ইসলাম, ঈমান ও ইহসান

SeekersHub-এর  Absolute Essentials of Islam: Basic Hanafi Jurisprudence কোর্সের কোর্স ম্যাটেরিয়ালের ছায়া অবলম্বনে আমার নিজের ভাষায় রচিত। লেখাটি কোর্স নোট ও লেকচারের হুবহু প্রতিলিপি নয়।

প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবীদের নিয়ে বসে আছেন। এমন সময়ে এক আজব ঘটনা ঘটল। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)’র জবানী থেকেই ঘটনাটি শোনা যাক। 

একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট বসেছিলাম, এমন সময় হঠাৎ এক ব্যক্তি আমাদের সামনে উপস্থিত হন যার কাপড় ছিলো ধবধবে সাদা, চুল ছিলো ভীষণ কালো; তার মাঝে ভ্রমণের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। আমাদের মধ্যে কেউ তাকে চিনতে পারেনি।

এই আগন্তুক মদিনার অধিবাসী হলে সাহাবীদের কেউ না কেউ তাঁকে চিনতেনই। কিন্তু কেউই তাঁকে চিনতে পারলেন না। তিনি অবশ্যই অন্য কোনো জায়গা থেকে এসেছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সফরের কোনো আলামতও তাঁর মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে গিয়ে বসে, নিজের হাঁটু তাঁর হাঁটুর সঙ্গে মিলিয়ে নিজের হাত তাঁর উরুতে রেখে বললেন, “হে মুহাম্মাদ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন।”

মদিনায় বসবাসরত কোনো সাহাবী সাধারণত রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এত কাছে এভাবে বসতেন না। তাঁরা তাঁকে সরাসরি নাম ধরেও ডাকতেন না, বরং তাঁরা তাঁকে “ইয়া রাসুলাল্লাহ” বলে সম্মোধন করতেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “ইসলাম হচ্ছে এই – তুমি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসুল, সালাত প্রতিষ্ঠা কর, যাকাত আদায় কর, রমযানে সওম সাধনা কর এবং যদি সামর্থ থাকে তবে (আল্লাহর) ঘরের হজ্জ কর।”

আগন্তুক ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলেন। জবাবে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের কথা জানিয়ে দিলেন। আমাদের নিজেদেরকে স্বেচ্ছায় আল্লাহর প্রত্যাদেশের কাছে সমর্পন করে দেওয়ার নামই হলো ইসলাম। এখানে বর্ণিত ‘ইসলাম’ হলো ইসলামের বাহ্যিক রূপ। ইসলামকে যদি একটি দেহের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে সেই দেহটি এই পাঁচটি কাঠামোর উপর টিকে আছে। এই পাঁচটি কাঠামোর কোনো একটিও যদি ভেঙে পড়ে তাহলে আমাদের ‘ইসলাম’ নামক দেহটিও ভেঙে পড়বে।

আমরা যদি নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবী করি তাহলে এই কাজগুলো আমাদেরকে করতেই হবে:

১ – “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ (অর্থাৎ উপাস্য ও চুড়ান্ত বিধানদাতা) নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসুল” – এই কথাটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে এবং আমাদের কথা ও কাজের মাধ্যমে তা অন্যদেরকে বুঝতে দিতে হবে। এই বাক্যের ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমেই একজন অমুসলিম ইসলামে প্রবেশ করে এবং একে প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমেই একজন মানুষ ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়।

২ – সাবালক হওয়ার পর থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট নিয়মে আদায় করতে হবে। শেষ বিচারের দিনে আমাদের যাবতীয় কাজের মধ্য থেকে এই নামাযের হিসাবই সবার আগে নেওয়া হবে। আমাদের নামাযের হিসাব সহজ হলে বাকী হিসাবও সহজ হয়ে যাবে, আর নামাযের হিসাব সহজ না হলে বাকী সব হিসাবও কঠিন হয়ে যাবে।উপরন্তু, “নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে” [কুরআন ২৯:৪৫]| আমাদের নামায আমাদেরকে অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে তখনই বিরত রাখবে যখন আমরা নামাযের হকসমূহ সঠিকভাবে আদায় করতে থাকব।

