লাইলাতুল কদর: হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ একটি রাত

১৯৯৪ সালের জুলাই মাসের কথা। ক্যালিফোর্নিয়ার রোজ বোল স্টেডিয়ামে চলছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা। মুখোমুখি হয়েছে রোমারিওদের ব্রাজিল আর ব্যাজ্জিওদের ইতালি। পৃথিবীর অপর প্রান্তে আমি বুদ হয়ে বসে আছি টেলিভিশন স্ক্রিনের সামনে। নির্ধারিত নব্বই মিনিটের খেলা শেষ হল। কোন দলই গোল করতে পারল না। খেলা গড়াল অতিরিক্ত সময়ে, তাতেও কোন মিমাংসা হল না। অবশেষে খেলা গড়াল পেনাল্টি শুট আউটে। ব্যাজ্জিও গোলপোস্টে বল না পাঠিয়ে বল পাঠিয়ে দিলেন আকাশের দিকে, আর পরোক্ষভাবে জিততে সাহায্য করলেন ব্রাজিলকে। চতুর্থবারের মত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হল ব্রাজিল।

ক্যালিফোর্নিয়াতে খেলা তো শেষ হল, আর এদিকে আমার এখানে রাত গড়িয়ে ভোর হয়ে গেল। নির্ঘুম একটি রাত কাটালাম ফুটবল খেলা দেখে। ঘুম আমাদের সবারই প্রিয়। তবে আমাদের ভালোবাসা বা আগ্রহের কাছে অনেক সময় সেই ঘুমও হার মানে। আমরা কেউ রাত কাটিয়ে দেই মুভি দেখে, কেউ স্প্যানিশ লা লিগা দেখে, কেউ আবার পছন্দের বই পড়ে। আবার অনেক সময় জীবিকার তাগিদে বা বিপদে পড়েও আমাদের রাত জাগতে হয়। আমরা যে কারণেই রাত জাগি না কেন, তা এটাই প্রমাণ করে যে বিষয়টি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। হোক তা শখের কারণে বা সিরিয়াস কারণে।

আচ্ছা বলুন তো, একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী হওয়া উচিৎ? একজন সত্যিকার মুসলিম আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে, ফলে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও কুন্ঠাবোধ করে না। আমরা আল্লাহর জন্য কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করেছি? আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় আমরা কয়টি রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি?

lailatul-qadrমুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের সবার জন্য আদর্শ। তিনি জীবনে কখনই কোন পাপ কাজ করেননি। এরপরও তার দ্বারা অনিচ্ছাকৃতভাবে যদি কখনো কোন ভুলভ্রান্তি হয়েও থাকে তবে তাও আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। অর্থাৎ তার আমলনামা ভালো কাজে পরিপূর্ণ আর সমস্ত রকম খারাপ কাজ থেকে মুক্ত। ফলে তিনি চাইলে খুব বেশি নফল ইবাদাত না করলেও পারতেন, কিন্তু তারপরও তিনি রাতের একটি বড় অংশ না ঘুমিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের জন্য নফল নামাযে কাটিয়ে দিতেন।

রাতের এই নামায আমাদের আত্মসংশোধনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টা হয় কোলাহলমুক্ত। বেশিরভাগ লোক ঘুমিয়ে থাকে। রাতের এই নামাযে বান্দা আল্লাহর সাথে একান্ত কথপোকথনে রত থাকে। দিনের পর দিন এই নামাযের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সাথে একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলে। ফলে বান্দা সব অবস্থাতেই আল্লাহর উপর ভরসা করতে শেখে, বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করতে শেখে, সর্বোপরি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হতে শেখে, যেমনটি আল্লাহ বলেন (মর্মার্থ):

“হে চাদর আবৃত!

রাতে সালাতে দাঁড়াও কিছু অংশ ছাড়া।

রাতের অর্ধেক কিংবা তার চেয়ে কিছুটা কম।

অথবা তার চেয়ে একটু বাড়াও। আর স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে কুরআন আবৃত্তি কর।

নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি এক অতিভারী বাণী নাযিল করেছি।

নিশ্চয় রাত জাগরণ আত্ম-সংযমের জন্য অধিকতর প্রবল এবং স্পষ্ট বলার জন্য অধিকতর উপযোগী।

নিশ্চয় তোমার জন্য দিনের বেলায় রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা।

