আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের আদর্শ মেনে চলার গুরুত্ব

SeekersHub-এর  Absolute Essentials of Islam: Basic Hanafi Jurisprudence কোর্সের কোর্স ম্যাটেরিয়ালের ছায়া অবলম্বনে আমার নিজের ভাষায় রচিত। লেখাটি কোর্স নোট ও লেকচারের হুবহু প্রতিলিপি নয়।

মানুষ শুধুমাত্র দেহসর্বস্ব কোনো প্রাণী নয়। দেহ ও রূহ এই দুই স্বত্ত্বা নিয়েই মানুষের অস্তিত্ব। একজন মানুষের রূহ বা আত্মা তাকে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। এই রূহ সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে রহস্যময় জিনিসগুলোর মধ্যে একটি। মানুষ এই রহস্যের সামান্যই ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে। এই বিষয়ে মানুষের জ্ঞান একেবারেই সীমিত। “তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন: রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।” [কুরআন ১৭:৮৫]

এই পৃথিবীতে আসার আগে আমরা ছিলাম রূহ-এর জগতে। আমাদের সেই জগতে আল্লাহ প্রতিটি মানুষের রূহকে সমবেত করেছিলেন। শুরু থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ। এরপর তিনি আমাদের রূহকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই?” আমরা সবাই বলেছিলাম, “অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি।” [দেখুন কুরআন ৭:১৭২] আমাদের জন্মের আগেই আমরা আমাদের পালকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে চিনেছিলাম। তাঁকে চেনার সেই বীজ অর্থাৎ ফিতরত সাথে করে নিয়েই আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি। এই ফিতরতের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই মানুষ তার পালনকর্তা আল্লাহকে চেনার মতো করে চিনতে পারে। আমরা যদি আমাদের ফিতরতের সঠিক ব্যবহার না করি তবে এর জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী, কেননা আমাদের রূহ তাঁকে ঠিকই চিনেছিল।

ফিতরতের সঠিক ব্যবহার না করে আমরা যদি পথভ্রষ্ট হয়ে যাই তবে চাইলে শুধুমাত্র এজন্যই আল্লাহ আমাদেরকে পাকড়াও করতে পারেন। কিন্তু তিনি তো পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু। তাই তিনি আমাদেরকে সঠিক রাস্তা দেখানোর জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসুল পাঠিয়েছেন এবং তাঁদের ওপর তাঁর প্রত্যাদেশ বা ওয়াহি নাযিল করেছেন। আমাদের ফিতরত যদি কলুষিত না হয়ে থাকে তবে এই ওয়াহির সংস্পর্শে আসা মাত্রই আমরা আমাদের পালনকর্তা আল্লাহকে চেনার মতো করে চিনে নিতে পারব। এটিই আমাদের প্রতি আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ। তাঁর এই অনুগ্রহকে অবহেলায় দুই পায়ে ঠেলে দিলে আমাদের মতো হতভাগা আর কে হবে?

আল্লাহর পক্ষ থেকে ওয়াহি প্রেরণের এই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর নাযিল করা হয় সর্বশেষ আসমানি কিতাব কুরআন। এই কুরআনই হলো আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ ওয়াহি। এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী সব ওয়াহি রহিত করা হয়েছে। এর পরে আর কোনো ওয়াহি আসবে না। যেহেতু এটিই সর্বশেষ ওয়াহি তাই আল্লাহ নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।” [কুরআন ১৫:৯] আল্লাহ এখানে কুরআনকে ‘উপদেশগ্রন্থ’ বা ‘যিকির’ বলে অভিহিত করেছেন। আর এর মাধ্যমেই আমাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। “জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়।” [কুরআন ১৩:২৮]

মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ নিছক একজন ‘ডাকপিওন’ হিসেবে পাঠাননি যে মানুষের প্রতি কুরআনের কথাগুলো পৌঁছে দিয়েই তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে। “রাজ্যাধিপতি, পবিত্র, পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে, যা কিছু আছে নভোমন্ডলে ও যা কিছু আছে ভূমন্ডলে। তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।” [কুরআন ৬২:১-২] আল্লাহর কালাম অর্থাৎ কুরআনকে মানুষের কাছে পাঠ করে শোনানোর পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের অন্তরকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য সর্বাত্নক চেষ্টা করেছেন। একইসাথে তিনি মানুষকে এই কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিয়েছেন। কিতাব শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর কালামের সঠিক ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন। আর হিকমত শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে তিনি কুরআনের প্রয়োগ কখন কোথায় কিভাবে করতে হবে তা বাস্তবে করে দেখিয়েছেন।

