বর্তমানে প্রচলিত ‘ইসলামি রাজনীতি’ কতটুকু ইসলামি? (অনুবাদ)

মোহাম্মদ গিলান-এর একটি লেখা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত আকারে অনূদিত। মূল লেখকের প্রতিটি বক্তব্যের সাথে অনুবাদক একমত নাও হতে পারেন। ইংরেজিতে মূল লেখাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।  

আমরা মুসলিমরা অনেকেই সরল মনে এই বিশ্বাস লালন করে চলি যে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার খুঁটিনাটি দিকনির্দেশনা কুরআন ও সুন্নাহ’তে সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া আছে। ফলে, আমাদের অনেকের মধ্যেই এই বিশ্বাস জন্মেছে যে আমরা যদি ‘ইসলামি শাসন’ কায়েম করতে পারতাম তাহলেই আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। [আসলেই কি কুরআন ও সুন্নাহ’তে বিষয়টি এভাবে বলে দেওয়া হয়েছে? ইসলামে রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা কি একটিই? অমুসলিমদের অনুসৃত রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো কি আমরাও অনুসরণ করতে পারি? মূলত এই বিষয়গুলো নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা। পাশাপাশি, আমাদের মুসলিম সমাজের জন্য সামষ্টিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ও এই আলোচনায় উঠে আসবে।]

০০০

[একজন মুসলিম মাত্রই আমরা এই আত্মপ্রসাদে ভুগি যে কেবলমাত্র ইসলামই দুনিয়ার সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে।] কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের মুসলিমদের সামষ্টিক চিন্তা ও চেতনার  জগতে ফির্কাবাজি ও দলাদলি শক্ত আসন গেঁড়ে বসেছে। [এর ফলে সচেতনভাবে হোক বা অবচেতন মনে হোক,] আমাদের [ধর্মীয়] আলোচনাগুলোকে আমরা “আমরা বনাম ওরা”, এই [সরল] ছকে বেঁধে ফেলেছি। [ফলশ্রুতিতে আমরা সহজেই বলে দিতে পারছি যে] অমুসলিমরা যা যা করছে তার সবই অনৈসলামিক। “ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন,” [২:১২০] কুরআনের এই আয়াতটি থেকে আমরা [অনেকেই] এই উপসংহারে পৌঁছেছি যে অমুসলিমরা যেসব পথে চলেছেন সেসব পথে আমাদের চলতে মানা। সত্যের একনিষ্ঠ সন্ধানী হয়ে এমনটি ভাবলে কথা আলাদা ছিলো, তবে বাস্তবে আমরা বিরোধিতার খাতিরেই [তাদের] বিরোধিতা করে থাকি। [উদাহরণস্বরূপ,] গণতন্ত্রের কথাই ধরুন। মুসলিমরা যে গণতন্ত্রকে নিজেদের জন্য একটি শাসনব্যবস্থা হিসেবে নিতে পারেন এমনটি বললেই হয়েছে, [আমাদের মধ্যে এমন] অনেকেই আছেন যারা বিনা বাক্যব্যয়ে আপনার কথাটিকে তৎক্ষণাৎ উড়িয়ে দেবেন। এখনকার সময়ে ইসলামের যে রূপটিকে আমরা ধারণ করেছি এই উদাহরণটি তার একটি ভালো নমুনা। আমরা ইসলামকে রাজনৈতিক রং দিয়ে একে একটি প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মে রূপান্তরিত করে ফেলেছি, যেখানে আমরা পারলে [আমাদের নিজেদের মতের অনুসারী মুসলিমদের বাইরে] বাকী সবাইকে নাকচ করে দিতে চেষ্টা করি। আমাদের এই মানসিকতাটি অবশ্য ইসলামের মূল চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইসলামের ফিকাহ শাস্ত্রের একটি মূলনীতি হলো, কোনো পরিভাষা (terminology) নিয়ে অনর্থক হৈচৈ করা আমাদের জন্য সমীচিন নয়। একজন আলিমের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে কোনো একটি কাজ যতক্ষণ পর্যন্ত ইসলামের মূল শিক্ষার সাথে সংগতিপূর্ণ থাকছে ততক্ষণ পর্যন্ত সেটিকে সংজ্ঞায়িত করতে কী পরিভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। [উদাহরণস্বরূপ,] কেউ দাবী করতে পারেন যে কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক ‘ইসলামি’ নিয়ম-কানুন মেনেই লেনদেন করছে। [গ্রাহক ও ঋণ গ্রহীতাদের সাথে করা] সেই ব্যাংকের চুক্তির বিভিন্ন ধারা-উপধারা বদলে ফেলে তার বদলে নতুন [‘ইসলামি’] পরিভাষা ব্যবহার করে তিনি এমনটি দাবী করতেই পারেন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলগত দিক দিয়ে সেই ঋণের প্রকৃতি যদি অন্যান্য প্রথাগত ব্যাংকের মতোই হয়, যারা সুদের কথাটি সরাসরিই উল্লেখ করে থাকে, তবে ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী সেই তথাকথিত ‘ইসলামি’ ব্যাংকের ওই লেনদেনটি বৈধ বলে বিবেচিত হবে না। ‘ইসলামি’ পরিভাষা ব্যবহার করলেই কোনো একটি কাজ ইসলামসম্মত হয়ে যায় না। অমুসলিম দেশসমূহে প্রচলিত রাজনৈতিক রীতিনীতির ক্ষেত্রেও এই একই মূলনীতি প্রযোজ্য। সেসব দেশে প্রচলিত রাজনীতির রীতিনীতিসমূহ যদি ইসলামের মূলনীতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক না হয় তবে তাদের ব্যবহৃত [রাজনীতির] পরিভাষা দিয়ে কিছুই আসে-যায় না।

