সফলতা বা ব্যর্থতা নয়, লক্ষ্য হোক আল্লাহর সন্তুষ্টি

kashmir-lake

মানবজীবন বড়ই বৈচিত্রময়। সমস্যা আর সম্ভাবনার চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা এই জীবনে কিভাবে কিভাবে যেন আমরা আমাদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাই। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে অনেক কিছুই আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়ে যায়, কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই হয় না। আমরা যা চাই তা হতেও পারে, নাও হতে পারে। আল্লাহ যা চান তা অবশ্যই হয়। কোনো মানুষই তার নিজের ভাগ্যবিধাতা নয়। আমার নিজের জীবনই তার একটি বড় উদাহরণ। হয়ত আপনার জীবনেও এরকম অনেক উদাহরণ আছে।

যে পরিবারে আমার জন্ম সেখানে না জন্মে আমি তো খোলা আকাশের নিচে ফুটপাথে বাস করা কোনো পরিবারেও জন্মাতে পারতাম! সেখানে জন্মালে আমি কি আপনাদের কাছে শিক্ষিত বলে গণ্য হতে পারতাম? খুব সম্ভবত, না। হয়ত আমার শৈশব কাটত ট্রাফিক সিগনালে ফুল বিক্রি করে! হয়ত আমাকে এখন রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হতো! কিন্তু আল্লাহ আমার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন বলেই হয়ত আজ আমি উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশে থাকছি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে অফিস করছি, নিজের গাড়ি নিয়ে মন চাইলে এখানে-ওখানে ঘুরছি, আর বসে বসে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক বুলি কপচাচ্ছি।

আজ থেকে বছর দেড়েক আগেও আমার জীবনটা কিন্তু ছিলো অন্যরকম। তখন আমি বাংলাদেশের একটি বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। সপ্তাহের পাঁচ দিন সকাল পৌনে সাতটায় বাসা থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার আগে ফিরতেই পারতাম না। সে এক ভিন্ন জীবন, চারপাশের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক আলাদা জগৎ। রাস্তায় মানুষ রোদে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে, গায়ের ঘাম ঝরিয়ে আয়-উপার্জন করছে, আর আমি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে বসে, নিয়মিত বিরতিতে চা-কফিতে চুমুক দিয়ে, কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে কোম্পানির আয়-উপার্জন বাড়ানোর চিন্তায় ব্যস্ত। তখন থেকে নিয়ে আমার আগেকার ছয়-সাতটি বছর এভাবেই কেটেছে।

ঠিক তখনই এক অসম্ভব সম্ভব হয়ে গেলো। হঠাৎ একদিন আমি এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি সেখানে আর কাজ করব না। অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে সঙ্গী করে কর্পোরেট জীবন থেকে আমি বেরিয়ে পড়লাম। সেই সিদ্ধান্তের ফলেই আজ আমি এখানে। কিন্তু সেদিন ওই পরিস্থিতির মুখোমুখি না হলে আমি তখন এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম না।

আমার কর্পোরেট জীবন শুরুরও পাঁচ বছর আগে যদি চলে যাই তাহলে দেখা যাবে কর্পোরেট জিনিসটা কী সেটাই আমি ঠিকমত বুঝতাম না। এইচ এস সি পাশ করে বেশ কয়েকটি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে এক জায়গাতে চান্স পেয়ে আমি সেখানে ভর্তি হয়ে গেলাম। তবে একদিনও সেখানে ক্লাস করতে পারিনি। এর মধ্যেই কিভাবে কিভাবে যেন দেশের নামী এক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হয়ে গেলাম। আমার পরিবারের তখনকার আর্থিক বাস্তবতায় আমি কখনোই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পর্যন্ত দেখিনি। স্বপ্ন না দেখেও জীবনে যে কিছু পাওয়া যায় এটি তার একটি উদাহরণ। বছর দুয়েকের কিছু কম সময়ের মধ্যে আমি হাপিয়ে উঠলাম, কম্পিউটার সায়েন্স আর ভালো লাগছিল না। পরিবারের মৃদু অমতেই আমি ব্যবসায় প্রশাসন পড়া শুরু করলাম। শেষ দুই বছরে অতিরিক্ত কোর্স নিয়ে নির্দিষ্ট চার বছরেই আমার ডিগ্রি শেষ হলো।

এইচ এস সি-তে আমার রেজাল্ট বলার মতো কিছু ছিলো না। আর কয়েক মাস পরেই আমি যে একাধিক সরকারী সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে যাব তা তখনকার পরিস্থিতিতে ছিলো অকল্পনীয়। আর চান্স পেয়ে যে পড়ব না তা ছিলো চিন্তারও বাইরে।