৩ – প্রতি বছর যথাযথ নিয়মে হিসেব করে আমাদের সম্পদের একটি অংশ নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বন্টন করে দিতে হবে, “যাতে ধনৈশ্বর্য্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়” [কুরআন ৫৯:৭]| যাকাত আমাদের সম্পদকে পবিত্র করে এবং সেই সাথে সমাজে ধনী ও গরিবের মধ্যকার ব্যবধানকে কমিয়ে আনতেও তা সাহায্য করে।

৪ – রমযান মাসে প্রতিদিন ভোরের শুরু থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্দিষ্ট নিয়মে রোযা রাখতে হবে। “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা পরহেযগারী (বা তাকওয়া) অর্জন করতে পার” [কুরআন ২:১৮৩]| আল্লাহর প্রতি আমাদের ভালোবাসামিশ্রিত যে ভয় তাকেই তাকওয়া বলে। আমার এই কথায় আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন তো? আমার এই কাজে তিনি সন্তষ্ট হবেন তো? আমাদের প্রতিটি কথা বা কাজের আগে আমরা যদি এভাবে চিন্তা করি এবং সেভাবেই আমরা আমাদের কথা ও কাজকে সাজাই তাহলে আশা করা যায় যে আমরা তাকওয়ার গুণটি অর্জন করতে পেরেছি। রমযানের রোযার হকসমূহ সঠিকভাবে আদায় করতে পারলে এই মহৎ গুণটি অর্জন করা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।

৫ – সামর্থ থাকলে জীবনে অন্তত একবার হজ্জ করতে হবে। আল্লাহর ঘর কা’বাকে নিজের চোখে দেখতে পারার অপার্থিব অনুভূতি, আরাফাতের ময়দানে প্রখর রোদের মধ্যে অশ্রুসিক্ত নয়নে নিজেকে ভিখিরির মতো আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে পারা, মুযদালিফায় খোলা আকাশের নিচে মরুর প্রান্তরে লক্ষ লক্ষ মানুষের রাত কাটানো, মিনায় তাঁবুর মধ্যে অবস্থান ও লক্ষ লক্ষ মানুষের ইবাদাত – এসব প্রত্যক্ষ করার পর বিবেকসম্পন্ন মানুষ মাত্রই তার নিজের ক্ষুদ্রতাকে অনুভব করতে শুরু করে। আরাফাতের ময়দান যেন হাশরের ময়দানেরই একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। মুযদালিফায় রাত্রিযাপন যেন মাটির মানুষকে মাটিতে নামিয়ে আনার একটি শিক্ষালয়। মিনার প্রান্তর যেন মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধকে জাগাবার একটি উত্তম স্থান। কা’বা ঘরের তাওয়াফ যেন আমাদের জীবনের আসল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ কেবলমাত্র আল্লাহকেই আমাদের সবকিছুর কেন্দ্রে রাখতে হবে, এই কথাটি মনে করিয়ে দেয়। হজ্জ-এর হকসমূহ সঠিকভাবে আদায় করে হজ্জ পালন করতে পারলে তা আমাদের পরবর্তী জীবনের গতিধারাকে ইতিবাচকভাবে বদলে দেবেই। আর তেমনটি হয়ে থাকলে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, “মাবরুর হজ্জ-এর প্রতিদান জান্নাত ভিন্ন অন্য কিছু নয়” [বুখারি]।

এই পাঁচটি জিনিসকে জেনে-বুঝে সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরতে পারলে ইসলামের বাকী বিধানসমূহ মানাও আমাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে। আর ইসলামের যাবতীয় বিধানাবলী মানার মাধ্যমেই আমাদের ‘ইসলাম’ নামক দেহটি পরিপূর্ণতা পাবে।

তিনি (অর্থাৎ লোকটি) বললেন, “আপনি ঠিক বলেছেন।” আমরা বিস্মিত হলাম, সে নিজে তাঁর নিকট জিজ্ঞাসা করেছে,আবার নিজেই তাঁর জবাবকে ঠিক বলে ঘোষণা করছে!

