সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২১): নিরাশ হওয়া যাবে না

sunflower-bloom-opening

আগের আলোচনা: আয়াত ১-৬ | ৭-৮ | ৯-১২ | ১৩-১৪ | ১৫-১৬ | ১৭-১৮ | ১৯-২০  

18:21

২১। এভাবে আমি মানুষের কানে তাদের সংবাদ পৌঁছিয়ে দিলাম, যাতে তারা নিশ্চিতভাবে জানতে পারে আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং এটাও যে, কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। (অতপর সেই সময়ও আসল) যখন লোকে তাদের সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিল। কিছু লোক বলল, তাদের উপর সৌধ নির্মাণ কর। তাদের প্রতিপালকই তাদের বিষয়ে ভালো জানেন। (শেষ পর্যন্ত) তাদের বিষয়ে যাদের মত প্রবল হলো, তারা বলল, আমরা অবশ্যই তাদের উপর একটি মসজিদ নির্মাণ করব।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

যাকে খাদ্য কিনতে পাঠানো হয়েছিল সে যথারীতি শহরের উদ্দেশ্যে রওনা করল। কিন্তু, তার দেওয়া মুদ্রা দেখে দোকানদার অবাক হয়ে গেল, কেননা তা ছিল কয়েক শতাব্দীর পুরনো মুদ্রা। দোকানদার তাকে রাজার কাছে নিয়ে গেল। এই রাজা ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। তাঁর এই ঘটনা জানা ছিল যে, কয়েক শতাব্দী আগে তৎকালীন এক রাজার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে একদল যুবক নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। তিনি আরও খোজ-খবর নিলেন। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেল যে, এরাই সেই যুবক দল। এভাবে আল্লাহ মানুষের কানে তাদের সংবাদ পৌঁছিয়ে দিলেন, যাতে তারা নিশ্চিতভাবে জানতে পারে যে, তাঁর ওয়াদা সত্য এবং এটাও সত্য যে, কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গুহায় আশ্রয় নেওয়া এই যুবকদের সুদীর্ঘকাল ঘুমিয়ে থাকা এবং তারপর আবার জেগে ওঠা নিঃসন্দেহে আল্লাহর অপার কুদরতেরই নিদর্শন ছিল। এই ঘটনার প্রতি লক্ষ্য করলে যেকোনো ব্যক্তির অতি সহজেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কথা যে, যেই সত্ত্বা সেই যুবক দলকে তাদের সুদীর্ঘকালীন ঘুমের পর জীবিতরূপে জাগাতে পেরেছেন নিঃসন্দেহে তিনি গোটা মানবজাতিকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম। রাজা তাদেরকে খুব সম্মান ও খাতির-যত্ন করলেন। কিন্তু, তারা পুনরায় সেই গুহায় চলে গেল এবং সেখানেই আল্লাহ তাদেরকে মৃত্যু দান করলেন। তাদের দীর্ঘকালীন ঘুম থেকে জাগার পর এই যুবকেরা বেশিকাল বেঁচে থাকেনি।

অতপর আল্লাহ তাঁর কুদরতের আরেক কারিশমা দেখালেন। যে শহরে এককালে তাদের জীবনের কোনো আশা ছিল না সেই শহরেই এখন তাদের আশাতীত সম্মান। সেই সময়ও আসল যখন লোকে তাদের সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিল। কিছু লোক বলল, তাদের উপর সৌধ নির্মাণ কর। শেষ পর্যন্ত তাদের বিষয়ে যাদের মত প্রবল হলো, তারা বলল, আমরা অবশ্যই তাদের উপর একটি মসজিদ নির্মাণ করব। সেই মতে গুহার প্রবেশপথে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। [তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন ও তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

