সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২২): সঠিক জ্ঞান আহরণ করতে শিখতে হবে

machu-picchu

আগের আলোচনা: আয়াত ১-৬ | ৭-৮ | ৯-১২ | ১৩-১৪ | ১৫-১৬ | ১৭-১৮ | ১৯-২০ | ২১

18:22

২২। কিছু লোক বলবে, তারা ছিল তিনজন আর চতুর্থটি তাদের কুকুর। কিছু লোক বলবে, তারা ছিল পাঁচজন আর ষষ্ঠটি তাদের কুকুর। এসবই তাদের অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া জাতীয় কথা। কিছু লোক বলবে, তারা ছিল সাতজন আর অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। বলে দাও, আমার প্রতিপালকই তাদের প্রকৃত সংখ্যা ভালো জানেন। অল্প কিছু লোক ছাড়া কেউ তাদের সম্পর্কে পুরোপুরি জানে না। সুতরাং তাদের সম্পর্কে সাদামাটা কথাবার্তার বেশি কিছু আলোচনা করো না এবং তাদের সম্বন্ধে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদও করো না।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

কিছু লোক বলবে, গুহায় আশ্রয় নেওয়া এই যুবকদের সংখ্যা ছিল তিনজন আর চতুর্থটি তাদের কুকুর। কিছু লোক বলবে, তারা ছিল পাঁচজন আর ষষ্ঠটি তাদের কুকুর। এসবই তাদের অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া জাতীয় কথা। কিছু লোক বলবে, তারা ছিল সাতজন আর অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। (হে মুহাম্মাদ ﷺ!) বলে দিন, আমার প্রতিপালকই তাদের প্রকৃত সংখ্যা ভালো জানেন। সুতরাং আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার বাইরে তাদের সম্পর্কে বেশি কিছু আলোচনা করবেন না। আর তাদের সম্বন্ধে আহলে কিতাবদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদও করবেন না। [তাফসির আল-জালালাইন]

আয়াতটি আমাদেরকে আলাদাভাবে একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দান করেছে। আর তা এই যে, যে বিষয়ে মানুষের কোনো ব্যবহারিক ও কর্মগত মাসআলা নির্ভরশীল নয় সে বিষয়ে অহেতুক খোঁড়াখুঁড়ি ও তত্ত্ব তালাশে লেগে পড়া উচিৎ নয়। গুহায় আশ্রয় নেওয়া যুবকেরা সংখ্যায় কতজন ছিল তা মজলিস সরগরম করে তোলার মতো কোনো প্রশ্ন নয়। এর উপর বিশেষ কোনো মাসআলাও নির্ভরশীল নয়। তাই এ নিয়ে মাথা গরম করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে, কেউ যদি এ নিয়ে আলোচনা ওঠায়ও তবে সাদামাটা উত্তর দিয়ে কথা শেষ করে ফেল। অহেতুক এর পিছনে সময় নষ্ট করো না। [তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

সঠিক বিষয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি করতে পারলে গঠণমূলক জ্ঞান আহরণ করা আমাদের জন্য সহজতর হয়ে যায়। অন্যদিকে, প্রাসঙ্গিকতা নেই এমন বিষয় নিয়ে পড়ে থাকলে যে জ্ঞান অর্জিত হয় তা আত্মঅহমিকার জন্ম দিতে পারে বটে, কিন্তু তা দিয়ে বাস্তব জীবনে তেমন কোনো উপকার পাওয়া যায় না। ফলে, কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে যাওয়ার আগে বিষয়টির প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিৎ।

বিষয়টি ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কিত হলে এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে আমরা তার প্রাসঙ্গিকতা নির্ণয় করার চেষ্টা করতে পারি:

  • এখানে আমাকে কিছু করতে বলা হয়েছে কি?
  • কোনো বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে কি?
  • এটি জানলে কোনো বিষয়ে আমি সাবধান হতে পারব কি?
  • এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাকে দিকনির্দেশনা দেবে কি?
  • এর মাধ্যমে আমার নিজের জীবনে আমি উপকৃত হব কি?
  • এটি দিয়ে অন্য মানুষের কোনো উপকার আমি করতে পারব কি?
  • সর্বোপরি, এর মাধ্যমে আমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারব কি?

এই প্রশ্নগুলোর প্রতিটির উত্তর যদি ‘না’ হয় তাহলে বিষয়টি আমার জন্য প্রাসঙ্গিক না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

সূরা কাহফ-এর এই আয়াতটিতে একটি সুন্দর উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। শিরক ও অজ্ঞতার পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত একটি সমাজের কতিপয় যুবকের এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন, পরিণতিতে সমাজের তীব্র বৈরী আচরণের মুখে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া, নির্জন স্থানে একটি গুহার মধ্যে আশ্রয় নেওয়া, সময়ের আবর্তনে সেই মুশরিক সমাজের শাসক ও শাসিতের ঈমান আনয়ন, দীর্ঘ তিন শতাব্দী পর সেই যুবকদের ঘুম থেকে জেগে ওঠা, পরিবর্তিত সেই সমাজে তাদের অতুলনীয় সম্মান ও সমাদর – এই গোটা কাহিনীটি যুগে যুগে দুর্বল ও অধিকার বঞ্চিত মুসলিমদের আশার আলো দেখিয়েছে। দিয়েছে অমূল্য দিকনির্দেশনা। কিন্তু, সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ওই গুহায় ঠিক কতজন যুবক আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের সঙ্গে থাকা কুকুরটির গায়ের রঙ কী ছিল – এই জাতীয় প্রশ্নও কোনো কোনো মানুষের মাথায় ঘুরপাক খায়। এগুলো জানার মধ্যে আমাদের কোনো ফায়দা নেই, তাই এসব কথার জবাব জানার চেষ্টা না করে পুরো কাহিনীটিতে আমাদের জন্য যে শিক্ষা আছে সেদিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিৎ।

সৃষ্টির সূচনা, প্রথম মানুষ আদাম (عليه السلام)-এর সৃষ্টি ও ইবলিসের প্রতিক্রিয়া, বিগত হয়ে যাওয়া জাতিসমূহের কাহিনী – অতীতের এরকম অনেক ঘটনার আলোচনা এসেছে কুরআনে। এসেছে অদৃশ্য জগতের ফেরেশতা ও জিনদের কথা। আমাদের মহান প্রভু আল্লাহর সত্বা ও ক্ষমতা নিয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। মৃত্যুর পরে কী হবে সে আলোচনাও বাদ পড়েনি। এসব আলোচনার মধ্যে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে। সেখান থেকে সঠিক শিক্ষা নিতে পারলে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা আমাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে যায়। কিন্তু, শিক্ষা আহরণের পরিবর্তে কেবলই খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে পড়ে থাকলে তা আমাদের তেমন কোনো উপকারে আসবে না – না এই দুনিয়াতে, না মৃত্যু পরবর্তী জীবনে।

অতএব, কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে যাওয়ার আগে আমাদের জন্য তার কোনো প্রাসঙ্গিকতা আছে কি না তা অবশ্যই যাচাই করে নিতে হবে। আমাদের আহরিত প্রতিটি জ্ঞান যেন হয় উপকারী জ্ঞান এবং আমাদের দুনিয়ার সাফল্য ও আখিরাতে মুক্তির পাথেয়।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ২২শে জানুয়ারি, ২০১৭

Advertisements

8 thoughts on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২২): সঠিক জ্ঞান আহরণ করতে শিখতে হবে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close