সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৫-২৬): সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করে যেতে হবে

bus-seat

আগের আলোচনা: আয়াত ১-৬ | ৭-৮ | ৯-১২ | ১৩-১৪ | ১৫-১৬ | ১৭-১৮ | ১৯-২০ | ২১ | ২২ | ২৩-২৪ 

18:25

18:26

২৫। তারা তাদের গুহায় তিনশ’ বছর এবং অতিরিক্ত নয় বছর ছিল।

২৬। বলো, আল্লাহই ভালো জানেন তারা কতকাল ছিল। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর যাবতীয় গুপ্ত জ্ঞান তাঁরই আছে। তিনি কত উত্তম দ্রষ্টা! কত উত্তম শ্রোতা! তিনি ব্যতীত তাদের আর কোনো অভিভাবক নেই। তিনি নিজ কর্তৃত্বে কাউকে শরিক করেন না।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

ওই যুবকেরা তাদের গুহায় তিনশ’ সৌর বছর নিদ্রিত অবস্থায় ছিল। আরবদের ব্যবহৃত চান্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করলে এর সাথে আরও নয় বছর যোগ হবে। কেউ যদি এ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে বলুন, হে মুহাম্মাদ ﷺ, যারা এ ব্যাপারে মতভেদ করছে তাদের চেয়ে আল্লাহই ভালো জানেন তারা কতকাল ঘুমিয়ে ছিল। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর যাবতীয় গুপ্ত জ্ঞান তাঁরই আছে। তিনি কত উত্তম দ্রষ্টা! কত উত্তম শ্রোতা! কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টি ও শ্রবণের বাইরে নয়। তিনি ব্যতীত তাদের আর কোনো সাহায্যকারী অভিভাবক নেই। তিনি নিজ কর্তৃত্বে কাউকে শরিক করেন না। [কৃতজ্ঞতা: তাফসির আল-জালালাইন এবং তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন] 

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

কয়েকজন মানুষ মিলে আমরা যখন শুভ ও কল্যাণকর কোনো কাজে হাত দিই তখন আমাদের অনেকের মনে এই ধারণা কাজ করে যে আমাকে ছাড়া এই কাজ চলবে না। এরই পরিণতিতে অহংকার আমাদের উপর ভর করে বসে। নিজেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে মনে হয়।

ছোট অথবা বড় পরিসরে ইসলামের জন্য যারা কাজ করছে তাদের মধ্যেও এই রোগ জেঁকে বসতে পারে। আমাকে ছাড়া এই সংগঠণ চলবে না, আমি না থাকলে এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে, আমি চলে গেলে দীনের দাওয়াত আর কেউ দিতে পারবে না – এমনতর সব হামবড়া ভাব আমাদের মধ্যে চলে আসতে পারে।

সূরা কাহফ-এর আলোচ্য আয়াতদ্বয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে আমাদের এই মিথ্যা অহমিকার অসারতা আমাদের সামনে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়ে উঠবে। শিরকে আকন্ঠ নিমজ্জিত একটি সমাজের কতিপয় যুবক এক আল্লাহর উপর ঈমান আনল। তাদের ঈমান আনার খবর গোটা সমাজে চাউর হয়ে গেল। ঈমান বাঁচাতে তাদেরকে দেশান্তরী হতে হলো। সমাজের লোক জানল না তাদের কী পরিণতি হলো। তারাও জানল না তাদের অনুপস্থিতিতে সমাজে কী ঘটে গেল। এভাবে কেটে গেল তিনশ’ বছর। তারপর একদিন তারা একে একে ঘুম থেকে জেগে উঠল। খাবার আনতে লোকালয়ে গেলে তাদের পরিচয় প্রকাশিত হয়ে পড়ল। তারা আবিষ্কার করল যে, যাদের কারণে তাদেরকে দেশান্তরী হতে হয়েছিল তাদের বংশধরেরা ততদিনে এক আল্লাহর উপর ঈমান এনে ফেলেছে।

এই যুবকেরা তাদের জনপদে দাওয়াতী কাজ করার তেমন কোনো সুযোগ পায়নি। পরিবেশ তাদের অনুকূলে ছিল না। তারা সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হওয়ার পর সেই জনপদে কোনো দাওয়াতী কাজ হয়েছিল কি না তা আমরা জানি না। দাওয়াতী কাজ হয়ে থাকলে কারা সেই কাজ করেছিল তাও আমাদের অজানা। যেভাবেই হোক, আল্লাহর একত্ববাদের বাণী সেই জনপদের মানুষের কাছে পৌঁছেছিল এবং সময়ের আবর্তনে সেই আহ্বানে একসময় তারা সাড়া দিয়েছিল।

