সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৪৫-৪৬): দুনিয়ার জীবনের উপমা

সূরা কাহফ থেকে পাওয়া কিছু দিকনির্দেশনার ওপর ধারাবাহিক আলোচনার আঠারতম কিস্তি

৪৫ – (হে নবী,) তুমি এদের কাছে দুনিয়ার জীবনের উদাহরণ পেশ করো। (এ জীবনটা হচ্ছে:) পানির মতো আমি তাকে আকাশ থেকে বর্ষণ করি, যার কারণে যমিনের উদ্ভিদ ঘন (সুশোভিত) হয়ে ওঠে, অতপর একসময় বাতাস তা উড়িয়ে নিয়ে ফিরে। মূলত আল্লাহ সবকিছুর ওপর প্রচন্ড ক্ষমতাবান।

সৃষ্টি, বিকাশ, ক্ষয় ও সমাপ্তি – আমাদের চারদিকে আমরা যেদিকেই তাকাই না কেন, এটিই সৃষ্টিজগতের বাস্তবতা। এই নিয়মেই সবকিছু চলছে। আমাদের বাঙালিদের খাদ্যের প্রধান উৎস ধানের কথাই ধরা যাক। জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় মাসে কৃষক ধানের বীজতলা তৈরি করে। সেখান থেকে ধানের যে চারা পাওয়া যায় তা শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে ভরা বর্ষার মধ্যে মূল ক্ষেতে রোয়া হয়। বর্ষার মৌসুম শেষ হলে ধানক্ষেতের সবুজ রঙ সোনালী রূপ ধারণ করে, সেই সাথে হেমন্তের শিশিরবিন্দুর সাথে সাথে লতার আগায় নতুন ধান ঝিলিক দিতে থাকে। অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে কৃষক সেই ধান কেটে ঘরে তোলে। কয়েক মাস আগের শুকনো ক্ষেত আবারও শুকনো হয়ে পড়ে। সেই ক্ষেতেরই অল্প কিছু ধান কৃষক সযত্নে রেখে দেয় বীজ ধান হিসেবে। পরের বছর জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় মাসে সেই জমা করা বীজ ধান দিয়েই বীজতলা তৈরি করা হয়। সেই বীজ একসময় চারায় পরিণত হয়, সময় এলে সেই চারাকে মূল ক্ষেতে রোয়া হয়, সেই চারা আবার বড় হতে থাকে এবং আবারও ধানের ফলন দেয়। বছরের পর বছর ধরে এই চক্রটি এভাবেই আবর্তিত হতে থাকে।

একজন মানুষের জীবনও এই একই রকম। এই পৃথিবীতে একসময় তার কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। সামান্য কয়েক ফোটা তরল পদার্থের মাধ্যমে তার প্রাণের সূচনা হয়। দীর্ঘ নয় মাস পরে একটি মানব শিশু হিসেবে তার জন্ম হয়। জন্মের পরে সে নিজে নিজে উল্লেখযোগ্য কিছুই করতে পারে না। ধীরে ধীরে সে বড় হতে থাকে। একসময় সে বসতে শেখে, হামাগুড়ি দিতে শেখে, দাঁড়াতে শেখে, হাঁটতে শেখে, দৌড়াতে শেখে, কথা বলতে শেখে। শৈশব থেকে কৈশোর পেরিয়ে সে যৌবনে পদার্পন করে। সে কর্মক্ষম হয়ে ওঠে, উপার্জন করতে শুরু করে। এক পর্যায়ে সে তার সঙ্গী বেছে নেয়। তার নিজেরই সন্তান হয়। সেই সন্তান বেড়ে উঠতে থাকে, আর সে বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যায়। একসময় সেই সন্তান তারই মতো যৌবনে পদার্পন করে, কিন্তু ততদিনে সে নিজে বুড়ো হয়ে যায়, তার আগেকার সব শক্তি লোপ পায়। স্বাভাবিক নিয়মে সবকিছু চললে একসময় সে মারা যায়, থেকে যায় তার সন্তান-সন্ততি। ওরাও সন্তানের জন্ম দেয়, ওরাও একসময় বুড়ো হয়, ওদেরও মৃত্যু ঘটে। এই চক্রটি এভাবে চলতেই থাকে।

ধানের জীবনচক্র বা মানুষের জীবনচক্র – আমরা যেদিকেই তাকাই না কেন, এই পৃথিবীতে আমাদের অবস্থানের সময়টা একেবারেই ক্ষুদ্র। আজকের পূর্ণ শক্তির যুবক গতকালকের দুধের শিশু আর আগামীর দুর্বল বৃদ্ধ। মাঝখানের এই কয়েকটা দিন আল্লাহ আমাদেরকে শক্তি ও সক্ষমতা দিয়েছেন। এসবের কিছুই আমাদের ছিলো না, তিনিই দয়া করে আমাদেরকে তা দিয়েছেন, একসময় তিনিই আবার তা ফিরিয়ে নেবেন। অন্যরা তখন আমাদের জায়গা নেবে। আমাদেরকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে। দুর্বল অবস্থাতেই আমাদেরকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। তাই এই সাময়িক জ্ঞান, এই সাময়িক শক্তি নিয়ে অহংকার করা কি আমাদের সাজে? যে মহান স্বত্ত্বা এই সবকিছু এভাবে সৃষ্টি করলেন তাঁকে অস্বীকার করা কি আমাদের মানায়? তাঁর মনোনীত জীবনবিধানকে অবজ্ঞা করা কি আমাদের জন্য শোভা পায়?

