সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৯-২০): সাবধানী হতে হবে

Metal Fence in Grass Field

আগের আলোচনা: আয়াত ১-৬ | ৭-৮ | ৯-১২ | ১৩-১৪ | ১৫-১৬ | ১৭-১৮ 

18:19

18:20

১৯। আমি এভাবেই তাদেরকে জাগিয়ে দিলাম, যাতে তারা পরস্পরে একে অন্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের মধ্যে একজন বলল, তোমরা এ অবস্থায় কতকাল থেকেছ? কেউ কেউ বলল, আমরা একদিন বা তার কিছু কম থেকে থাকব। অন্যরা বলল, তোমাদের প্রতিপালকই ভালো জানেন তোমরা এ অবস্থায় কতকাল থেকেছ। এখন নিজেদের কোনো একজনকে রূপার মুদ্রা দিয়ে নগরে পাঠাও। সে গিয়ে দেখুক তার কোন এলাকায় ভালো খাদ্য আছে এবং সেখান থেকে তোমাদের জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসুক। সে যেন সতর্কতার সাথে কাজ করে এবং সে যেন তোমাদের সম্পর্কে কাউকে অবহিত হতে না দেয়।

২০। কেননা, তারা যদি তোমাদের সন্ধান পেয়ে যায় তবে তারা তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরে যেতে বাধ্য করবে। আর তাহলে তোমরা কখনোই সফলতা লাভ করতে পারবে না।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

আমি তাদেরকে যেমন নিদ্রাচ্ছন্ন করেছিলাম এভাবেই তাদেরকে জাগিয়ে দিলাম, যাতে তারা পরস্পরে একে অন্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে নিজেদের অবস্থা ও অবস্থানকাল সম্পর্কে। তাদের মধ্যে একজন বলল, তোমরা এ অবস্থায় কতকাল থেকেছ? কেউ কেউ বলল, আমরা একদিন বা তার কিছু কম সময় ঘুমিয়ে থেকে থাকব। তারা সূর্য উদিত হওয়ার সময়ে গুহায় প্রবেশ করেছিল এবং সূর্যাস্তের সময়ে জাগ্রত হয়েছিল। তাই তারা মনে করেছিল যে, এটা গুহায় প্রবেশের দিনেরই সূর্যাস্ত। অন্যরা ক্ষণিক চিন্তাভাবনা করে বলল, তোমাদের প্রতিপালকই ভালো জানেন তোমরা এ অবস্থায় কতকাল থেকেছ। এখন নিজেদের কোনো একজনকে রূপার মুদ্রা দিয়ে শহরে পাঠাও। সে গিয়ে দেখুক তার কোন এলাকায় ভালো খাদ্য আছে এবং সেখান থেকে তোমাদের জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসুক। এটাই প্রকাশ যে, উত্তম খাদ্য দ্বারা এখানে হালাল খাবারকে বোঝানো হয়েছে। তাদের ভাবনা ছিল, পৌত্তলিকদের শহরে হালাল খাবার পাওয়া তো সহজ নয়, তাই যাকে পাঠিয়েছিল তাকে সতর্ক করে দিলো যেন  এমন জায়গা থেকে খাবার কেনে যেখানে হালাল খাদ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া, তাদের ধারণা মতে সেখানে তখনও সেই পৌত্তলিক রাজার শাসন চলছিল। তাই তাদের দ্বিতীয় চিন্তা ছিল এ গুহায় তাদের আত্মগোপনের কথা কেউ না আবার জেনে ফেলে। তাই তাকে সতর্ক করে দিলো, সে যেন খাবার কিনতে গিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করে। সে যেন সতর্কতার সাথে কাজ করে এবং সে যেন তোমাদের সম্পর্কে কাউকে অবহিত হতে না দেয়। কেননা, তারা (অর্থাৎ, শহরের অধিবাসীরা) যদি তোমাদের সন্ধান পেয়ে যায় তাহলে তারা তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরে যেতে বাধ্য করবে। আর তাহলে তোমরা কখনোই সফলতা লাভ করতে পারবে না। [তাফসির আল-জালালাইন ও তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

বাহ্যিক দৃষ্টিতে আমরা যা দেখি সেটিই পরিপূর্ণ বাস্তবতা নাও হতে পারে। ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় – যে ক্ষেত্রের কথাই বলি না কেন, সময়ে সময়ে না জেনে, আংশিক জেনে বা ভুল জেনে আমরা মনে মনে অনেক কিছু ধরে নিই। অনেক কথা বলে ফেলি। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করি। একজন সত্যিকারের মুসলিমের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়। আমরা ঈমানদার হয়ে থাকলে আমাদেরকে মেনে নিতে হবে যে, আমরা সামান্যই জানি। আল্লাহ সব জানেন। আল্লাহর অসীম জ্ঞানের সামনে আমাদেরকে বিনয়ী হতেই হবে। যে বিষয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে মনপছন্দ কথা বলা থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকতে পারা এই বিনয়ের একটি আলামত।

ঈমানের নূরে উদ্ভাসিত পরিচ্ছন্ন অন্তকরণের অধিকারী অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিরা হলেন এই বিষয়ে বিনয়ীদের বাস্তব প্রতিমুর্তি। “আমি জানি না, আমার প্রতিপালকই ভালো জানেন” – এমনটি বলতে পারা অনেক বড় একটি গুণ। এই গুণে নিজেকে গুণান্বিত করতে না পারলে চরম প্রতিকূল পরিবেশে মাথা ঠান্ডা রেখে ধৈর্য ও স্থিরতা অবলম্বন করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, এই গুণটির অভাবেই বিজয়ী অবস্থায় মানুষ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতে থাকে।

জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী আল্লাহওয়ালা এই মানুষগুলো তাঁদের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে এমন অনেক বিষয় অনুধাবন করতে পারেন যা কেবলই ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায় না। অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের একজন হতে পারা বান্দার প্রতি আল্লাহর এক বিশেষ উপহার। অন্তরের পরিশুদ্ধি অর্জন করার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর দিকে যত এগিয়ে যায় আল্লাহ ততই রূহানী জগতের অনেক রহস্য তার সামনে একে একে উন্মোচিত করে দেন।

কেবলই বই পড়ে বা বক্তৃতা শুনে বদ্ধ অন্তরের তালা খোলে না। এজন্য অনেক সাধনা করতে হয়। আল্লাহর সাহায্য চাইতে হয়। আমাদের রিযিক হালাল হওয়া এর প্রথম ধাপ। হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট অন্তরের বদ্ধ কপাট আল্লাহ খোলেন না। অতএব, আমাদের উপার্জন হালাল ও পবিত্র হতে হবে। আমাদের খাবার ও পানীয় হালাল ও পবিত্র হতে হবে। আমাদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি বিষয় হালাল ও পবিত্র হতে হবে। আমাদের জিহ্বা, চোখ, কান, হাত, পা ও অন্তরকে যাবতীয় হারাম ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। পরিবেশ প্রতিকূল হওয়ার কারণেই কোনো হারাম হালাল হয়ে যায় না। যে ব্যক্তি হারাম থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করে না সে ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর কিছু করে ফেলবে এমনটি হতেই পারে না।

হারামকে বর্জন ও হালালকে গ্রহণ করার মাধ্যমে বান্দা নিজেকে পরিশুদ্ধ রাখার সংগ্রামে সদা লিপ্ত থাকে। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাকে কল্যাণকর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেন। কখন সংগ্রামী হতে হবে আর কখন সংযমী হতে হবে সেই বোধ তাকে দেন। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের লাগাতার উষ্কানির মুখে অনেক মানুষের আবেগের লাগাম ছিড়ে যায়। কিন্তু, সেই অবস্থাতেও দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের কথা মাথায় রেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটা হলো প্রকৃত অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বিজ্ঞ ব্যক্তির লক্ষণ। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত এই বান্দারা প্রতিশোধপরায়ণ ও প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতাসম্পন্ন হন না।

পরিস্থিতির দাবী অনুযায়ী সাবধানী হওয়া ও সতর্ক আচরণ করা মানে নিজের আদর্শকে বিসর্জন দেওয়া নয়। বরং, এটিই হলো আমাদের নবীর (ﷺ) প্রদর্শিত পন্থা। তাঁর মক্কী জীবনে চরম প্রতিকূল একটি পরিবেশে ইসলামের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য এমন একটি স্থান বেঁছে নেওয়া হয়েছিল যেন তা সহজে কুরাইশ নেতাদের চোখে না পড়ে। সেই স্থানটি পরবর্তীতে পরিচিত হয় ‘দারুল আরকাম’ নামে। শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নির্যাতনের শিকার দুর্বল মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার খাতিরে তাঁকে এই কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল। প্রবল পরাক্রান্ত প্রতিপক্ষ ইসলামের চিহ্নকে পর্যন্ত মিটিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায়ে সদা তৎপর থাকলে ক্ষমতা ও শক্তির নিরিখে দুর্বল ঈমানদারদের উচিৎ পরিণতির দিক দিয়ে আত্মঘাতী আচরণ করার পরিবর্তে সতর্কতা অবলম্বনের রাস্তা বেঁছে নেওয়া।

সূরা কাহফ-এর এই আয়াতদ্বয় থেকেও আমরা একই শিক্ষা পাই। চরম প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের ঈমানকে রক্ষা করার জন্য ঘরছাড়া হতে বাধ্য হওয়া যুবকরা পাহাড়ের গুহার মধ্যে দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর বৈরী সমাজের সম্ভাব্য ফিতনা থেকে বাঁচতে যা করণীয় তার সবই করার চেষ্টা করেছিল।

ইসলামের স্বাভাবিক চর্চা যেখানে একেবারেই রুদ্ধ সেখানে আমাদের করণীয় এতটুকুই। আমরা নিজে থেকে অপরিণামদর্শী আচরণ করে ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাব না। অন্যথায় ‘দারুল আরকাম’-এর মতো নিছক শিক্ষাধর্মী উদ্যোগ অথবা গুহায় আশ্রয় নেওয়া সেই যুবকদের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুর মতো আমাদের মাথা গোঁজার ঠাই পর্যন্ত ইসলামবিদ্বেষীদের শ্যেণ দৃষ্টি থেকে রেহাই পাবে না।

বাতাস সবসময় একদিকে বয় না। কণকণে ঠান্ডা উত্তুরে বাতাসে আমাদেরই ভুলের কারণে আমাদের একেকটি প্রতীকি ‘দারুল আরকাম’ অথবা আমাদের আশ্রয়স্থল একেকটি প্রতীকি ‘গুহাকে’ রক্ষা করতে না পারলে বাসন্তী বাতাস যখন আবার বইতে শুরু করবে তখন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও চর্চা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। সুদিন আসবে সেই আশায় হলেও আমাদের প্রতিটি ‘দারুল আরকাম’ ও ‘গুহা’-কে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সাবধানী হতে হবে। সতর্ক আচরণ করতে হবে। আল্লাহওয়ালা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষদের সাহচর্য অবলম্বন করতে হবে। তাঁদের কথা শুনতে হবে। বাকীটা আল্লাহর ইচ্ছা।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ৩০শে আগস্ট, ২০১৬

Advertisements

10 thoughts on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ১৯-২০): সাবধানী হতে হবে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close