আর তুমি তোমার রবের নাম স্মরণ কর এবং একাগ্রচিত্তে তার প্রতি নিমগ্ন হও।

তিনি পূর্ব আর পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। সুতরাং তাকেই তুমি কার্য সম্পাদনকারীরূপে গ্রহণ কর।” [আল কুরআন ৭৩:১-৯]

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার রবের এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও, এমনকি সফরে থাকা অবস্থাতেও তিনি রাতের এই নফল নামায বাদ দিতেন না। রাতের এই নামাযের মাধ্যমে বান্দাকে কষ্টে ফেলা আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়, বরং তাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও মনোবলকে দৃঢ় করাই উদ্দেশ্য, চাই তা পরিমাণে কম হোক বা বেশি হোক। আল্লাহ বলেন (মর্মার্থ):

“নিশ্চয় তোমার রব জানেন যে, তুমি রাতের দুই-তৃতীয়াংশের কিছু কম, অথবা অর্ধরাত অথবা রাতের এক-তৃতীয়াংশ সালাতে দাঁড়িয়ে থাক এবং তোমার সাথে যারা আছে তাদের মধ্য থেকে একটি দলও। আর আল্লাহ রাত ও দিন নিরূপণ করেন। তিনি জানেন যে, তোমরা তা করতে সক্ষম হবে না। তাই তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন। অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকু পড়। তিনি জানেন তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে পৃথিবীতে ভ্রমণ করবে, আর কেউ কেউ আল্লাহর পথে লড়াই করবে। অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকু পড়। আর সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। আর তোমরা নিজেদের জন্য মঙ্গলজনক যা কিছু অগ্রে পাঠাবে তোমরা তা আল্লাহর কাছে পাবে প্রতিদান হিসেবে উৎকৃষ্টতর ও মহত্তর রূপে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আল কুরআন ৭৩:২০]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা রাতের এই বিশেষ নামায, বা তাহাজ্জুদের জন্য কোন ন্যুনতম পরিমাণ বা রাকাত সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেননি। আমাদের জন্য যতটুকু সহজ ততটুকু পড়াই যথেষ্ট। হতে পারে তা দুই রাকাত বা চার রাকাত বা আরো বেশি। তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য রাকাত সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, মনের একাগ্রতা আর আল্লাহমুখিতাই আসল।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তার অসংখ্য সাহাবী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং পরবর্তী প্রজন্মসমূহের মুত্তাকী ব্যক্তিরা রাতের একটি বড় অংশ কাটিয়ে দিতেন তাহাজ্জুদ নামাযে, আল্লাহর সাথে একান্ত কথপোকথনে। রাতের এই নামায, যা কিয়ামুল লাইল নামেও পরিচিত, তা ইশার ফরয নামাযের পরে থেকে নিয়ে ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত আদায় করা যায়। তবে রাতের শেষ অংশে আদায় করতে পারলে বেশি ভাল, আগে আদায় করলেও কোন ক্ষতি নেই।

আমরা মুখে মুখে আল্লাহকে ভালবাসার আর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসরণ করার দাবী করি ঠিকই, কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ আমল, অর্থাৎ তাহাজ্জুদ, বা কিয়ামুল লাইলের সাথে আমাদের কোন রকম সম্পর্ক নেই বললেই চলে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে আমাদের অন্তর দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে, আধ্যাত্নিক দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ছি। আমরা যদি আসলেই আল্লাহকে ভালবাসতে চাই, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করতে চাই তবে প্রথমে আমাদের অন্তরকে নরম করতে হবে, আল্লাহর ভয়ে এবং তার রহমতের আশায় অঝোরে চোখের পানি ফেলতে হবে, আল্লাহর কাছে রাতের নির্জনে নিজেকে সপে দিতে হবে।

***

তবে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আশার আলো এখনো নিভু নিভু করে জ্বলছে। আমাদের অন্তর এখনো পুরোপুরি মরে যায়নি। রামাদান মাস এর একটি প্রমাণ। যার ভিতরে সামান্য পরিমাণ ঈমান আছে তিনিও এই মাসে চেষ্টা করেন বছরের বাকী ১১ মাসের চেয়ে বেশি অপেক্ষাকৃত ভাল মুসলিম হতে। এদের মধ্যে যারা সারা বছর পাচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিতভাবে পড়েন না তারা অন্তত রামাদান মাসে পাচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিতভাবে পড়ার চেষ্টা করেন।

