পিছনে পড়ে যাওয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা- ১ম কিস্তি: “আফসোস! আমি যদি এমনটি করে ফেলতাম!” (অনুবাদ)

date-palm

সময়টা নবম হিজরী। মদীনা তপ্ত সূর্যালোকে দগ্ধ। মাত্রাতিরিক্ত গরম পড়েছে সেবছর। সময়টা ফসল তোলার ঠিক আগে আগে। খেজুর গাছগুলো ফলের ভারে ন্যুব্জ; খেজুরের শীতল ছায়ায় অলস সময় কাটছে শহরবাসীর।

এই শহরের যিনি নেতা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর মাথায় কিন্তু তখন অলস সময় কাটানোর থেকে হাজারগুণে মহত্তর পরিকল্পনা। তিনি তখন ভাবছেন মদীনা থেকে ৬০০ কিমি উত্তরের তাবুক শহরে সামরিক অভিযান পরিচালনার কথা। সফর দূরবর্তী আর কঠিন; তপ্ত মরু আর তৃষ্ণা হবে সফরকারীদের সঙ্গী। সত্যিকারের বিশ্বাসী যারা, তারা ঠিকই নেতার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আহবানে সাড়া দিয়ে আল্লাহর পথে বের হয়ে এলেন। এলো না কিছু লোক, যাদের সংখ্যা ৮০-র মতো। এরা ছিলো ভণ্ড; মুনাফিক। তাদের হৃদয় বিষিয়ে ছিল কপটতায়। আল্লাহ আর তাঁর রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ডাক নয়, বরং তাদের প্রাধান্য ছিল আসন্ন ফসল, আর মদীনার ছায়া।

এরা ছাড়াও গেলেন না আরো তিনজন। ইনারা কিন্তু মুনাফিক ছিলেন না; ছিলেন অকৃত্রিম, আন্তরিক বিশ্বাসী। তাঁরা হলেনঃ হিলাল ইবন উমাইয়া, মিরারা ইবন আলরাবী’, আর এই ঘটনার বর্ণনাকারী কা’ব ইবন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)| কা’ব-এর অসম্ভব শক্তিশালী বর্ণনা থেকে আমরা তাঁর মানসিক অবস্থা আর আবেগকে অনুভব করতে পারি, প্রায় ১৫০০ বছর পরেও! অনুশোচনার আগুন তাঁকে দগ্ধ করছিল; তাঁর ঈমান তাঁকে মিথ্যা থেকে রক্ষা করছিল; কিন্তু রাসুলুল্লাহ-র (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শাস্তি যেন তাঁর বুক ভেঙ্গে দিচ্ছিলো। অবশেষে আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমা তাঁর জীবনে আনন্দ ফিরিয়ে দেয়!

তিনি বলেন (তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ-র বর্ণনা)-

“রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তাবূক ও বদর ছাড়া আর কোন যুদ্ধেই আমি অনুপস্থিত থাকিনি। তবে বদর যুদ্ধে যারা পেছনে থেকে গিয়েছিলেন, তাদের কাউকে তিনি ভর্ৎসনা করেননি। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুধুমাত্র একটি কুরাইশ কাফেলার সন্ধানে বের হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের ও শত্রুদের মাঝে অঘোষিত এ যুদ্ধ সংঘটিত করেন। আর আকাবার রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখন ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে কায়েম থাকার জন্য আমাদের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন। তাই আমি আকাবার বায়‘আতের চেয়ে বদরের যুদ্ধকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করতাম না। যদিও মানুষের মাঝে আকাবার ঘটনা অপেক্ষা বদর যুদ্ধ অধিক প্রসিদ্ধ ছিল।

যাহোক আমার ঘটনা এই যে, আমি যখন তাবূকের যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলাম, সে সময়ের চেয়ে অন্য কোন সময়েই আমি অধিক শক্তিশালী ও সচ্ছল ছিলাম না। আল্লাহ্‌র কসম! আগে আমার কখনো একসাথে দু’টো উট ছিল না। অথচ এ যুদ্ধের সময় (যুদ্ধের আগে) ছিল। আর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেকোনো যুদ্ধের আগে কোথায় যেতে হবে সে ব্যাপারে তাঁর মনের প্রকৃত অভিসন্ধি আগে থেকে প্রকাশ করতেন না । কিন্তু এ যুদ্ধের সময় ভীষণ গরম ছিল। লম্বা পথ এবং সেটা বিশাল মরুভূমির মধ্য দিয়ে। শত্রুর সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। কাজেই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাবার পথ বলে দিলেন যাতে সাহাবীরা যুদ্ধের উপযুক্ত সরঞ্জাম নিয়ে রওয়ানা দিতে পারেন। তখন তাঁর সাথে বিপুলসংখ্যক মুসলিম ছিলেন। তবে তাঁদের নাম কোন রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ ছিল না।

