সূরা ফাতিহা – আমরা যা শিখিনি

আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ যখন ১৪০০ বছর আগে অমুসলিম আরবদেরকে কু’রআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন, তখন তা শুনে আরবদের দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হতো:

কি অসাধারণ কথা! এভাবে তো আমরা কখনও আরবি ব্যবহার করার কথা ভেবে দেখিনি! এত অসাধারণ বাক্য গঠন, শব্দ নির্বাচন তো আমাদের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকরাও করতে পারে না! এমন কঠিন বাণী, এমন হৃদয় স্পর্শী করে কেউ  তো কোনো দিন বলতে পারেনি! এই জিনিস তো মানুষের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়! এটা নিশ্চয়ই আল্লাহর ﷻ বাণী! আমি সাক্ষি দিচ্ছি – লা ইলাহা ইল্লালাহ…

অথবা, 

সর্বনাশ, এটা নিশ্চয়ই যাদু! এই জিনিস মানুষের পক্ষে বানানো সম্ভব না। এটা তো মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি কোনো দৈব বাণী। কিন্তু এই জিনিস আমি মেনে নিলে তো আর মদ খেতে পারবো না, জুয়া খেলতে পারবো না, আমার দাসগুলোর সাথে যা খুশি তাই করতে পারবো না। এরকম করলে তো আমার পরিবার এবং গোত্রের লোকরা আমাকে বের করে দিবে। আমার মান-সন্মান, সম্পত্তি সব পানিতে চলে যাবে। এই জিনিস যেভাবেই হোক আটকাতে হবে। দাঁড়াও,আজকেই আমি আমার দলবল নিয়ে এই লোকটাকে…

কু’রআন তিলাওয়াত শোনার পর হয় মানুষ এর সত্যতা উপলব্ধি করে, সত্য ধর্ম খুঁজে পাবার উপলব্ধি থেকে সাথে সাথে মুসলমান হয়ে যেত, অথবা তারা এর সত্যতা উপলব্ধি করে বুঝতো যে, তাদের জীবন পুরাপুরি পালটিয়ে ফেলতে হবে এবং সেটা তারা কোনোভাবেই করবে না, সুতরাং যেভাবেই হোক কু’রআনের প্রচারকে বন্ধ করতে হবে।

কু’রআনের বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদ পড়ে কখনও আপনার এরকম কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছে?

কু’রআনের বাণীর যে অলৌকিকতা, ভাষাগত মাধুর্য রয়েছে – তা সুরা ফাতিহা দিয়ে শুরু করি। ফাতিহার প্রতিটি আয়াত এবং শব্দের যে কত ব্যাপক অর্থ রয়েছে, আল্লাহর ﷻ প্রতিটি শব্দ নির্বাচন যে কত সূক্ষ্ম, আয়াতগুলো যে কত সুন্দর ভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে তৈরি করা—তা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। এগুলো জানার পরে আপনি যখন নামাযে সুরা ফাতিহা পড়বেন, তখন সেই পড়া, আর এখন যেভাবে পড়েন, সেটার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য হবে – ইনশা’আল্লাহ।

bismillah

সূরা ফাতিহা

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

শুরু করছি আল্লাহর ﷻ নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

যদিও আয়াতটির প্রচলিত অনুবাদে বলা হয় “শুরু করছি আল্লাহর নামে…”, কিন্তু বিসমিল্লাহতে কোনো “শুরু করছি” নেই। এর অনুবাদ হবে শুধুই “আল্লাহর নামে।” এখানে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে ‘শুরু করছি’ না বলে বিসমিল্লাহ-এর প্রয়োগকে আরও ব্যাপক করে দিয়েছেন। আমরা ‘আল্লাহর নামে’ শুধু শুরুই করি না, বরং পুরো কাজটা করি আল্লাহর ﷻ নামে এবং শেষ করিও আল্লাহর ﷻ নামে। আমি বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করলাম, কিন্তু খাবারটা যদি কেনা হয়ে থাকে হারাম রোজগার থেকে, তখন সেটা আল্লাহর ﷻ নামে খাওয়া হল না। আমি বিসমিল্লাহ বলে একটা ফাইল নিলাম সই করার জন্য এবং সই করার আগে অন্যদিকে তাকিয়ে খুক্‌ খুক্‌ করে কেশে হাত বাড়িয়ে দিলাম ঘুষ নেবার জন্য, তাহলে সেটা আর আল্লাহর নামে সই করা হল না। একইভাবে আমি বিসমিল্লাহ বলে পরীক্ষা দিতে বসলাম, তারপর পাশের জনেরটা দেখে নকল করা শুরু করলাম, আমার বিসমিল্লাহ তখন বাতিল হয়ে গেল। আল্লাহ যেটুকু বরকত দিতেন আমার কাজে — সেটা চলে গেল।

যেহেতু বিসমিল্লাহ অর্থ শুধুই শুরু করা নয়, তাই আমরা শুধু কোনো কিছু শুরু করার জন্যই বিসমিল্লাহ বলব না, আরও অনেক উদ্দেশ্যেই বিসমিল্লাহ বলা যাবে। এছাড়াও আরবি ‘বি’ এর অনেকগুলো অর্থ হয়, যেমন ‘সাথে’, ‘দিয়ে’, ‘জন্য’, ‘উদ্দেশ্যে’, ‘সাহায্যে’ ইত্যাদি। বাংলা বা ইংরেজিতে এমন একটি শব্দ নেই যা একসাথে এতগুলো অর্থ বহন করে। সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াতের, প্রথম শব্দের, প্রথম অংশটিই আমাদেরকে দেখিয়ে দেয় যে, কু’রআনের অনুবাদ করলে মূল আরবির ভাবের কতখানি ভাব হারিয়ে যায়। আমরা যদি বিসমিল্লাহকে অনুবাদ করতে যাই ‘বি’ এর অর্থগুলোকে একসাথে করে, তাহলে শুধুই বিসমিল্লাহের অর্থ দাঁড়াবেঃ

আল্লাহর নামের উদ্দেশ্যে, আল্লাহর নামের জন্য, আল্লাহর নামের সাথে, আল্লাহর নামের সাহায্যে, …

বিসমিল্লাহ বলার সময় অবস্থা অনুসারে এই অর্থগুলোর একটি বা একাধিক নিজেকে মনে করিয়ে দিবেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সুরা ফাতিহার এই প্রথম আয়াতে ‘আল্লাহর নামে’ কি? আল্লাহ ﷻ কিন্তু এই আয়াতে বলেননি যে, ‘আল্লাহর নামে তিলাওয়াত শুরু করছি’, বা ‘আল্লাহর নামে এই কু’রআন’, বা ‘আল্লাহর নামে তোমরা কু’রআন পড়।’ তিনি ‘কি করছি’ তা না বলে বিসমিল্লাহ-এর প্রয়োগকে অবাধ করে দিয়েছেন। এর মানে দাঁড়ায় – যে কোনো হালাল কিছুতেই “বিসমিল্লাহির রাহমা-নির রাহি-ম” ব্যবহার করা যাবে।

বিসমিল্লাহ কোনো নতুন কিছু নয়। নবী নুহ ﷺ কে আল্লাহ ﷻ তার জাহাজে উঠার সময় বলেছিলেন, ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللَّهِ “আরোহণ কর আল্লাহর নামে…”(১১:৪১) নবী সুলায়মান ﷺ যখন রানী বিলকিসকে বাণী পাঠিয়েছিলেন, তখন তা শুরু হয়েছিল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” দিয়ে (২৭:৩০)| এই দুটি আয়াত থেকে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে শেখাচ্ছেন: আমরা যখন কোনো যাত্রা শুরু করবো, বা কোনো দলিল বা চিঠি লিখব, তখন আমরা যেন “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে শুরু করি।

এর পরে আসে আররাহমা-ন এবং আররাহি-ম। এই শব্দ দুটির অর্থ অদ্ভুত সুন্দর, যা আমি আপনাদেরকে তৃতীয় আয়াত ব্যাখ্যা করার সময় বলবো। এখন শুধুই বলি আররাহমা-ন অর্থ ‘পরম দয়ালু’ এবং আররাহি-ম অর্থ ‘নিরন্তর দয়ালু।’

সুতরাং এই প্রথম আয়াতটির শুদ্ধত্বর অনুবাদ হবে:

পরম দয়ালু, নিরন্তর দয়ালু আল্লাহর নামে।

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ ﷻ তা’আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা

প্রথমত, অনুবাদ পড়ে মনে হয় যেন আমরা আল্লাহর ﷻ প্রশংসা করছি। যেমন আপনি কাউকে বলেন – “আপনি অনেক ভালো”, সেরকম আমরাও আল্লাহকে ﷻ বলছি যে সমস্ত প্রশংসা তাঁর। কিন্তু ব্যপারটা তা নয়। “আলহামদু লিল্লাহ” কোনো ক্রিয়া বাচক বাক্য নয়, এটি একটি বিশেষ্যবাচক বাক্য। সহজ বাংলায় বললে, এখানে কোনো কিছু করা হচ্ছে না বরং কোনো সত্যের পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে। যেমন আমরা যখন বলি, “আকাশ নীল” − তখন আমরা কোনো একটি সত্যের পুনরাবৃত্তি করছি। আমরা কিন্তু প্রশংসা করে বলছি না − “আহা! আকাশ, তুমি কত নীল।” আকাশ সবসময়ই নীল, সেটা আমরা বলি, আর না বলি। আমরা সবাই যদি “আকাশ নীল” বলা বন্ধ করেও দেই, আকাশ নীলই থাকবে। ঠিক একই ভাবে আলহামদু লিল্লাহ অর্থ“আল্লাহর ﷻ সমস্ত প্রশংসা”, সেটা আমরা বলি আর না বলি, সমস্ত প্রশংসা ইতিমধ্যেই আল্লাহর। যদি কেউ আল্লাহর ﷻ প্রশংসা নাও করে, তারপরেও তিনি স্ব-প্রশংসিত। পৃথিবীতে কোনো মানুষ বা জ্বিন না থাকলেও এবং তারা কেউ আল্লাহর ﷻ প্রশংসা না করলেও, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর ﷻ ছিল, আছে এবং থাকবে। বরং এটা আমাদের জন্যই একটা বিরাট সন্মান যে, আমরা আল্লাহর ﷻ প্রশংসা করার সুযোগ পাচ্ছি।

সুরা ফাতিহার এই আয়াতটির বাক্য গঠন দিয়েই আল্লাহ ﷻ বুঝিয়ে দিয়েছেন: তাঁর অবস্থান কত উপরে এবং আমাদের অবস্থান কত নিচে। তিনি আমাদেরকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি ইতিমধ্যেই প্রশংসিত; আমাদের ধন্যবাদ এবং প্রশংসার তাঁর কোনোই দরকার নেই।

তাহলে প্রশ্ন আসে, কেন আল্লাহর ﷻ প্রশংসা করা দরকার? তাঁর ﷻ প্রশংসা করলে আমাদের কী লাভ হয়?

২০১০ সালে টাইম ম্যাগাজিনে একটি আর্টিকেল বের হয়েছিল কৃতজ্ঞতার উপকারিতার উপরে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালে ২,৬১৬ জন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের উপরে গবেষণা করে দেখা গেছে: যারা অপেক্ষাকৃত বেশি কৃতজ্ঞ, তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা, অমূলক ভয়-ভীতি, অতিরিক্ত খাবার অভ্যাস এবং মদ, সিগারেট ও ড্রাগের প্রতি আসক্তির ঝুঁকি অনেক কম। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে: মানুষকে নিয়মিত আরও বেশি কৃতজ্ঞ হতে অনুপ্রাণিত করলে, মানুষের নিজের সম্পর্কে যে হীনমন্যতা আছে, নিজেকে ঘৃণা করা, নিজেকে সবসময় অসুন্দর, দুর্বল, উপেক্ষিত মনে করা, ইত্যাদি নানা ধরণের সমস্যা ৭৬% পর্যন্ত দূর করা যায়।

২০০৯ সালে ৪০১ জন মানুষের উপর গবেষণা করা হয়, যাদের মধ্যে ৪০%-এর ক্লিনিকাল স্লিপ ডিসঅর্ডার, অর্থাৎ জটিল ঘুমের সমস্যা আছে। তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ, তারা একনাগাড়ে বেশি ঘুমাতে পারেন, তাদের ঘুম নিয়মিত হয়, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েন এবং দিনের বেলা ক্লান্ত-অবসাদ কম থাকেন।

নিউইয়র্কের Hofstra University সাইকোলজির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ডঃ জেফ্রি ফ্রহ ১০৩৫ জন ১৪-১৯ বছর বয়সি শিক্ষার্থীর উপর গবেষণা করে দেখেছেন: যারা বেশি কৃতজ্ঞতা দেখায়, তাদের পরীক্ষায় ফলাফল অপেক্ষাকৃত বেশি ভালো, সামাজিকভাবে বেশি মেলামেশা করে এবং হিংসা ও মানসিক অবসাদে কম ভোগে।

Wall Street Journal-এর একটি আর্টিকেলে বলা হয়েছেঃ

Adults who frequently feel grateful have more energy, more optimism, more social connections and more happiness than those who do not, according to studies conducted over the past decade. They’re also less likely to be depressed, envious, greedy or alcoholics. They earn more money, sleep more soundly, exercise more regularly and have greater resistance to viral infections.

এবার বুঝতে পারছেন কেন আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে প্রতিদিন ৫ ওয়াক্তে, কমপক্ষে ১৭ বার বলতে বলেছেনঃ

আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন

সমস্ত প্রশংসা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিজগতের প্রভু। [ফাতিহা ১:২]

এখন, আরবিতে প্রশংসার জন্য অনেক শব্দ আছে, যেমন মাদহ্‌, ছানাআ, শুকর। কিন্তু আল্লাহ ﷻ সেগুলো থাকতে কেন তাঁর জন্য হামদ শব্দটি বেছে নিলেন?

হামদ শব্দটি একটি বিশেষ ধরণের প্রশংসা। আরবিতে সাধারন প্রশংসাকে মাদহ مدح বলা হয়। এছাড়াও সানাআ ثناء অর্থ গুণগান। শুকর شكر অর্থ ধন্যবাদ দেওয়া। কিন্তু হামদ অর্থ একই সাথে ধন্যবাদ দিয়ে প্রশংসা করা, যখন আপনি কারো গুণে মুগ্ধ। আপনি কারো কোনো বিশেষ গুণকে স্বীকার করে, তার মুল্যায়ন করার জন্য হামদ করেন। হামদ করা হয় ভালবাসা থেকে, শ্রদ্ধা থেকে, নম্রতা থেকে। এছাড়াও হামদ করা হয় যখন কারো কোনো গুণ বা কাজের দ্বারা আপনি উপকৃত হয়েছেন। আল্লাহর ﷻ অসংখ্য গুণের জন্য এবং তিনি আমাদেরকে যে এত অসীম নিয়ামত দিয়েছেন, যা আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করি—তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে তাঁর প্রশংসা করার জন্য হামদ সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ।

যদি আয়াতটি হতো আল-মাদহু লিল্লাহ – “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর”—তাহলে কী সমস্যা ছিল?

মাদহ অর্থ যদিও প্রশংসা, কিন্তু মাদহ একই সাথে বস্তু এবং ব্যক্তির জন্য করা যায়। মাদহ এমন কারও জন্য করা যায়, যে সেই গুণ নিজে অর্জন করেনি। যেমন আপনি বলতে পারেন, “গোলাপ ফুল খুব সুন্দর।” কিন্তু গোলাপ ফুল সুন্দর হওয়ার পেছনে গোলাপের কোনো কৃতিত্ব নেই। কিন্তু হামদ শুধুমাত্র বুদ্ধিমান, ব্যক্তিত্ববান সত্ত্বার জন্য প্রযোজ্য।

যদি আয়াতটি হতো আছ-ছানাউ লিল্লাহ – “সমস্ত গুণগান/মহিমা আল্লাহর”—তাহলে কী সমস্যা ছিল?