দুনিয়ার এই জীবন জান্নাত নয়। জান্নাত বা জাহান্নাম পরকালীন জীবনের বিষয়। এই জীবনের গোটাটাই হলো পরীক্ষা। আমরা প্রত্যেকেই জীবন পরীক্ষার পরীক্ষার্থী। ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ কোনো অবস্থাই আমাদের জীবনে স্থায়ী নয়। কখনো ‘উত্থান’ দিয়ে আবার কখনো ‘পতন’ দিয়ে, কখনো ‘ভালো সময়’ দিয়ে আবার কখনো ‘মন্দ সময়’ দিয়ে আল্লাহ আমাদেরকে পরীক্ষা করেন। তাই আমাদের যখন ‘ভালো সময়’ যাবে তখন আত্মশ্লাঘায় ভুগলে চলবে না, কেননা অচিরেই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। আবার, ‘খারাপ সময়েও’ বিমর্ষ হওয়া চলবে না, কারণ সামনেই হয়ত অপেক্ষা করছে বহুল প্রতীক্ষিত সুদিন। সুখে-দুঃখে সব অবস্থাতেই যারা তাঁদের ঈমানের ওপর অটল ও অবিচল থাকবেন চূড়ান্ত বিচারে তাঁরাই হবেন সফল ও বিজয়ী।

এই প্রসঙ্গে সূরা কাহফ-এর এই আয়াতটি ঈমানের বলে বলীয়ান প্রতিটি মানুষকে আশার আলো দেখায়। এখন সময় যত প্রতিকূল যাক না কেন, সুদিন আসবেই। আজকের দিনে যাদেরকে নিয়ে মানুষ হাসাহাসি করছে তাদেরকেই তারা এক সময় শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। আল্লাহ চাইলে মুহুর্তেই মানুষের অন্তরকে পরিবর্তিত করে দিতে পারেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে তিনি অনুকূল করে দিতে পারেন।

উদাহরণস্বরূপ, উহুদের যুদ্ধে অমুসলিম পক্ষের প্রধান তিন সেনানায়ক ছিলেন আবু সুফিয়ান, খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ এবং ইকরিমা বিন আবু জাহল। খালিদের সমর কুশলতায় মুসলিম শিবিরে সেদিন নেমে আসে মহা বিপর্যয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) মারা গেছেন। এই গুজব পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হলেও প্রিয় নবীর (ﷺ) দেহ সেদিন রক্তাক্ত হয়েছিল। সত্তরজন সাহাবী উহুদের ময়দানে শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর কি ইচ্ছা, তাঁর প্রেরিত রাসুলের (ﷺ) বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া এই তিনজন কাফিরকেও আল্লাহ হিদায়াতের জন্য মনোনীত করে নিয়েছিলেন। এই ঘটনার বেশ কয়েক বছর পর তাঁরা তিনজনই তাঁদের পূর্ব আদর্শ ত্যাগ করে একে একে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নবগঠিত ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রাথমিক প্রসারের জন্য নিজেদেরকে উৎসর্গ করে দেন। ইকরিমা ইয়ারমুকের যুদ্ধে শহীদ হন। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার মাধ্যমেই বৃহত্তর সিরিয়া অঞ্চল মুসলিমদের দখলে আসে। খালিদ প্রিয় নবীর (ﷺ) কাছ থেকে ‘সাইফুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর তলোয়ার’ উপাধিপ্রাপ্ত হন। মুসলিমদের বৃহত্তর সিরিয়া ও পারস্য বিজয়ের পিছনে খালিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, আবু সুফিয়ান তাঁর একটি চোখ হারান মুসলিম বাহিনীর হয়ে তায়েফ অবরোধের সময়ে। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি তাঁর দ্বিতীয় চোখটিও হারান। আল্লাহর রাসুলের (ﷺ) বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মতো দুঃসাহস দেখানো এই তিনজন ব্যক্তি যদি পরবর্তীতে হিদায়াতের যোগ্য হয়ে থাকেন তাহলে আজকের দিনের কট্টর কাফির ও ইসলামবিদ্বেষীদের মধ্যে কেউ কেউ কি আগামীতে হিদায়াতের যোগ্য হতে পারেন না? হতেও তো পারে যে, এদের মধ্যেই লুকিয়ে আছেন আগামীর কোনো খালিদ, ইকরিমা বা আবু সুফিয়ান।

সূরা কাহফ-এ বর্ণিত গুহায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়া যুবকদের কাহিনী থেকেও আমরা এই একই শিক্ষা পাই। যে পৌত্তলিক রাজার অত্যাচার থেকে বাঁচতে এই যুবকদের পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল কয়েক শতাব্দী পর গিয়ে দেখা গেল যে, তারই সিংহাসনের উত্তরাধিকারীরা পৌত্তলিকতা ত্যাগ করে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছেন। রাজ্যের সাধারণ মানুষও এরই মধ্যে ঈমানদার হয়ে গেছে।