আল্লাহ তাঁর ‘যিকির’ অর্থাৎ কুরআনকে তো সংরক্ষণ করেছেনই, সেই সাথে ‘হিকমত’ অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতের সংরক্ষণও করেছেন। কুরআনের প্রতিটি আয়াত যেভাবে নাযিল হয়েছে এখনও তা ঠিক সেভাবেই সংরক্ষিত আছে। এমনকি কুরআনের প্রতিটি শব্দের সঠিক উচ্চারণও সংরক্ষিত হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশে দেশে কোটি কোটি মানুষ এই কুরআনকে মুখস্ত করেছেন এবং এখনও করছেন। কুরআনের সঠিক পাঠ সংরক্ষণের এই ধারা এখনও জারি আছে। অন্য কোনো ধর্মের ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে কি?

অন্যদিকে, ‘হিকমত’ সংরক্ষিত হয়েছে প্রধানত ইসলামের আলিমদের মাধ্যমে। এজন্যই তো রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “আলিমগণ হলেন নবীদের উত্তরাধিকারী।” রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ‘হিকমত’ তাঁর সাহাবীরা ধারণ করেছেন এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছেন। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ‘হিকমত’ পৌঁছেছে। আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে অতীত ও বর্তমানের আলিমদের এই মেহনতের ফলেই রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শেখানো ‘হিকমত’ থেকে আমরা আজও উপকৃত হচ্ছি। এটি আল্লাহর ‘যিকির’ অর্থাৎ কুরআন সংরক্ষণেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন কেউ যদি দাবী করেন যে শুধুমাত্র কুরআনের পাঠকে আল্লাহ সংরক্ষণ করেছেন কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ‘হিকমত’ সংরক্ষিত হয়নি তাহলে তিনি আল্লাহর রাসুলের ভূমিকাকে একজন ‘ডাকপিওনের’ পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এই অসার দাবী থেকে পুরোপুরি মুক্ত এবং পবিত্র।

reading_quran_in_planeযিনি আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের ‘হিকমত’কে সঠিকভাবে ধারণ করতে পেরেছেন তিনিই প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠির সন্ধান পেয়ে গেছেন। তিনি সঠিক বিশ্বাস অর্জন করেছেন, ইবাদাতের কাজসমূহ নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছেন এবং সেই সাথে সৎকর্মশীলও হয়েছেন। একইসাথে তিনি আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি তার দায়িত্বসমূহকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন এবং সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। এমন লোকদেরকে উদ্দেশ্য করেই রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “আল্লাহ যার ভালো চান তাকে দীনের সঠিক বুঝ দান করেন।” এই দীন অর্থাৎ ইসলামের সঠিক বুঝ অর্জন করার জন্য আমাদেরকে সর্বাত্নক চেষ্টা করে যেতে হবে। এজন্য আমাদেরকে নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে এবং আলিম ও সৎকর্মশীলদের সাহচর্যে থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সময় থেকেই ইসলামের সঠিক জ্ঞান মানুষ থেকে মানুষে সরাসরি সঞ্চারিত হয়েছে, শুধুমাত্র বইয়ের মাধ্যমে সঞ্চারিত হয়নি। কেবলমাত্র বই থেকে আহরিত জ্ঞান সঠিক জ্ঞান নাও হতে পারে, কেননা এক্ষেত্রে এমনটি হওয়া অসম্ভব নয় যে আমাদের বোঝার মধ্যে কোনো ভুল থেকে থাকতে পারে। যিনি জানেন এমন কারও কাছ থেকে সরাসরি শিখলে এমনটি হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। অতএব আমাদের সবাইকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জনের জন্য লেগে থাকতে হবে, সৎকর্মশীল আলিমদের কাছ থেকে সরাসরি এই জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং সর্বোপরি সেই জ্ঞানকে আমাদের নিজেদের জীবনে কাজে লাগাতে হবে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহায্য করুন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close