ছানাআ হচ্ছে কারো কোনো গুণের প্রচার করা। যেমন, “ভাই, আমার ছেলেটা পড়ালেখায় খুবই ভালো। ওর মতো ভালো ফুটবল এই দেশে কেউ খেলে না। ওর হাতের লেখা দেখলে আপনি হাঁ হয়ে যাবেন। ওর মতো শান্ত শিষ্ট ছেলে আর হয় না। আমার সব প্রতিবেশী বলেছে, ও হচ্ছে আমাদের দেশের গৌরব…” ইত্যাদি। এই ধরনের বাড়াবাড়ি রকমের প্রশংসা ছানাআ এর মধ্যে পড়ে। কিন্তু এর মধ্যে কোনো কৃতজ্ঞতা নেই, কোনো সমর্পণ নেই। আমরা শুধুই আল্লাহর ﷻ গুণের প্রশংসা করি না। আমরা তাঁর প্রতি একই সাথে কৃতজ্ঞ এবং তার প্রতি নিজেদেরকে সমর্পণ করি।

তাহলে আয়াতটি আশ-শুকরু লিল্লাহ – “সমস্ত ধন্যবাদ আল্লাহর”—হলো না কেন? আমরা কাউকে ধন্যবাদ দেই শুধুই যখন কেউ আমাদের কোনো উপকার করে। আল্লাহর ﷻ বেলায় সেটা প্রযোজ্য নয়। আমরা আল্লাহর ﷻ হামদ সবসময় করি। হঠাৎ করে কোটিপতি হয়ে গেলেও করি, আবার ক্যানসার ধরা পড়লেও করি। এছাড়াও শুকর করা হয় যখন আপনি কারো কাছ থেকে সরাসরি উপকার পান। কিন্তু হামদ করা হয় যখন উপকারটি শুধু আপানাকে না বরং আরও অনেককে প্রভাবিত করে। যেমন কেউ আপনাকে এক গ্লাস পানি এনে দিলো: আপনি তাকে ‘শুকরান’ বলে ধন্যবাদ দিলেন। কিন্তু আল্লাহ শুধু আপনাকে একগ্লাস পানিই দেননি, বিশাল সমুদ্র দিয়েছেন পানি ধারণ করার জন্য। সূর্য দিয়েছেন যাতে সূর্যের তাপে সেই পানি বাস্প হয়ে বিশুদ্ধ রূপে মেঘে জমা হয়। তারপর শীতল বায়ু দিয়েছেন যাতে সেই মেঘ ঘন হয়ে একসময় বৃষ্টি হয়। তারপর মাটির ভেতরে পানি জমার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যাতে সেই পানি বিশুদ্ধ অবস্থাতেই শত বছর জমা থাকে। তারপর সেই বিশুদ্ধ পানি বের হয়ে আসার জন্য ঝর্ণা, নদী, পুকুর দিয়েছেন, যাতে আপনি সহজেই সেই বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারেন। এসবের জন্য আল্লাহকে ﷻ শুধু ‘ধন্যবাদ আল্লাহ’ বললে সেটা আল্লাহর অবদানকে অনেক ছোট করে দেখা হবে। সুতরাং শুকর বা ধন্যবাদ ছোট একটা ব্যপার, এটা আল্লাহর ﷻ জন্য উপযুক্ত নয়।

رَبِّ الْعَالَمِين

রাব্বিল আ’-লামি-ন

রাব্ব শব্দটির যথার্থ অনুবাদ করার মত বাংলা বা ইংরেজি শব্দ নেই, কারণ রাব্ব অর্থ একই সাথেমালিক, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি, সযত্নে পালনকর্তা, অনুগ্রহ দাতা, রক্ষক। অনেকে এটার অর্থ শুধুই পালনকর্তা করেন, অনেকে সৃষ্টিকর্তা করেন, আবার অনেকে প্রভু করেন। সম্ভবত প্রভু বেশি উপযুক্ত, কারণ আমরা যে একজন প্রভুর দাস, তা একটু পরেই আসবে।

রাব্ব-এর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল: রাব্ব আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেন, যেটা মালিক (রাজা), খালিক (সৃষ্টিকর্তা) করে না। একজন মালিক তার দাসকে বলবে, “আমার খাজনা কই?” সেই খাজনা দাস কিভাবে জোগাড় করবে, সেটা নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই। আর একজন খালিক দাসকে সৃষ্টি করেই খালাস। দাসের বেঁচে থাকার জন্য যা দরকার, তার পরিপূর্ণ বেড়ে ওঠার জন্য যে পথনির্দেশ দরকার, তা দিতে খালিক বাধ্য নয়। একারণে আল্লাহ ﷻ যখন তাঁকে প্রভু হিসেবে ঘোষণা করছেন, তখন তিনি ‘রাব্ব’ শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন। এই সুরার একটু পরেই আমরা আমাদের রাব্ব-এর কাছে পথনির্দেশ চাইব। একজন দাসের তার প্রভুর কাছ থেকে প্রথম যেই জিনিসটা চাওয়ার আছে তা হল: তাকে কী করতে হবে? প্রভু যদি দাসকে না বলে কী করতে হবে, তাহলে দাস বুঝবে কীভাবে তাকে কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না?

তবে প্রভু-দাস এই শব্দগুলো সম্পর্কে আমাদের মনে কোনো ভালো ধারণা নেই। প্রভু শব্দটা শুনলেই আমাদের মনের কোনোয় এক খান্দানি মোচওয়ালা, অত্যাচারী জমিদারের ছবি ভেসে উঠে। আর দাস বলতে আমরা সাধারণত দুর্বল, না খাওয়া, অভাবী, অত্যাচারিত মানুষের কথা ভাবি। আমাদের মনে যেন এধরনের কোনো ধারণা না আসে, সেজন্য পরের আয়াতটি আমাদেরকে পরিষ্কার করে দিচ্ছে: আল্লাহ ﷻ কী ধরনের দয়ালু প্রভু।

আল-আ’লামি-ন শব্দটির দু’ধরনের অর্থ হয়: ১)সকল সৃষ্টি জগত, ২)সকল জাতি। আল-আ’লামি-ন শব্দটি আলআ’-লাম العالم এর বহুবচন, যার অর্থ: জগত। এখন আলআ’-লাম العالم এর দুটি বহুবচন আছে: আল আ’লামি-ন العالمين —যার অর্থ সকল চেতন/বুদ্ধিমান জাতি (মানুষ, ফেরেশতা, জ্বিন, এলিয়েন, …), আর আল আ’ওয়া-লিম العوالم —যা আল্লাহ ﷻ ছাড়া সকল সৃষ্টি জগত, চেতন বা অচেতন (জড়), দুটোই নির্দেশ করে। এখন প্রশ্ন আসে, কেন আল্লাহ ﷻ আল আ’ওয়া-লিম ব্যবহার না করে, আল-আ’-লামি-ন ব্যবহার করলেন? তিনি কি সকল চেতন এবং অচেতন সবকিছুর সৃষ্টি কর্তা নন? সুরা ফাতিহা হচ্ছে চেতন সৃষ্টির জন্য একটি পথ নির্দেশ। এই সূরার মাধ্যমে বুদ্ধিমান সৃষ্টিরা আল্লাহর ﷻ কাছে পথ নির্দেশ চায় এবং আল্লাহর কাছে নিজেদেরকে সমর্পণ করে। আপনার গাড়িটির সুরা ফাতিহার কোনো দরকার নেই, কারণ তার আল্লাহর কাছ থেকে পথনির্দেশ পাবার দরকার নেই। বরং আপনার ড্রাইভারের আল্লাহর কাছ থেকে পথনির্দেশ পাওয়াটা বড়ই দরকার, যাতে করে তারা বুঝে শুনে রাস্তায় বিবেকবান মানুষের মত গাড়ি চালায়।

এছাড়াও আভিধানিকভাবে আ’লামি-ন শব্দটি এসেছে ع ل م মুল থেকে, যার অর্থ: ‘জ্ঞান’, যা দ্বারা কোনো কিছু জানা যায়, অর্থাৎ সৃষ্টিজগত। কারণ আমরা সবকিছু জানতে পারি সৃষ্টিজগত থেকে। আমাদের সকল জ্ঞানের মাধ্যম হচ্ছে সৃষ্টিজগত, যার মাধ্যমে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে জ্ঞান দেন। আর এই সৃষ্টিজগতই আমাদেরকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করে। একটা মোবাইল ফোন দেখলে আমরা যেমন নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারি: এটা প্রযুক্তিতে অগ্রসর কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী বানিয়েছে, তেমনি আকাশের সূর্য, রাতের আকাশে লক্ষ কোটি তারা, বিশাল সমুদ্র, কোটি প্রজাতির কীটপতঙ্গ, কোটি প্রজাতির গাছ, লক্ষ প্রজাতির মাছ, লক্ষ প্রজাতির পাখি—এই সবকিছু দেখলে আমরা বুঝতে পারি: এক অকল্পনীয় জ্ঞানী, প্রচন্ত ক্ষমতাবান এবং অত্যন্ত সৃজনশীল একজন সত্ত্বা রয়েছেন, যিনি এত কিছু বানাতে পারেন এবং এত বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে পারেন।

সুতরাং “আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামি-ন”-এর বাংলা অনুবাদ হওয়া উচিত:

সকল প্রশংসা, মহিমা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর; তিনি সকল চেতন অস্তিত্বের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি, যত্নশীল প্রভু।

এরপরের অসাধারণ আয়াতটি আমাদেরকে শেখাবে আল্লাহ ﷻ কেমন প্রভু।

الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু

এই আয়াতে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে তিনি কেমন প্রভু, তার এক বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। মাত্র দুটি শব্দের মধ্যে কী ব্যাপক পরিমাণের তথ্য আছে দেখুন।

