সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৫-১৬): সমাজ যখন শিরকে নিমজ্জিত

Easter Island Ahu Tongariki

আগের আলোচনা: আয়াত ১-৬ | ৭-৮ | ৯-১২ | ১৩-১৪

18:15

১৫। এই আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজন, যারা ওই প্রতিপালকের পরিবর্তে আরও বহু মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে। (তাদের বিশ্বাস সত্য হলে) তারা নিজ মাবুদদের সপক্ষে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে?

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

এরা আমাদেরই স্বজাতি। এরা আল্লাহর পরিবর্তে আরও অনেক উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে। (তাদের বিশ্বাস সত্য হলে) তারা নিজ উপাস্যদের সপক্ষে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে? অর্থাৎ, যে আল্লাহর প্রতি অংশীদার সাব্যস্ত করে তার চেয়ে বড় যালিম আর কেউ নয়। [তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

আল্লাহর সঙ্গে শরীক বা অংশীদার সাব্যস্ত করাকে ইসলামের পরিভাষায় শিরক বলে। এর চাইতে বড় কোনো অপরাধ মানুষ করতে পারে না। “আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এর নিচের যেকোনো গুনাহ যার ক্ষেত্রে চান ক্ষমা করে দেন।“ [কুরআন, ৪:১১৬] এটি এই কারণে যে, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করে সে সঠিক পথ থেকে বহু দূরে সরে যায়।” [৪:১১৬] আর সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার শাস্তিস্বরূপ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। তার ঠিকানা জাহান্নাম।” [৫:৭২] একজন মানুষ সারা জীবন ধরে যত ভালো কাজ করুক না কেন, সে যদি এই একটি মাত্র অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তাহলে সে যেন ভুলে না যায় যে, “তুমি যদি শিরক কর, তবে তোমার সমস্ত কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।” [৩৯:৬৫]

যেহেতু এটিই ক্ষমার অযোগ্য একমাত্র গুনাহ, তাই কীভাবে শিরক হতে পারে তা আমাদের সবার জানা থাকা দরকার, যেন আমরা এই মহা পাপ থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকতে পারি।

আল্লাহকে অস্বীকার করা এক প্রকার শিরক। নাস্তিকরা মনে করে যে, সবই প্রকৃতির (“Mother Nature”) লীলা, স্রষ্টা বলে কিছু নেই, যদিও বাস্তবতা হলো: “তিনিই আল্লাহ, যিনি সৃষ্টিকর্তা, অস্তিত্বদাতা, রূপদাতা। সর্বাপেক্ষা সুন্দর নামসমূহ তাঁরই। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে তা তাঁর তাসবীহ পাঠ করে এবং তিনিই ক্ষমতাময়, হিকমতের মালিক।” [৫৯:২৪] সমসাময়িক বিশ্বে যারা বিজ্ঞানকে ধর্ম বানিয়ে নিয়েছে তারা প্রকৃতিকে, যাকে তারা বলে “Mother Nature”, তাকে স্রষ্টার স্থলাভিষিক্ত করার মাধ্যমে এবং স্রষ্টাকে যাবতীয় সমীকরণ থেকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ক্রমাগতভাবে শিরক করে যাচ্ছে।

অনেকে আবার আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করলেও আল্লাহকে নিছক সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মানে। এদের মতে, আল্লাহ সৃষ্টির শুরু করে দিয়েছেন বটে, কিন্তু এরপর থেকে সবকিছু নিজের নিয়মেই চলছে। আল্লাহর ক্ষমতা এত সীমাবদ্ধ নয়। “নিজ প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা কর, যার মর্যাদা সমুচ্চ, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ও সুগঠিত করেছেন, এবং যিনি সবকিছুকে এক বিশেষ পরিমিতি দিয়েছেন, তারপর পথ প্রদর্শন করেছেন।” [৮৭:১-৩] আল্লাহর অসীম ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ মনে করার কারণে এরা শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। সৃষ্টির শুরুতে আল্লাহ সৃষ্টি তো করেছেনই, সেইসাথে তিনি ক্রমাগতভাবে সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। তিনি সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেন না। তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে কিছুই হয় না।

