আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন (অনুবাদ)

ইসলামে পাপ আর প্রায়শ্চিত্তের ধারণা আমার কাছে সবসময়ই আকর্ষণীয় মনে হয়। তাওবা সংক্রান্ত আয়াত আর হাদীসগুলো এত ইতিবাচক যে, সেটা আমার পাপী হৃদয়ে আশা জাগায়: ক্ষমার আশা, করুণার প্রত্যাশা। সূরা যুমার-এ যখন পড়ি, “আমার বান্দাহরা—যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ—আল্লাহর করুণা থেকে নিরাশ হয়োনা! নিঃসন্দেহে আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেন!” (৩৯:৫৩) অথবা যখন পড়ি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা, ‘মরুভূমিতে তোমাদের হারিয়ে যাওয়া উট খুঁজে পেয়ে তোমরা যতটা খুশি হও, আল্লাহ তার চেয়েও বেশি খুশি হন, যখন তাঁর বান্দা [তাঁর দিকে] তাওবা করে ফিরে আসে।’ [সাহীহ বুখারী]

এত সহজে কি আর কোথাও ক্ষমা পাওয়া যায়? মা-বাবাও তো এত তাড়াতাড়ি মাফ করেন না। তারাও তো জুড়ে দেন নানান শর্ত। খ্রিস্টধর্মে দেখি, মানুষের পাপমোচনের জন্য যিশুকে আত্মদান করতে হয়! আর আমার ধর্মে? ফিরে এসো, অতীত ভুলের জন্যে মাফ চাও! ব্যস! আল্লাহ আমার ফিরে আসায় আমার চেয়েও খুশি! তিনিই যে আর-রাহমান, পরম করুণাময়।

এর পরের লেখাগুলো আমার নয়। আমি অনুবাদ করেছি মাত্র—ইন্টারনেট থেকে। অসাধারণ ইংরেজি ব্লগ http://thehumblei.com/-এর লেখাটা আমার মনে হলো সবার পড়া উচিত। মূল লেখাটা আছে এখানে— http://thehumblei.com/2012/08/15/ibn-juzayy-on-repentance/ লেখকের কাছে অনুবাদ করার অনুমতি চেয়েছিলাম ওই ব্লগের কমেন্ট সেকশনে। আলহামদুলিল্লাহ, উনি সম্মতি দিয়েছেন। ভবিষ্যতে সেখান থেকে আরও কিছু অনুবাদের আশা রাখি।

তাওবা সম্বন্ধে ইবন জুযায়ী

orchidআমাদের ইমামদের মতে তাওবা হলো আল্লাহর পথে কারও যাত্রার একদম শুরুর জায়গা, যাকে বলে starting point। যেসব ইমাম অন্তঃরাজ্যের কারিগর ছিলেন (সুফি সাধক হিসেবে যারা সমধিক পরিচিত), তাঁদের ভাষায়, “ইন্নাল যুনুব, হিজাবুন ‘আনিল মাহবুব”—“পাপ কাজ বান্দাহ আর আল্লাহর মাঝে অন্তরায়”| এ বিষয়ে কুরআনের নির্দেশনা, “বিশ্বাসীরা! আল্লাহর দিকে ফেরো, যাতে সফলতা অর্জন করতে পারো। (সূরা আন-নূর, ২৪:৩১)

তাওবার মূলে রয়েছে ‘ফেরা’ বা ‘প্রত্যাবর্তন’—পাপ থেকে প্রত্যাবর্তন। অন্যভাবে বলতে গেলে, আল্লাহবিমুখতা থেকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। তাওবা না-করলে আমাদের গুনাহগুলো ক্রমশ জমে জমে অন্তরে অন্ধকারের অবগুণ্ঠন টেনে দেয়। ক্রমে এই অন্ধকারের ঘনত্ব বাড়তেই থাকে। একসময় হৃদয় অন্ধ হয়ে যায়; ঐশ্বরিক জ্যোতি সে আর দেখতে পায় না। “বস্তুত চোখতো মোটেও অন্ধ নয়, অন্ধ হচ্ছে হৃদয়, যে হৃদয় আছে বুকের ভিতর।” (সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪৬) আল-কুরআনে আরও আছে, “না! তাদের কার্যকলাপের কারণে, তাদের হৃদয়ে জং ধরেছে। (সূরা মুতাফফিফীন ৮৩:১৪)

