শবে বরাত: একটি মহিমান্বিত রজনী?

প্রায় সাত বছর আগের কথা। চাকরির সুবাদে আমি তখন খুলনাতে থাকতাম। একই ফ্ল্যাটে আমার সাথে থাকতেন আমারই বয়সী আরো দুইজন ভদ্রলোক। সেদিন ছিলো শবে বরাতের রাত। চারিদিকে মসজিদের লাউড স্পিকার থেকে ভেসে আসছে ওয়াজ, যিকির আর দুআর আওয়াজ। আশে-পাশের বাসা থেকে মুখে জল আনা সব খাবারের গন্ধ বেরুচ্ছে। বেশির ভাগ পুরুষ মানুষ গেছেন মসজিদে। মহিলারা ব্যস্ত খাবার তৈরি আর পরিবেশনে, একটু পরে তারাও শুরু করবেন নফল ইবাদাত।

রাত সাড়ে নয়টা বাজতে তখন কয়েক মিনিট বাকী। আমার এক ফ্ল্যাটমেট আমার কাছে জানতে চাইলেন শবে বরাত বলে আদৌ কিছু আছে কি না। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বক্তাদের বিপরীতধর্মী কথাবার্তায় অন্যদের মতো উনিও খানিকটা দ্বিধান্বিত। আমি খুব কনফিডেন্স নিয়ে তাকে বলে দিলাম যে শবে বরাত বলে আসলে কিছু নেই, তাই এই রাতের বিশেষ কোনো তাৎপর্যও নেই।

সর্বনাশ! যেই না বলা অমনি উনি সনি এন্টারটেইনমেন্ট টিভিতে টিউন করলেন। একটু পরেই যে শুরু হবে সুপার হিট শো ইন্ডিয়ান আইডল। পরবর্তী ঘন্টাখানাকের জন্য আমার ফ্ল্যাটমেট ডুবে গেলেন হিন্দি গানের জগতে। তখন নিজেকে কিছুটা হলেও দোষী মনে হতে লাগল। আমি যদি তাকে বলতাম যে শবে বরাত একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাত তাহলে হয়ত উনি কিছু ইবাদাত-বন্দেগি করতেন, হয়ত উনি ওই রাতে ইন্ডিয়ান আইডল দেখতেন না। হোক এক রাতের জন্য, তবুও তো আল্লাহকে কিছুটা স্মরণ করতেন!

ওই সময়ে আমি একটি বিশেষ দেশের আলিম এবং তাদের অনুসারীদের লেখা বেশি পড়তাম এবং তাদের মতকেই একমাত্র “সঠিক ইসলাম” বলে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতাম। বিতর্ক এড়ানোর জন্য সঙ্গত কারণেই দেশটির নাম উল্লেখ করছি না।

পরবর্তীতে অন্যান্য দেশের আলিম এবং তাদের অনুসারীদের লেখার সাথেও ধীরে ধীরে পরিচিত হতে শুরু করলাম। যতই পড়তে থাকলাম ততই আবিষ্কার করতে লাগলাম যে “সঠিক ইসলাম” কোনো বিশেষ দেশের আলিমদের একক সম্পত্তি নয়। কোনো একটি বিষয়ে আলিমদের মধ্যে একাধিক মত থাকতে পারে, আর মজার বিষয় হলো যে এই মতগুলোর প্রতিটিই কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থিত হতে পারে। ফলে, আলিমদের কোনো মতকেই সরাসরি ভুল বলে উড়িয়ে দেয়াটা সমীচীন হবে না।

umayyad-mosqueশবে বরাত এমন একটি বিষয় যা নিয়ে অনেক আগে থেকেই আলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য চলে আসছে। এখানে ইচ্ছা করেই আমি শবে বরাত সংশ্লিষ্ট হাদিসসমূহের বিশুদ্ধতা বা অশুদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করছি না, কারণ না আমি নিজে, না এই লেখার পাঠকরা উসুলুল হাদিস এবং রিজালশাস্ত্র নিয়ে তেমন কোনো বিশেষ  জ্ঞান রাখেন। জৈব রসায়নের বিশেষ কোনো সূত্র নিয়ে আলোচনার সঠিক স্থান যেমন এটি নয়, ঠিক তেমনি কোনো বিশেষ হাদিসের বিশুদ্ধতা বা অশুদ্ধতা নিয়ে সমালোচনামূলক বিস্তারিত আলোচনার সঠিক স্থানও এটি নয়। সাধারণ মানুষ হিসেবে এই বিষয়ের ওপর প্রদত্ত বিশেষজ্ঞ আলিমদের মত জানাটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।

যেসব বিখ্যাত আলিম এই রাতের বিশেষ তাৎপর্যের পক্ষে মত দিয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন ইমাম আওযায়ী, ইমাম ইবনে তায়মিয়্যা, ইমাম ইবনে রজব এবং তৎকালীন শামদেশীয় অধিকাংশ আলিম। অন্যদিকে ইমাম আতা বিন আবি রাবাহ, ইবনে আবি মুলাইকা, ইমাম মালিকের ছাত্রগণ  এবং তৎকালীন হিজাজের অধিকাংশ আলিমদের মতে এই রাতের বিশেষ কোনো তাৎপর্য নেই, বরং এটি অন্যান্য রাতগুলোর মতোই একটি রাত।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, শবে বরাত এমন একটি বিষয় যেটি নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে মতপার্থক্য চলে আসছে। তাই আপনি শবে বরাত পালন করুন বা না করুন, অন্ততপক্ষে আপনার বিপরীত মতের অনুসারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন এটিই কাম্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মতপার্থক্যমূলক ধর্মীয় বিষয়সমূহে আমাদেরকে আরও সহনশীল হওয়ার তৌফিক দিন।

সহায়ক পাঠ:

  • “Fussing Over the 15th of Sha‘ban” by Ustadh Abu Aaliyah Surkheel Sharif (মধ্য শা’বানের রজনী নিয়ে এখন পর্যন্ত আমার পড়া সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ লেখা);
  • “Muadh ibn Jabal and the Night of Mid-Sha’ban” by Sidi Samer Dajani (মধ্য শা’বানের রজনী উদযাপনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত একটি লেখা);
  • “The Night of Bara’ah” by By Mufti Taqi Usmani (শবে বরাত উদযাপন করা বা না করার ব্যাপারে দেওবন্দি আলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি);
  • “Sha’ban: One Scholarly Perspective”, an answer by Dr. Ali Goma (শবে বরাত উদযাপন করা বা না করার ব্যাপারে আযহারি আলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি);
  • “Ruling on Celebrating the Middle of Sha’baan”, a Fatwa by Shaykh Abdul Aziz bin Abdullah bin Baz (শবে বরাত উদযাপন করা বা না করার ব্যাপারে সৌদি সালাফি আলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি)।

——————————————————————————————

 ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন ও সংলগ্ন ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত এলাকাসমূহ অতীতে শাম নামে পরিচিত ছিলো।

 আরব উপদ্বীপের পশ্চিম অংশ নিয়ে গঠিত ভূখণ্ডটি হিজাজ নামে পরিচিত। পবিত্র মক্কা ও মদিনা হিজাজের অন্তর্ভুক্ত।

 দেওবন্দ দারুল উলুম ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আলিমদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেওবন্দি ঘরানার অনুসারী।

 জামিয়াতুল আযহার বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি এবং সুন্নি ইসলামের অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s