এরপর বললেন, “আচ্ছা, আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন।”

তিনি (অর্থাৎ রাসুল) বললেন, “তা হচ্ছে এই – আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ ও আখিরাতে বিশ্বাস করা এবং ভাগ্যের ভালো-মন্দকে বিশ্বাস করা।”

আগন্তুক নিজেই প্রশ্ন করছেন, আবার তিনি নিজেই বলছেন যে উত্তর ঠিক হয়েছে! যাই হোক, এরপর তিনি ঈমান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। জবাবে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের কথা জানিয়ে দিলেন। কোনো জিনিসকে সত্য বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করার নামই হলো ঈমান। এ এমন এক বিশ্বাস যাতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। একটু আগে ইসলামের যে পাঁচটি স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে তা হলো ‘ইসলাম’ নামক দেহের বাহ্যিক রূপ, আর ‘ঈমান’ হলো সেই দেহের রূহ বা আত্মাস্বরূপ। একজন মানুষের দেহ দেখতে যত সুন্দরই হোক না কেন, তার আত্মা যদি দেহ ছেড়ে চলে যায় তবে সে একজন লাশ হয়ে যায়। একইভাবে, আমাদের ইসলামের বাহ্যিক প্রকাশ যতই মনোহর হোক না কেন, সঠিক ঈমানের অধিকারী হতে না পারলে সেই ‘ইসলাম’ যেন মৃত, তা আমাদের কোনো উপকারে আসবে না।

সঠিক ঈমানের অধিকারী হতে হলে যে ছয়টি জিনিসের প্রতি আমাদেরকে ঈমান আনতেই হবে তা হলো:

১ – আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। তিনি আছেন। তিনি এক ও একক। তাঁর কোনো শরিক বা অংশীদার নেই। তিনি যাবতীয় দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত ও পবিত্র। তিনিই একমাত্র স্রষ্টা। তিনিই একমাত্র প্রতিপালক। তিনিই সকল ক্ষমতার অধিকারী। গোটা সৃষ্টিজগতের একচ্ছত্র রাজত্ব একমাত্র তাঁরই। তিনি ছাড়া ইবাদাত বা উপাসনা পাওয়ার যোগ্য আর কেউ নেই। তিনি ছাড়া চুড়ান্ত বিধানদাতা আর কেউ নন।

২ – ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস। তাঁরা আল্লাহর এক বিশেষ সৃষ্টি। তাঁরা কখনোই আল্লাহর কোনো আদেশ অমান্য করেন না। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বে রত আছেন।

৩ – আসমানি কিতাবের প্রতি বিশ্বাস। এই কিতাবসমূহের মাধ্যমেই তাঁকে পাওয়ার সঠিক পথটি আল্লাহ মানুষকে বাতলে দিয়েছেন। কুরআন সর্বশেষ আসমানি কিতাব। এটি এর পূর্ববর্তী সকল কিতাবকে রহিত করে দিয়েছে। আল্লাহকে পেতে হলে এই কুরআনের অনুসরণ করতেই হবে।

৪ – নবী ও রাসুলের প্রতি বিশ্বাস। মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন জনপদে আল্লাহ নবী ও রাসুলদেরকে পাঠিয়েছেন। নবী ও রাসুল প্রেরণের এই ধারাবাহিকতায় মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন সর্বশেষ নবী ও রাসুল। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আনীত আদর্শের অনুসরণ করতেই হবে।

৫ – আখিরাতের জীবনের প্রতি বিশ্বাস। আমাদের এই জীবনই একমাত্র জীবন নয়। মৃত্যুর পরে আমাদেরকে শেষ বিচারের জন্য পুনরুত্থিত করা হবে। সেই বিচারের ভিত্তিতে জান্নাত বা জাহান্নাম হবে আমাদের আবাস। সেটিই হলো আসল জীবন। সেই জীবনই হলো চিরস্থায়ী।

৬ – ভাগ্যের ভালো ও মন্দ যে একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয় তার প্রতি বিশ্বাস।

ঈমানের এই ছয়টি স্তম্ভের প্রতি বিশ্বাস আমাদের অন্তরে যত মজবুত হবে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের ওপর আমল করা আমাদের জন্য তত সহজ হয়ে যাবে। আর এর ইতিবাচক প্রভাব আমাদের জীবনের বাকী সব ক্ষেত্রে গিয়েও পড়তে শুরু করবে।

তিনি (অর্থাৎ লোকটি) বললেন, “আপনি ঠিক বলেছেন।”

তারপর বললেন, “আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন।”

তিনি (অর্থাৎ রাসুল) বললেন, “তা হচ্ছে এই – তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত কর যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ,আর তুমি যদি তাঁকে দেখতে নাও পাও তবে তিনি তোমাকে দেখছেন।”