নিচে আমরা তাওবার একটা সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়া তুলে ধরছি। এটি লিখেছেন ইবনু জুযায়ী আল- কালবি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৭৪১ হিজরি, ১৩৪০ ঈসায়ী)| এটি নেওয়া হয়েছে তাঁর লিখিত আল-কুরআন এর বিখ্যাত তাফসীর, আল-তাহসিল লি উলুম আল-তানযীল, (ওহী বিজ্ঞান সহায়িকা) থেকে। অতি সংক্ষেপে ইবন জুযায়ী এখানে তাওবার প্রক্রিয়া, তাওবাকারীর মানসিক অবস্থা এবং তাওবার পূর্বশর্ত তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে তিনি যেভাবে তাওবার ধাপগুলো চিত্রায়িত করেছেন তা খুবই উপকারী; এতে করে মু’মিনের আল্লাহর দিকে ফিরে আসা দৃঢ়তর হয়, সে তার রাব্ব-এর আরও কাছাকাছি আসতে পারে।

ইবন জুযায়ী লিখেছেন:

বিশ্বাসীরা! আল্লাহর দিকে ফেরো, যাতে করে সফলতা অর্জন করতে পারো। (সূরা আন-নূর: ৩১) আল-কুরআন, সুন্নাহর দলিল এবং মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যের ভিত্তিতে এটা প্রতিষ্ঠিত যে, তাওবা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ঈমানদারের জন্য অবশ্যকর্তব্য-ফরজ।

তাওবায় করণীয় তিনটি: (১) অনুশোচনা— এই অনুতাপ কোনো পার্থিব ক্ষতির জন্য নয়, বরং হতে হবে আল্লাহর নির্দেশ অমান্যের জন্য। (২) গড়িমসি বা অবহেলায় সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে গুনাহ থেকে নিবৃত্ত হতে হবে এবং (৩) ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার শপথ নিতে হবে। যদি কেউ ওয়াদা পালনে সক্ষম না হয়, তাহলে নতুন করে আবার সংকল্পবদ্ধ হতে হবে।

তাওবার বৈশিষ্ট্য তিনটি: (১) সম্পূর্ণ বিনম্র অনুভূতি নিয়ে নিজের গুনাহর স্বীকারোক্তি দেওয়া (২) অনুনয়-বিনয়ের সাথে আল্লাহর কাছে ক্ষমাভিক্ষা চাওয়া এবং (৩) অতীতের পাপমোচনের লক্ষ্যে বেশি বেশি ভালো কাজ করা।

তাওবার রয়েছে সাতটি স্তর: (১) অবিশ্বাসীর তাওবা; অবিশ্বাস থেকে বিশ্বাসের দিকে (২) আন্তরিক বিশ্বাসীর তাওবা; গুরুতর অপরাধ (কবীরা গুনাহ) থেকে (৩) মর্যাদাবান বিশ্বাসীর তাওবা; লঘু অপরাধ (সাগীরা গুনাহ) থেকে (৪)আন্তরিক পরহেজগার ব্যক্তির তাওবা, আলসেমি থেকে (৫) পথচারীর তাওবা, হৃদয়ের দোষ-ত্রুটি থেকে (৬) উন্নত হৃদয়-বিবেকবান ব্যক্তির তাওবা, সন্দেহজনক বিষয় থেকে (৭) আত্মিকভাবে আল্লাহকে প্রত্যক্ষকারীর তাওবা, আল্লাহ থেকে অমনোযোগী হয়ে যাওয়া থেকে।

Advertisements

8 thoughts on “আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন (অনুবাদ)

  1. পিংব্যাকঃ আল্লাহর স্মরণ সম্মন্ধে ইবন জুযায়ী (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ আরবি শব্দ “দ্বীন”-এর পাঁচটি অর্থ | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ আমাদের রামাদান বৃথা যাবে না যদি … | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ সিয়াম পালনকারীর জন্য আনন্দের দুই উপলক্ষ | আমার স্পন্দন

  5. পিংব্যাকঃ সূরা ‘আসর অল্প কথায় আমাদেরকে যা শেখায় (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

  6. পিংব্যাকঃ মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত বলে প্রতীয়মান হলে সেই পরিস্থিতিতে একজন মুসলিমের করণীয় | আমার স্পন্দন

  7. পিংব্যাকঃ সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (২): মাথা ঠান্ডা রেখে সামনে এগিয়ে যান | আমার স্পন্দন

  8. পিংব্যাকঃ ঈমান বাড়ানোর সহজ চারটি উপায় | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s