এ তো গেল আল্লাহর অস্তিত্ব বা তাঁর ক্ষমতাকে অস্বীকার করার শিরকের কথা। এগুলো হলো অবিশ্বাস বা আংশিক বিশ্বাসের শিরক। কেউ আবার এমন কিছু বিশ্বাস করে যে, সেই বিশ্বাসটিই শিরক। যেমন, কোনো কোনো সম্প্রদায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী সত্য ও সুন্দরের স্রষ্টা এবং ধ্বংস ও নাশের স্রষ্টা আলাদা আলাদা। তাদের মতে, এই বিপরীতধর্মী স্রষ্টারা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। কুরআনে এই বিশ্বাসকে খন্ডন করা হয়েছে এভাবে: “সেরকম হলে প্রত্যেক ইলাহ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত, তারপর তারা একে অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করত। তারা যা বলে তা হতে আল্লাহ পবিত্র।” [২৩:৯১] শুধু তাই নয়, “যদি আসমান ও যমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্য ইলাহ থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। সুতরাং তারা যা বলছে আরশের মালিক আল্লাহ তা থেকে পবিত্র।” [২১:২২]

তবে, এর চেয়েও অধিক সংখ্যক মানুষ বিভিন্ন দেবতাকে আল্লাহর একেকটি ক্ষমতা ও গুণ আরোপ করার মাধ্যমে শিরকের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় নবী ইউসুফ (عليه السلام) দেবতা সংক্রান্ত এই বিশ্বাসটিকে খন্ডন করেছিলেন এভাবে: “হে আমার কারা সঙ্গী-দ্বয়! ভিন্ন-ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না সেই এক আল্লাহ, যার ক্ষমতা সর্বব্যাপী? তাঁকে ছেড়ে তোমরা যার ইবাদত করছ তার সারবত্তা কতগুলো নামের বেশি কিছু নয়, যা তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা রেখে দিয়েছ। আল্লাহ তার পক্ষে কোনো দলিল নাযিল করেননি। হুকুম দানের ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নেই। তিনিই এ হুকুম দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁর ভিন্ন অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল-সোজা পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।” [১২:৩৯-৪০] উপরন্তু, এই দেবতারা আমাদের উপকার বা ক্ষতি কিছুই করতে পারে না। কুরআনে বিষয়টিকে একটি উপমার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে এভাবে: “হে মানুষ! একটি উপমা দেওয়া হচ্ছে। মনোযোগ দিয়ে শোন। তোমরা দু’আর জন্য আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে ডাক, তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারে না, যদিও এ কাজের জন্য তারা সকলে একত্রিত হয়ে যায়। এমনকি মাছি যদি তাদের থেকে কোনো জিনিস ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তাও তারা তার থেকে উদ্ধার করতে পারে না। এরূপ দু’আকারীও বড় দুর্বল এবং যার কাছে দু’আ করা হয় সেও। তারা আল্লাহর যথাযথ মর্যাদা উপলব্ধি করেনি। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ শক্তিরও মালিক, ক্ষমতারও মালিক।” [২২:৭৩-৭৪]

অনেকে আবার আল্লাহর উপর সৃষ্টির গুণাবলী আরোপ করে শিরকের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, যদিও বাস্তবে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে কোনো সাদৃশ্য নেই। এমনকি, আল্লাহ কেমন তা কল্পনা করতেও আমরা অক্ষম। আমরা যদি মনে মনে ভাবি যে, আল্লাহ এমন, তবে আল্লাহ অবশ্যই তেমন নন। “কোনো জিনিস নয় তাঁর অনুরূপ। তিনিই সব কথা শোনেন, সব কিছু দেখেন।” [৪২:১১]

পক্ষান্তরে, কেউ যদি মনে করে যে, অমুক ব্যক্তির রূপে, বা তমুক ব্যক্তির উপর ভর করে আল্লাহ এই পৃথিবীতে এসেছিলেন বা এসেছেন, অথবা আল্লাহ স্ত্রী বা সন্তান গ্রহণ করেছেন, তবে সেই বিশ্বাসটিও শিরক।