০০০

আমার জীবনের এসব ঘটনাপ্রবাহ থেকে আমি শিখেছি যে আমাদের ইচ্ছা, পরিকল্পনা বা স্বপ্ন অনুযায়ী আমাদের জীবনটা চলে না। সময়ে সময়ে আল্লাহ আমাদেরকে এমন সব পরিস্থিতির মুখোমুখি করেন যে ঠিক সেই সময়টিতে আমাদেরকে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, আর সেই কয়েকটি সিদ্ধান্তেই আমাদের পরবর্তী জীবনের ধারাটাই পাল্টে যায়। আমি বেঁচে থাকলে আমার সামনে এরকম পরিস্থিতি সামনেও আসবে, আর সেই সময়কার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই হয়ত পাল্টে দেবে আমার ভবিষ্যৎ জীবনের বাঁক।

০০০

আমরা যারা ইসলামকে ভালোবাসি, আমরা যারা ইসলামের জন্য কাজ করতে চাই, আমরা যারা ইসলামের জন্য সবরকম ত্যাগ স্বীকারে তৈরি আছি, আমাদের সবার জন্যই জীবন থেকে নেওয়া এই শিক্ষাটুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়াব্যাপী বিস্তৃত ইসলামী ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি, কেউ নিজের দেশের গন্ডির মধ্যেই ইসলামি বিধান প্রতিষ্ঠা করতে চাই, কেউ ইসলামী বিষয়সমূহে অনেক অনেক জ্ঞানী হতে চাই, কেউ নিজের পেশার মাধ্যমে ইসলামের সেবা করতে চাই, কেউ ইবাদাত-বন্দেগিতে অনেক সামনে এগিয়ে যেতে চাই, কেউ আবার শুধুই ভালো মুসলিম হিসেবে জীবনটাকে কাটিয়ে দিতে চাই। আমাদের সবার উদ্দেশ্যই ভালো। আমরা কিছু একটা করতে চাই। আমরা আমাদের সমাজটাকে পাল্টাতে চাই।

কিন্তু আমরা চাইলেই কিছু হয় না। আল্লাহ চাইলে সবই হয়। শুধুমাত্র আমাদের চেষ্টায় সমাজে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না। আবার আল্লাহ চাইলে আমাদেরকে দিয়েই সমাজে পরিবর্তন আনবেন। ইসলাম আমাদের ইচ্ছার বা চাওয়ার মুখাপেক্ষী নয়, বরং আমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী।

০০০

আমরা যারা ইসলামের জন্য কিছু করতে চাই তারা সাধারণত বৃহত্তর সমাজের জন্য কিছু একটা করে যেতে চাই। আমাদের কারো চেষ্টা পারিবারিক গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, কেউ প্রাতিষ্ঠানিক বা সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে যাই, কেউ আবার আরো বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা করি। একটি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন সমাজে যতটুকু ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসক সমাজে তার চাইতেও অনেক বেশি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। একজন মুসলিম শাসকের প্রধান কাজ মূলত চারটি, যা বর্ণিত হয়েছে নিচের আয়াতটিতে:

“আমি যদি এ (মুসলমান)-দের (আমার) যমীনে (রাজনৈতিক) প্রতিষ্ঠা দান করি, তাহলে তারা (প্রথমে) নামায প্রতিষ্ঠা করবে, (দ্বিতীয়ত) যাকাত আদায় (-এর ব্যবস্থা) করবে, আর (নাগরিকদের) তারা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে, তবে সব কাজেরই চুড়ান্ত পরিণতি একান্তভাবে আল্লাহ তায়ালারই এখতিয়ারভুক্ত।” [কুর’আন ২২:৪১]

এই আয়াতের শুরু এবং শেষের কথাটুকু আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আয়াতটির একেবারে শুরুতে বলা হচ্ছে যে আল্লাহ চাইলে এবং শুধুমাত্র আল্লাহ চাইলেই তিনি মুসলিমদেরকে এমন শাসক দান করবেন যিনি এই চারটি কাজ করবেন। অন্য কথায়, আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, আল্লাহ না চাইলে শুধুমাত্র আমাদের চেষ্টার মাধ্যমে আমরা তেমন শাসক কখনোই পাব না, যেমনটির ইশারা এই আয়াতের শেষ বাক্যটিতে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে।