আবারও সেই একই ঘটনা। আগন্তুক নিজেই প্রশ্ন করছেন, আবার তিনি নিজেই বলছেন যে উত্তর ঠিক হয়েছে। ‘ইসলাম’ ও ‘ঈমান’ সম্পর্কে প্রশ্ন করার পর এবার তিনি ‘ইহসান’ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। কোনো কাজকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের উৎকর্ষতার মাধ্যমে সম্পন্ন করার নামই হলো ‘ইহসান’। “তাদেরকে এছাড়া কোনো নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম।” [কুরআন ৯৮:৫] এই “খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত” করার নামই হলো ‘ইহসান’।

ইহসানের আবার দু’টি পর্যায় আছে। এর সর্বোত্তম পর্যায় হলো, “তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত কর যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ”| আল্লাহর খুব অল্প সংখ্যক বান্দাই ইহসানের এই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছেন। ইহসানের আরেকটি পর্যায় হলো, “তুমি যদি তাঁকে দেখতে নাও পাও তবে তিনি তোমাকে দেখছেন” অন্তত এই অবস্থায় পৌঁছানো।

যুগের পর যুগ ধরে হকপন্থী সুফি সাধকরা এই ইহসানের সাধনাতেই তাঁদের গোটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। “যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়।” [কুরআন ৯১:৯-১০] আমাদের বাহ্যিক ‘ইসলাম’ ও অন্তরের ‘ঈমান’-কে ‘ইহসান’-এর রস দ্বারা সিক্ত করতে পারলেই কেবল আমরা ইসলামে পরিপূর্ণভাবে দাখিল হতে সক্ষম হব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে সেদিকে আহ্বান করেই বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু” [কুরআন ২:২০৮]।

তিনি (অর্থাৎ লোকটি) বললেন, “আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে বলুন।”

তিনি (অর্থাৎ রাসুল) বললেন, “যাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে সে জিজ্ঞাসাকারী অপেক্ষা বেশি কিছু জানে না।”

‘ইসলাম’, ‘ঈমান’ ও ‘ইহসান’ সম্পর্কে প্রশ্ন করার পর আগন্তুক এবার কিয়ামত সম্পর্কে জানতে চাইলেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এখানে “আমি জানি না” একথাটি বললেন না, বরং বললেন যে “যাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে সে জিজ্ঞাসাকারী অপেক্ষা বেশি কিছু জানে না”| কিয়ামত কখন হবে সে জ্ঞান আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। “নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে” [কুরআন ৩১:৩৪]।

এক গ্রাম্য লোক [একবার] নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে এসে বলল, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, কিয়ামত কবে সংঘটিত হবে?” তিনি বললেন, “তোমার জন্য আক্ষেপ! তুমি এর জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?” [বুখারি] কিয়ামতের নির্দিষ্ট সময়টি জানা যদি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতো তবে আমাদেরকে অবশ্যই সেই জ্ঞান প্রদান করা হতো। অতএব, কেউ যদি নিশ্চিত করে দাবী করেন যে অমুক সময়ে কিয়ামত সংঘটিত হবে তাহলে তিনি অবশ্যই একজন মিথ্যাবাদী।

তবে কিয়ামত সংঘটনের সময়টি আমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানানো না হলেও সেটি যে অনেক দূরের ব্যাপার তাও নয়, কেননা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “আমার প্রেরিত হওয়া ও কিয়ামত এই দুই আঙ্গুলের ন্যায়, (বলে তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা দিয়ে ইশারা করলেন)” [বুখারি ও মুসলিম]| রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই দুনিয়া থেকে চলে গেছেন ১৪২৫ বছর হলো। সেই সময়টি হয়ত নিকটেই। আর কুরআনে তো বলাই হয়েছে যে, “কিয়ামত আসন্ন” [৫৪:১]।

কিয়ামত আমাদের জীবদ্দশাতে ঘটুক বা আরও অনেক অনেক বছর পরে ঘটুক, মৃত্যু আমাদের সবার জীবনে আসবেই। আমাদের জন্য সেটিই কিয়ামত। তাই সেই মৃত্যুর জন্য আমাদেরকে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে এবং মৃত্যুর পরবর্তী অনন্ত জীবনের জন্য এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। চারটি এমন কাজ আছে যা করতে না পারলে সেই অনন্ত জীবনে আমাদেরকে পস্তাতে হবে। “কসম যুগের (সময়ের), নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের এবং তাকীদ করে সবরের।” [কুরআন ১০৩:১-৩] আর এই চারটি কাজের ওপর ইহসানের সাথে অটল থাকতে পারলে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে আমাদের জন্য কোনো ভয় নেই, কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