কা‘ব (রা.) বলেন, সুতরাং কেউ যুদ্ধে না যেতে চাইলে সহজেই তা করতে পারত, যতক্ষণ না তার বিষয়ে অহি নাযিল হয়।

কা’ব (রা.) বলছেন যে তাঁর তখনকার অবস্থা এমন ছিল যে না যাওয়ার পক্ষে কোন যুক্তিই ছিলোনা। বরং অবস্থা এতোখানি ভালো ছিলো যে তাঁর কাছে একটির পরিবর্তে দু’দুটি উট ছিল। তিনি জোর দিয়ে এও বলছেন যে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই অভিযানে অন্য অভিযানের মতো কোন সামরিক কৌশলের আশ্রয় না নিয়ে প্রথম থেকেই গন্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন।

স্পষ্টই বুঝা যায় যে জীবনকে বদলে দেয়া এই ঘটনা থেকে তিনি যে অমূল্য শিক্ষা পেয়েছেন তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যেই কেবল কা’ব (রা.) এই ঘটনা অকপটে তুলে ধরছেন। একইভাবে, আমাদের কোন ভুল থেকে যদি আমরা শিক্ষা লাভ করি, তাহলে আমাদেরও উচিত হবে তা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া; এতে করে তারা হয়তো উপকৃত হবে, ভুল থেকে দূরে থাকতে পারবে।

স্বাস্থ্য বা সাঁজ সরঞ্জাম, কোনটারই কোন ঘাটতি কা’ব (রা.)-এর ছিলো না। তাহলে কী তাঁকে পিছিয়ে দিলো? কেন তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ডাকে সাড়া দিতে পারলেন না?

চলুন, নিজেদের জীবনের দিকে একবার তাকাই। পূর্ণ ইচ্ছা ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে দেখা যায় আমরা কোন কাজ দিনের পর দিন করছি না, ভবিষ্যতে করবো বলে ফেলে রাখি। না করার কারণ একটাইঃ অকারণ দীর্ঘসূত্রিতা (procrastination)! যখন অন্য কোন অজুহাত থাকে না, তখন এই অকারণ দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়, লক্ষ্যে পৌঁছানোতে বাঁধা সৃষ্টি করে। কা’ব (রা.)-এর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল! এই কারণ-ই তাঁকে মুসলিম-দের সাথে অভিযানে যোগ দেয়া থেকে বিরত রাখে!

তিনি বলেন:

“রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন এক সময় এ অভিযানে যান যখন ফল পাকার ও গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেয়ার সময়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সাথে সাহাবীরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমিও রোজ সকালে তাঁদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকি। কিন্তু ঘরে ফিরে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম না। শুধু মনে হতো, ‘আমি তো যে কোন সময় যাবার প্রস্তুতি নিতে পারি। এভাবে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মাঝে আমার সময় কাটতে লাগল। অথচ অন্যরা পুরোদস্তুর প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল।

একদিন সকালে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুসলমানদের নিয়ে রওয়ানা দিয়ে দিলেন। অথচ তখনো আমি যাবার জন্যে তৈরি নই। মনে মনে ভাবলাম, ‘দু’এক দিন পরে প্রস্তুতি নিয়েও তাঁদের সঙ্গে মিলিত হ’তে পারব’| তারা চলে যাওয়ার পর আমি মসজিদে গেলাম এবং প্রস্তুতি নেওয়ার পরিকল্পনা করলাম কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তহীনভাবে ঘরে ফিরলাম। পরদিন সকালে যাওয়ার নিয়ত করলাম, কিন্তু আবারো সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। আমার এ দোদুল্যমনতার মাঝে মুসলিম সেনারা দ্রুত চলছিলেন এবং বহুদূর চলে গেলেন। অথচ আমি রওয়ানা দিয়ে তাঁদের ধরে ফেলার ইচ্ছা পোষণ করতে থাকলাম। আফসোস! আমি যদি তা করে ফেলতাম (তাহলে ভালই হ’ত)! কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চলে যাওয়ার পর আমি যখন বাইরে বের হতাম, তখন পথে-ঘাটে মুনাফিকদেরকে অথবা দুর্বল হওয়ার কারণে আল্লাহ যাদেরকে অক্ষম করে দিয়েছেন, তাদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। আর এটা আমাকে মন:ক্ষুণ্ণ করত।