অতএব, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও হতাশ হওয়া যাবে না। হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। আমাদেরকে আমাদের কাজ করে যেতে হবে। যতদিন বেঁচে আছি ততদিন ঈমানের ওপর অটল থাকতে হবে। পাশাপাশি, দ্রুত ফল লাভের আশায় হঠকারী কোনো কাজ করা থেকে সচেতনভাবে নিজেদেরকে বিরত রাখতে হবে। আমাদের কাজের ইপ্সিত ফলাফল এই দুনিয়াতে আমরা দেখে যেতে পারি বা না পারি, আমাদের একনিষ্ঠ  প্রচেষ্টার ফলাফল পরকালীন জীবনে আমরা অবশ্যই পাব।

আর এই দুনিয়াতেই আল্লাহ আমাদেরকে সাফল্যের মুখ দেখালে সেটিও যে স্থায়ী হবে এমন কোনো কথা নেই। কোনো মানুষের দ্বারা ইসলামের বড় কোনো কাজ আল্লাহ করিয়ে নিতে চাইলে সেই কাজটি সমাধা হওয়ার ঠিক পরপরই সাধারণত তিনি তাকে দুনিয়া থেকে তুলে নেন। দশম হিজরিতে তাঁর বিদায়ী হজের মাধ্যমে ইসলামের বাণীকে পরিপূর্ণভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় আমাদের প্রিয় নবীকে (ﷺ) আল্লাহ এই দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছেন। তার ঠিক পরেই ইসলাম ত্যাগের হিড়িক, যাকাত দিতে অস্বীকার করা এবং একাধিক ভন্ড নবীর আবির্ভাব – এই তিনটি বড় ফিতনার মুখে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে সদ্য গঠিত ইসলামী সাম্রাজ্য। ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর আস-সিদ্দীক (رضي الله عنه) সাফল্যের সাথে এই ফিতনা সামাল দেন। এর ঠিক পরপরই তাঁকেও দুনিয়া থেকে তুলে নেওয়া হয়। সূরা কাহফ-এ বর্ণিত যুবকদের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল। তাদের মাধ্যমে যে বার্তা আল্লাহ মানুষকে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন তা পৌঁছানোর ঠিক পরপরই তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে মাত্রা কম বা বেশি হলেও এই দুনিয়াতে প্রতিকূলতার মুখোমুখি আমাদের সবাইকে হতেই হবে। কুরআনে বর্ণিত প্রত্যেক নবী-রাসুলকেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছিল। অতীতের প্রতিটি উম্মতকে আল্লাহর রাস্তায় কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উম্মতও এর ব্যতিক্রম নয়। কোন মাত্রা পর্যন্ত প্রতিকূলতার মোকাবেলা করতে আমরা সক্ষম তা আল্লাহ জানেন। আমাদের সাধ্যের বাইরে কোনো পরীক্ষায় তিনি আমাদেরকে ফেলবেন না এই দৃঢ় বিশ্বাস বুকে ধারণ করে এই দুনিয়ার যাবতীয় প্রতিকূলতার মোকাবেলা করে যেতে হবে। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কোনো ঈমানদারের পক্ষে শোভনীয় নয়।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ 

Advertisements

9 thoughts on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২১): নিরাশ হওয়া যাবে না

  1. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২২): সঠিক জ্ঞান আহরণ করতে শিখতে হবে | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৩-২৪): আল্লাহ না চাইলে আমাদের চাওয়ায় কিছু হয় না | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৫-২৬): সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করে যেতে হবে | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৭): কুরআনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা যাবে না | আমার স্পন্দন

  5. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৮): সৎ সঙ্গী বেঁছে নিতে হবে | আমার স্পন্দন

  6. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৯-৩১): ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না | আমার স্পন্দন

  7. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩২-৩৬): প্রাচুর্যের পরীক্ষা | আমার স্পন্দন

  8. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩৭-৪১): সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় | আমার স্পন্দন

  9. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৪২-৪৪): জীবনে হঠাত নেমে আসা বিপদ যখন বিপথে যাওয়া থেকে আমাদেরকে বাঁচায়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s