০০০

dhaka-prayer-on-street‘ইসলামি শাসন’ আসলে কাকে বলে? [ইসলামে] আমাদের জন্য নামায-রোযার ক্ষেত্রে যেমন সরাসরি ও সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ঠিক তেমনি আমরা কিভাবে দেশ চালাব বা রাজনীতি করব তাও [ইসলামে] সরাসরি ও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে এমন একটি ধারণা আমাদের অনেকের মধ্যেই আছে। তবে মুশকিল হলো, এই ধারণাটি একেবারেই সঠিক নয়। আল্লাহ এবং তাঁর প্রেরিত রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো একটি বিশেষ কাঠামো আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেননি। আমাদের জন্য কিছু নীতিমালা এবং নিয়ম-কানুন দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার একাধিক কাঠামোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে। ইমাম ইবনে তায়মিয়্যা তাঁর লেখা গবেষণাধর্মী আলোচনাগ্রন্থ “আস-সিয়াসা আশ-শারিয়াহ”-র একেবারে শুরুতে উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামসম্মত একটি শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি হলো কুরআনের এই দু’টি আয়াত: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায় ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদিগকে সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী। হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর – যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।” [৪:৫৮-৫৯]

ইমাম ইবনে তায়মিয়্যা তাঁর ওই একই বইয়ে একজন আমির বা খলিফা নিয়োগের বাধ্যবাধকতার ব্যাপারেও আলোচনা করেছেন, যেন মুসলিমরা ‘আল্লাহর আইন’ দ্বারা শাসিত হতে পারে। শুধু ইমাম ইবনে তায়মিয়্যা একা নন, আরও অনেক আলিমই মনে করেন যে, একজন আমির বা খলিফা নিয়োগ করা মুসলিম সমাজের জন্য আবশ্যক। তবে সেই সাথে একথাটিও দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে হচ্ছে যে এই বিষয়টির পক্ষে একাধিক আলিমের মতকে উদ্ধৃত করতে পারার মানে এই নয় যে, এটি ইসলামি ধর্ম বিশ্বাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাছাড়া, রাজনৈতিক বিষয়ে প্রদত্ত আলিমদের মতসমূহকে তাঁদের সময়কার ঐতিহাসিক বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনা করলে, এবং তাঁদের উপসংহারের পিছনে প্রদত্ত অভীষ্ট লক্ষ্যসমূহকে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখব যে, কুরআন ও সুন্নাহ থেকে [তাঁদের মতের পক্ষে যে] অভীষ্ট লক্ষ্যসমূহ তাঁরা চিহ্নিত করেছেন তা অকাট্য ও কালজয়ী, তবে তাঁদের দেওয়া মতসমূহ আপেক্ষিক, কেননা তাঁরাও তাঁদের সময়কার ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

