দাজ্জাল, মাহদি ও শেষ যমানা (অনুবাদ)

ডক্টর শাবির আলী’র একটি প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানের অনুলিপি থেকে অনুদিত। সাক্ষাৎকারের প্রতিটি বক্তব্যের সাথে অনুবাদক একমত নাও হতে পারেন। ইংরেজিতে মূল অনুলিপিটি পড়ুন এখানে: http://www.onislam.net/english/reading-islam/understanding-islam/belief/468949-the-anti-christ-mahdi-a-the-end-of-times.html

bright-star

প্রশ্ন: শেষ যমানা সম্পর্কে ইসলামে কী বলা হয়েছে? দাজ্জাল বলতে [সেখানে] ঠিক কী বোঝানো হয়েছে? মাহদি-ই বা কে?    

উত্তর: আসলে বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কিত। হাদিসে বলা হয়েছে যে শেষ যমানার কাছাকাছি কোনো এক সময়ে ঈসা (আলাইহিস সালাম) আসমান থেকে নেমে আসবেন এবং [এরপর] নির্দিষ্ট কয়েক বছর ধরে তিনি যমিনের বুকে শাসন করবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শুয়োর হত্যা করবেন এবং জিযিয়া বিলুপ্ত করবেন। অতীতে মুসলিম শাসিত রাষ্ট্রে বসবাসরত অমুসলিমদের নিরাপত্তার দায়িত্ব মুসলিমরাই গ্রহণ করত এবং এর বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে জিযিয়া কর আদায় করা হতো।

তখনকার সময়টি হবে শান্তিময়। কারও কারও মতে এই [অবস্থাটি] সাত বছর স্থায়ী হবে। সর্বোপরি, [এই পৃথিবীতে] তাঁর পুনরাগমণের পর ঈসা (আলাইহিস সালাম) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।

আপনি হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন যে দাজ্জাল আসলে কী? সে কী একজন মানুষ? সে আসলে কে? কোনো কোনো হাদিসে তাকে একজন মানুষ হিসেবেই বর্ণনা করা করা হয়েছে। এমনকি এও বর্ণিত হয়েছে যে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সময়ে কতিপয় সাহাবী ইবনে সাইয়াদ নামক একজনকে দাজ্জাল বলে সন্দেহ করেছিলেন। কিছুদিন ধরে পর্যবেক্ষণের পর তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে সে আসলে দাজ্জাল নয়।

প্রশ্ন: আচ্ছা, তাকে কেন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল? তার কিছু শারীরিক বৈশিষ্টের জন্য নাকি তার তার কিছু আচরণের জন্য? আসলে ঘটনাটি ঠিক কী ছিলো?     

উত্তর: আমার মনে হয় যে মূলত তার শারীরিক বৈশিষ্টের জন্য নয়, বরং তার আচরণের জন্যই তাকে দাজ্জাল বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। [খুব সম্ভবত,] তার শয়তানসুলভ কিছু আচরণের জন্য [মানুষ তাকে সন্দেহ করেছিল]।

প্রশ্ন: তাহলে মুসলিমরা যখন দাজ্জাল নিয়ে কথা বলে, তখন তাদের মাথায় আসলে ঠিক কী থাকে? তার নির্দিষ্ট কোনো শারীরিক বৈশিষ্ট? নাকি তার চরিত্র বা ব্যক্তিত্যের কিছু বৈশিষ্ট?   

