আমাদের সময়ের অংশীদার ১ – ডিজিটাল লাইফস্টাইল

আপনি কি কখনো হিসেব করে দেখেছেন আপনার সময়ের সবচেয়ে বেশী অংশ কিভাবে ব্যয় করেন আপনি যখন ঘরে বসে অবসর সময় কাটান? পরিবারের সদস্যদের সময় দিয়ে নাকি ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিকস মাধ্যমগুলো নিয়ে ব্যস্ত থেকে।

আসুন এই লেখায় দেখি পরিবারের সদস্যদরা কি ভাবছে একে অন্যের ব্যাপারে। একদিন শিক্ষিকা ক্লাশে সবাইকে ওপেন এন্ডেড ছোট রচনা লিখতে বললেন। বাচ্চাদের মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য শিক্ষকরা এরকম অনুশীলন প্রায় দিয়ে থাকেন। বাসায় নিয়ে লেখাগুলো নিজে পড়ার সময় এমন একটি লেখা তিনি পান যা পড়ে উনার চোখের পানি থামবার নামই নিচ্ছিলনা; আর তখন উনার স্বামী লেখাটা নিলেন পড়ার জন্য।

০০০০০

রচনার বিষয়ঃ টেলিভিশন

আমার নাম ইব্রাহীম, আমি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি। আমার বাসায় মা-বাবা ও ভাইবোন আছে, আমি তাদেরকে খুব ভালবাসি। আজ রাতে আমি আল্লাহ এর কাছে দুয়া করেছি –television_child[1]

“আল্লাহ আমাকে তুমি ঐ টেলেভিশনের মতো বানিয়ে দাও। আমি এটার জায়গা নিতে চাই। আমি টিভি এর মতো আমার জীবন চাই। আমার জন্য একটি বিশেষ স্থান যেখানে আমার পরিবার আমাকে ঘিরে থাকবে, আমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আমার কথা গুরুত্বের সাথে শুনবে কোনো বাঁধা বিপত্তি ছাড়া। আমাকে স্পেশাল কেয়ার নিবে যেভাবে আমার টিভি পায় যখন এটি নষ্ট থাকে। আমার সাথে এমনটাই হবে, যেভাবে টিভি আমার বাবার সঙ্গ পায় যখন তিনি কাজের পর বাসায় আসেন অথবা তিনি যখন ক্লান্ত থাকেন এবং আমার মা যেভাবে সময় কাটান যখন তাঁর বাসার কাজ শেষে অবসর পাবেন। এবং আমার ভাইবোনরা আমার সাথে সময় কাটানোর জন্য একে অন্যের সাথে লড়াই করবে, যেভাবে চ্যানেল পরিবর্তন করার জন্য টিভি রিমোট নিয়ে লড়াই করে।”

তাই “আল্লাহ আমি তোমার কাছে বেশি কিছু চাইনা শুধু এই টেলিভিশন এর মতো হতে চাই। কারণ আমি চাই আমার পরিবার সব সময় আমার সাথে থাকবে এবং আমাক গুরুত্ব দিবে অন্তত বাসার অবসর সময় গুলোতে। সবশেষে আমিও যেন তাদের আনন্দ আর খুশির কারণ হতে পারি।”

[স্টোরি রেফারেন্সঃ ডেইলি ইসলামিক স্টোরিজ/ফেসবুক]
০০০০০

লেখাটি পড়ে উনার স্বামী বেশ আফসোস করে বলছেন “কি কষ্টেই না আছে এই বাচ্চাটা; আর এ কি ধরনের মা-বাবা”। তখন সেই শিক্ষিকা বললেন “এই রচনাটি আমাদের সন্তানের লেখা!” সুবহানাল্লাহ!

কি আপনাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছি তাই না! যদি পেরে থাকি তবেই হবে এই লেখার সার্থকতা।

যাই হোক আমি এখানে মাত্র টেলিভিশন নিয়ে উদাহারণ টানলাম। এছাড়াও আমরা প্রতিদিন বাসায় বিভিন্ন গ্যাজেট যেমন স্মার্ট ফোন, নোটবুক, ট্যাবলেট পিসি, ইন্টারনেট, এল-ই-ডি, এমপি-থ্রি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকি; এখনতো বাংলাদেশও 3G এর যুগের মধ্যে চলে এসেছে। আর এসব মাধ্যমগুলোর অসময়ে ব্যবহার আর সঠিক সময়ে অপব্যবহারের জন্যই আমার এই লেখাটিতে ডিজিটাল লাইফ স্টাইল এর বাস্তবতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি; কেননা এত digitization আগামীতে আমাদের প্রিয় পরিবারের জন্যই বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাড়াচ্ছে।