ইসলামি শরিয়তের প্রাথমিক উৎসসমূহে (অর্থাৎ কুরআন ও হাদিসে) রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো বিশেষ পদ্ধতিকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। আর অতীতে ইসলামের রাজনৈতিক দিকসমূহ নিয়ে যেসব পান্ডিত্যপূর্ণ কাজ হয়েছে সেগুলোও তখনকার ঐতিহাসিক বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত ছিলো। ফলে ওই কাজগুলোকেই ইসলামের [একমাত্র রাজনৈতিক] মতবাদ ভাবাটা ঠিক হবে না। এর ঠিক উল্টো ভাবাটাই আজকের দিনে আমাদের মুসলিমদের জন্য অন্যতম একটি মৌলিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের নামায অবশ্যই ইসলাম নির্দেশিত একটি ইবাদাত, কিন্তু আমাদের রাজনীতিকে ‘ইসলাম নির্দেশিত রাজনীতি’ বললে ভুল হবে, বরং সঠিকভাবে বললে আমাদের রাজনীতিকে ‘মুসলিমের রাজনীতি’ বলা যেতে পারে।

আমাদের নিজস্ব মত বা কাজকে অসঙ্গতভাবে বৈধতা দিতে গিয়ে আমরা প্রায়ই এর আগে ‘ইসলামি’ বা ‘ইসলামসম্মত’ এই বিশেষণগুলো ব্যবহার করতে চেষ্টা করি। ইসলামের ইতিহাসের একেবারে শুরু থেকেই আমরা এমনটি করে আসছি। উদাহরণস্বরূপ, আলী ইবনে আবু তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শহীদ হওয়ার সাথে সাথেই ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী যাকে খিলাফত বলে সেই অর্থে খিলাফতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। [এর পরবর্তী] উমাইয়া শাসনামলকে খিলাফত বলাটা ঠিক হবে না, কারণ সেটি ছিলো একটি নির্দিষ্ট বংশের বাদশাহী শাসন। আব্বাসিয়, উসমানিয় এবং আরও যারা ‘খলিফা’, ‘আমিরুল মু’মিনীন’ ইত্যাদি খেতাব নিয়ে শাসন করেছেন তাদের সবার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। [শুধুমাত্র] আরবি ভাষার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে [অবশ্য] তাদেরকে ‘খলিফা’ বলা যেতেই পারে, কেননা একজনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে যিনি আসেন তাকেই আরবিতে ‘খলিফা’ বলে। কিন্তু ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী যাকে খিলাফত বলে, অর্থাৎ যে শাসন ব্যবস্থায় শাসক রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেন, তা [খ্রিস্টিয় বিংশ শতাব্দীর গোড়ায়] উসমানিয় সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে শেষ হয়ে যায়নি, যদিও অনেকেই তেমনটি মনে করে থাকেন। [প্রকৃতপক্ষে,] খিলাফতের অবসান তো প্রায় ১৪০০ বছর আগেই হয়ে গেছে। তাছাড়া, [আসলেই হোক বা নাম কা ওয়াস্তে হোক] একটি ‘খিলাফত’ থাকলেই যে মুসলিমরা সবসময় একতাবদ্ধ থেকেছে তেমনটিও নয়।