উত্তর: তার শারীরিক বৈশিষ্টের কিছু বর্ণনা [কতিপয় হাদিসে] এসেছে। [কিন্তু সমস্যা হলো,] ইতিহাসের এক চরিত্র সেই ইবনে সাইয়াদ-ও দাজ্জাল হতে পারত। আর এখানে এসেই বিষয়টি জট পাকিয়ে যাচ্ছে, কারণ হাদিসে দাজ্জালের শারীরিক বৈশিষ্টের যে বর্ণনা এসেছে তাতে সে হবে এক চোখে কানা একজন ব্যক্তি এবং সে খুব দ্রুত সময়ে [দীর্ঘ পথ] সফর করতে সক্ষম হবে। সে সকালে এক মহাদেশে থাকবে, দিনের পরবর্তীভাগে থাকবে আরেক মহাদেশে।

সেইসাথে, তার অনেক শক্তি বা প্রভাব থাকবে। সে মানুষকে তার উপাসনা করতে বলবে। কেউ তা করতে অস্বীকার করলে সে তাকে তার ‘জাহান্নামে’ নিক্ষেপ করে [অন্যদের জন্য কড়া] দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। তাকে উপাসনা করতে অস্বীকার করার অপরাধে যাদেরকে তার ‘জাহান্নামে’ নিক্ষেপ করা হবে তাদের জন্য [বাস্তবে] সেটিই হবে ‘জান্নাত’।

অন্যদিকে, তাকে উপাসনা করার মাধ্যমে যারা তার ‘জান্নাতে’ প্রবেশ করবে তাদের জন্য [বাস্তবে] সেটিই হবে ‘জাহান্নাম’।

এমনই প্রবল হবে দাজ্জালের শক্তি ও প্রভাব। সেই সময়ে (অর্থাৎ এখন থেকে ১,৪০০ বছরেরও আগে) বসবাসকারী একজন ব্যক্তি [ইবনে সাইয়াদ] যে এমন বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে এমনটি অকল্পনীয় [হওয়াটাই আসলে স্বাভাবিক]| এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে [দাজ্জাল সংক্রান্ত] এই হাদিসগুলো ইসলামের প্রথম কয়েকটি শতাব্দীতে বিবর্ধিত হচ্ছিল। [পরবর্তীতে] হাদিসের বিভিন্ন সংকলনে এই [বিবর্ধিত] বর্ণনাগুলোও লিপিবদ্ধ হয়েছে।

[লিপিবদ্ধ হওয়ার আগে] বর্ণনাগুলো মুখে মুখে [এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে] পৌঁছেছে এবং বিকশিত ও বিবর্ধিত হয়েছে। অবশেষে সেই হাদিসগুলোই এখন [লিখিত অবস্থায়] আমাদের কাছে পৌঁছেছে।

প্রশ্ন: আচ্ছা, তাহলে হাদিসে যেমনটি বলা হয়েছে ঠিক সেভাবেই কি দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে? এ ব্যাপারে আমরা কতটা সুনিশ্চিত? 

উত্তর: এই হাদিসগুলো নিয়ে আমাদের নতুন করে গবেষণা করা উচিৎ। ইসলামের প্রথম যুগের প্রাজ্ঞ আলিমরা এই বিষয়ে বর্ণিত প্রায় সবগুলো হাদিসকেই নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেছেন এবং সেভাবেই দাজ্জালের আবির্ভাবকে ব্যাখ্যা করেছেন। যেখানে [একাধিক বর্ণনার মধ্যে] দ্বন্দ্ব দেখা গেছে সেখানে [উভয় বর্ণনার মধ্যে] সমন্বয় সাধন করতে তাঁরা সর্বাত্নক চেষ্টা করেছেন। এর কারণ হলো, তাঁদের মতে এই সবগুলো বর্ণনাই বিশুদ্ধ সূত্রে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এসেছে। তাঁরা আসলে এই বর্ণনাগুলোর মূলভাবটুকুই শুধু বুঝতে চেয়েছেন।