রামাদানের আরেকটি প্রাণভোমরা হল তারাবী নামায। সাধারণত ইশার নামাযের পর মসজিদগুলোতে জামাতের সাথে এই দীর্ঘ নামায পড়া হয়। অনেকে বাসাতেও এই নামায পড়েন। তারাবী একটি ভিন্ন নাম হলেও এটিও তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইলের সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে, যেহেতু এই নামায ইশার নামাযের পরে এবং ফজরের ওয়াক্তের আগে পড়া হয়। আমরা যারা সারা বছর ব্যস্ততা বা অলসতার কারণে রাতের নামায পড়তে পারি না তারাও পুরো রামাদান মাস জুড়ে তারাবীর নামায পড়তে চেষ্টা করি।

তারাবীর জামাতের মূল আকর্ষণ হল এর তিলাওয়াত। বেশির ভাগ মসজিদে ইমাম সাহেবরা রমাদানের প্রতি রাতে এক পারা বা দেড় পারা করে পড়ে পুরো মাসে একবার সম্পুর্ণ কুরআন পড়া শেষ করেন। আমরা যারা কুরআনের বেশির ভাগ অংশ মুখস্ত করতে পারিনি তাদের জন্য তারাবীর জামাত তাই একটি বিরাট সুযোগ, যেখানে আমরা নামাযের মধ্যে এক মাসে পুরো কুরআনের তিলাওয়াত শুনতে পাই। ফলে জামাতে তারাবী আদায়ের সুযোগ থাকলে অবহেলা করে তা হারানো ঠিক হবে না।

তারাবী, কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ যে নামেই অভিহিতি করি না কেন, জামাতে বা ব্যক্তিগতভাভে যেভাবেই পড়ি না কেন, রমাদান মাসের এই নামাযের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে রামাদান মাসে রাতে ইবাদাত করে তার পূর্ববর্তী সকল (সগীরা বা ছোট) গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।” [বুখারি ও মুসলিম]

এখানে মনে রাখা জরুরী যে, কবীরা বা বড় গুনাহ থেকে মাফ পেতে চাইলে আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে তাওবা করতে হবে (অর্থাৎ অতীতের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে, আল্লাহর কাছে মাফ চাইতে হবে এবং ভবিষ্যতে ওই গুনাহের কাজ আর না করতে দৃঢ়ভাবে সঙ্কল্পবদ্ধ হতে হবে)| আর কোন বান্দার হক নষ্ট করলে যার হক নষ্ট করা হয়েছে তার কাছ থেকেও মাফ চেয়ে নিতে হবে।

***

বছরের বারটি মাসের মধ্যে ফাদায়িল বা মর্যাদার দিক দিয়ে রমাদান মাস সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদাত করতে তাগিদ দেয়া হয়েছে। আর এই রমাদান মাসের মধ্যেও একটি রাত আছে যা রমাদানের বাকী ২৮ বা ২৯ টি রাত অপেক্ষা মর্যাদার দিক দিয়ে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু রমাদান নয়, এই রাতটি সারা বছরের মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাতটি হল লাইলাতুল কদর। এই বিশেষ রাতটি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন (মর্মার্থ):

“নিশ্চই আমি একে (কুরআনকে) নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে।

তোমাকে কিসে জানাবে লাইলাতুল কদর কী?

লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।

সে রাতে ফেরেশতারা ও রূহ (জিবরাইল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে।

শান্তিময় সে রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত।” [আল কুরআন ৯৭:১-৫]

এক হাজার মাস মানে হল ৮৩ বছর ৪ মাস। আমাদের গড় আয়ু কত বছর? পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশি, বড়জোর একশ বছর। এর মধ্যে প্রথম পাচ-ছয়-সাত বছর আমরা খেলাধুলাতেই পার করে দেই। আনুমানিক সাত বছর বয়স থেকে নামায পড়া শিখতে শুরু করি। কেউ কেউ দশ-বার বছর বয়স থেকে নিয়মিতভাবে নামায পড়া শুরু করি, কেউ আরো অনেক পরে শুরু করি, আবার অনেকেই অনিয়মিত থেকে যাই। আমাদের মধ্যে যারা দশ বছর বয়স থেকেই নিয়মিতভাবে নামায পড়া শুরু করি তাদের পক্ষেও সারা জীবনে ৮৩ বছর ৪ মাস আল্লাহর ইবাদাতে লেগে থাকা বাস্তবিকপক্ষেই অসম্ভব। তারপরও আল্লাহ অনুগ্রহ করে প্রতি বছরে আমাদের জন্য একটি রাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যে রাতের ইবাদাতের মাধ্যমে হাজার মাসের ইবাদাত অপেক্ষা উত্তম প্রতিদান পাওয়া সম্ভব। অন্য কথায় এই এক রাতের নফল ইবাদাতের মাধ্যমে আমাদের সারা জীবনের নফল ইবাদাত অপেক্ষা বেশি প্রতিদান পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ আল্লাহ করে দিয়েছেন। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাদের জন্য লাইলাতুল কদরের মতো একটি রাত দিলেন।