০০০

রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি বা রাজনীতি সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো একটি বিশেষ নমুনা বা ব্যবস্থাকে ইসলাম নির্দিষ্ট করে দেয়নি, তবে এসব বিষয়ে কতিপয় মূলনীতি দেওয়া হয়েছে। এই পার্থক্যটি দু’টি উদ্দেশ্য সাধন করতে সাহায্য করে। এর প্রথম উদ্দেশ্যটি ইসলামের কালোত্তীর্ণ চরিত্রের সাথে সম্পর্কিত। মানব সমাজের বিকাশের সাথে সাথে তাদের খুঁটিনাটি প্রয়োজনগুলো বদলাতে থাকে। সেই সমাজ আজ আর নেই, আমরা বর্তমানে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।এরই ধারাবাহিকতায় রাজনীতির খোল-নলচেও বদলে গেছে। জাতি রাষ্ট্রের (nation-state) ধারণাটিই তো তখন ছিলো না। কিছু মূলনীতি ছাড়া [রাজনীতি বিষয়ে] ইসলামের প্রাথমিক উৎসসমূহের এই যে নিরবতা এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা ইসলাম একটি সর্বকালীন ও সার্বজনীন ধর্ম। ইসলাম স্থান ও কালের গন্ডি দ্বারা আবদ্ধ নয়। এমনকি, “যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই কাফের,” [৫:৪৪] “তারাই জালেম” [৫:৪৫] এবং “তারাই পাপাচারী” [৫:৪৭] – কুরআনের এই আয়াতগুলোতেও রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো একটি বিশেষ পদ্ধতিকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি।প্রকৃতপক্ষে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, একতাবদ্ধ থাকা এবং আমাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে যোগ্য মানুষদেরকে আমাদের জন্য শাসক হিসেবে নির্বাচিত করা – এরকম কিছু মূলনীতি ছাড়া এসব লোকদেরকে কিভাবে নির্বাচিত করা হবে বা তাদের ক্ষমতার সীমারেখা কতটুকু পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এসবের বিস্তারিত আমাদেরকে বলে দেওয়া হয়নি।

[ইসলামে] রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতির খুঁটিনাটি উল্লেখ না থাকার পিছনে দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি খোদ রাজনীতির সাথেই সম্পর্কিত। রাজনীতি জিনিসটি [নেহায়েতই তাত্ত্বিক কোনো বিষয় নয়, এটি] মূলত প্রায়োগিক একটি বিষয়, বিশেষত দ্বন্দ্বমুখর সময়ে। রাজনীতির ময়দানে হোক বা যুদ্ধক্ষেত্রে হোক, যখন নিজের অস্তিত্বে টান পড়ে তখন একজন মানুষের ভেতরকার পাশবিক প্রবৃত্তিটি সাধারণত বেরিয়ে পড়ে। চাপের এসব মুহুর্তেই প্রকাশ পায় কার নীতির দৌড় কতটুকু। ইসলাম ও মুসলিমদের মধ্যকার পার্থক্যটি এখানে এসেই আমাদের সামনে ধরা দেয়। এমন সময়ে একজন মানুষের ভালো-মন্দ পরিমাপ করতে হলে কোনো একটি নির্দিষ্ট মানদন্ডের সাহায্য নিতে হয়। সেই মানদন্ডটি অন্য কোনো ধর্ম বা দর্শন হতে পারে। সেটি ইসলামও হতে পারে। আমরা যদি মুসলিমদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে কথা বলি তবে আমরা তাদের আচরণকে ইসলামের মূল চেতনার নিরিখে পরখ করে দেখতে পারি। আর আমরা যদি ‘ইসলামি রাজনীতি’ নিয়ে কথা বলি তবে আমরা তাকে অন্যান্য ধর্ম ও দর্শনের সাথে তুলনা করে দেখতে চাইব। যদি ‘ইসলামি রাজনীতি’ এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয় তবে পারস্পরিক তুলনার এই ব্যাপারটিই আসলে নিরর্থক একটি বিষয়ে রূপ নেবে, কারণ তেমনটি হলে আমাদেরকে স্বীকার করে নিতে হবে যে ইসলাম ধর্ম নিজেই ত্রুটিপূর্ণ। আর তেমনটি হলে ইসলাম যে একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মব্যবস্থা সেই দাবীটিই অসার বলে প্রতিপন্ন হবে।