শিরক দুই প্রকার: ছোট শিরক ও বড় শিরক। কোনো নির্দিষ্ট কাজ ছোট শিরক হলে কেবলমাত্র সেই কাজটি ওই শিরক দ্বারা কলুষিত হয়ে পড়ে। কোনো মুসলিম এক বা একাধিক ছোট শিরকের মধ্যে জড়িয়ে পড়লে তিনি গুনাহগার তো হবেনই, তবে তারপরও তিনি মুসলিম বলেই গণ্য হবেন। পক্ষান্তরে, কোনো ব্যক্তি বড় শিরকের মধ্যে জড়িয়ে পড়লে তার সারা জীবনের যাবতীয় ভালো কাজ চুড়ান্ত ফলাফলের নিরিখে বরবাদ হয়ে যাবে এবং তিনি অতীতে মুসলিম বলে পরিচিত থাকলে ইসলাম থেকেও পুরোপুরি খারিজ হয়ে যাবেন।

ছোট শিরকের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্খার পরিবর্তে লোক দেখানোর জন্য কোনো ইবাদত করা বা ইবাদত করার ভান ধরা। ইসলামের পরিভাষায় একে বলে ‘রিয়া’। ‘রিয়া’ মিশ্রিত ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না।

আল্লাহর উপর ভরসা না করে উপকরণের উপর ভরসা করা ছোট শিরকের আরেকটি উদাহরণ। যেমন, কেউ যদি মনে করে যে, ওষুধ খেলেই অসুখ সেরে যাবে তাহলে তিনি ছোট শিরক করে বসলেন, কেননা সুস্থ করার মালিক আল্লাহ। ওষুধ উপকরণ মাত্র। ওষুধ খেলে উপকার হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

প্রমাণিত ভৌত কার্যকারণ ব্যতিরেকে অথবা কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত না হওয়া স্বত্ত্বেও কোনো একটি জিনিসকে উপকরণ বা কারণ মনে করে বসাও ছোট শিরক। উদাহরণস্বরূপ, আকাশের তারার অবস্থানের সঙ্গে বৃষ্টিপাত সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও কেউ যদি মনে করে যে, অমুক দিনে তমুক সময়ে ওই তারা উদিত হলে তখন বৃষ্টি হবে, তবে সে ছোট শিরকে জড়িয়ে পড়ল। জ্যোতিষশাস্ত্র এরকমই অনুমাননির্ভর একটি শাস্ত্র, ফলে জ্যোতিষীদের কথা বিশ্বাস করাও এই পর্যায়ের একটি শিরক। কিছু কাজের মাধ্যমেও আমরা এরকম ছোট শিরক করে বসতে পারি। যেমন, আল্লাহর নাম বা কালাম লেখা নেই এমন সব তাবিজ ব্যবহার করা এবং মনে করা যে, এর মাধ্যমে মঙ্গল অর্জন করা যাবে ও অমঙ্গল দূরীভূত হবে। এটি এই কারণে ছোট শিরক হবে যে, একটি দুর্বোধ্য নকশা, কাগজ, সুতা ইত্যাদি আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে এমনটি না কুরআনে আছে, না আমাদের নবী (ﷺ) তেমনটি বলেছেন, এবং ভৌত কার্যকারণ দ্বারাও এটি প্রমাণিত নয়।

নির্দিষ্ট কিছু কথার মাধ্যমেও আমরা ছোট শিরকে জড়িয়ে পড়তে পারি। যেমন, আল্লাহর পরিবর্তে কোনো সৃষ্টির নামে শপথ করা। অথবা, “চালকের দক্ষতাতেই এই যাত্রায় জানে বেঁচে ফিরলাম” – এমনটি বলাও ছোট শিরক, কেননা বাঁচানোর মালিক আল্লাহ, মারার মালিকও আল্লাহ। চালক এক্ষেত্রে একটি মাধ্যম মাত্র। সৃষ্টির জন্য শোভা পায় না এমন কোনো খেতাবে কাউকে ভূষিত করাও ছোট শিরক।

এ তো গেল ছোট শিরকের কথা। আল্লাহর প্রতি ঈমান থাকার পরেও এগুলোতে জড়িয়ে পড়লে আমরা মুসলিম থাকতে পারব বটে, কিন্তু বড় গুনাহগার হয়ে যাব। পরকালীন জীবনে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই এসব ছোট শিরক থেকে বাঁচার জন্য আমাদেরকে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যেতে হবে। কিন্তু, বড় শিরকে জড়িয়ে পড়লে আর রক্ষা নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের ঈমানটুকুও চলে যাব। আমরা ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাব। আল্লাহ আমাদেরকে সেই করুণ পরিণতি থেকে রক্ষা করুন।