৪৬ – (আসলে) ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি হচ্ছে (তোমাদের) পার্থিব জীবনের কতিপয় (অস্থায়ী) সৌন্দর্য মাত্র। চিরস্থায়ী বিষয় হচ্ছে (মানুষের) নেক কাজ, (আর তা হচ্ছে) তোমার মালিকের কাছে পুরস্কার পাওয়ার জন্যে অনেক ভালো, আর কোনো কল্যাণময় কিছু কামনা করতে গেলেও তা হচ্ছে উত্তম।

এই দুনিয়ার জীবনকে আল্লাহ আমাদের জন্য সুশোভিত করে দিয়েছেন, আর সম্পদ ও সন্তান হলো এর অন্যতম প্রধান দু’টি শোভা। হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন করতে আল্লাহ আমাদেরকে নিষেধ করেননি, বরং এই সম্পদ আমাদের জন্য আল্লাহর অনেক বড় এক নিয়ামত। ন্যায়সঙ্গত উপায়ে সম্পদ অর্জনকে নিরুৎসাহিত করলে ইসলামের তৃতীয় প্রধান স্তম্ভ যাকাতের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। এই সম্পদ দিয়েই আমরা আমাদের মৌলিক চাহিদা মিটাই, এখান থেকেই আমরা আমাদের পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-অনাত্মীয়দের জন্য খরচ করি। এখান থেকেই আমরা যাকাত ও নফল সদকার জন্য অর্থ ব্যয় করি। এই সম্পদের মাধ্যমে পরিপুষ্ট দেহ নিয়েই আমরা আল্লাহর ইবাদাত করি। সম্পদকে ‘হাতের ময়লা’ বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলে আমাদের জীবনটা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। পেটে খাবার না থাকলে এবং মাথা গোঁজার মতো একটু ঠাই না থাকলে হতে পারে যে আমরা আল্লাহ থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারি। এজন্যই তো রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চরম দারিদ্র থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন।

আমাদের সম্পদ যেমন আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সাহায্য করতে পারে, তেমনি এই সম্পদই আবার আমাদেরকে আল্লাহর ক্রোধের পাত্র বানাতে পারে। আমরা যদি হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে যেভাবেই হোক সেভাবে সম্পদ অর্জনের নেশায় মেতে থাকি, বা খরচের ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে না চলি তবে এই সম্পদই পরকালীন জীবনে আমাদের জন্য আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আর আল্লাহকে ঠিকমতো মেনে চললে এই সম্পদই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী এই জীবনে আমাদেরকে সাহায্য করবে, আর আল্লাহ চাইলে আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের নয়ন জুড়ানো চিত্ত প্রশান্তকারী সব পুরস্কার তো আমাদের জন্য আছেই।

আর সন্তান হলো আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান প্রণোদনা। আমাদের সন্তানের মাঝে আমরা আমাদেরকেই খুঁজে ফিরি। তাদের একটু খুশি, একটু অর্জন, একটু সাফল্য আমাদেরকে আনন্দের সাগরে ভাসায়, আবার তাদের একটু কষ্ট, একটু ক্ষতি, একটু ব্যর্থতা আমাদেরকে শোকাতুর করে তোলে। তাদের মুখের দিকে তাকিয়েই আমরা দিনের পর দিন ধরে আমানুষিক সব কষ্ট সহ্য করে যাই। তারা যদি সুসন্তান হতে পারে তবে আমাদের জীবনটাকে সার্থক বলে মনে হয়, অন্যথায় এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে আমাদেরকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়। তারা আল্লাহর অনুগত হয়ে বেড়ে উঠলে আমাদের মৃত্যুর পর তারাই হয় আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আল্লাহ আমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির সৌন্দর্য উপভোগ করতে নিষেধ করেননি, তিনি শুধু এই কথাটুকু স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে এগুলো নেহায়েতই ক্ষণস্থায়ী। আমাদের আসল জীবন তো পরকালীন জীবন। দুনিয়ার ক্ষণিকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে সেই চিরস্থায়ী জীবনকে ভুলে গেলে চলবে না। এই জীবনে অনেক ধন-সম্পদের অধিকারী হতে না পারলেও দুঃখ করার কিছু নেই, কারণ আল্লাহকে ঠিকঠাকভাবে মেনে চললে আখিরাতের অফুরন্ত প্রতিদান তো আমাদের জন্য রয়েছেই। আল্লাহ আমাদেরকে সন্তান না দিয়ে পরীক্ষা করলেও ভেঙে পড়ার কিছু নেই, হয়ত এতেই আমাদের জন্য মঙ্গল আছে। এই পার্থিব জীবনে যেমন সম্পদ ও সন্তান যেমন আমাদের জন্য সৌন্দর্যস্বরূপ, ঠিক তেমনি আমাদের পরকালীন জীবনের সৌন্দর্য এনে দিতে পারে দু’টি জিনিস, আর তা হলো সঠিক ঈমান এবং আল্লাহ নির্দেশিত ও তাঁর প্রেরিত রাসুল প্রদর্শিত সৎকর্মসমূহ। আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই বুদ্ধিমান হয়ে থাকি তবে এই দুনিয়ার হালাল সৌন্দর্যসমূহ উপভোগের পাশাপাশি আমাদের পরকালীন জীবনের সৌন্দর্যের উপকরণও আমরা সংগ্রহ করে যেতে থাকব। আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় তাঁরই নূর দ্বারা আমাদের অন্তরকে আলোকিত করুন যেন আমরা এই বাস্তবতাটুকু অনুধাবন করতে পারি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s