হিতাকাঙ্খী হিসেবে তাকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে হবে যে, আল্লাহ এক। না তিনি নিজে জন্ম নিয়েছেন, না তিনি কোনো সন্তান জন্ম দিয়েছেন। তিনিই একমাত্র চিরঞ্জীব। একমাত্র তিনিই সকল ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ছাড়া বাকী সবই তাঁর সৃষ্টি। তিনি কোনো কিছুর ওপর মুখাপেক্ষী নন, বরং গোটা সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী। তাঁর ইচ্ছা ও অনুমতি ছাড়া কিছুই হয় না। সেই ব্যক্তি এই কথাগুলো উপলদ্ধি করতে পারলে তাকে জানিয়ে দিতে হবে যে, যেহেতু আল্লাহই তাকে সৃষ্টি করেছেন, যেহেতু জন্ম থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুহুর্তে নিজের অস্তিত্বের জন্য সে আল্লাহর ওপরই নির্ভরশীল, তাই সেই মহান সত্ত্বার প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তার উচিৎ তার বাকী জীবনটুকু আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্যে কাটিয়ে দেওয়া। একমাত্র এই পথে চললেই মিলবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন অনাবিল শান্তি, অন্যথায় মিলবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও পরকালীন মর্মন্তুদ শাস্তি।

মানুষকে আল্লাহমুখী করতে হলে এভাবেই করতে হবে। একজন সত্যিকারের মুসলিম যদি মানুষের কাছে তার প্রতিটি কাজের জন্য ব্যাখ্যা প্রদান করতে থাকে, তবে তারাও তাদের মতো করে পাল্টা ব্যাখ্যা দিতে থাকবে। এভাবে কোনো কিছুর মীমাংসা হয় না বললেই চলে। তাই প্রথমে তাদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকতে হবে। একবার যদি কেউ আল্লাহকে চেনার মতো করে চিনতে পারে তাহলে প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা করে ব্যাখ্যা চাওয়ার পরিবর্তে সে বিনয়ে নত হয়ে স্বতঃস্ফুর্তভাবে তার পরবর্তী গোটা জীবনটাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে কাটিয়ে দিতে সর্বাত্নক চেষ্টা করে যাবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সবাইকে তাঁকে চেনার মতো করে চিনতে পারার তৌফিক দিন।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ১০ই আগস্ট, ২০১৬   

Photo credit: Ander Tim 

Advertisements

14 thoughts on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৩-১৪): যেভাবে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে হবে

  1. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৫-১৬): সমাজ যখন শিরকে নিমজ্জিত | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৭-১৮): আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার পূর্বশর্ত | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৯-২০): সাবধানী হতে হবে | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২১): নিরাশ হওয়া যাবে না | আমার স্পন্দন

  5. পিংব্যাকঃ ইসলামের দিকে মানুষকে ডাকার ক্ষেত্রে আমাদের কর্মপন্থা যেমনটি হওয়া উচিত | আমার স্পন্দন

  6. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২২): সঠিক জ্ঞান আহরণ করতে শিখতে হবে | আমার স্পন্দন

  7. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৩-২৪): আল্লাহ না চাইলে আমাদের চাওয়ায় কিছু হয় না | আমার স্পন্দন

  8. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৫-২৬): সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করে যেতে হবে | আমার স্পন্দন

  9. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৭): কুরআনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা যাবে না | আমার স্পন্দন

  10. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৮): সৎ সঙ্গী বেঁছে নিতে হবে | আমার স্পন্দন

  11. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৯-৩১): ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না | আমার স্পন্দন

  12. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩২-৩৬): প্রাচুর্যের পরীক্ষা | আমার স্পন্দন

  13. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩৭-৪১): সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় | আমার স্পন্দন

  14. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৪২-৪৪): জীবনে হঠাত নেমে আসা বিপদ যখন বিপথে যাওয়া থেকে আমাদেরকে বাঁচায়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s