নামায, দু’আ, কুরবানি ইত্যাদি ইবাদতের যত কাজ আছে তার কোনোটি আল্লাহ ছাড়া আর কারও উদ্দেশ্যে করলে সেটি বড় শিরক বলে গণ্য হবে এবং কোনো ব্যক্তি তেমনটি করলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে।

শিরকের অসারতা ও ভয়াবহতা এবং ছোট ও বড় শিরক কীভাবে হতে পারে তা বোঝার পর আমাদের নিজেদের দায়িত্ব হলো এই মহা পাপ থেকে বেঁচে থাকা। সেইসাথে, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, সহকর্মী – যাদেরকে বিষয়টি বোঝানো সম্ভব তাদেরকে দরদের সাথে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। কেউ আমাদের কথা শুনবে, অনেকেই শুনবে না। আমাদের কাজ প্রচার করা, জবরদস্তি করা নয়। তবে, তারা আমাদের কথা শুনুক বা না শুনুক, আমরা আমাদের বিশ্বাসের ওপর অটল থাকব। সারা দুনিয়া যদি আমাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায় তবুও আমরা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস থেকে একচুল পরিমাণ নড়ব না।

আর অতীতে আমরা নিজেরা জেনে বা না জেনে কোনো শিরকের মধ্যে জড়িয়ে পড়লে সেই গুনাহের জন্য এখনই আন্তরিকভাবে তওবা করে নিতে হবে এবং আল্লাহর কাছে মাফ চাইতে হবে। বড় শিরকের গুনাহ থেকে তওবা না করে মৃত্যুবরণ করলে সেই অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। খাঁটিভাবে তওবা করলে শিরকের মতো গুনাহও আল্লাহ মাফ করে দেন। তিনিই তো আমাদেরকে অভয় দিয়ে বলেছেন: “বলে দাও, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজ স্বত্ত্বার উপর সীমালঙ্ঘন করেছে, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [৩৯:৫৩] যারা বড় শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত তাদেরকে তওবা করার জন্য আল্লাহ বিশেষভাবে আহ্বান করছেন। “তারাও নিশ্চয় কাফির হয়ে গিয়েছে যারা বলে ‘আল্লাহ তিনজনের মধ্যে তৃতীয় জন’। অথচ এক ইলাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তারা যদি তাদের এ কথা থেকে বিরত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি স্পর্শ করবে।” [৫:৭৩] একটি নির্দিষ্ট শিরকে জড়িতদের উদ্দেশ্যে এই কঠোর হুশিয়ারি দেওয়ার ঠিক পরপরই আল্লাহ বলছেন: “তারপরও কি তারা ক্ষমার জন্য আল্লাহর দিকে রুজু করবে না এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? অথচ আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [৫:৭৪] শিরকের গুনাহ থেকে তওবা করার পর আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো আর যতদিন বেঁচে আছি ততদিন “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর ওপর অটল থাকার জন্য অবিরাম চেষ্টা করে যাওয়া। তেমনটি করতে পারলে আমাদের প্রতি আল্লাহর ওয়াদা হলো: “যে ব্যক্তি ঈমান আনে, সৎ কর্ম করে, অতঃপর সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকে – আমি তার পক্ষে পরম ক্ষমাশীল।” [২০:৮২]

18:16

১৬। (সাথী বন্ধুরা!) তোমরা যখন তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাদের থেকেও, তখন চলো, ওই গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য নিজ রহমত বিস্তার করে দেবেন এবং তোমাদের বিষয়টা যাতে সহজ হয় সেই ব্যবস্থা করে দেবেন।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

যুবকরা পরস্পর একজন অন্যজনকে বলল, (সাথী বন্ধুরা!) তোমরা যখন তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাদের থেকেও, তখন চলো, ওই গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর। অর্থাৎ, তোমরা যখন সত্য দীন অবলম্বন করেছ এবং তোমাদের শহরবাসী তোমাদের শ্ত্রু হয়ে গেছে, তখন এ দীন অনুসারে ইবাদত-বন্দেগী করার উপায় কেবল এই যে, তোমরা শহর ত্যাগ করে পাহাড়ে চলে যাও এবং তার গুহায় গিয়ে আশ্রয় নাও। তাহলে কেউ তোমাদের খুঁজে পাবে না। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য নিজ রহমত বিস্তার করে দেবেন এবং তোমাদের বিষয়টা যাতে সহজ হয় সেই ব্যবস্থা করে দেবেন। [তাফসির আল-জালালাইন ও তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

