সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩৭-৪১): সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়

Rain on plant

আগের আলোচনা: আয়াত ১-৬ | ৭-৮ | ৯-১২ | ১৩-১৪ | ১৫-১৬ | ১৭-১৮ | ১৯-২০ | ২১ | ২২ | ২৩-২৪ | ২৫-২৬ | ২৭ | ২৮ | ২৯-৩১ | ৩২-৩৬

18:37

18:38

৩৭। তার সাথী কথাচ্ছলে তাকে বলল, তুমি কি সেই সত্ত্বার সাথে কুফরি আচরণ করছ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি হতে, তারপর শুক্র হতে এবং তারপর তোমাকে একজন সুস্থ-সবল মানুষে পরিণত করেছেন?

৩৮। আমার ব্যাপার তো এই যে, আমি বিশ্বাস করি আল্লাহই আমার প্রতিপালক এবং আমি আমার প্রতিপালকের সাথে কাউকে শরিক মানি না।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

তদুত্তরে তার সাথী তাকে বলল, “তুমি কি সেই সত্ত্বার সাথে কুফরি আচরণ করছ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি হতে, তারপর শুক্র হতে এবং তারপর তোমাকে একজন সুস্থ-সবল মানুষে পরিণত করেছেন? আমার ব্যাপার তো এই যে, আমি বিশ্বাস করি আল্লাহই আমার প্রতিপালক এবং আমি আমার প্রতিপালকের সাথে কাউকে শরিক মানি না।” [তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন এবং তাফসির আল-জালালাইন] 

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

কোনো ব্যক্তি বিত্ত, বংশমর্যাদা, লোকবল, ক্ষমতা ও জ্ঞানে সমাজের অন্য অনেকের চাইতে এগিয়ে থাকলে সে সহজেই অহংকারী হয়ে উঠতে পারে। নিজেকে সে অন্যদের চেয়ে যোগ্যতর ও অধিক মর্যাদাবান বলে মনে করতে শুরু করতে পারে। প্রাচুর্যের পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে আমাদের নিজেদের পরিণতিও এমনটি হতে পারে।

আমি যদি দেখি যে, বিত্ত, বংশমর্যাদা, লোকবল, ক্ষমতা ও জ্ঞানের কোনো একটির দিক দিয়ে আমি সমাজের অন্য অনেকের চেয়ে উপরে অবস্থান করছি তাহলে সেজন্য অহংকারী হওয়ার বদলে নিজেকে দরকারী কিছু প্রশ্ন করা আমার জন্য জরুরী। আমি কীভাবে এই দুনিয়াতে এলাম? কীভাবে বেড়ে উঠলাম? শৈশবের দুর্বলতা কাটিয়ে কীভাবে আমি আজকের এই শক্তি ও সামর্থ অর্জন করলাম? আমার চুড়ান্ত গন্তব্য কোথায়? এই মৌলিক প্রশ্নগুলো নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করা উচিৎ।

একসময় আমার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে আমার বর্তমান সৃষ্টির সূচনা হলো। আমার ভ্রূণের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হলো। হৃদয়ের স্পন্দন শুরু হলো। আমার দেহের প্রাথমিক অবয়ব গঠিত হতে লাগল। আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে একে পূর্ণতা পেতে আরম্ভ করল। একসময় আমি ভূমিষ্ঠ হলাম। ধীরে ধীরে আমি বেড়ে উঠতে লাগলাম। এরই ধারাবাহিকতায় আমি আমার আজকের এই অবস্থানে এসেছি। এরপর একটা সময় আসবে যখন আমার সবকিছু একে একে ক্ষয় হতে শুরু করবে। আমার শারীরিক সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে লোপ পেতে থাকবে। স্মৃতিশক্তি হ্রাস পেতে থাকবে। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চললে আমি আবারও ফিরে যাব আমার শৈশবের সেই দুর্বল অবস্থায়। তারপর নির্ধারিত একটি সময়ে আমাকে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। সেই নির্ধারিত সময়টি আমার বার্ধ্যকে উপনীত হওয়ার আগেও হতে পারে। যখনই হোক, আমাকে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতেই হবে। আমার বিত্ত, বংশমর্যাদা, লোকবল, ক্ষমতা ও জ্ঞান এখানে রেখেই খালি হাতে আমাকে চলে যেতে হবে। ঈমান, সৎকর্ম ও আমার জন্য করা মানুষের দু’আ ছাড়া আর কিছুই সেই জগতে আমার কোনো কাজে আসবে না।

আমি আমার বংশের অহংকার করছি? কার শুক্রাণু ও কার ডিম্বাণু থেকে আমার ভ্রূণ সৃষ্টি হবে তা তো আমি নির্ধারণ করিনি। এ বিষয়ে আমার সামান্যতম কোনো ক্ষমতা ছিল না। আল্লাহ যেখানে চেয়েছেন সেখানেই আমার জন্ম হয়েছে। যে বিষয়ে আমার কোনোই ক্ষমতা ও স্বাধীনতা নেই সে বিষয় নিয়ে অহংকার করা আমার মানায় না।

জ্ঞানের অহংকার? আমার মস্তিষ্ক যে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে তা একান্তই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে করছে। তিনি চাইলে যেকোনো সময়ে আমার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা লোপ পেতে পারে।