প্রিয় পাঠক, একটু চিন্তা করে দেখুন, আপনার বস যদি আপনাকে বলেন যে আজ একটি রাত ভালভাবে কাজ করলে এক হাজার মাসের সমান বেতন পাওয়া যাবে, তবে আপনি কি ঘরে বসে থাকতে পারবেন? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা লাইলাতুল কদরের মাধ্যমে আমাদেরকে এর চাইতেও বড় একটি অফার দিয়ে রেখেছেন। আসুন না, আল্লাহর দেয়া এই অফারটা নিয়েই ফেলি।

এখন প্রশ্ন হল, লাইলাতুল কদর কোন রাতটি? রমাদানের ২৭ তম রাতটি লাইলাতুল কদর বলে বহুলভাবে প্রচলিত আছে। বিশিষ্ট সাহাবী উবাই বিন কাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শপথ করে বলেছেন যে রাতটি রমাদানের ২৭ তম রাত। বিশিষ্ট তাবেয়ী হাসান আল-বসরী (রাহিমাহুল্লাহ) পঞ্চাশ বছর ধরে প্রতি বছর লাইলাতুল কদরের আলামতসমূহ পর্যবেক্ষণ করে বলেছেন যে রাতটি রমাদানের ২৭ তম রাত। তবে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই রাতটি কোনটি তা নির্দিষ্ট করে বলে যাননি। উবাই বিন কাব, হাসান আল-বসরী এবং অন্য যারা বলেছেন যে রাতটি রমাদানের ২৭ তম রাত, তারা তা নিজেদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বলেছেন। তাদের এই পর্যবেক্ষণ সঠিক হতে পারে, আবার ভুলও হতে পারে। অবশ্য এতে কোন সন্দেহ নেই যে মতটি একটি শক্তিশালী মত।

আইশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমাদানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা রমাদানের শেষ দশ রাতে লাইলাতুল কদর সন্ধান কর। [বুখারি ও মুসলিম]

বুখারি ও মুসলিমে আইশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত আরেকটি বর্ণনায় রমাদানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর সন্ধান করতে বলা হয়েছে।

আমরা যদি রমাদানের শুরু থেকে গণনা করা শুরু করি তবে এই মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতসমূহ হবে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তম রাত। আবার আমরা যদি রমাদানের শেষের দিক থেকে গণনা শুরু করি এবং মাসটি যদি ৩০ দিনের হয়, তবে ৩০ তম রাতে মাসের ১ রাত বাকী থাকে, ২৮ তম রাতে বাকী থাকে ৩ রাত, ২৬ তম রাতে ৫ রাত, ২৪ তম রাতে ৭ রাত আর ২২ তম রাতে বাকী থাকে ৯ রাত। আবু সায়ীদ আল খুদরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে লাইলাতুল কদরের জন্য রমাদান মাস শেষের দিক থেকে গোনার কথাও বর্ণিত আছে। ফলে রমাদানের শেষ দশকের যে কোন রাতই হতে পারে লাইলাতুল কদর, তাই এই দশ রাতের কোন রাতকেই অবহেলা করা চলবে না।

লাইলাতুল কদরে আমাদের জন্য করণীয় কাজসমূহ কী? রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই রাতে, বা এই দশ রাতে, কী করতেন আসুন তা জানার চেষ্টা করি।

আইশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমাদানের শেষ দশক শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সারা রাত জাগতেন, নিজের পরিবারবর্গকেও জাগাতেন এবং (আল্লাহর ইবাদাতে) খুব বেশি সাধনা ও পরিশ্রম করতেন। [বুখারি ও মুসলিম]

আইশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে আরো বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমাদানে (আল্লাহর ইবাদাতের ক্ষেত্রে) এমন প্রচেষ্টা ও সাধনা করতেন যা অন্য কোন মাসে করতেন না। তিনি তার শেষ দশ দিনে এমন চেষ্টা ও সাধনা করতেন, যা অন্য সময় করতেন না। [মুসলিম]