প্রথমত, রাহমা-ন এবং রাহি-ম: এই দুটো শব্দই এসেছে রাহমা থেকে, যার অর্থ: দয়া। আরবিতে রাহমা শব্দটির আরেকটি অর্থ ‘মায়ের গর্ভ।’ মায়ের গর্ভে শিশু নিরাপদে, নিশ্চিতে থাকে। মায়ের গর্ভ শিশুর জীবনের সব মৌলিক চাহিদার ব্যবস্থা করে দেয়, শিশুকে আঘাত থেকে রক্ষা করে, শিশুর বেড়ে উঠার জন্য সব ব্যবস্থা করে দেয়। শিশুর জন্য সকল দয়ার উৎস হচ্ছে তার মায়ের গর্ভ।

এখন রাহমান এবং রাহিম দুটো শব্দই এসেছে রাহমাহ থেকে, কিন্তু যেহেতু শব্দ দুটোর গঠন দুই ধরনের, তাই তাদের অর্থ দুই ধরণের দয়ার—

আররাহমা-ন

রাহমা-ন এর শেষে যে একটা টান আছে: ‘আন’, তা প্রচণ্ডতা নির্দেশ করে। রাহমান হচ্ছে পরম দয়ালু, অকল্পনীয় দয়ালু। আল্লাহ ﷻ তার একটি গুণ ‘আর-রাহমা-ন’ দিয়ে আমাদেরকে বলেছেন যে, তিনি পরম দয়ালু, তাঁর দয়ার কথা আমরা কখনও কল্পনা করতে পারব না। একজন মা যেমন তার শিশুর জন্য সবরকম মৌলিক চাহিদা পূরণ করে, সবরকম বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করে, আল্লাহ ﷻ তার থেকেও বেশি দয়ার সাথে তাঁর সকল সৃষ্টিকে পালন করেন, রক্ষা করেন, তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করেন। আল্লাহ ﷻ তাঁর অসীম দয়া দিয়ে প্রকৃতিতে হাজারো ব্যবস্থা করে রেখেছেন পৃথিবীর সবধরনের প্রাণীর মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য। মানুষ হাজার বছর ধরে নানা ভাবে প্রকৃতির এই ব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করেছে, চরম দূষণ করেছে, অবাধে গাছ, পশুপাখি নিধন করেছে। কিন্তু তারপরেও কোটি কোটি প্রাণী প্রতিদিন খাবারের সন্ধানে বের হয় এবং ঠিকই খাবার খেয়ে ঘরে ফিরে। শুধু ইউরোপেই প্রতি বছর ৩০০ মিলিয়ন গবাদি পশু এবং ৮ বিলিয়ন মুরগি খাবার জন্য হত্যা করা হয়। তারপরেও আমাদের গবাদি পশু, হাস-মুরগির কোনো অভাব হয় না, কারণ আল্লাহ ﷻ পরম দয়ালু।

দ্বিতীয়ত, রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে, এটি কোনো কিছু এই মুহূর্তে হচ্ছে—তা নির্দেশ করে। যেমন আপনি যদি বলেন: “মুহম্মদ একজন উদার মানুষ”, তার মানে এই না যে মুহম্মদ এই মুহূর্তে কোনো উদার কাজ করছে, বা কাউকে কিছু দান করছে। কিন্তু রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে, তা নির্দেশ করে এই মুহূর্তে আল্লাহ ﷻ অকল্পনীয় দয়ালু। তিনি আপনাকে, আমাকে, আমাদের পরিবারকে, সমাজকে, আমাদের দেশকে, আমাদের ছোট গ্রহটাকে, আমাদের ছায়াপথের ১০০ কোটি তারা এবং কোটি কোটি গ্রহকে, পুরো মহাবিশ্বের ১০০ কোটি ছায়াপথকে এবং তাদের প্রত্যেকটির ভিতরে কোটি কোটি তারা এবং গ্রহকে এবং তাদের মধ্যে থাকা অসংখ্য প্রাণী জগতকে এই মুহূর্তে, একই সময়ে, একই সাথে দয়া করছেন।

তৃতীয়ত, রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে, এটি একটি অস্থায়ী ব্যাপার নির্দেশ করে। একই ধরণের কিছু শব্দ হল জাওআ’-ন (جوعان) যার অর্থ প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর, আ’তশা-ন (عطشان) প্রচণ্ড পিপাসার্ত। এই ধরণের শব্দগুলোর প্রতিটি একটি অস্থায়ী ধারণা নির্দেশ করে, যা পরিবর্তন হতে পারে। যেমন, খাবার ক্ষুধাকে দূর করে দেয়, পানি পিপাসাকে দূর করে দেয়। ঠিক একইভাবে আমরা যদি আল্লাহর ﷻ কথা না শুনি, তাহলে আল্লাহ ﷻ তাঁর রহমতকে আমাদের উপর থেকে তুলে নিতে পারেন। আল্লাহর ﷻ রহমত যে অস্থায়ী, তা রাহমা-ন শব্দটির গঠন নির্দেশ করে।

আররাহি-ম

রাহি-ম এর শেষে যে একটা টান আছে: ‘ইম’ −সেটা ‘সবসময় হচ্ছে’ এমন কিছু নির্দেশ করে। আল্লাহ ﷻ যে সবসময় দয়ালু, তাঁর দয়া যে কখনও শেষ হবে না, তা রাহি-ম এর শেষে ‘ইম’ টান দিয়ে নির্দেশ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, রাহি-ম এর অর্থ এই নয় যে, তিনি সবার প্রতি সবসময় দয়ালু। এমন হতে পারে: তিনি এই মুহূর্তে কাউকে তাঁর দয়া দেবার প্রয়োজন মনে করছেন না, কারণ সে তাঁর ﷻ দেওয়া সীমাকে লঙ্ঘন করেছে। এছাড়াও আল্লাহ ﷻ যদি সবসময় সবার প্রতি অসীম দয়ালু থাকতেন, তাহলে আর জাহান্নাম থাকত না, বা কেউ জাহান্নামী হতো না। সুতরাং আল্লাহ ﷻ রাহি-ম শুধু তাদেরই প্রতি, যারা তাঁর কথা শোনে।

এই দুটি শব্দ আররাহমা-ন এবং আররাহি-ম দিয়ে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে তাঁর দয়ার সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ ধারণা দিয়েছেন। সুতরাং এই আয়াতের একটি উপযুক্ত অনুবাদ হবে:

তিনি এই মুহূর্তে অকল্পনীয় দয়ালু এবং তিনি নিরন্তর দয়ালু।

এখন আল্লাহ ﷻ যদি অকল্পনীয় এবং নিরন্তর দয়ালু হন, তাহলে কি আমরা যা খুশি তাই করে পার পেয়ে যাব? কারন তাঁর দয়ার তো কোনো শেষ নেই? উত্তর হচ্ছে:

مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ

যিনি বিচার দিনের মালিক

আল্লাহ ﷻ এখানে খুব অল্প কিছু শব্দ ব্যবহার করে আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে, যদিও তাঁর করুণা অসীম কিন্তু তারপরেও আমাদেরকে আমাদের কাজের বিচার দিতে হবে এবং বিচারক হবেন স্বয়ং আল্লাহ ﷻ এবং কেউ আমাদেরকে সেদিন তাঁর বিচার থেকে রক্ষা করতে পারবে না এবং কেউ কোনো কাজে আসবে না। কারণ আল্লাহ ﷻ বিচার দিনের মালিক।

আরবি মালিক শব্দটির দুটো উচ্চারন রয়েছে, মালিক এবং মা-লিক। মালিক অর্থ রাজা। মা-লিক অর্থ অধিপতি। এখানে আল্লাহ ﷻ লম্বা মা-লিক ব্যবহার করেছেন যার অর্থ আল্লাহ ﷻ বিচার দিনের একমাত্র অধিপতি। এই দিন তিনি ছাড়া আর কারও কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তিনি হবেন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। যেমন একজন রাজার হয়তো অনেক বড় রাজত্ব আছে এবং প্রতিটি প্রজা তার হুকুম শুনে। কিন্তু একজন প্রজা তার বাড়ির ভিতরে তার আসবাব পত্রের সাথে কি করবে, সেটা পুরোপুরি তার ব্যাপার। এখানে রাজার কিছুই বলার নেই। প্রজা হচ্ছে তার আসবাবপত্রের মা-লিক, সে যা খুশি তাই করতে পারে তার আসবাবপত্র নিয়ে। একই ভাবে আল্লাহ হচ্ছেন বিচার দিনের মা-লিক, সেদিন সব ক্ষমতা থাকবে তাঁর। কেউ তাঁর ক্ষমতার সাথে ভাগ বসাতে পারবে না।