তিনি (অর্থাৎ আগন্তুক) বললেন, “আচ্ছা, তার লক্ষণ সম্পর্কে বলুন।”

তিনি (অর্থাৎ রাসুল) বললেন, “তা হচ্ছে এই – দাসী নিজের মালিককে জন্ম দেবে, [এবং] সম্পদ ও বস্ত্রহীন রাখালগণ উঁচু উঁচু প্রাসাদে দম্ভ করবে।”

কিয়ামত কখন হবে সেই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর আগন্তুক পেলেন না। এবার তিনি কিয়ামতের লক্ষণ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। জবাবে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিয়ামতের দু’টি লক্ষণ সম্পর্কে তাঁকে জানালেন। এই দু’টি লক্ষণ ছাড়াও অন্যান্য অনেক হাদিসে কিয়ামতের আরও অনেক লক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা যদি আমাদের সামনে এই লক্ষণগুলোকে ঘটতে দেখি তাহলে বুঝতে হবে যে সেই দিন আসতে হয়ত আর বেশি সময় বাকী নেই।

তারপর ওই ব্যক্তি চলে যান, আর আমি আরো কিছুক্ষণ বসে থাকি।

তখন তিনি (অর্থাৎ রাসুল) আমাকে বললেন, “হে উমার, প্রশ্নকারী কে ছিলেন তুমি কি জান?

আমি বললাম, “আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অধিক ভালো জানেন।”

তিনি বললেন, “তিনি হলেন [ফেরেশতা] জিবরীল। তোমাদেরকে তোমাদের দীন শিক্ষা দিতে [তিনি] তোমাদের কাছে এসেছিলেন।” [সহীহমুসলিম]

এতক্ষণে এই আগন্তুকের পরিচয় পাওয়া গেল। তিনি ছিলেন ফেরেশতা জিবরাইল (আলাইহিস সালাম)| ইসলাম ধর্মের অতি প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহের সাথে সাহাবীদেরকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি মানুষের রূপ ধরে এসেছিলেন।

masjid-contemplationএই হাদিসে বর্ণিত কয়েকটি কাঠামোর উপরেই আমাদের ধর্মটি দাঁড়িয়ে আছে। এগুলোর উপমা একটি তাঁবুর খুঁটির মতো। কোনো স্থানে তাঁবু খাটাতে গেলে আমরা প্রথমে চারদিকে কয়েকটি খুঁটি গেঁড়ে তারপর ত্রিপল দিয়ে এর চারদিক ও ছাদ ঘিরে ফেলি, এরপর মাটির উপর বিছানা বিছাই এবং এভাবে তাঁবুটিকে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলি। কোনো জায়গায় গিয়ে চারদিকে কয়েকটি খুঁটি গেঁড়ে দিয়ে তাকে তাঁবু বলে আখ্যায়িত করা যেমন হাস্যকর ঠিক তেমনি এই হাদিসে বর্ণিত বিষয়গুলোকে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপ বলে দাবী করাটাওপুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত নয়। এখানে বর্ণিত বিষয়গুলো তাঁবুর খুঁটির মতো। খুঁটি পোতার মধ্য দিয়ে যেমন তাঁবু বসানোর কাজের সূচনা হয়, ঠিক তেমনি এই হাদিসে বর্ণিত বিষয়গুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। এগুলো এমনই সব বিষয় যা একজন মুসলিমকে সারা জীবন ধরে আঁকড়ে রাখতে হবে। তিনি যেখানেই বসবাস করুন না কেন, যে পরিবেশেই থাকুন না কেন, এই খুঁটিগুলো সবসময়ই অটল থাকবে। এগুলো ঠিক রেখে তারপর তাকে ইসলামের বাকী বিধানাবলী পালন করার দিকেও মনোযোগী হতে হবে। ইসলামের অতিরিক্ত সেই বিধানসমূহ হলো ইসলাম নামক তাঁবুর ত্রিপল, গালিচা ইত্যাদি। ইসলামের এই প্রতীকী তাঁবুটিকে সৌন্দর্যমন্ডিত করতেই আমাদের একে অপরের সাথে সৌহার্দপূর্ণ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া উচিৎ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর মনোনীত একমাত্র দীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং সেই দীনে আমাদেরকে পুরোপুরিভাবে দাখিল হওয়ার তৌফিক দিন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close