আমাদের পরিবার বিশেষভাবে আমি বলব সন্তানদের কথা যারা আমাদের কাছে কিছু কোয়ালিটি টাইম আশা করে যা আমদের দৃষ্টিগোচর হয়না। আমরা আমাদের সন্তানদেরকে স্কুলের মাসিক ফি, দরকারি জামাকাপড় এবং অন্যান্য দরকার পূরণ করেই যেন ক্ষান্ত; ভাবতে কেমন যেন রোবট এর মত লাগে। প্রোগ্রাম করা এক যন্ত্র, যতটুকু দরকার তা করেই শেষ, কোনো ইমোশান, সাইকোলজি আমাদের মাথায় এবং অন্তরের মধ্যে আর কাজ করেনা। এমনকি খাওয়ার টেবিলে একসাথে বসে বিভিন্ন হিন্দি সিরিয়াল, রিয়্যালিটি শো, স্ত্রীর সাথে অফিসের সহকর্মীদের নিয়ে গল্পে এইসব নিয়েই ব্যস্ত আমরা। এমনকি ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও মোবাইল নিয়ে সময় ব্যয় না করলে যেন আমাদের ঘুমই আসেনা।

আমরা যদি সব সময় বাসায় এই সমস্ত গ্যাজেট নিয়ে ব্যস্ত থাকি তাহলে বিশেষত বাচ্চাদের সাথে এবং পরিবারের সাথে সময় কাটাব কিভাবে? আপনি হয়ত বলবেন এত সময় কোথায়? অফিস থেকে বাসায় এসে একটু নিজের বিনোদন এর দরকারও হয়। আর এর পরিণতি হচ্ছে –

  • সন্তান নিজেকে একা ভাবতে শুরু করে এবং তার সুস্থ মানসিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়
  • স্কুল এক্সাম এ খারাপ করতে থাকা এবং খারাপ স্টুডেন্ট এ পরিণত হয়
  • অথবা এক্সট্রিমলি অন্তর্মূখী (introvert) হয়ে যাওয়া যদি সে সহজে বাইরে জগতের সাথে মিশতে না পারে
  • খারাপ ব্যবহার শুরু করা এবং তা হয়ত আরও অনেক দূর গড়াতে পারে যেমন ড্রাইভার, দারোয়ান, পাড়া প্রতিবেশী, শিক্ষক এবং সবশেষে আপনি
  • অথবা সে যখন বুঝতে পারবে তাকে নজরদারি করার কেউ নেই সে বিপথে চলে যাবে যেমন সিগেরেট, নেশা ইত্যাদি;
  • সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হচ্ছে দিনে দিনে ইসলাম থেকে অনেক দূরে সরে যেতে পারে খারাপ সংগের কারণে
  • অনেক সময় স্বামী আর স্ত্রী মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয় এবং তা সম্পর্ক ভাঙ্গা পর্যন্ত গড়াতে পারে (আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন)

সন্তানদের ক্ষেত্রে মা-বাবাদেরই তাদের সাথে সময় ব্যয় করার সুযোগটা বের করে আনতে হবে রতিদিনের ব্যস্ততা থেকে। তাই বাচ্চাদের সাথে সময় ব্যয় করার কিছুবেসিক জিনিস এখানে উল্লেখ করলাম, যা আমরা হয়ত জানি কিন্তু একদমই প্রাধান্য দেইনা। আসুন এগুলো আমরা আর একবার একটু দেখে নেই –