এখন কেন বিচার ‘দিনের’ অধিপতি? কেন বিচারের অধিপতি নয়? আমরা যখন বলি – ওই বাড়িটা আমার, তার মানে সাধারণত দাঁড়ায় ওই বাড়ির ভেতরে যা কিছু আছে তার সবই আমার। এমনটা নয় যে বাড়িটা আমার, কিন্তু বাড়ির ভেতরে সব আসবাবপত্র অন্য কারো। একইভাবে আল্লাহ ﷻ যখন বলেন তিনি বিচার দিনের মালিক, তার অর্থ বিচার দিনে যা কিছু হবে, তার সব কিছুর একমাত্র অধিপতি তিনি। বিচার দিন একটা লম্বা সময় এবং সে দিনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটবে, যার সবকিছুরই একমাত্র অধিপতি তিনি। তিনি হবেন একমাত্র জজ। তিনি নিজে প্রত্যেকের বিচার করবেন, কোনো উকিল ধরার সুযোগ থাকবে না।

আরবিতে ইয়াওম يَوْم এর বেশ কিছু অর্থ হয় – দিন, যুগ, পর্যায়, লম্বা সময়। যদিও সাধারণত ‘ইয়াওমি দ্দিন’ সবসময় ‘বিচার দিন’ অনুবাদ করা হয়, কিন্তু আমরা যদি ইয়াওমের অন্য অর্থগুলো দেখি তাহলে এটা ‘বিচার পর্যায়’ অনুবাদ করা যেতে পারে। বিচার দিন যে আমাদের একটি দিনের সমান নয় বরং একটা লম্বা পর্যায়, তা ইয়াওমের বাকি অর্থগুলো ইঙ্গিত করে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যপার হল, কেন আল্লাহ ﷻ এর আগের আয়াতে তাঁর দয়ার কথা বলার পর এই আয়াতে শাস্তির কথা না বলে বিচারের কথা বললেন। এর কারণ হচ্ছে, কিয়ামতের দিন দুই ধরণের মানুষ থাকবে – যারা আল্লাহর ﷻ রহমত পেয়ে জান্নাতে যাবে, আর যারা ন্যায় বিচার পেয়ে জাহান্নামে যাবে। জাহান্নাম কোনো শাস্তি নয়, সেটি ন্যায় বিচার। আল্লাহ ﷻ কাউকে শাস্তি দেন না, তিনি ন্যায় বিচার করেন। যারা জান্নাত পায়, তারা আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের জন্য জান্নাত পায়, ন্যায় বিচারের জন্য নয়। সত্যিই যদি আল্লাহ ﷻ আমাদের ভালো কাজগুলোর ন্যায় বিচার করতেন, তাহলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যেত। তখন আপনার আমার একটা নামাযও সঠিক নামায হতো না, কারন আমরা নামাযে দাঁড়িয়ে এমন কিছু নেই যা ভাবি না। আমাদের একটা রোজাও রোজা হতো না, কারন আমরা রোজা রেখে মিথ্যা কথা বলি, হিন্দি সিরিয়াল দেখি, সুদ খাই, উল্টোপাল্টা জিনিসের দিকে তাকাই, আজেবাজে কথা শুনি ইত্যাদি। আমাদের যাকাত কোনো যাকাত হতো না, কারণ আমাদের অনেকের যাকাত হচ্ছে লোক দেখানো একটা ব্যাপার, যেখানে আমরা আমাদের মোট সম্পত্তির হিসাব যত কম করে করা যায় তা করে, তার ২.৫% যাদেরকে দিলে লোকমুখে অনেক নাম হবে, তাদেরকেই বেশি করে দেই। আমাদের বিরাট সৌভাগ্য যে আল্লাহ ﷻ আমাদের কিছু ভালো কাজকে ১০ গুণ, কিছু ভালো কাজকে ১০০ গুণ, ১০০০ গুণ করে হিসাব করবেন। তা না হলে কেউ কোনোদিন জান্নাত পেত না।

এখন এই আয়াতটির শব্দগুলোর অর্থকে যদি ঠিকভাবে তুলে ধরি, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়-

বিচার দিনের/পর্যায়ের একমাত্র অধিপতি।

সূরা ফাতিহার ওপর আমাদের এই পর্যন্ত আলোচনায় আমরা আল্লাহর সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ ধারণা পেলাম। এখন আমরা জানি আমাদের প্রভু কে। সুতরাং এখন আমাদের কী বলা উচিৎ?

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ

আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি

এই আয়াত থেকে শুরু হলো আমাদের চাওয়া। এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রভুর পরিচয় পেয়েছি। এখন দাস হিসেবে আমাদের প্রভুর কাছ থেকে কিছু চাওয়ার পালা। এই আয়াতটির অর্থের গভীরতা এবং বাক্য গঠণ অসাধারণ। প্রথমে বাক্য গঠন দিয়ে শুরু করি।

আরবিতে যদি আমরা বলতে চাই, আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি, তাহলে তা হবে“না’বুদু ইয়্যা-কা।” কিন্তু আল্লাহ ﷻ এখানে শব্দ দুটো উলটিয়ে দিয়েছেন। আরবিতে এটা করা হয় যখন কোনো কিছুকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়। যেমন আমরা যদি বলি, “প্রশংসা আপনার”, তাহলে তার আরবি হবে “হামদুন লাকা।” কিন্তু আমরা যদি বিশেষভাবে বলতে চাই, “প্রশংসা শুধুমাত্র আপনারই” তাহলে আমরা উলটিয়ে বলব, “লাকাল হামদ।” ঠিক একইভাবে “ইয়্যা-কা না’বুদু” অর্থ “আমরা একমাত্র আপনার, শুধুই আপনার ইবাদত করি” এবং “ইয়্যা-কা নাসতা’ই-ন” অর্থ “আমরা একমাত্র আপনার কাছে, শুধুই আপনার কাছে সাহায্য চাই।”

এবার আসি শব্দগুলোর অর্থের গভীরতায়। বেশিরভাগ অনুবাদে না’বুদুকে نعبد ইবাদত বা উপাসনা অনুবাদ করা হয়। সেটি মোটেও না’বুদুর প্রকৃত অর্থকে প্রকাশ করে না। না’বুদু এসেছে আ’বদ عبد থেকে যার অর্থ দাস। আমরা শুধুই আল্লাহর ﷻ উপাসনা করি না, আমরা আল্লাহর ﷻ দাসত্ব করি। এমনটি নয় যে আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়লাম, রোযা রাখলাম, যাকাত দিলাম – ব্যাস, আল্লাহর ﷻ সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ। এরপর আমি যা খুশি তাই করতে পারি। বরং আমরা সবসময় আল্লাহর দাস। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটা কাজে, প্রতিটা কথায় আমাদেরকে মনে রাখতে হবে – আমরা আল্লাহর ﷻ দাস এবং আমরা যে কাজটা করছি, যে কথাগুলো বলছি, তাতে আমাদের প্রভু সম্মতি দেবেন কি না এবং প্রভুর কাছে আমি জবাব দিতে পারব কি না। এরকম মানুষ দেখেছেন যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে গিয়ে পড়ে, কিন্তু ব্যাংকের একাউন্ট থেকে সুদ খায়, সুদের লোন নিয়ে বাড়ি কেনে, কাউকে ভিক্ষা দেবার সময় বা মসজিদে দান করার সময় মানিব্যাগে সবচেয়ে ছোট যে নোটটা আছে সেটা খোঁজে? বা এরকম মানুষ দেখেছেন, যে হজ্জ করেছে, বিরাট দাড়ি রেখেছে কিন্তু বাসায় তার স্ত্রী, সন্তানদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে? এরা আল্লাহ ﷻ আবদ্‌ নয় এবং এরা আল্লাহর ﷻ ইবাদত করছে না। এরা শুধুই উপাসনা করছে। উপাসনার বাইরে আল্লাহর ﷻ প্রতি নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে আল্লাহর আবদ্‌ হতে এখনও বাকি আছে।