০০০

একটি সম্প্রদায় হিসেবে আমরা [মুসলিমরা] একে অন্যের সাথে যেমন আচরণ করে থাকি সেটিই যদি আমাদের আসল চেহারা হয়ে থাকে তবে বলতেই হবে যে ক্ষমতার স্বাদ ও নেতৃত্বের আসন থেকে আমাদের বঞ্চিত থাকটা আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ বটে। এই অবস্থায় ক্ষমতা ও নেতৃত্বের আসনে বসলে তা আমাদের জন্য বিপর্যয় ছাড়া আর কিছুই ডেকে আনবে না। আমাদের নিজেদের ভেতরকার মতপার্থক্যকে আমরা কিভাবে সামলাই বা অমুসলিমদের আমরা কী চোখে দেখি তা একটু খেয়াল করলেই বিষয়টি আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমরা যারা মনে করি যে ইসলামের বৈধ ব্যাখ্যা মাত্র একটিই তারা ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে যে ইসলাম ভিন্ন ভিন্ন রূপ পেতে পারে সেটি স্বীকারই করতে চাই না। আমাদের নিজেদের ইতিহাসকে আমরা কল্পনাবিলাসী চোখে দেখি। আমরা কল্পলোকের স্বপ্নে বিভোর থাকি। আমাদের সঙ্গীদের সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে গলাবাজির আশ্রয় নিয়ে, এমনকি ভয়ভীতি দেখিয়ে হলেও, আমরা নিজেরা ইসলামকে যেভাবে বুঝেছি সেটিই বাকী সবার ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাদেরকে আমাদের রাস্তায় চলতে বাধ্য করি। আধুনিক সময়ের আলিমদের কোনো একটি মত যদি ইসলামের মূল চেতনা আর ফিকাহ’র সঠিক উসুলের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েও থাকে, আর সেটি যদি আমাদের মনঃপুত না হয় তবে আমরা তাঁদের যাবতীয় মতামত ও অবদানকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বসি। ইউটিউবে দেখা ভিডিওকে একটি পরিমাপক হিসেবে ধরলে আমরা দেখতে পাব যে ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী পালন করা কেন বিদআত এই বিষয়ের ওপর আলোচনা শুনতে আমাদের বেজায় আগ্রহ, কিন্তু “মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাইবেল (The Bible Through a Muslim Lens)” নামক ধারাবাহিক শিক্ষামূলক আলোচনাটি শোনার ধৈর্য আমাদের নেই। আমাদের সাথে কারও মতে না মিললেই হয়েছে, সে তো তার কুকুর-বিড়ালসহ ‘জাহান্নামী’! কোনো মুসলিমের সাথে আমাদের মতে না মিললে তারও রেহাই নেই। সেও ‘জাহান্নামী’! রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ব্যাঙ্গ করে কার্টুন আঁকা হলে আমরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ি, এমনকি এজন্য দরকার হলে আমরা খুন-খারাবিতে পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ি। কিন্তু যখন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য কোনো আত্মঘাতী হামলাকারী [নিরীহ মানুষের ওপর] হামলে পড়ে তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া কী হয়? এসব হামলার কথা আমাদের কানে আসলে হয় আমরা বিষয়টি এড়িয়ে যাই অথবা বড়জোর কিছু বিবৃতি দিয়ে দায় সারি। আমাদের দৃষ্টিতে পাশ্চাত্য সভ্যতার রূপ একটিই, ফলে [গভীরে না গিয়ে] আমরা সেই সভ্যতার সবকিছুকে [সহজেই] সাধারণ কিছু সংজ্ঞা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করে ফেলতে চাই। এই [বাস্তবতা বিবর্জিত সরলীকৃত] চিন্তাধারার ফলে আমাদের মধ্যেকার “আমরা বনাম ওরা” মনোভাবটি দিনে দিনে আরও পোক্ত হতে থাকে। [ধীরে ধীরে] অমুসলিমদেরকে আমরা আমাদের চেয়ে নিচু পর্যায়ের মানুষ বলে গণ্য করতে শুরু করি এবং ইসলামের প্রতি তাদের ঈমান না আনার কারণে তাদেরকে অবজ্ঞার চোখে দেখতে থাকি। সংক্ষেপে বললে, আমাদের শক্তিহীন ও ক্ষমতাহীন অবস্থাতেই আমরা এরকম গুরুতর সব সমস্যার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি। এগুলো ঠিক করার উদ্যোগ না নিয়ে শক্তি ও ক্ষমতার কথা চিন্তা করাটা [দীর্ঘ মেয়াদে] আমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়। অন্যথায়, যেসব অমুসলিম ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী তারা ইসলাম ও মুসলিমদের [কাজ-কর্মের] মধ্যকার প্রভেদটি বুঝতে সক্ষম নাও হতে পারে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে যদি আমাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা চলে আসে তবে আমরা ইসলামকে একটি রহমতের ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হবো। তখন মুসলিম শাসিত স্বৈরশাসন, ঘৃণা ও ফির্কাবাজিসহ আমাদের আরও অনেক কদর্য চেহারা বেরিয়ে পড়বে। আর মুশকিল হলো, আমাদের এসব নেতিবাচক কাজ-কর্মকে মানুষ তখন খোদ ইসলামের সাথেই গুলিয়ে ফেলবে।