বিত্তের বড়াই? এই পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা আমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী ও পরিশ্রমী, কিন্তু তারপরও তারা আমার মতো সম্পদ অর্জন করতে পারেনি। আল্লাহ আমাকে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা দিয়েছেন এবং ‘সঠিক সময়ে’ ‘সঠিক স্থানে’ থাকার সুযোগ দিয়েছেন বলেই আমি বিত্ত-বৈভবের অধিকারী হতে পেরেছি। আমি ‘ভুল সময়ে’ ‘ভুল স্থানে’ থাকলে শত পরিশ্রম করেও সম্পদের অধিকারী হতে পারতাম না। আমার লোকবল ও ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

আল্লাহ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণে আছেন এবং আমি তাঁর সামান্য একজন বান্দা – এই বোধটুকু আমাদের মধ্যে আসতে শুরু করলে পার্থিব প্রাচুর্যের কারণে আমাদের অহংকারী হওয়ার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকবে। পাশাপাশি, আমাদের পরিচিত কাউকে আমরা যদি প্রাচুর্যের কারণে অহংকারী, উদ্ধত, দাম্ভিক ও স্বেচ্ছাচারী হতে দেখি তাহলে সুযোগ থাকলে তাদেরকেও দরদ সহকারে হিকমত অবলম্বন করে সাবধান করা দরকার। আল্লাহ যার মধ্যে কল্যাণ রেখেছেন আশা করা যায় সে সাবধান হয়ে যাবে।

18:39

18:40

18:41

৩৯। তুমি যখন নিজ বাগানে প্রবেশ করছিলে তখন তুমি কেন বললে না – আল্লাহ যা চান তাই হয়, আল্লাহর তাওফিক ছাড়া কারও কোনো ক্ষমতা নেই? তোমার দৃষ্টিতে যদি আমার সম্পদ ও সন্তান তোমা অপেক্ষা কম হয়ে থাকে …

৪০। … তবে আমার প্রতিপালকের পক্ষে অসম্ভব নয় যে, তিনি আমাকে তোমার বাগান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট জিনিস দান করবেন এবং তোমার বাগানে আসমান থেকে কোনো বালা পাঠাবেন, ফলে তা তরুহীন প্রান্তরে পরিণত হবে।

৪১। অথবা তার পানি ভূগর্ভে নেমে যাবে, অতপর তুমি তার সন্ধান লাভে সক্ষম হবে না।

সংক্ষিপ্ত তাফসির:

তুমি যখন নিজ বাগানে প্রবেশ করছিলে তখন তুমি কেন বললে না – আল্লাহ যা চান তাই হয়, আল্লাহর তাওফিক ছাড়া কারও কোনো ক্ষমতা নেই? তোমার দৃষ্টিতে যদি আমার সম্পদ ও সন্তান তোমা অপেক্ষা কম হয়ে থাকে তবে আমার প্রতিপালকের পক্ষে অসম্ভব নয় যে, তিনি আমাকে তোমার বাগান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট জিনিস দান করবেন এবং তোমার বাগানে আসমান থেকে পাঠাবেন বিদ্যুৎ চমক, ফলে তা তরুহীন প্রান্তরে পরিণত হবে অথবা তার পানি ভূগর্ভে নেমে যাবে। অতপর তুমি তার সন্ধান লাভে সক্ষম হবে না। [তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন এবং তাফসির আল-জালালাইন]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

যে সাবধান হবে না তার জন্য হয়তো অপেক্ষা করছে বিশাল ক্ষতি। এই দুনিয়াতে সম্পদ ও সম্মানের অধিকারী হওয়া সত্বেও মৃত্যু পরবর্তী জীবনে সে হতে পারে নিঃস্ব ও অপদস্ত। অথবা, কোনো এক সময়ে এই দুনিয়াতেই সে হয়ে পড়তে পারে নিঃস্ব। এমনকি, অনেক সম্পদের অধিকারী হয়েও সম্পদে বরকত না থাকার কারণে সে থাকতে পারে সদা অশান্তিতে নিমজ্জিত। আল্লাহ আমাদেরকে তাদের একজন হওয়া থেকে রক্ষা করুন।

অন্যদিকে, বিত্ত, বংশমর্যাদা, লোকবল, ক্ষমতা ও জ্ঞানের বিচারে যারা আমাদের পিছনে রয়েছেন বলে আমরা মনে করছি পরকালীন জীবনে তাদের মর্যাদা আমাদের চেয়ে অনেক উপরে থাকতে পারে। আর আল্লাহ চাইলে এই দুনিয়াতেও তারা একসময় প্রাচুর্যের অধিকারী হয়ে যেতে পারেন।

যেহেতু প্রাচুর্য বা দারিদ্র কারও মর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি নয়, তাই কোনো ব্যক্তির বর্তমান পার্থিব অবস্থানের কারণে তাকে ছোট চোখে দেখার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। ধনী হোক বা গরিব, যার মধ্যে তাকওয়া বেশি তিনিই সবচেয়ে অধিক মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী।

সর্বশেষ সম্পাদনা: ৬ই এপ্রিল, ২০১৭  

 

Advertisements

One thought on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৩৭-৪১): সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়

  1. পিংব্যাকঃ সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৪২-৪৪): জীবনে হঠাত নেমে আসা বিপদ যখন বিপথে যাওয়া থেকে আমাদেরকে বাঁচায়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s