এই হাদিসগুলো নিয়ে এখনও অনেক কাজ করার আছে। ইসলামের প্রাথমিক সময় থেকেই তাকে “আল-মাসিহ আদ-দাজ্জাল” বলে আখ্যায়িত করে আসা হচ্ছে। বর্ণিত হয়েছে যে, তার ব্যাপক ধ্বংসলীলা দিগদিগন্তব্যাপী বিস্তৃত হবে। তার অপকর্মের প্রতিক্রিয়াতেই ঈসা (আলাইহিস সালাম) [আল্লাহর নির্দেশে] আসমান থেকে নেমে আসবেন। লুদ নামক স্থাকে তারা পরস্পরের মুখোমুখি হবেন। জায়গাটি [ইসরাইলের] তেল আবিবের কাছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে। সেখানে এখন একটি বিমানবন্দর আছে। ফলে, দাজ্জালের আন্তর্জাতিক সফরের গতি নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। [খুব সহজেই] সকালে সে এক মহাদেশে থাকবে, সন্ধ্যায় থাকবে আরেক মহাদেশে।

যাই হোক না কেন, বর্ণিত হয়েছে যে, ঈসা (আলাইহিস সালাম) দুইজন ফেরেশতার ডানায় ভর দিয়ে যমিনে নেমে আসবেন। ফজরের ওয়াক্তে তিনি [সিরিয়ার] দামেশক শহরের একটি মসজিদের সাদা মিনারের ওপর অবতরণ করবেন। [সেখানে] তিনি মুসলিমদের সাথে নামায আদায় করবেন।

নামায শেষে কতিপয় মুসলিমকে সাথে নিয়ে তিনি তেল আবিবের নিকটবর্তী লুদ-এর উদ্দেশ্যে রওনা করবেন এবং সেখানে তিনি দাজ্জালের মুখোমুখি হবেন ও তার দেহ লক্ষ্য করে একটি বর্শা নিক্ষেপ করবেন। বর্ণিত হয়েছে যে, ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে দেখেই দাজ্জালের দেহ গলে যেতে শুরু করবে। বর্শাটি হবে একেবারে শেষ ধাক্কা, যা দাজ্জালকে খতম করে দেবে। এর পরের সময়টুকু [মানুষের জন্য] হবে পরম শান্তিময়।

প্রশ্ন: আচ্ছা, সেখান থেকে শেষ যমানায় আমরা কিভাবে পৌঁছব?  

উত্তর: হুম, মাহদি’র কথা তো আমি বলিইনি। বর্ণিত হয়েছে যে, এই কাহিনীতে ঈসা (আলাইহিস সালাম) ও দাজ্জালের পাশাপাশি আরেকজন কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকবেন, যিনি মাহদি (বা সুপথপ্রাপ্ত) বলে পরিচিত হবেন। তিনি একজন সৎকর্মশীল ব্যক্তি হবেন এবং এই পৃথিবীতে শান্তিময় অবস্থার প্রসার ঘটাবেন। তিনি ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর আগেই আসবেন এবং নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য তিনি [এই পৃথিবীকে মানুষের জন্য] শান্তিময় করবেন। এরপর [পৃথিবীতে আবার] বিশৃঙ্খলার আবির্ভাব হবে এবং দাজ্জালের কর্মকান্ডে অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকবে। ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর পুনরার্বিভাব এবং [তাঁর হাতে] দাজ্জাল নিহত না হওয়া পর্যন্ত এই [নৈরাজ্যকর] অবস্থা চলতে থাকবে।

বর্ণিত হয়েছে যে, এই মাহদি হবেন ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর সূত্রে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একজন বংশধর। তাঁর এই বংশধারাটি শিয়াদের একটি গোষ্ঠীর মতের সাথেও একভাবে মিলে যায়। এরা মনে করেন যে তাদের [একজন] ইমাম, যিনি [অনেক শতাব্দী ধরে রহস্যময়ভাবে] লোকচক্ষুর আড়ালে আছেন, [একসময়] মাহদি হিসেবে প্রত্যাবর্তন করবেন।

আপনি শেষ যমানা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। তো এর পরে, [অর্থাৎ মাহদি, দাজ্জাল ও ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর আবির্ভাব ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলী ঘটার পরে কোনো এক সময়ে] হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী সূর্য পশ্চিম দিক থেকে ওঠা শুরু করবে। এটি বাস্তবে কিভাবে সম্ভব তা একটি ভিন্ন প্রশ্ন।

