কাবা ঘর: প্রথম দেখাতেই ভালোবাসা এবং ভালো লাগা

আমার চোখ তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল – একটিবার, শুধু একটিবার – দেখার জন্য। রাত তখন একটা বাজে। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে সবে ঘরে পৌঁছেছি, কিন্তু i-love-Makkah-islam-31274263-500-364[1]তারপরও আমি কোনভাবেই নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। মন পড়ে আছে তার দিকে। কখন যে তাকে সামনাসামনি দেখব! কখন যে তাকে কাছে পাব!

ধরুন একজন সেলিব্রিটি যাকে আপনি প্রতিদিন টিভির পর্দায় দেখেছেন বয়স হওয়ার পর থেকে, যার কথা শুনেছেন, যদি একদিন তাকে সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয় তবে আপনার মনের মধ্যে কি অদ্ভুত এক রোমাঞ্চকর অনুভূতিই না হবে! এ এমনই এক অনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। 

আমার কাছে তার গুরুত্ব আর মর্যাদা সেলিব্রিটি থেকেও অনেক অনেক বেশি ছিল।

কি অদ্ভুত! অচেনা এক নগরীতে এরকম কিছুর প্রতি এত আকর্ষণ অনুভব করা, এটাই আমার কাছে সেদিন স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। আর এই জায়গাতে আমাদের প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের অনেক সময় কাটিয়েছেন। তিনি যখন সেই জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন; দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলেন এবং দুঃখবোধ করেছিলেন এর থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন –

“তুমি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় শহর। এবং এইখানকার লোকেরা যদি আমাকে তোমার (মক্কার) থেকে বহিষ্কৃত না করত তাহলে আমি কক্ষনই তোমাকে (মক্কাকে) ছেড়ে যেতামনা”

আপনি হয়ত এতক্ষনে বুঝে ফেলেছেন আমি কোন জায়গার ব্যপারে কথা বলতে চাইছি – পবিত্র মক্কা নগরীর কাবা ঘরের বা বায়তুল্লাহ এর কথা। ইসলামের উত্থান হয়েছে যেখান থেকে; আর যেখানে ইসলামের অন্যতম একটি স্তম্ভ হজ্জ পালন করতে মসুলিমরা প্রতিবছর আসেন কত দূরদুরান্ত থেকে। এক সময় নাকি সমুদ্রপথে আসতেন হাজীরা ৬মাস থেকে ১ বছর লেগে যেত; তারও আগে পায়ে হেঁটে, সুবহানাল্লাহ কত কষ্টইনা করেছেন তাঁরা। আর এই পবিত্র নগরীর পবিত্র ঘরটিতে আসতে পারাটা আমি বলব আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার অসংখ্য রহমতের মধ্যে আর একটি রহমত যা কখনও কারও স্মৃতি থেকে মুছে যায়না।

একটু ভেবে দেখুন আমরা যারা এইখানে কখনো যায়নি তারা আল্লাহ এই সুন্দর নিদর্শন চোখের সামনে দেখতে পায়নি। আমাদের সবার উদ্দেশ্য থাকা উচিত যেন একবার হলেও আল্লাহর এই ঘরে আমরা যেতে পারি, আর এর জন্য বেশি বেশি দুয়া করা উচিত। বায়তুল্লার ভেতরে কিছু নিদর্শন সংক্ষিপ্ত ভাবে উল্লেখ করলাম –

  • বায়তুল্লাহ (কাবা ঘর) – যা নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) পবিত্র জিনিস দিয়ে [দেখুন কুর’আন ২২:২৬]
  • মুলতাযাম – কাবা ঘরের একটি অংশ যা কাবার দরজা হতে হাযরে আসওয়াদ-এর মধ্যবর্তীতে আছে।
  • মাকাম ইবরাহিম – যেখানে দাঁড়িয়ে ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এই বায়তুল্লাহ নির্মাণ করেছিলেন।
  • হিজর ইসমাঈল – অর্ধবৃত্ত জায়গা, যা কাবা ঘরের একটি অংশ – যেখানে নামাজ আদায় করা কাবার ভেতরে নামাজ পড়ার সমতুল্য।
  • হাযরে আসওয়াদ (কালো পাথর) – একটি বেহেশতী পাথর যা কাবা ঘরের দক্ষিন-পূর্ব পাশে স্থাপন করা আছে।
  • সাফা ও মারওয়া পাহাড় – যেখানে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর মা এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ছুটাছুটি করেছিলেন সাহায্যের জন্য।
  • জমজম কুয়া এবং এর পানি – একটি মিরাকল যেখান থেকে অবিরত পানি আসছে। ইবন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন – “এই পৃথিবীতে সবচেয়ে উত্তম পানি হচ্ছে জমজমের পানি, এতে আছে খাদ্যপুষ্টি এবং একজন অসুস্থের জন্যে সুস্থতা।”

আরও আশ্চর্যের ব্যপার হচ্ছে কত ভাষাভাষি আর কত বর্ণের মানুষ যে এখানে আসেন শুধুমাত্র আল্লাহ এর ঘরের যেয়ারত এবং ইবাদতের উদ্দেশ্যে আর এই নিদর্শনগুলকে সচক্ষে দেখার জন্য যা নিঃসন্দেহে মুসলিমদের জন্য এক ইমান বুস্টার। আর আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন সূরা হাজ্জ এর ২৬ ও ২৭ নম্বর আয়াত এ –

“(হে নবী, স্মরণ করো,) যখন আমি ইব্রাহীমকে এ (কাবা) ঘর নির্মাণের জন্য স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম (তখন তাকে আদেশ দিয়েছিলাম), আমার সাথে অন্য কিছুকে শরীক করো না, আমার (এ) ঘর তাদের জন্য পবিত্র রেখো যারা (এর) তাওয়াফ করবে, যারা (এখানে নামাজের জন্যে) দাঁড়াবে, রুকু করবে, সেজদা করবে”

“তাকে আরও আদেশ দিয়েছিলাম, তুমি মানুষদের মাঝে হজ্জের ঘোষনা দাও, যাতে করে তারা তোমার কাছে পায়ে হেঁটে ও সর্বপ্রকার দুর্বল উটের পিঠে আরোহণ করে ছুটে আসে, (ছুটে আসে) দূরদূরান্তের পথ অতিক্রম করে”

প্রথম দর্শনে যে ভালবাসা এবং ভাললাগা  হয় তাকে কখনো ভোলা যায় না। আর কাবা হচ্ছে এমন এক স্থান যাকে দেখে অন্তরে ভালবাসা এবং ভাললাগা জন্মায় প্রথম দর্শনেই। আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয় তবে আপনিও একবার যান, গিয়ে দেখেই আসুননা, আমি নিশ্চিত আপনার বার বার যেতে ইচ্ছা করবে। আর আশা করা যায় এর মাধ্যমে আপনি হয়ে উঠবেন আল্লাহর কাছে অনেক প্রিয় আর আপনার সমস্ত গুনাহ মাফের মাধ্যমে আপনি পেয়ে যাবেন উত্তম প্রতিদান বা পুরস্কার – জান্নাত। কারণ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন –

“একটি কবুল হজ্জ এর প্রতিদান জান্নাত আর কিছুই না”

আসুননা আমরা সবাই অন্তরকে ঠিক করে নেই এবং যথাসাধ্য চেষ্টা এবং বেশি করে দুয়া করতে থাকি বায়তুল্লাহ যাওয়ার। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে বায়তুল্লাহ যাওয়ার সুযোগ দান করেন। আমিন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s