আমি বলছি না যে আমাদের রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার আগে গোটা উম্মাহ’র সবাইকে বড় মাপের পরহেজগার হয়ে যেতে হবে। আমি এমনটিও বলছি না যে “قَدْ كَفَانِي عِلْمُ رَبِّي (আমার রব্ব-এর জ্ঞানই আমার জন্য যথেষ্ট)” বলে আমাদেরকে নিজের ঘরের মধ্যে বা মসজিদের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলতে হবে এবং কিছু যিকির-আযকার করেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। ইসলামের ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে যে লোকাচারসর্বস্ব [বিশেষ ধরণের] সুফিবাদ আমি সেদিকেও আহ্বান করছি না। কারা ক্ষমতায় বসবে ও কিভাবে বসবে তা বুঝতে হলে আমাদেরকে কুরআনের দিকেই ফিরে যেতে হবে। “বলুন, ইয়া আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত কর। তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।” [৩:২৬] আজকের দিনে এমন অনেক মুসলিম আছেন যারা রাজনীতির ময়দানেই তাদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ শেষে আমাকে বলতেই হচ্ছে যে একজন মুসলিম হিসেবে আমি এমন এক দুনিয়ায় বসবাস করতে চাই না যেখানে দূরদৃষ্টিহীন ও দলকানা কতিপয় মানুষ আমার ওপর শাসন করছে। মদিনাতে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রথম বক্তৃতাটি শুরু হয়েছিল “হে মানব সম্প্রদায়” সম্বোধনের মাধ্যমে, “হে মুসলিম সম্প্রদায়” সম্বোধনের মাধ্যমে নয়। বিখ্যাত ‘মদিনা সনদ’ এর কিছুদিন পরে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও খুলাফায়ে রাশিদীন-এর সামরিক কর্মকান্ডের প্রেক্ষাপটও যদি আমরা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করি তবে আমরা দেখতে পাব যে তার সবগুলোই ছিলো মানুষকে অত্যাচার থেকে মুক্ত করার জন্য। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে অনেক ভুল বোঝাবুঝির উদ্ভব হয়েছে। “ইসলাম তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে” এই কথাটি অন্যদের আগে আমাদের নিজেদের মধ্যেই আসন গেঁড়ে বসেছে।

