ঈদের দিনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা

রমাদান মাসটা দেখতে দেখতে চলেই গেল। এই একটি মাসের জন্য দুই শ্রেণীর লোক সারা বছর ধরে অধীর অপেক্ষায় থাকেন – দোকানদার আর ইমানদার। অধিকাংশ দোকানদারের জন্য রমাদান হলো ব্যবসার মূল মৌসুম। ঈদকে সামনে রেখে তারা এই মাসে তাদের সমস্ত পুজি বিনিয়োগ করেন, দরকার হলে ধার-কর্জ করে হলেও ব্যবসায় টাকা খাটান। তাদের এই পরিশ্রমের ফল তারা ঈদের ঠিক  আগেই পেয়ে যান।

রমাদান মাসে একজন ইমানদারের জন্য বিনিয়োগটা একটু অন্যরকম। তিনি তার সময়, শারীরিক সামর্থ আর আর্থিক সম্পদকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় ব্যয় করেন। তার রমাদানের দিনগুলো কাটে রোযা রেখে আর রাতগুলো কাটে নামায আর আল্লাহর স্মরণে। তিনি অন্য মাসের চেয়ে এই মাসে বেশি বেশি করে দান করেন, বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করেন। ইমানদারও তার প্রচেষ্টার জন্য প্রতিদানের আশা রাখেন, তবে এই দুনিয়াতে নয়, আখিরাতে।

আর কোন ইমানদার যদি একইসাথে দোকানদারও হন তবে তো সোনায় সোহাগা! এই দুনিয়াতেও লাভ, আখিরাতেও লাভ।

০০০

আপনি এমন কোন দোকানদারকে কি দেখেছেন যিনি শুধু রমাদান মাসে দোকানদারি করেন আর সারা বছর ঘুমিয়ে কাটান? বা মন চাইলে সপ্তাহে শুধু একদিন দোকান খোলেন? অথবা দিনে মাত্র এক বেলা দোকান খোলা রাখেন?

প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত দোকানদারই সারা বছর ধরে ব্যবসা চালিয়ে যান। বাকী এগার মাসের লাভের টাকা রমাদান মাসের জন্য পুজি হিসেবে বিনিয়োগ করেন। আর এই পুজির জোরেই তিনি রমাদানের বাড়তি লাভটুকু তুলে আনেন।

একজন দোকানদার তার ব্যবসার ব্যাপারে যতটুকু সিরিয়াস আমরা আমাদের ইমানের ব্যাপারে কি ততটুকু সিরিয়াস হতে পেরেছি? শুধু রমাদান মাসে নয়, বাকী এগার মাসেও কি আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় কুরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ অনুযায়ী আমাদের জীবনকে পরিচালিত করছি? আমাদের প্রত্যেকেরই উচিৎ এই ব্যাপারে আত্মসমালোচনা করে দেখা।

০০০

রমাদান মাসে আমাদের করা ইবাদাতসমূহ আল্লাহর কাছে গৃহীত হয়েছে কি না তা আল্লাহই ভালো জানেন। আমরা কেউই তা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। আমরা প্রত্যেকেই রমাদান মাসে জেনে বা না জেনে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অনেক ভুল-ত্রুটি করে ফেলেছি, ফলে আমাদের সবার অন্তরেই ভয় থাকা উচিৎ যে হয়ত আল্লাহর কাছে আমাদের ইবাদাতসমূহ গৃহীত হয়নি। একইসঙ্গে আবার আশাও রাখতে হবে যে আমাদের প্রচেষ্টার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে পুরস্কৃত করবেন, কারণ তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। একজন সত্যিকার ইমানদারের জন্য ভয় এবং আশা পাখির দুইটি ডানার মতো – উড়তে গেলে উভয় ডানার সাহায্য লাগে, শুধুমাত্র একটি ডানা দিয়ে ওড়া যায় না। একজন প্রকৃত ইমানদার আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে, তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে এবং তাঁর কাছ থেকেই উত্তম প্রতিদানের আশা রাখে।