“আফসোস! আমি যদি এমনটি করে ফেলতাম (তাহলে ভালই হ’ত)! এই খেদোক্তি আমাদের খুবই পরিচিত। হয় আমরা নিজেরাই বলি (বা বলেছি কখনো না কখনো), অথবা আশেপাশে উচ্চারিত হতে শুনি। অথবা হয়তো এখনো বলিনি, কিন্তু মনের গহীনে লুকানো আছে এই আক্ষেপ। এই মর্মবেদনার তিক্ততা তখন শতগুনে বেড়ে যায় যখন তা আখিরাতের সাথে সম্পর্কিত হয়।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লা বলেন:

তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছোটো যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা তৈরী করা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। (সূরা আলে ইমরানঃ ১৩৩)

ভালো কাজকে প্রাধান্য দেয়া, তার জন্যে তাড়াহুড়া করার উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমরা পাই রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন থেকে।

উকবা ইবন আল হারিস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন: “একদিন আমি মদীনায় রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পিছনে আসরের নামায পড়লাম। নামায শেষে সালাম ফিরিয়ে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাড়াতাড়ি করে উঠে লোকজনকে ডিঙ্গিয়ে তাঁর কোন এক স্ত্রীর ঘরে গেলেন। লোকজন তাঁর তাড়াহুড়ায় অবাক হল। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফিরে এসে লোকজনের অবাক হওয়া খেয়াল করে বললেন: “আমার মনে পড়ল যে আমার কাছে দান করার জন্যে কিছু সোনা রয়ে গেছে; আমি চাইনি এগুলো আমার কাছে আর কিছুক্ষণও থাকুক। তাই আমি সেগুলো বিলি করে দেয়ার আদেশ দিয়ে এলাম।“ (বুখারী) অন্য এক বর্ণনা অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “ঘরে আমি দান করার জন্যে কিছু সোনা রেখে এসেছিলাম। ওগুলো আজ রাতে আমার ঘরে থাকুক আমি চাইনি।”

যদিও বেশীরভাগ মতানুসারে মসজিদে লোকজনকে ডিঙ্গানো অপছন্দনীয়, তবুও রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই কাজ করেছিলেন। কারণ ঘরে রয়ে যাওয়া দানসামগ্রী বিলি করতে দেরী না করা তাঁর কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কা’ব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘটনায় স্পষ্ট দেখা যায় যে তখনকার মুসলিম সমাজ সৎ কাজকে প্রাধান্য দেয়ায়, ভালো কাজে তাড়াহুড়া করায় অভ্যস্ত ছিল। মদীনার রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কা’ব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কাদেরকে দেখতে পেলেন? “মুনাফিকদেরকে অথবা দুর্বল হওয়ার কারণে আল্লাহ যাদেরকে অক্ষম করে দিয়েছেন, তাদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না”| এটা স্পষ্ট যে সাহাবীরা পরিষ্কারভাবে জানতেন যে এই ধর্মের জন্য কাজ করা, সংগ্রাম করা তাঁদের সবার জন্য অত্যাবশ্যক; এটা শুধু যুবকদের বা মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কাজ নয়। উপরের অনুচ্ছেদ থেকে আমরা সৎকর্মশীলদের বন্ধুত্বে অগ্রবর্তী হওয়া, তাঁদের সাহচর্যে সময় কাটানোর গুরুত্বের ব্যাপারেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই। যদি আমরা নিজে থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগী না হই, তাহলে হয়ত অচিরেই নিজেদেরকে বিপরীত চরিত্রের লোকজনের মাঝে দেখতে পাব।