এই বিষয়ে কুরআনের নির্দেশনাটি একেবারেই পরিষ্কার। “আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” [১৩:১১] আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের [অন্তরের] ভেতরকার অবস্থারই একটি বহিঃপ্রকাশ। [আমাদের সামর্থ সীমাবদ্ধ, তাই একসাথে] অসংখ্য বিষয়ের দিকে [সমান তীব্রতায়] মনোযোগ দিতে আমরা অসমর্থ। শায়খ আব্দাল হাকিম মুরাদ সুন্দর একটি কথা বলেছেন, “রাজনীতি হলো ইসলাম নামক শরীরের একটি কোষ মাত্র। এই কোষটি যদি ছড়িয়ে পড়ে তবে তা ক্যান্সারে পরিণত হয়।” [রাজনীতি নামক] এই ক্যান্সারটি ইতিমধ্যেই বেশ ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা এখন এই ক্যান্সারের চতুর্থ পর্যায় (stage IV) অতিক্রম করছি। এই পরিস্থিতিতে যখন [ধার্মিক] মুসলিমরা রাজনীতিতে জড়িত হচ্ছেন তখন আমাদের মধ্যে কেউ কেউ [এসব দেখে] খোদ ইসলামের ব্যাপারেই তাদের আগ্রহটুকু হারিয়ে ফেলছেন। [বর্তমান সময়ে] ইসলামের ভাসা-ভাসা ধারণার কাছে প্রজ্ঞাপূর্ণ জ্ঞান পর্যুদস্ত হচ্ছে। আমাদেরকে আবারও খাতা-কলম নিয়ে বসতে হবে। অতীতের বড় বড় আলিমরা তাঁদের সময়কার প্রেক্ষাপট বিবেচনাতে নিয়েই তাঁদের লেখাগুলো লিখেছেন। সেই যুগ এখন গত হয়ে গেছে। পূর্বাপর প্রেক্ষাপট বিবেচনাতে না নিয়েই আমরা সরাসরি তাঁদের লেখা পড়তে বসি এবং খিলাফত কায়েমের উত্তেজনাময় স্বপ্ন দেখি ও আমাদের কল্পিত ইতিহাসের মতো করে সমাজ গড়ার স্বপ্ন বুনি। আমাদেরকে এসব স্বপ্নবিলাস ছাড়তে হবে।

প্রকৃতপক্ষে আমাদের অন্যতম একটি সমস্যা হলো, ইসলামের ঐতিহ্যের প্রতি একনিষ্ঠ থাকতে গিয়ে আমরা সেই ঐতিহ্যের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেছি। [অতীতের] আলিমদের ব্যবহৃত উসুল বা মূলনীতিকে বাদ দিয়ে আমরা সরাসরি তাঁদের পৌঁছানো উপসংহারে চলে যাই এবং দাবী করি যে এটিই হলো ইসলাম। এভাবে [আমাদেরই কারণে] আমরা ইসলামকে আধুনিকতার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ [একটি ধর্ম] বানিয়ে ফেলেছি। আর যখনই আমরা এই বাস্তবতার মুখোমুখি হই তখনই আমরা [এর মূল কারণকে পাশ কাটিয়ে] আবেগ মিশ্রিত কিছু প্রতিক্রিয়া দেখাই। [ইসলামের মূলনীতিগুলো অপরিবর্তনীয়, কিন্তু এর প্রেক্ষিতে আলিমদের প্রদত্ত উপসংহারসমূহ স্থান, কাল ও পাত্র দ্বারা প্রভাবিত ও পরিবর্তনীয়।] অতএব, ইসলামের সংস্কার নয়, বরং মুসলিমদের চিন্তা-চেতনার সংস্কারই এখন সময়ের দাবী।

মূল লেখক পরিচিতি: মোহাম্মদ গিলান একজন কানাডিয় নাগরিক। তাঁর জন্ম সৌদি আরবে। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ ভিক্টোরিয়াতে নিউরোসায়েন্স বিষয়ের ওপর একজন পিএইচডি গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। ইসলামের একজন ‘তালিবুল ইলম’ হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ২০০৭ সালে। তিনি একাধিক প্রথিতযশা আলিমের কাছ থেকে আকিদা, ফিকহ, হাদিস, উসুল, আরবি ভাষা ও এর অলঙ্কার, আরবি কবিতা শাস্ত্র, তাযকিয়াতুন নফস, কুরআনের জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ইত্যাদি বিষয়ে অধ্যয়ন করছেন এবং এজন্য তিনি নিয়মিত বিভিন্ন স্থানে সফর করে যাচ্ছেন।

Advertisements

One thought on “বর্তমানে প্রচলিত ‘ইসলামি রাজনীতি’ কতটুকু ইসলামি? (অনুবাদ)

  1. পিংব্যাকঃ জিহাদ ও ক্বিতাল সম্পর্কে যে বিষয়গুলো আমাদের জানা থাকা উচিৎ | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s