অন্য কথায়, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমাদান মাসে অন্যান্য মাসের চেয়ে বেশি ইবাদাত করতেন, আর রমাদানের শেষ দশ রাতে আগের বিশ রাত অপেক্ষা অনেক বেশি ইবাদাত করতেন।

রমাদানের শেষ দশকে আমরা নিচের আমলগুলো পালন করার চেষ্টা করে দেখতে পারি:

  • আপনি যদি মসজিদে নিয়মিতভাবে জামাতে তারাবী আদায় করেন তবে তারাবীর নামায শেষ করেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘুমিয়ে পড়ুন। ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার দুই ঘন্টা বা দেড় ঘন্টা আগে অ্যালার্ম সেট করে রাখতে ভুলবেন না। সম্ভব হলে একাধিক ডিভাইসে অ্যালার্ম সেট করে রাখতে হবে, যেন একটিতে স্নুজ বাটনে চাপ পড়লেও আরেকটি যেন মিস না হয়। ঘুম থেকে উঠে উযু বা গোসল করে তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে যান। সম্ভব হলে ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আধা ঘন্টা আগে পর্যন্ত নামায চালিয়ে যান, এরপর সেহরি খান।
  • আপনি যদি আশঙ্কা করেন যে শেষ রাতে তাহাজ্জুদের জন্য ঘুম থেকে উঠতে পারবেন না, তবে তারাবীর জামাতের পর আধা ঘন্টা বা এক ঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে ঘুমানোর আগেই তাহাজ্জুদ নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আপনার সাধ্যে যতক্ষন কুলায় ততক্ষন এই নামায পড়ে যেতে থাকুন।
  • আর যদি আপনি জামাতে তারাবী না পড়েন তবে আপনার হাতে সময় কিছুটা বেশি থাকবে। শেষ রাতে বা ঘুমানোর আগে, যখন সুবিধা হয়, তখনই তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে যান।
  • তাহাজ্জুদের নামায পড়তে গিয়ে যদি ঘুম চলে আসে তবে খানিকটা ঘুমিয়ে নিন। ঘুম চোখে নিয়ে নামায পড়তে যাবেন না।
  • তাহাজ্জুদ নামাযের কিয়াম (দাঁড়ানো) যতটা পারা যায় দীর্ঘ করুন। যদি আপনার মাত্র পাচটি ছোট সুরা মুখস্ত থাকে, তবে প্রথম রাকাতে এই পাচটি সুরা পড়ুন, পরের রাকাতে আবারও এই পাচটি সুরা পড়ুন। যাদের অনেকগুলো সুরা মুখস্ত আছে তাদের জন্য কিয়াম দীর্ঘায়িত করা অপেক্ষাকৃত সহজ।
  • রুকু, রুকু থেকে উঠে দাঁড়ানো, সিজদা এবং দুই সিজদার মাঝখানের বসা যতটা সম্ভব দীর্ঘ করুন।
  • সিজদায় যত পারুন আল্লাহর কাছে দুআ করতে থাকুন। দুনিয়া ও আখিরাতে আপনার যা কিছু চাওয়ার আছে তার সবই আল্লাহর কাছে চান।
  • নিজে কুরআন তিলাওয়াত করুন। অন্যের কুরআন তিলাওয়াত শুনুন।
  • আল্লাহর বিভিন্ন যিকিরে আপনার সময়কে ব্যয় করুন। ওঠা, বসা, শোয়া — সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকুন।
  • মহিলাদের মধ্যে যারা বিশেষ কারণে সাময়িকভাবে নামায আদায় করতে পারছেন না তারা যিকির, দুআ ও কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখার সর্বাত্নক চেষ্টা করুন।

এছাড়াও লাইলাতুল কদরের বিশেষ দুআ হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে এই দুআটি শিখিয়েছেন:

Dua of Lailatul Qadr

“হে আল্লাহ! তুমি অবশ্যই ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা পছন্দ কর, কাজেই আমাকে ক্ষমা কর।” [তিরমিযি]

আসুন, রমাদানের শেষ দশকে আমরা আমাদের সময় ও শক্তিকে আখিরাতে প্রতিদান পাওয়ার আশায় বিনিয়োগ করি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের যথাযথ হক আদায় করার তৌফিক দিন।

Advertisements

One thought on “লাইলাতুল কদর: হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ একটি রাত

  1. পিংব্যাকঃ শত ব্যস্ততার ভিড়ে রমযান মাসটি যেভাবে কাটাতে পারি | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s