০০০

যদিও আমরা জানি না যে আমাদের রমাদানের ইবাদাতসমূহ গৃহীত হয়েছে কি না, তবে কিছু আলামত থেকে তা কিছুটা হলেও ধারণা করা যেতে পারে।

প্রথমত, আমাদের মনে যদি একটা খচখচানি থাকে যে, যেভাবে রমাদান কাটানো উচিৎ ছিল আমরা সেভাবে কাটাতে পারিনি এবং মনের মধ্যে একটা অজানা আশঙ্কা থাকে যে আমাদের রমাদান আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে তো, তবে এটি একটি ভাল লক্ষন। আশা করা যায় আমাদের অন্তরের নিষ্ঠা আর প্রচেষ্টার কারণে আল্লাহ আমাদেরকে পুরস্কৃত করবেন।

আর যদি আমরা মনে মনে আত্মপ্রসাদ লাভ করি যে, দীর্ঘ এক মাস রোযা রাখলাম, রাত জেগে তারাবী আর তাহাজ্জুদ পড়লাম, কয়েকবার কুরআন খতম করলাম, আমার পুরস্কার আর ঠেকায় কে, তবে বুঝতে হবে যে লক্ষন ভাল নয়।

দ্বিতীয়ত, আমাদের ভেবে দেখতে হবে আমরা রমাদানের আগে আল্লাহর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে যে অবস্থায় ছিলাম, রমাদানের পরেও কি সেই একই অবস্থায় আছি, তার চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছি, নাকি কিছুটা হলেও অবস্থার উন্নতি হয়েছে। যদি উন্নতি হয়ে থাকে তবে ভাল, অন্যথায় বুঝতে হবে লক্ষন আসলেই সুবিধার নয়।

উদাহরণস্বরূপ, রমাদানের আগে আপনি নিয়মিত এমটিভি দেখতেন, রমাদান শেষেও নিয়মিত দেখছেন, তবে বুঝতে হবে আপনার রমাদানের ইবাদাতে মানের দিক দিয়ে ঘাটতি ছিল। আর যদি এখন এমটিভি দেখলেই আপনার অস্বস্তি লাগে, তবে বুঝতে হবে আপনি রমাদান মাসে আন্তরিকভাবেই আল্লাহর ইবাদাত করতে চেষ্টা করেছেন।

তৃতীয়ত, আমাদের জন্য যদি ভাল কাজ করা আগের চেয়ে সহজতর হয়ে থাকে তবে আশা করা যায় যে আল্লাহ আমাদের ইবাদাতসমূহ গ্রহণ করেছেন।

উদাহরণস্বরূপ, রমাদানের আগে আপনি ফজরের নামাযের সময় নিয়মিত ঘুম থেকে উঠতে পারতেন না, রমাদানের পরে নিয়মিতই পারছেন, তবে বুঝতে হবে যে আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই রমাদানে ইবাদাত করেছেন, ফলে আল্লাহ আপনার জন্য ভাল কাজ করাকে আগের চেয়ে সহজ করে দিয়েছেন।

০০০

eid-mubarakঈদ মানে আনন্দ, তবে তাদের জন্য যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেরেছেন, আগের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভাল মানুষ হতে পেরেছেন। ঈদ মানে লাগামহীন আনন্দ নয়, আল্লাহর নির্দেশের অবাধ্যাচরণ করা নয়, বিনোদনের নামে যা খুশি তা করা নয়। গত এক মাসে আপনি যা অর্জন করেছেন তা কি এই একটি দিনে, আল্লাহর আবাধ্য হয়ে, ধুলিস্মাত করে দিতে চান?

আমরা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই, পরকালে উত্তম প্রতিদান পেতে চাই, তবে আসুন আমরা সবাই মিলে আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হয়ে যাই, তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী বাকী জীবনটুকু কাটানোর চেষ্টা করি।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাকে এবং এই লেখার সকল পাঠককে কথাগুলো উপলব্ধি করার এবং সেই অনুযায়ী জীবনকে পরিচালিত করার তৌফিক দিন। আমিন।

০০০

ঈদ মুবারক!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s