প্রকৃত মুসলিম তো সেই যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর দাবী অনুযায়ী যা করা উচিৎ তা করার চেষ্টা করে, আর যা পরিহার করা উচিৎ তা বর্জন করতে সচেষ্ট থাকে। ফলে, তাকে কখনো কখনো সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস, সংস্কার, রীতিনীতি, প্রথা ইত্যাদির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হতে পারে। সমাজের লোকজনের তাতে আপত্তি না থাকলে তার জীবন তো সহজ হয়েই গেল। আর তারা যদি তর্কে লিপ্ত হতে চায় তাহলে প্রসঙ্গভিত্তিক বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর স্বত্ত্বা ও গুণাবলীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর মৌলিক দাওয়াত দেওয়া যেতে পারে। এরপর প্রয়োজন পড়লে তাদের ভুলত্রুটিগুলো দরদের সাথে ধরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে করে হয় তারা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা বুঝতে পারবে, অথবা পারবে না। তারা যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সক্ষম হয় এবং আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দেয়, তবে সেটিও আমাদের জন্য ভালো। কেননা, তেমনটি হলে পারস্পরিক মতপার্থক্য বজায় রেখেও আমরা উভয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সহ-অবস্থান করতে পারবে।

পক্ষান্তরে, কট্টর ইসলামবিদ্বেষীরা, যারা কিনা ইসলামের চিহ্নকে পর্যন্ত মিটিয়ে দেওয়ার জন্য সংকল্পবদ্ধ ও একতাবদ্ধ, যদি ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক দিয়ে সমাজে ব্যাপকভাবে প্রভাবশালী হয়, এবং সেখানকার সত্যিকারের মুসলিমরা হয় দুর্বল ও প্রতিপত্তিহীন, তাহলে নিজেদের ঈমানকে ধরে রাখার স্বার্থে অনুকূল পরিবেশের উদ্দেশ্যে হিজরতের রাস্তা বেঁছে নেওয়ার জন্য সর্বাত্নক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কেউ যদি নিজের ঈমানকে বাঁচাতে হিজরতের রাস্তা বেছে নেয় এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে থাকে, তবে আল্লাহ তার জন্য তার এই ত্যাগকে সহজ করে দেবেন এবং তার ঈমানকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করবেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের জন্য আমাদের পরিবেশকে অনুকূল করে দিন, যেন নিজেদের ঈমানকে ধরে রাখার জন্য আমাদেরকে হিজরত করতে না হয়। আর যদি হিজরত করতেই হয়, তবে তিনি যেন আমাদের জন্য তা সহজ করে দেন।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৭ই আগস্ট, ২০১৬

Photo credit: Nicolas de Camaret

Advertisements

12 thoughts on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৫-১৬): সমাজ যখন শিরকে নিমজ্জিত

  1. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৭-১৮): আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার পূর্বশর্ত | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৯-২০): সাবধানী হতে হবে | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২১): নিরাশ হওয়া যাবে না | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২২): সঠিক জ্ঞান আহরণ করতে শিখতে হবে | আমার স্পন্দন

  5. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৩-২৪): আল্লাহ না চাইলে আমাদের চাওয়ায় কিছু হয় না | আমার স্পন্দন

  6. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৫-২৬): সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করে যেতে হবে | আমার স্পন্দন

  7. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৭): কুরআনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা যাবে না | আমার স্পন্দন

  8. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৮): সৎ সঙ্গী বেঁছে নিতে হবে | আমার স্পন্দন

  9. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৯-৩১): ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না | আমার স্পন্দন

  10. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩২-৩৬): প্রাচুর্যের পরীক্ষা | আমার স্পন্দন

  11. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩৭-৪১): সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় | আমার স্পন্দন

  12. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৪২-৪৪): জীবনে হঠাত নেমে আসা বিপদ যখন বিপথে যাওয়া থেকে আমাদেরকে বাঁচায়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s