আরেক ধরণের মানুষ যারা এখনও আল্লাহর ﷻ ইবাদত করা শুরু করতে পারেনি তারা হলো সেই সব মানুষ যারা ঠিকই নামায পড়ে, রোযা রাখে, যাকাত দেয়, কিন্তু ছেলে মেয়ের বিয়ে দেয় হিন্দুদের বিয়ের রীতি অনুসরণ করে গায়ে-হলুদ, বউ-ভাত করে। আরেক ধরণের মানুষ হলো যারা মসজিদে বা ইসলামিক অনুষ্ঠানে যায় একদম মুসলিম পোশাক পরে, হিজাব করে, কিন্তু বন্ধু বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর বাসায় বা বিয়ের অনুষ্ঠানে যায় একেবারে সার্কাসের মেয়েদের মতো রঙ-বেরঙের সাজসজ্জা করে। আরেক ধরণের আজব বান্দা দেখেছি যারা হজ্জ করতে যায় হিজাব পরে, কিন্তু প্লেন সউদি আরবের সীমানা থেকে বের হয়ে অন্য এয়ারপোর্টে নামার সাথে সাথে বাথরুমে গিয়ে হিজাব খুলে ফেলে আপত্তিকর পশ্চিমা কাপড় পরে নেয়। এদের সবার সমস্যা একটি, এরা এখনও আল্লাহকে ﷻ প্রভু হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। এদের কাছে “লোকে কী বলবে” বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু “আমার প্রভু কী বলবেন” তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আমরা যখন নিজেদেরকে আল্লাহর ﷻ দাস হিসেবে ঘোষণা দেব, তখনই আমরা আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করতে পারবো। যতদিন সেটা করতে না পারছি, ততদিন আমরা “লোকে কী বলবে”-এর দাস হয়ে থাকব। ফ্যাশনের দাস হয়ে থাকব। বিনোদন, সংস্কৃতি, সামাজিকতার দাস হয়ে থাকব। একমাত্র আল্লাহর প্রতি একান্তভাবে দাসত্ব করতে পারলেই আমরা এই সব মিথ্যা “প্রভু”দের দাসত্ব থেকে নিজেদেরকে বের করে আনতে পারব। যারা সেটা করতে পেরেছেন, তারা জানেন এই পৃথিবীতে সত্যিকার স্বাধীনতার স্বাদ কত মধুর!

নাস্তা’ই-ন نَسْتَعِينُ অর্থ যদিও করা হয় “সাহায্য” কিন্তু নাস্তা’ই-ন এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে – আপনি অনেক চেষ্টা করেছেন, আর আপনার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, এখন আপনি সাহায্য চান। যেমন: রাস্তায় আপনার গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি একা ঠেলে পারছেন না। তখন আপনি রাস্তায় কাউকে অনুরোধ করলেন আপনার সাথে ধাক্কা দেবার জন্য। এটা হচ্ছে নাস্তা’ইন। কিন্তু আপনি যদি আরামে গাড়িতে এসি ছেড়ে বসে থেকে রাস্তায় কাউকে বলতেন ধাক্কা দিতে, তাহলে সেটা নাস্তাই’ন হতো না।

আমরা আল্লাহর ﷻ কাছে তখনি সাহায্য চাওয়ার মতো মুখ করতে পারব, যখন আমরা নিজেরা যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। জীবনে একবার কু’রআন পুরোটা পড়ে দেখিনি, অথচ আমরা নামাযে আল্লাহর ﷻ কাছে চাচ্ছি, “ও আল্লাহ, আমাকে বেহেশত দেন” – এরকম হাস্যকর কাজ নাস্তাই’ন নয়। আমরা নিজেরা অনেক ইসলামের আর্টিকেল পড়ি, বই পড়ি, লেকচার শুনি, অথচ আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদেরকে ইসলামের কথা বলতে লজ্জা পাই, কিন্তু আল্লাহর কাছে ঠিকই চাই -“ও আল্লাহ, আমাকে একজন আদর্শ মুসলমান বানিয়ে দিন” – এটা নাস্তাই’ন নয়।

এই আয়াতটিতে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে শুধু তাঁর কাছে সাহায্য চাইতেই বলেননি, বরং নাস্তা’ইন শব্দটা ব্যবহার করে আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে, আমাদেরকে যথাসাধ্য চেষ্টা করে তারপরে তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

এই আয়াতে একটি লক্ষ্য করার মত ব্যপার হলো, আল্লাহ ﷻ কিন্তু বলেননি, কিসের জন্য সাহায্য চাইতে হবে। তিনি শুধুই বলেছেন সাহায্য চাইতে। ধরুন আপনি সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে তিন তলা থেকে গড়িয়ে, নিচ তলায় এসে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন এবং আপনার হাত-পা ভেঙ্গে গেছে। এই অবস্থায় আপনি কি বলবেন – “ভাই সব, আমি সিঁড়ি হইতে পড়িয়া গিয়া আমার হাত-পা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছি। আপনারা অনুগ্রহ করিয়া আমাকে সাবধানে তুলিয়া একটি স্ট্রেচারে করিয়া নিকটবর্তী পঙ্গু হাসপাতালে লইয়া যাইবেন এবং একজন ডাক্তারকে ঘটনা বৃত্তান্ত বলিবেন।” আপনি সেটা করবেন না, বরং আপনি এক কথায় বলবেন – “বাঁচাও!” এক কথাই যথেষ্ট। ঠিক একইভাবে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে বলেছেন, আমাদের অবস্থা বড়ই খারাপ, এখন আমরা একটা কাজই করতে পারি তা হলো বলা, “আমাদেরকে সাহায্য করুন! আমরা আর পারছিনা!”

সুতরাং এই আয়াতটির শুদ্ধত্বর অনুবাদ হবে:

আমরা একমাত্র আপনার, শুধুই আপনার দাসত্ব করি, এবং একমাত্র আপনার কাছে, শুধুই আপনার কাছে অনেক চেষ্টার সাথে সাহায্য চাই।

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ

আমাদেরকে সরল পথ দেখাও

আমরা আল্লাহর কাছে অনেক কিছুই চাইতে পারতাম। যেমন আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে জীবনে সফল করে দিন, খাঁটি মুসলমান বানিয়ে দিন, আমাদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন ইত্যাদি। কিন্তু আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, আমাদের যা দরকার তা হচ্ছে পথনির্দেশ। এই পৃথিবীটা আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা এবং এই পরীক্ষায় সফলভাবে পাস করার জন্য আমাদের দরকার পথনির্দেশ। আমরা স্কুলে শিক্ষকের কাছে যেমন সাজেশন চাইতাম – কোন চ্যাপটারগুলো পড়তে হবে, কোনগুলো না পড়লেও হবে, কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর শিখলেই পরীক্ষায় কমন আসবে – সেরকম আমাদের জীবনের পরীক্ষায় আমাদের আল্লাহর পথনির্দেশ দরকার।

ইহদিনা এসেছে হুদা هدى থেকে যার অর্থ পথনির্দেশ। হুদা অর্থ সম্পূর্ণ, বিস্তারিত পথনির্দেশ। এটি শুধুই পথের ইঙ্গিত নয়। যেমন আপনি কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই মতিঝিল কোন দিকে?” সে বলল, “ওই পূর্ব দিকে।” এই ধরণের পথনির্দেশ দিয়ে আপনার কোনো লাভ নেই। কিন্তু সে যদি বলত, “এই রাস্তা ধরে সোজা গিয়ে প্রথম বায়ে যাবেন, তারপর তিনটা সিগনাল পার হয়ে ডানে গেলে যে শাপলা চত্বর দেখতে পারবেন, সেখান থেকে মতিঝিল শুরু। চলেন আপনাকে আমি কাকরাইল পর্যন্ত আগিয়ে দেই।” এটা হল হুদা – পথনির্দেশ। আমরা আল্লাহর কাছ থেকে পথের ইঙ্গিত চাচ্ছি না, বিস্তারিত পথ নির্দেশ চাচ্ছি, সেই পথে চলার জন্য সাহায্য চাচ্ছি। আল্লাহ ﷻ আমাদের চাওয়ার এই উত্তরে ৬২৩৬ টা পথনির্দেশ সহ এক সম্পূর্ণ কু’রআন দিয়েছেন।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষ করুন, এই আয়াতটি এবং আগেরটিতে “আমাদেরকে”, “আমরা” ব্যবহার করা হয়েছে। কেন “আমি” ব্যবহার করা হলনা?