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের শিখিয়েছেন:
“সাতটি ব্যধিতে আক্রান্ত হওয়ার আগেই সৎ কাজে অগ্রবর্তী হও।”সতর্কবাণী উচ্চারণ করে তিনি বলেন, “তোমরা কি সেই দারিদ্রের অপেক্ষা করছ যা তোমাদের নিষ্ঠা থেকে অমনোযোগী করে দিবে; অথবা সেই প্রাচুর্যের যা তোমাদের অসৎ করে দিবে, অথবা এমন রোগ যা তোমাদের অক্ষম করে ফেলবে, এমন বার্ধক্য যা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন করে ফেলবে, অথবা আকস্মিক মৃত্যু, অথবা দাজ্জাল যে কিনা প্রত্যাশিত অনুপস্থিতিগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ, অথবা কিয়ামতের দিন, যা হবে সবথেকে যন্ত্রনাদায়ক ও তিক্ত।” (তিরমিযী)

আমরা যদি নিজেদের জীবনে এই মূলনীতি বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে অবশ্যই আমাদের ঈমান দৃঢ়তর হবে আর আমাদের সৎ কাজের সংখ্যাও বাড়বে।

ভালো কাজের ডাক পাওয়ার সাথে সাথেই অগ্রসর হওয়া

আল্লাহ যখন আমাদের জন্য তাঁর করুণার দরজা খুলে দেন, আমাদের তখন কালক্ষেপন না করে তাতে প্রবেশ করা উচিৎ। নাহলে আমরা যদি এরকম সুযোগ হারাতে থাকি, হয়তো একসময় এই দরজা আমাদের মুখের উপর বন্ধ হয়ে যাবে, যা আমরা কল্পনাও করিনি। আমরা হয়তো ভেবেছিলাম দরজা চিরকাল খোলা থাকবে, আর আমরা যখন খুশী একসময় ঢুকে যাব! কিন্তু এটা তো নাও হতে পারে! জামা’তে নামায আদায়, বা আরবী ভাষা শিখা, বা যথাযথ হিজাব করা, এসব ক্ষেত্রে করব, বা শিখব এই ‘ব’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দগুলোক প্রতিবন্ধক হিসেবে নেয়া উচিৎ যা আমাদেরকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌঁছাতে বাধা দেয়।

সৎকাজের সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হল অক্ষমতার ফাঁদে পা না দিয়ে সুযোগ যখন আসে, তখন দৃঢ় সংকল্পের সাথে তৎপর হতে পারা। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্যক্তি সে-ই যে কোন উৎসাহব্যঞ্জক ভাষণ শোনার পরে, অথবা তথ্যবহুল কোন লেখা পড়ার পরে প্রাপ্ত শিক্ষাকে কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে ওঠে। পরের দিনের জন্য সে অপেক্ষা করে না, কারণ ততোক্ষণেতো দেরী হয়ে যেতে পারে!

কা’ব ইবন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একজন সাহাবী ছিলেন; অর্থাৎ তিনি এই জাতির সর্বোৎকৃষ্ট প্রজন্মের একজন। তবুও তিনি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে যাওয়ার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, শুধুমাত্র প্রস্তুতিতে দেরী করার কারণে! আমাদের তাহলে কি অবস্থা হতে পারে, আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি?

আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন যে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কিছু সাহাবীকে নামাযের পিছনের কাতারে দাঁড়াতে দেখে বললেন: সামনে এসো আর আমাকে (নামাযে) অনুসরণ কর। যারা পরে আসবে, তারা তোমাদের অনুসরণ করবে। মানুষ পিছনে পড়ার জন্য অবিচল থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ তাঁদের পেছনে ঠেলে দেন (মুসলিম)| আমরা যদি ক্রমাগত আল্লাহর ইবাদতে পিছনে পড়তে থাকি, তাহলে আল্লাহ আমাদের পিছনে পড়ে থাকার কারণ ঘটানোর মাধ্যমে শাস্তি দিতে পারেন।

সত্য জানার পর অনতিবিলম্বে মেনে নেয়া

সৎ কাজে অগ্রাধিকারের সাথে অগ্রসর হওয়ার মধ্যে এটাও পড়ে যে সত্য জানার সাথে সাথে আমরা তা মেনে নেব। যদি আমরা তা না পারি, তাহলে আল্লাহ আমাদের বুঝশক্তি কমিয়ে দিয়ে এবং সরল পথ থেকে আমাদেরকে বিচ্যুত করে দেয়ার মাধ্যমে শাস্তি দিতে পারেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লা বলেন:

আমি ঘুরিয়ে দিব তাদের অন্তর ও দৃষ্টিকে, যেমন-তারা এর প্রতি প্রথমবার বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্ত ছেড়ে দিব। (সূরা আনআ’মঃ ১১০)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেন:

… অতঃপর তারা যখন বক্রতা অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না। (সূরা আস-সফঃ ৫)

এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে প্রথমবারেই সত্যকে গ্রহণ না করার কারণে হেদায়াত পাওয়ার আগেই অন্তর আবার মিথ্যায় ফিরে যেতে পারে। এই আয়াতগুলো আমাদের দুর্বলতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আর স্পষ্ট করে দেয় যে একমাত্র আল্লাহ্‌ই আমাদেরকে সৎ কাজ করার সুযোগ করে দেন অথবা তা থেকে বিরত রাখেন।

আল্লাহ্‌ বিশ্বাসীদের আদেশ করেন:

হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ মান্য কর, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যাতে রয়েছে তোমাদের জীবন। জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষের এবং তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে যান। বস্তুতঃ তোমরা সবাই তাঁরই নিকট সমবেত হবে। (সূরা আনফালঃ ২৪)

অতএব আমাদের বুঝতে হবে যে সৎকাজে দেরী করলে পরবর্তীতে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ওই কাজ করার সৌভাগ্য আমরা আর কখন নাও পেতে পারি।

দুঃখ দুর্দশায় প্রথম প্রতিক্রিয়াই হতে হবে ধৈর্য

আনাস ইবন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, “রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি কবরের পাশে ক্রন্দনরত এক মহিলাকে অতিক্রম করলেন। তিনি মহিলাকে আল্লাহকে ভয় করতে ও ধৈর্য ধারণ করতে উপদেশ দিলেন। মহিলা তাকে চিনতে না পেরে বললেন, “দূর হও! তুমি তো আর আমার মতো দুর্দশাগ্রস্ত হওনি। পরে যখন মহিলাকে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিচয় দেয়া হলো, তিনি তখন রাসুলুল্লাহর বাড়িতে গেলেন। সেখানে তিনি কোন প্রহরীর দেখা পেলেন না। মহিলা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, “আমি আপনাকে চিনতে পারিনি”| রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বললেন: “নিশ্চয়ই দুর্ঘটনার প্রথম আঘাতেই ধৈর্য ধরতে হবে”। (বুখারী)

সুতরাং আমরা দেখতে পেলাম যে ধৈর্যের ক্ষেত্রেও অগ্রবর্তী হওয়ার মধ্যেই পুরষ্কার!

কা’ব ইবন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)’র দীর্ঘ গল্পের এই ছোট অংশ থেকে আমরা পুরো ঘটনার গোঁড়ার কারণ খুঁজে পাই। কা’ব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)’র নিজের ভাষায়: “আফসোস! আমি যদি এমনটি করে ফেলতাম (তাহ’লে ভালই হ’ত)!” তিনি কিন্তু এর সাথে এটাও যোগ করেছেন, “কিন্তু তা আমার ভাগ্যে ছিল না”।
হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের মুসলমানদের সাবধান করার জন্য আল্লাহ কা’ব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে এই পরীক্ষায় ফেলেছিলেন।

… কাজেই সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাও … (সূরা আল বাকারাঃ ১৪৮)

মূল লেখা: http://muslimmatters.org/2010/04/05/lessons-in-staying-behind-part-1-i-wish-i-had-done-so/ 

Advertisements

3 thoughts on “পিছনে পড়ে যাওয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা- ১ম কিস্তি: “আফসোস! আমি যদি এমনটি করে ফেলতাম!” (অনুবাদ)

  1. পিংব্যাকঃ পিছনে পড়ে যাওয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা- ২য় কিস্তি: “কা’ব এটা কী করল?” (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ পিছনে পড়ে যাওয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা- ৩য় কিস্তিঃ পৃথিবী যখন অচেনা! (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ পিছনে পড়ে যাওয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা- ৪র্থ কিস্তিঃ নিঃশর্ত আনুগত্য (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s