এই ঘটনা থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো, প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কখনো কখনো আমাদেরকে পিছু হটতে হতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সামষ্টিক কাজে প্রবল বাঁধাবিপত্তির মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যেতে পারে। এরকম পরিস্থিতিতে কিছু একটা করে ফেলার তাড়না অনেকের মধ্যে কাজ করে থাকে। কিন্তু, ওই যুবকেরা চরম সঙ্কটময় মুহুর্তেও তাদের হিতাহত জ্ঞান হারায়নি। প্রবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সাথে সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে নিজেদের ঈমানকে বাঁচাতে তারা দৃশ্যপট থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল।

আল্লাহর ইচ্ছা ছিল যে সেখানকার মানুষ একসময় ঈমান আনবে। তাঁর এই ইচ্ছার বাস্তবায়ন আল্লাহ যখন চেয়েছেন তখন হয়েছে, তার আগে হয়নি। পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া সেই যুবকদের কোনো ভূমিকা ছাড়াই আল্লাহর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে। আবেগের বশবর্তী হয়ে একটা কিছু করে ফেললেই তা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করে না। মাঝখান দিয়ে আদর্শচ্যুত হওয়ার কারণে শেষ বিচারের দিনে আমাদেরকেই খেসারত দেওয়া লাগতে পারে।

অতএব, আদর্শচ্যুত হওয়া যাবে না। আমাদেরকে আমাদের আদর্শের উপর অটল ও অবিচল থাকতে হবে, চাই তাতে বাহ্যিক সাফল্য আসুক বা না আসুক। আল্লাহর দীনের কাজ তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে। আমাদেরকে ছাড়াই এগিয়ে যাবে। আমরা সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে পারলাম কি না সেটিই হলো আমাদের জন্য আসল পরীক্ষা। ফলে, হঠকারিতার রাস্তা না ধরে স্থির কিন্তু দৃঢ় চিত্তে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে ব্যক্তি হিসেবে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দিকেই আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করা উচিৎ, যেমনটি গুহায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়া ওই যুবকেরা করেছিল।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ২৪শে জানুয়ারি, ২০১৭ 

Advertisements

8 thoughts on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৫-২৬): সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করে যেতে হবে

  1. সুন্দর লিখেছেন মাশা আল্লাহ্‌।
    লেখাটা পড়তে গিয়ে একটা বিষয়ে মাথায় আসলো। অনেক সময় কেউ হয়তো আমাদের সাহায্য চাইল, আর আমরা তার উপকার করলাম। এরপর আমাদের মধ্যে ধারণা হয় – আমি উপকার না করলে ঐ লোকটার কি অবস্থাই না হত! অথচ ধারণাটা ঠিক নয়। আমি যদি তার উপকার করতে এগিয়ে না আসি, আল্লাহ্‌ তাকে অন্য উপায়ে সাহায্য করবেন। প্রকৃত সত্য হলো – ঐ ব্যক্তিকে উপকার করার সুযোগ দিয়ে আল্লাহ্‌ আমাকে কিছু হাসানাহ আদায় করার সুযোগ করে দিয়েছেন মাত্র। কারো উপকার করে গর্ব বা অহংকার বোধ করার কিছু নেই।

    1. ঠিক বলেছেন।

      কারও জন্য যদি লেখা হয়ে থাকে যে সে সাহায্য পাবে তাহলে সে সাহায্য পাবেই, তা যার কাছ থেকে হোক না কেন। আর তার জন্য সাহায্য লেখা না হয়ে থাকলে আমি শত চেষ্টা করেও তার কোনো উপকারে আসতে পারব না।

      আবার, আমি চাইলেও কারও উপকার করতে পারব না যদি না আল্লাহ চান। তিনি চাইলে অন্য কাউকে দিয়েও কাজটি করিয়ে নিতে পারেন। আল্লাহ তৌফিক দেন বলেই আমরা ভালো কাজ করতে পারি।

      এই উপলব্ধিটুকু আমাদের সবার মধ্যে আসা দরকার।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close