একা ইসলামের পথে থাকা খুবই কঠিন। আপনারা যারা ইসলাম মেনে চলার যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন, কিন্তু আপনার পরিবারের বাকি সবাই ইসলামের ধারে-কাছেও নেই, আপনারা জানেন আপনাদের পক্ষে ইসলাম মেনে চলাটা কত কঠিন। প্রতিদিন আপনাকে আপনার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আপত্তিকর কথা, কাজ, অনুষ্ঠান সহ্য করতে হচ্ছে, যা আপনাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়, আপনার মন ভেঙ্গে দেয়। আর আপনারা যারা অমুসলিম দেশে আছেন, তারা জানেন এক হালাল খাবার খুঁজে পাবার জন্য আপনাদেরকে কত মাইলের পর মাইল খুঁজে বেড়াতে হয়, জুম্মার নামায পড়ার জন্য কত সংগ্রাম করতে হয়। একারণেই আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে সম্মিলিতভাবে তাঁর ইবাদত করতে বলেছেন, তাঁর সাহায্য চাইতে বলেছেন এবং তাঁর কাছে পথনির্দেশ চাইতে বলেছেন। যখন একটি পরিবারের সবাই, সমাজের সবাই ইসলাম মেনে চলা শুরু করে, তখন সেই পরিবারের বা সমাজের প্রতিটি সদস্যের জন্য ইসলাম মেনে চলাটা অনেক সহজ এবং আনন্দের হয়ে যায়।

সিরা-ত صراط শব্দটির অর্থ একমাত্র সোজা পথ। আরবিতে পথের জন্য আরও শব্দ আছে যেমন তারিক طريق, শারি’ شارع, সাবিল سبيل ইত্যাদি। কিন্তু এই সব শব্দের বহুবচন হয়, অর্থাৎ একাধিক পথ হয়। কিন্তু সিরা-ত একটি একবচন শব্দ এবং এর বহুবচন নেই। যার মানে দাঁড়ায় – সত্যের পথ একটাই। জীবনের পরীক্ষায় সফল হবার অনেকগুলো পথ নেই, একটাই পথ।

ভাষাগতভাবে সিরা-ত অর্থ সোজা, চওড়া এবং বিপদজনক পথ। এই রাস্তাটি এতই সরল এবং সোজা যে, যারা এই পথে যাচ্ছে, তাদেরকে সহজেই যে কেউ আক্রমন করতে পারে। একারনেই আল্লাহ ﷻ যখন শয়তানকে বলেছিলেন আদমকে সিজদা করতে এবং সে অবাধ্যতা করেছিল, তখন তাকে বের করে দেবার সময় সে বলেছিল: “যেহেতু আপনি আমাকে বিপথগামী করলেন, আমি এদের (মানুষ) সবার জন্য সিরা-তাল মুস্তাকি’মে ওৎপেতে থাকব”। [দেখুন কুরআন ৭:১৬]

আমরা যারা সিরা-তুল মুস্তাকি’মে চলার চেষ্টা করব, আমাদেরকে শয়তান প্রতিনিয়ত আক্রমণ করবে সেই পথ থেকে বের করে আনার জন্য। শয়তান তার বাহিনী নিয়ে সিরা-তুল মুস্তাকি’মের দুই পাশে ঘাপটি মেরে আছে এমবুশ করার জন্য। আমরা একটু অসাবধানী হলেই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত আমাদেরকে জীবনের শত প্রলোভন, কামনা, বাসনা, রাগ, ঘৃণা, অহংকার থেকে নিজেদেরকে সংযত রেখে খুব সাবধানে এই পথটি পার করতে পারলেই আমরা আমাদের গন্তব্য জান্নাতে পোঁছে যাবো।

এখন সিরা-ত যদি সোজা পথ হয় তাহলে মুস্তাকি’ম অর্থ সরল/সোজা কেন? এখানে বাড়তি মুস্তাকি’মের কি দরকার? মুস্তাকি’ম এসেছে قوم থেকে যার অর্থ দৃঢ় ভাবে দাঁড়ানো, প্রতিস্থিত, সুবিন্যস্ত। মুস্তাকি’ম শুধুই সরল পথ নির্দেশ করে না, বরং এটি এমন একটি পথ যা সুপ্রতিষ্ঠিত এবং ঊর্ধ্বগামী। আমরা এই পথে যত আগাবো, আমরা তত উপরে উঠব, তত আল্লাহর কাছাকাছি হব, তত সন্মানিত হব, কিন্তু একই সাথে সেটা আমাদের জন্য তত কঠিন হতে থাকবে। সিরা-তাল মুস্তাকি’-ম আমাদেরকে উপরের দিকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়, কিন্তু শয়তান এবং এই দুনিয়ার কামনা, বাসনা, প্রলোভন আমাদেরকে নিচের থেকে ক্রমাগত টেনে ধরে রাখে। আমরা যত সিরা-তুল মুস্তাকি’মে এগিয়ে যাবো, আমাদের জন্য আরও সামনে এগিয়ে যাওয়াটা তত কঠিন হতে থাকবে। আল্লাহ ﷻ এখানে মুস্তাকি-ম ব্যবহার করে আমাদেরকে আগে থেকেই জানিয়ে দিচ্ছেন যে, সফলতার পথ সহজ নয় এবং এই পথে যত এগিয়ে যাবো, সেই পথে অবিচল থাকাটা আমাদের জন্য তত কঠিন হবে। তাই আমরা যেন যথাযথ মানসিক প্রস্তুতি নেই।

সুতরাং এই আয়াতটির শুদ্ধত্বর অনুবাদ হবে:

আমাদেরকে একমাত্র সঠিক, প্রতিষ্ঠিত, ঊর্ধ্বগামী, ক্রমাগত কঠিনতর পথের জন্য বিস্তারিত পথনির্দেশ দিন।

صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ

সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে

এই আয়াতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যপার রয়েছে। প্রথমত আল্লাহ ﷻ বলছেন, তাদের পথ যাদেরকে তিনি নিয়ামত দিয়েছেন। তিনি কিন্তু বলেন নি, তাদের পথ যাদেরকে তিনি নিয়ামত দেন বা দেবেন বা দিচ্ছেন। এখানে অতীত কাল ব্যবহার করা হয়েছে। এর বিশেষত্ব হচ্ছে, যারা আল্লাহর নিয়ামত পেয়েছেন, তারা অতীত হয়ে গেছেন। কু’রআনের আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে বহু ব্যক্তির এবং জাতির উদাহরণ দিয়েছেন যারা আল্লাহর নিয়ামত পেয়ে সফল হয়েছে। যেমন তিনি আমাদেরকে ইব্রাহিম ﷺ এর উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে মুসা ﷺ এর উদাহরণ দিয়েছেন। আমাদেরকে মুহাম্মাদ ﷺ এর উদাহরণ দিয়েছেন। আমাদেরকে তাদের পথ অনুসরণ করতে হবে। সফল হবার পথের নিদর্শন আমাদেরকে আগেই দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। সফল হবার জন্য কোনো নতুন পথ আর আসবে না। কেউ যদি আপনাকে কোনো নতুন পথের সন্ধান দিয়ে বলে এটা হচ্ছে সফল হবার পথ, তাহলে আপনি তার থেকে দূরে থাকবেন।

এছাড়াও আরেকটি মনে রাখার ব্যপার হলো, আমাদের জন্য যারা আদর্শ, তারা কেউ এযুগের কোনো মানুষ নন। আমাদের আদর্শ মানুষরা অনেক আগেই পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। তাই আমরা যেন এযুগের কোনো মানুষকে আদর্শ হিসেবে ধরে তাদের অন্ধ অনুকরণ করা শুরু না করি।

আরেকটি ব্যপার হলো, সুরা ফাতিহা কিন্তু শুধু আমাদেরকেই দেওয়া হয়নি, বরং সাহাবিদেরকেও দেওয়া হয়েছিল। সাহাবিদের বেলায় তাহলে “আনআ’মতা আ’লাইহিম” কারা ছিলেন? নবী মুহম্মদ ﷺ কে যখন আল্লাহ ﷻ সুরা ফাতিহা শিখিয়েছিলেন, তখন তার কাছে অনুসরণ করার মত আদর্শ কারা ছিলেন? কু’রআনে বহু জায়গায় আল্লাহ ﷻ নবীকে ﷺ এবং তার অনুসারিদেরকে (যার মধ্যে সাহাবারাও পড়েন), আগের নবীদের ﷺ এবং কিছু সফল জাতির উদাহরণ দিয়েছেন, যাদেরকে আল্লাহ ﷻ অনুসরণ করার মত আদর্শ বলে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। আমরা কু’রআন পড়লেই অনুসরণ করার মত এমন অনেক আদর্শ খুঁজে পাবো। কু’রআনে শত শত ঘটনা ও কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে সেই আদর্শগুলো শিখিয়েছেন।

ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে আনআ’মা এসেছে নুউ’-মা نعومة থেকে, যার অর্থ নম্র, শান্ত, শিথিল ইত্যাদি। যেমন গরু, ভেড়াকে আনআ’ম বলা হয় কারণ তারা সবসময়ই শান্ত, ধিরস্থির থাকে। অন্যদিকে বিড়ালকে দেখবেন সবসময় সতর্ক থাকতে। আল্লাহ ﷻ এখানে আনআ’মা শব্দটি ব্যবহার করে আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, যারা সিরা-তাল মুস্তাকি’মে চলে গন্তব্যে পৌঁছে গেছে, তাদের উপরে আল্লাহ ﷻ শান্তি বর্ষণ করেছেন। তারা এখন শান্ত, শিথিল।

আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি “তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে।” প্রচলিত এই অনুবাদে একটি বড় ভুল রয়েছে, যা সাম্প্রতিক অনুবাদগুলোতে ঠিক করা হয়েছে। “তোমার গজব” একটি ভুল অনুবাদ কারণ আরবিতে কোনো “তোমার” নেই, যা আল্লাহকে ﷻ নির্দেশ করে। “মাগ’দুবি আ’লাইহিম” আরবিতে ব্যবহার করা হয় এমন কাউকে নির্দেশ করতে যার উপর সবাই রেগে আছে। “মাগ’দুবি” শব্দটির অর্থ “ক্রোধের শিকার।” যখন এরকম কোনো শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেখানে কে কাজটা করছে তা বলা থাকেনা, তার মানে হচ্ছে কাজটা করছে একাধিক জন, একজন নয়। সুতরাং “তোমার গজব” ভুল অনুবাদ। বরং শুদ্ধ অনুবাদ হচ্ছে, “যারা ক্রোধের শিকার হয় না।” আল্লাহ ﷻ এখানে তাঁর কথা উল্লেখ না করে এই আয়াতটির অর্থকে অনেক ব্যাপক করে দিয়েছেন। এখানে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে আমরা যেন নিজের, পরিবারের, আত্মীয়স্বজনের, প্রতিবেশীর – সকল মানুষের এবং অন্যান্য সব সৃষ্টির এবং সর্বোপরি আল্লাহর ক্রোধের শিকার না হই। আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে সব ধরণের, সবার ক্রোধের শিকার হতে মানা করেছেন। মানুষের, ফেরেশতাদের এবং আল্লাহর ক্রোধের শিকার কারা হয়, তা কু’রআনের বেশ কিছু আয়াতে পরিস্কারভাবে বলা আছে এবং সেসব জায়গায় আল্লাহ ﷻ পরিস্কার ভাবে তাঁকে উল্লেখ করেছেন। সুরা ফাতিহাতে তিনি বিশেষভাবে তাঁকে উল্লেখ করেননি কারণ তাঁর আমাদের প্রতি নির্দেশ হচ্ছে: আমরা যেন ক্রোধের শিকার না হই, সেটা নিজের ক্রোধ এবং অন্যর ক্রোধ, দু’টোই।

আদ্দ—ল্লি-ন এর অর্থ করা হয় “যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে”, কিন্তু এর অনুবাদ হওয়া উচিৎ “যারা পথ হারিয়ে ফেলেছে।” এরা সাধারণত এমন লোক নয় যারা ইচ্ছা করে পথ হারায়, কারণ যারা আল্লাহর বাণী জেনে শুনে অস্বীকার করে ভুল পথে চলে, তারা কাফির, তারা দল্লিন নয়। দল্লিন তারাই, যারা না বুঝে ভুল পথে আছে। যেমন ধরুন আপনার দু’টো বাচ্চা আছে। আপনি বড়টাকে বললেন যে, “ফ্রিজে অনেক চকলেট আছে, কিন্তু আমি না ফেরা পর্যন্ত তোমরা কেউ ফ্রিজ খুলবে না।” আপনি ফিরে এসে দেখেন দুই জনেই মহানন্দে চকলেট খাচ্ছে। এখন তাদের প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া কি হবে? বড়টা নিশ্চিতভাবে আপনার আদেশ অমান্য করেছে, এবং ছোটটা না বুঝে ভুল করেছে। বড়টা হবে আপনার ক্রোধের শিকার, কিন্তু ছোটটা সেরকম বকা খাবে না। সুতরাং বড়টা হচ্ছে মাগ’দুবি-র উদাহরণ এবং ছোটটা হচ্ছে দল্লা-র উদাহরণ।

সূরা ফাতিহার কিছু ভাষাতাত্ত্বিক মাধুর্য

১) সূরা ফাতিহার প্রতিটি আয়াত কবিতার ছন্দের মত শেষ হয় ‘ইম’ বা ‘ইন’ দিয়ে। যেমন প্রথম আয়াত শেষ হয় রাহি-ম দিয়ে, দ্বিতীয় আয়াত শেষ হয় আ’লামি-ন দিয়ে, তৃতীয় আয়াত রাহি-ম, চতুর্থ আয়াত দি-ন।

২) সূরাটির মাঝামাঝি যেই আয়াতটি “ইয়্যা-কা না’বুদু…” এর আগের আয়াতগুলো হচ্ছে বিশেষ্য বাচক বাক্য এবং তার পরের আয়াতগুলো হচ্ছে ক্রিয়া বাচক বাক্য।

৩) “ইয়্যা-কা না’বুদু…” এর আগের আয়াতগুলো হচ্ছে আল্লাহর সম্পর্কে ধারণা। এর পরের আয়াতগুলো হচ্ছে আল্লাহর কাছে আমাদের চাওয়া।

৩) সূরা ফাতিহার আয়াতগুলোর উচ্চারন ক্রমাগত ভারি এবং কঠিন হতে থাকে। যেমন প্রথম চারটি আয়াতে দেখবেন সেরকম ভারি শব্দ নেই। কিন্ত “ইয়্যাকা না’বুদু…” থেকে ক্রমাগত ভারি শব্দ শুরু হতে থাকে এবং ক্রমাগত ভারি শব্দ বাড়তে থাকে। যেমন: 

  • ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যা-কা নাসতাই’ন − দু’টি ভারি শব্দ।
  • ইহদিনাস সিরা-তা’ল মুসতাকি’ম − দু’টি ভারি শব্দ।
  • সিরা-তা’ল্লাযিনা আনআ’মতা আ’লাইহিম − তিনটি ভারি শব্দ।
  • গা’ইরিল মাগ’ধুবি আ’লাইহিম ওয়া লা দ্দ−ল্লি-ন – চারটি ভারি শব্দ।

সূরা ফাতিহার গভীরতর অর্থানুবাদ

بِسْمِ اللَّهِ   الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ বিসমিল্লাহির রাহমা-নির রাহি-ম অকল্পনীয় দয়ালু, সবসময় দয়ালু আল্লাহর নামে।
الْحَمْدُ   لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল   আ’-লামি-ন সকল প্রশংসা, মহিমা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর; তিনি সকল চেতন অস্তিত্বের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি, যত্নশীল প্রভু।
الرَّحْمَٰنِ   الرَّحِيمِ আররাহমা-নির রাহি-ম অকল্পনীয় দয়ালু, সবসময় দয়ালু।
مَالِكِ يَوْمِ   الدِّينِ মা-লিকি ইয়াওমিদ্দি-ন বিচার দিনের/পর্যায়ের একমাত্র অধিপতি।
إِيَّاكَ   نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ইয়্যা-কা না’বুদু ওয়া   ইয়্যা-কা নাসতাই’-ন আমরা একমাত্র আপনার, শুধুই আপনার দাসত্ব করি, এবং একমাত্র আপনার কাছে, শুধুই আপনার কাছে অনেক চেষ্টার সাথে সাহায্য   চাই।
اهْدِنَا   الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ ইহদিনাস সিরাতা’ল মুসতাকি’-ম আমাদেরকে একমাত্র সঠিক, প্রতিষ্ঠিত, ঊর্ধ্বগামী, ক্রমাগত কঠিনতর পথের জন্য বিস্তারিত পথনির্দেশ দিন।
صِرَاطَ   الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا   الضَّالِّينَ সিরাতা’ল্লা যি-না আনআ’মতা   আ’লাইহিম গা’ইরিল মাগ’দু’বি আ’লাইহিম ওয়ালা দ্দ—ল্লি-ন তাদের পথ যাদেরকে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য, অনুগ্রহ, কল্যাণ দিয়েছেন, যারা নিজের এবং অন্যের ক্রোধের শিকার হয় না এবং ভুল পথে যায় না।

Fatiha-Bengali-Translation

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে: http://quranerkotha.com/surah-fatiha/

Advertisements

One thought on “সূরা ফাতিহা – আমরা যা শিখিনি

  1. পিংব্যাকঃ সূরা ‘আসর অল্প কথায় আমাদেরকে যা শেখায় (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s