  • বাচ্চাদের সারাদিনের কথা মন দিয়ে শোনা; হতে পারে স্কুলে সে সারাদিন কি করেছে অথবা তার কালকের সারাদিনের প্ল্যান কি
  • বাচ্চাদের সাথে সুন্দর করে কথা বলা এবং তাদের সামনে অন্যদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা; কারণ তারা যা দেখে তাই শিখে
  • বাচ্চাদের কুরআন থেকে সুন্দর কিছু ঘটান বলা যেতে পারে অথবা আমাদের প্রিয় নবীর সুন্দর ব্যবহার এবং চারিত্রিক গুনাবলী গুলো বলতে পারেন
  • বাইরে বেড়াত নিয়ে যাওয়া এবং তাদের সাথে খোলা মাঠে খেলাধুলা করা
  • পড়াশোনার ব্যাপারে সাহায্য করা, পরামর্শ দেওয়া। স্কুলের হোমওয়ার্ক এবং কুরআন দুইক্ষেত্রে এর জন্য সময় ব্যয় করা
  • একসাথে রাতের ডিনার করা এবং এই জায়গায় কিছু শিক্ষামূলক ও আনন্দদায়ক কথা বলা
  • সাপ্তাহিক ছুটির দিন স্পেশাল খাবারের ব্যবস্থা করা এতে সন্তান নিজেকে অন্য সবার মত স্পেশাল মনে করবে
  • বাজার করতে সাথে নিয়ে যাওয়া এতে আপনার সন্তান নিজেকে দায়িত্ববান হিসেবে ভাবতে শুরু করবে
  • বাসার ছোট ছোট কিছু কাজের দায়িত্ব দিয়ে তাকে রেসপনসিবল করা
  • ছোট বয়স থেকেই একসাথে মসজিদে যাওয়া এতে ধীরে ধীরে সে ইসলামের সাথে পরিচিত হবে
  • আধা ঘণ্টার কুরআন ও সুন্নাহ থেকে পারিবারিক ইসলামিক ডিসকাশন করতে চেষ্টা করা
  • সবশেষে, বাচ্চাদের নিয়ে একসাথে টিভিতে শিক্ষণীয় প্রোগ্রাম গুলো দেখতে পারেন

ইমাম আন-নাওয়াবি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “একজন বাবা তার সন্তানকে অবশ্যই শৃঙ্খলা শেখাবে এবং শিক্ষা দেবে ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে। এটা অবশ্যকর্তব্য সব বাবার উপর এবং যারা সন্তানদের দায়িত্বে আছেন সন্তানদের বয়:সন্ধি হওয়ার পূর্বে”। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) একটা প্রসিদ্ধ হাদীস যা বুখারী এবং মুসলিম গ্রন্থে এসেছে যা থেকে আমরা আমাদের পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারনা পেতে পারি –

“তোমরা প্রত্যকেরই নিজ দায়িত্ব সম্বন্ধে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং নেতা, যিনি জনগণের তত্ত্বাবধায়ক, তিনি স্বীয় অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। প্রত্যেক পুরুষ নিজ পরিবারের লোকদের তত্ত্বাবধায়ক এবং নিজের অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আর প্রত্যেক মহিলা তার স্বামীর পরিবারের লোকদের ও তার সন্তানের তত্ত্বাবধায়ক এবং তিনি তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। কোন ব্যক্তির কর্মচারী স্বীয় মনিবের সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক এবং সে সেই সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। প্রত্যেকেই নিজের অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”

“ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই নাকি জ্ঞানীর কাজ”, আর আপনার সন্তান হতে পারে আপনার সবচেয়ে উত্তম ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট যদি তাকে সঠিক সময়ে সঠিক ভাবে গাইড করা হয়। তাই আমরা চেষ্টা করি এই ডিজিটাল যুগে পরিবারকে ভুলে না যেতে এবং তাদের সুসময় দিতে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরিবারের সাথে সুন্দর সময় ব্যয় করার সুযোগ করে দিন। আমিন।

>>> আমাদের সময়ের অংশীদার ২ এর অপেক্ষায় থাকুন, আর এই লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন। জাযাকআল্লাহ। <<<

Advertisements

5 thoughts on “আমাদের সময়ের অংশীদার ১ – ডিজিটাল লাইফস্টাইল

  1. পিংব্যাকঃ আমাদের সময়ের অংশীদার ২ – ফ্রেন্ড সার্কেল এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ শিশু সন্তানের নৈতিক শিক্ষা নিয়ে প্রস্তাবনা: প্রথমে মনুষ্যত্বের মৌলিক পাঠের গাঁথুনি, এর উপর ধর্ম

  3. পিংব্যাকঃ শিশু আক্রমণাত্মক আচরণ করলে যেভাবে তাকে সামলাতে হবে | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ শিশুকে সদাচার ও শিষ্টাচার শেখানো | আমার স্পন্দন

  5. পিংব্যাকঃ আমাদের সময়ের অংশীদার ২ – ফ্রেন্ড সার্কেল ও সোশ্যাল নেটওয়ার্ক | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s