“এই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে এমনি এমনি!”

দু সপ্তাহ আগে কাজের সূত্রে চাটগাঁ গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী তখন চাটগাঁতেই ছিল। ভাবলাম ছুটি নিয়ে কয়েকদিন শ্বশুড়বাড়িতে আয়েশ করে কাটিয়ে যাই! ছুটি নিলাম দুদিন।

ওদের বাসায় যেয়ে শুনি আমার শ্বাশুড়ি এবার আমাকে দুতিনটা পাঞ্জাবি বানিয়ে দেবেন। আমার তো মহাআনন্দ। ভেবেছিলাম শুধু শুয়ে-বসেই দুতিনদিন পার করব। সাথে বোনাস জুটল পাঞ্জাবি! আমার স্ত্রী বলল সে-ও আমাকে দুটা বানিয়ে দেবে। বোনাসের পর যা পাওয়া যায় তাকে কী বলে?

গতকাল আমার শ্বাশুড়ি তাঁর বড় বোনকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন একটা কাজে। পাঞ্জাবিগুলোও নিয়ে এসেছেন। পাঁচটা পাঞ্জাবির মধ্যে সবচেয়ে পছন্দেরটা পরে সকালে অফিসে এসেছি।

পছন্দটা বেশি ছিল কিনা জানি না, তবে রিকশায় উঠে বারকয়েক নিজেই নিজের পাঞ্জাবির দিকে চোখভরে তাকাচ্ছিলাম। এই যে কাপড় কিনে পাঞ্জাবি বানানো হলো—আচ্ছা কাপড়টা যদি কিনে এমনি এমনি ফেলে রাখা হতো তাহলে কি আদৌ এটা কোনো পাঞ্জাবি হতো? কোনো দর্জি যদি মাপ না নিয়ে তার ইচ্ছেমতো বানাত তাহলে কি সেটা আমার গায়ে ফিট হতো?

লাখ লাখ বছর ফেলে রাখলেও কোনো কাপড় নিজে থেকে পোশাক হয়ে যেত না। সুন্দর পোশাক তো দূরের কথা। অথচ কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, এই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে এমনি এমনি!

new-leafধরণির বুকে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটা গ্রহ-নক্ষত্র, সূর্য-চন্দ্র সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যে-পরিমাপ নিয়ে নিজেদের কক্ষপথে বিচরণ করছে—সেটাও কি তবে এমনি এমনি হয়ে গেল? এগুলোর পেছনে কি কোনো কারিগরের ভূমিকা নেই?

রিকশা তখন বাসা পেরিয়ে অর্ধেক পথ চলে এসেছে। চারপাশে ব্যস্ত সব মানুষ। ছুটছে মৌমাছির মতো। গাড়িগুলো যেন কচ্ছপের মতো—গড়নে, চলনে—জটলার মধ্যে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে কোনোমতে।

ভাবনার ডালপালাগুলো আবার এসে জড়ো হলো পাঞ্জাবির উপর। প্রতিটা পোশাকই তো কোনো না কোনো দর্জির তৈরি; কোনো না কোনো ডিজাইনারের ডিজাইন। পোশাকটা তৈরির পর প্রতিটা পোশাকের সাথে সিম্বলিক কিছু নির্দেশনা লাগানো থাকে। সেটা ড্রাই ওয়াশ করতে হবে নাকি না। সাবান দিয়ে ধুলেও চলবে নাকি ডিটারজেন্টই ব্যবহার করতে হবে। আবার কিছু নির্দেশনা আমরা সাধারণভাবে জানি। যেমন ইস্ত্রি করলে কতটুকু তাপে ইস্ত্রি করতে হবে। আমরা জানি কাপড়ভেদে এর রকমফের হয়। তারপর যে-কাপড়ের রং সহজে উঠে যায় সেই কাপড়ের সাথে আমরা অন্য কাপড় ধুই না।

আমরা জানি এগুলো না-মানলে এত সুন্দর পোশাকটাই নষ্ট হয়ে যাবে। দুএকদিন ব্যবহারের পর না-ধুলে ময়লা হবে; ইস্ত্রি না করলে কুচকে যাবে…

কিন্তু বাধ সাধে কেবল স্রষ্টার নির্দেশনা মানতে। অনেকে স্রষ্টায় বিশ্বাস করলেও মানতে চান না স্রষ্টা কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। যেন কাপড় থেকে পোশাক বানিয়েই দর্জির কাজ খালাস। এরপর আমরা যেনতেনভাবে সেই পোশাক ব্যবহার করতে পারব। টানা-হেঁচড়া করতে পারব। বোতামওয়ালা জামা বোতাম না খুলেই গায়ে জড়াতে পারব। গায়ে হয়তো জড়াবে কিন্তু বোতামগুলো কি আর জায়গামতো থাকবে?

ভাবানগুলো আরও চড়ে ওঠার আগেই রিকশা পৌঁছে গেল বারিধারায়। ভাড়া চুকিয়ে ডানে-বামে তাকিয়ে রাস্তা পার হলাম। ব্যস্ত রাস্তায় সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন কতজন মানুষ চোখ বন্ধ করে রাস্তা পার হবেন জানি না, তবে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভ্রমণ চোখ বন্ধ করেই পার করছেন তারা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s