সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ২৭): কুরআনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা যাবে না

mosque-at-isfahan

আগের আলোচনা: আয়াত ১-৬ | ৭-৮ | ৯-১২ | ১৩-১৪ | ১৫-১৬ | ১৭-১৮ | ১৯-২০ | ২১ | ২২ | ২৩-২৪ | ২৫-২৬

18:27

২৭। তোমার কাছে তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যে ওহী পাঠানো হয়েছে তা পড়ে শোনাও। এমন কেউ নেই যে তাঁর বাণী পরিবর্তন করতে পারে এবং তুমি তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো আশ্রয়স্থল পাবে না কখনোই।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

মক্কার কাফিররা মহানবীর ﷺ কাছে দাবী করত যে, আপনি আমাদের ইচ্ছা ও বিশ্বাস অনুযায়ী এ কুরআনকে পরিবর্তন করে দিন। তা করলে আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনতে প্রস্তুত আছি। বস্তুত তাদেরকে শোনানোর লক্ষ্যেই নবীকে ﷺ সম্ভাষণ করে আল্লাহ এ আয়াতের বক্তব্য পেশ করেছেন:

হে নবী ﷺ! আপনার কাছে আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যে ওহী পাঠানো হয়েছে তা পড়ে শোনান। আল্লাহর কালামে কোনো রদবদল করতে পারে এমন এখতিয়ার কারও নেই। কেউ যদি এমনটা করে তবে আল্লাহর আযাব থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সে কোনো আশ্রয়স্থল পাবে না। [কৃতজ্ঞতা: তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিধিবিধানের প্রধানতম উৎস হলো কুরআন। বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ কীভাবে করতে হবে তা শেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ হাতেকলমে দেখিয়ে গেছেন। তাঁর সাহাবীরা তা তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সরাসরি সঞ্চারিত সেই জ্ঞান আজও আমাদের কাছে বিদ্যমান আছে। এই উপায়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে যে জ্ঞান আমাদের কাছে পৌঁছেছে তাকে পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। কেউ পছন্দ করুক বা না করুক – এটিই ইসলাম।

নবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে কুরআন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলে যা অবশিষ্ট থাকবে সেটি ইসলাম নয়, বরং ইসলাম থেকে বিকৃতি। মুহাম্মাদ ﷺ-কে বাদ দিয়ে কেবলই আরবি ভাষা দিয়ে কুরআন বুঝতে চাইলে তা ফিতনার সকল দরজা খুলে দেবে। কেননা, আরবি ভাষায় একটি শব্দের অনেকগুলো অর্থ হয়ে থাকে। আবার, অঞ্চলভেদে একই শব্দের প্রয়োগে পার্থক্য দেখা যায়। সময়ের আবর্তনেও শব্দের ব্যবহার পরিবর্তিত হয়। আজকে থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে মক্কার কুরাইশ গোত্র যে প্রমিত আরবি ভাষা ব্যবহার করত সেই ভাষায় কুরআন নাযিল হয়েছে। সমসাময়িক আরবি দিয়ে তৎকালীন কুরাইশদের আরবিকে ব্যাখ্যা করতে গেলে অনেক স্থানেই কুরআনের অর্থের বিকৃতি ঘটতে বাধ্য।

অতএব, সাহাবীদের কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্র পরম্পরায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সরাসরি সঞ্চারিত আকারে কুরআনের যে পাঠ, উচ্চারণ ও ব্যাখ্যা আমাদের কাছে পৌঁছেছে সেটিই সঠিক। তাত্ত্বিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে এই বিষয়ে আপোষ করার কোনো সুযোগ নেই।

তবে, বাস্তব জীবনে কখনো কখনো আমাদের জীবনে এমনতর সব পরিস্থিতি আসতে পারে যখন কোনো একটি বিষয়ে কুরআনের সরাসরি আয়াত বা এর কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা বৃহত্তর সমাজের কাছে বা সমাজের ক্ষমতাধরদের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তখন আমাদের অনেকেরই মনে হতে পারে যে, এই একটি বিষয়ে কিছুটা ছাড় দিয়ে যদি সমাজের বা ক্ষমতাধরদের কাছ থেকে খানিকটা গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যায় তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের বৃহত্তর স্বার্থে সেটিই বুঝি উত্তম। সূরা কাহফ-এর এই আয়াতে তেমনটি করতে কড়া ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে।

তাছাড়া, সমাজ ও ক্ষমতাধরদের চাহিদা সতত পরিবর্তনশীল। আজ একটি বিষয়ে ছাড় দিলে কিছুদিন পর আরেকটি নতুন বিষয় এসে উপস্থিত হবে। এভাবে ক্রমাগত ছাড় দিতে থাকলে ইসলাম একসময় একটি আচার-আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত হবে। প্রতিপক্ষ উগ্র হলে সেটুকু ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়া অসম্ভব নয়।

বয়ঃপ্রাপ্তির সময় থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে কুরআন আমাদেরকে দিকনির্দেশনা দেয়। ধর্মীয় বিশ্বাস, উপাসনা, আধ্যাত্মিকতা, নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন কীভাবে চলবে, আমাদের পারস্পরিক লেনদেনের মূলনীতি কী হবে, পরস্পরের মধ্যে মতপার্থক্য কীভাবে নিরসন করা হবে, নেতৃত্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রধান করণীয় কী – এরকম প্রতিটি বিষয়ে কুরআনের দিকনির্দেশনা রয়েছে।

খন্ডিত উদ্ধৃতি বা অপব্যাখ্যার মাধ্যমে একে পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা আল্লাহ আমাদেরকে দেননি। আমরা দুর্বল হতে পারি। অপারগ হতে পারি। কিন্তু, মুখ খুললে হক কথা আমাদেরকে বলতেই হবে। সাহস না থাকলে প্রয়োজনে চুপ থাকতে হবে, কিন্তু তারপরও কোনো অবস্থাতেই কুরআনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা যাবে না। কেননা, নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো আমাদের সবার জন্য ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম সম্প্রদায়ের ‘বৃহত্তর স্বার্থ’ উদ্ধার করে আমার কী উপকার হবে যদি আমি নিজেই কুরআন বিকৃত করার অপরাধে জাহান্নামে চলে যাই?

আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআনের যথাযথ হক আদায় করার তৌফিক দিন।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ২৫শে জানুয়ারি, ২০১৭

Photo credit: Desmond Kavanagh

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close