অনেক বছর আগে আমি বিজ্ঞানের ওপর একটি কোর্স করেছিলাম। সেখান থেকে আমি জানতে পেরেছিলাম যে আমাদের সৌরজগতের কয়েকটি গ্রহের ঘুর্ণনে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা গেছে। এদের মধ্যে কোনো গ্রহ যেমন তার কক্ষপথে স্বাভাবিক নিয়মেই ঘুরছে, তেমনি এমন গ্রহও আছে যেটি অন্যান্য গ্রহের সাথে তুলনা করলে তার কক্ষপথে স্বাভাবিক নিয়মের বিপরীত দিকে ঘুরছে।

এসব গ্রহের অস্বাভাবিক ঘুর্ণনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে এগুলো কিছু গ্রহাণু দ্বারা এমন কঠিনভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল যে এর ফলে তারা তাদের মূল কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে এবং তাদের ঘুর্ণনের ক্রম বদলে যায়।

ফলে, এমনটি হওয়া আমার মতে খুবই সম্ভব, এবং আল্লাহই ভালো জানেন, যে যদি পৃথিবী এরকম একটি গ্রহাণু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, অথবা আল্লাহ যদি অন্য কোনোভাবে চান, তবে এর ফলে পৃথিবীর ঘুর্ণন উল্টে যেতে পারে। তখন পূর্ব দিকের বদলে পশ্চিম দিক দিয়েই সূর্য উঠছে বলে আমরা দেখতে পারব।

প্রশ্ন: দাজ্জাল সম্পর্কে আপনি যা বললেল তাতে স্বভাবতই এখানে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার কোনো দরকার নেই। ব্যাপারটি কল্পনাপ্রসূত বলে মনে হলেও এটি কি আসলেই বিস্ময়কর নয়?  

উত্তর: অবশ্যই। যেসব হাদিস থেকে আমরা প্রধানত ভবিষ্যতের ঘটনাবলীর বিবরণ পাই সেগুলো ওই হাদিসগুলোর মতো নয় যেখান থেকে ধরুন আমরা নামাযের বর্ণনা পাই। এদের মধ্যকার পার্থক্যটি আমি বুঝিয়ে বলছি। [দীনের] কোনো একটি আমল, যেটি মানুষ প্রতিদিনই পালন করতেন এবং যেটির নিয়মাবলী তাঁরা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছ থেকে শিখেছিলেন, [আমি সেরকম একটি আমলের কথা বলছি]।

তিনি তাঁদেরকে কাজটি এভাবে করতে হবে বলে শিখিয়েছেন এবং তাঁরাও প্রতিদিন সেটি সেভাবেই করে গেছেন। এর নিয়মাবলী তাঁরা সবাই জানতেন, ফলে এখানে [বিশেষ করে] মনে রাখার মতো কিছু ছিলো না। কিন্তু ভবিষ্যতে ঘটবে এমন কোনো ঘটনার বর্ণনা সম্বলিত হাদিসের ক্ষেত্রে আমরা একটি প্রশ্ন করতে পারি। আর তা হলো, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি হুবহু এভাবেই কথাগুলো বলেছিলেন? নাকি [এই ধরণের হাদিসের ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীদের মধ্যে] কেউ কেউ বর্ণিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোনো ভুল করে থাকতে পারেন?

উপস্থাপক: ঠিক আছে। আপনার সময়ের জন্য ধন্যবাদ, শাবির ভাই।   

অতিথি: আপনাকেও ধন্যবাদ।

০০০

মূল সাক্ষাৎকারটি দেখুন এখানে:

   

Advertisements

2 thoughts on “দাজ্জাল, মাহদি ও শেষ যমানা (অনুবাদ)

  1. পিংব্যাকঃ পৃথিবী জুড়ে পড়ন্ত বেলার পদধ্বনি | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ কিয়ামত নিকটবর্তী? (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s