সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩২-৩৬): প্রাচুর্যের পরীক্ষা

Purple grapes vineyard

আগের আলোচনা: আয়াত ১-৬ | ৭-৮ | ৯-১২ | ১৩-১৪ | ১৫-১৬ | ১৭-১৮ | ১৯-২০ | ২১ | ২২ | ২৩-২৪ | ২৫-২৬ | ২৭ | ২৮ | ২৯-৩১

18:32

18:33

৩২। তাদের সামনে সেই দুই ব্যক্তির উপমা পেশ কর যাদের একজনকে আমি আঙ্গুরের দুটি বাগান দিয়েছিলাম এবং সে দুটিকে খেজুর গাছ দ্বারা ঘেরাও দিয়ে রেখেছিলাম, আর বাগান দুটির মাঝখানকে শস্যক্ষেত্র বানিয়েছিলাম।

৩৩। উভয় বাগান পরিপূর্ণ ফল দান করত এবং কোনোটিই ফল দানে কোনো ত্রুটি করত না। আমি বাগান দুটির মাঝখানে একটি নহর প্রবাহিত করেছিলাম।

18:34

৩৪। সেই ব্যক্তির প্রচুর ধন-সম্পদ অর্জিত হলো। অতপর সে কথাচ্ছলে তার সঙ্গীকে বলল, আমার অর্থ-সম্পদও তোমার চেয়ে বেশি এবং আমার দলবলও তোমার চেয়ে শক্তিশালী।

18:35

18:36

৩৫। নিজ সত্ত্বার প্রতি সে যুলুম করেছিল, আর এ অবস্থায় সে তার বাগানে প্রবেশ করল। সে বলল, আমি মনে করি না এ বাগান কখনো ধ্বংস হবে।

৩৬। আমার ধারণা কিয়ামত কখনোই হবে না। আর আমাকে আমার প্রতিপালকের কাছে যদি ফিরিয়ে নেওয়া হয় তবে আমি নিশ্চিত (সেখানে) আমি এর চেয়েও উৎকৃষ্ট স্থান পাব।

সংক্ষিপ্ত তাফসির: 

হে মুহাম্মাদ ﷺ! তাদের সামনে সেই দুই ব্যক্তির উপমা পেশ করুন যাদের একজনকে আমি আঙ্গুরের দুটি বাগান দিয়েছিলাম এবং বাগান দুটিকে খেজুর গাছ দ্বারা ঘেরাও দিয়ে রেখেছিলাম, আর বাগান দুটির মাঝখানকে বানিয়েছিলাম শস্যক্ষেত্র। উভয় বাগান পরিপূর্ণ ফল দান করত এবং কোনোটিই ফল দানে কোনো ত্রুটি করত না। আমি বাগান দুটির মাঝখানে একটি নহরও প্রবাহিত করেছিলাম। সেই ব্যক্তির প্রচুর ধন-সম্পদ অর্জিত হলো। অতপর সে গর্বভরে তার সঙ্গীকে বলল, আমার অর্থ-সম্পদও তোমার চেয়ে বেশি এবং আমার দলবলও তোমার চেয়ে শক্তিশালী। নিজ সত্ত্বার প্রতি সে যুলুম করেছিল। আর এই অবস্থায় সে তার সেই সঙ্গীকে নিয়ে বাগানে প্রবেশ করল এবং তাকে তার ফলফলাদি দেখাতে লাগল। সে বলল, “আমি মনে করি না এই বাগান কখনো ধ্বংস হবে। আমি এও মনে করি না যে, কিয়ামত হবে। আর তোমার ধারণা অনুযায়ী আমাকে যদি আমার প্রতিপালকের কাছে যদি ফিরিয়ে নেওয়াও হয় তবে আমি নিশ্চিত সেখানে আমি এর চেয়েও উৎকৃষ্ট স্থান পাব।“ [তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন এবং তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

এই দুনিয়াতে কারও দিন কাটে অভাব ও অনটনের মধ্যে। কেউ আবার অনেক সম্পদের অধিকারী। যাকে কম দেওয়া হয়েছে তার প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্ট, আর যাকে বেশি দেওয়া হয়েছে তার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট – এমনটি মোটেও নয়। দারিদ্র ও প্রাচুর্য, সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা, সম্পদের হ্রাস ও বৃদ্ধি ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা করে যাচ্ছেন। আমরা সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে পারছি কি না সেটিই হলো পরীক্ষা।

দারিদ্রের পরীক্ষা প্রচন্ড কঠিন হলেও প্রাচুর্যের পরীক্ষাও কিন্তু সহজ নয়। কোনো ব্যক্তি অনেক সম্পদের অধিকারী হলে এই সম্পদই তাকে অহংকারী করে তুলতে পারে। আল্লাহর স্মরণ থেকে সে গাফেল হয়ে যেতে পারে। অন্য মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করতে সে প্ররোচিত হতে পারে।

দুঃখজনকভাবে, আমরা অনেকেই ভুলে যাই যে, আমাদের জীবন, জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, শক্তি, সামর্থ, অনুকূল পারপার্শিকতা ও পরিবেশ ইত্যাদি সবই আল্লাহর দেওয়া। আমাদের যা কিছু আছে তার সবই তাঁর দেওয়া এবং তিনি চাইলে যেকোনো সময়ে আমাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে – এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ভুলে থাকি বলেই পার্থিব সম্পদ আমাদেরকে অহংকারী করে তোলে।

সূরা কাহফ-এর আলোচ্য আয়াতসমূহে সেদিকেই দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। এখানে বর্ণিত সম্পদশালী ব্যক্তিটি কৃষিপ্রধান একটি জনপদের নিরিখে বিচার করলে একজন ধনী ব্যক্তি ছিল। তার খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান ছিল। ছিল শস্য ক্ষেত। সেসব বাগান ও ক্ষেতে সেচের সুবন্দোবস্ত ছিল। জমি সেচ করতে যে পানি লাগে তা তো আল্লাহরই দেওয়া। মাটির উর্বরাশক্তি, চাষের জন্য অনুকূল আবহাওয়া, বৃষ্টি, সূর্যের কিরণ – এ সব কিছু তো তাঁরই দেওয়া। এর কোনো একটি থেকেও বঞ্চিত থাকলে শত মেহনত করার পরেও প্রত্যাশিত ফল ও ফসলের দেখা সে পেত না। কিন্তু, প্রাচুর্যের অধিকারী অনেক মানুষের যা হয় তারও তা-ই হলো। সে অহংকারী হয়ে উঠল। নিজেকে সে অন্যের চেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে করতে শুরু করল। আর এভাবেই প্রাচুর্যের পরীক্ষায় সে ব্যর্থ হতে শুরু করল।

সম্পদশালী হওয়া দোষের কিছু নয়। দম্ভ ও অহংকার না আসলে এবং আল্লাহকে ভুলে না গেলে এই সম্পদও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। শুনতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি বেশ কঠিন এক পরীক্ষা।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ২৪শে মার্চ, ২০১৭  

Advertisements

2 thoughts on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩২-৩৬): প্রাচুর্যের পরীক্ষা

  1. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩৭-৪১): সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৪২-৪৪): জীবনে হঠাত নেমে আসা বিপদ যখন বিপথে যাওয়া থেকে আমাদেরকে বাঁচায়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s