০০০

যেহেতু আমাদের ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসক পাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত বিচারে একান্তই আল্লাহর এখতিয়ারে, তাই এমনটি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় যে কখনো কখনো আমরা আদর্শ মুসলিম শাসক পাবো না। সেই পরিস্থিতিতেও প্রতিটি মুসলিমের জন্য এই চারটি কাজ নিজ উদ্যোগেই করার বাধ্যবাধকতা থেকে যায়, যেমনটি নিচের আয়াতটিতে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে:

“মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীরা হচ্ছে একে অপরের বন্ধু। এরা (মানুষদের) ন্যায় কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে, তারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে, (জীবনের সব কাজে) আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুলের (বিধানের) অনুসরণ করে, এরাই হচ্ছে সেসব মানুষ যাদের ওপর আল্লাহ তায়ালা অচিরেই দয়া করবেন; অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা পরাক্রমশালী, কুশলী।” [কুর’আন ৯:৭১]

অতএব একটি আদর্শ মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হোক বা না হোক, আল্লাহ আমাদেরকে একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসক দান করেন বা না করেন, ব্যক্তি মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতা থেকেই যায়। ব্যক্তি হিসেবে আমরা যদি উপরের এই আয়াতের [৯:৭১] নির্দেশনা অনুযায়ী না চলি তবে আল্লাহ আমাদেরকে আগের বর্ণিত আয়াতের [২২:৪১] ওয়াদা অনুযায়ী একজন আদর্শ মুসলিম শাসক দেবেন এমন আশা দূরাশা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বা সাংগঠনিকভাবে ইসলামের জন্য যতই কাজ করে যাই না কেন, আমাদের ব্যক্তি স্বত্ত্বার দায়িত্বকে ভুলে গেলে চলবে না। মনে রাখতে হবে যে আমার মৃত্যুর পরে আমি একাই আমার কবরে যাব, কবরে আমাকে এককভাবেই প্রশ্ন করা হবে, আমার কবরের আরাম বা শাস্তি আমি একাই ভোগ করব, হাশরের ময়দানে আমাকে এককভাবেই আমার এই জীবনের বিশ্বাস ও কাজ সম্পর্কে হিসেব দিতে হবে, শেষ বিচারের পরে আমার জান্নাত বা জাহান্নাম আমিই ভোগ করব। একজন ব্যক্তি হিসেবে আমাকে সেই বাস্তবতার জন্যই প্রথমে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে এবং এর পরে নিজের পরিবার ও সমাজে ইসলামের আলো ছড়ানোর জন্য আমাদের সাধ্যের সবটুকু ঢেলে দিতে হবে, প্রয়োজনে কঠিন ত্যাগ স্বীকারের জন্যও তৈরি থাকতে হবে।

০০০

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই আমাদের মূল লক্ষ্য। ইসলামের জন্য আমরা যতটুকু কাজই করে থাকি না কেন সেই কাজকে কখনোই মূল লক্ষ্য বানানো যাবে না। আমাদের এই কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কিছু পন্থা মাত্র। আমাদের কাজ কাজ করে যাওয়া, আর ফলাফল আল্লাহরই হাতে। সুতরাং ইপ্সিত ফলাফল অর্জনের স্বার্থে আমাদের আদর্শকে কোনো অবস্থাতেই বিসর্জন দেওয়া যাবে না। একইসাথে ব্যক্তি জীবনে আমাদের আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষতা অর্জনের নিরলস প্রচেষ্টাকে কখনোই খাটো করে দেখা উচিৎ হবে না।

আসুন, আমরা আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করে যাই। আল্লাহ আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হলে তিনি আমাদেরকে অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসক উপহার দেবেন। আর আমরা তাঁর অবাধ্যাচারণে নিমজ্জিত থাকলে তিনি আমাদেরকে জালিম শাসক দিয়ে শাস্তি দেবেন এটিই স্বাভাবিক। ন্যায়পরায়ণ শাসক বা জালিম শাসক আমাদেরই হাতের কামাই। তাই আপনি যে দেশের নাগরিকই হয়ে থাকুন না কেন, আসুন, সরকারবিরোধী বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলনের আগে আমরা আমাদের নিজেদের ভেতরকার কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্নক আন্দোলন শুরু করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দিন।

Advertisements

2 thoughts on “সফলতা বা ব্যর্থতা নয়, লক্ষ্য হোক আল্লাহর সন্তুষ্টি

  1. পিংব্যাকঃ জিহাদ ও ক্বিতাল সম্পর্কে যে বিষয়গুলো আমাদের জানা থাকা উচিৎ | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s