ইতিহাস সংরক্ষণের বিজ্ঞান এবং অপরিবর্তিত কুর’আন – প্রথম খন্ড (অনুবাদ)

বিগত প্রায় ৩০-৩৫ বছর ধরে কুর’আন লিপিবদ্ধকরণ ও সংরক্ষণের ইতিহাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলার চেষ্টা করছে নতুন কিছু দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আসা বই, জরিপ, এবং গবেষণা।পুরো পৃথিবীজুড়েই নাস্তিকতার অধিক প্রচার এবং মানবতার নামে ধর্মহীনতার জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়াই এতদিন পর এসে এই চেষ্টা শুরু হবার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়। গত ৩০ বছরে প্রযুক্তির বিকাশ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশী দ্রুত হয়েছে, যার ফলে আমাদের সাধারণ জীবনযাপনের পদ্ধতি অনেক পরিবর্তিত হয়েছে।আমাদের কাছে এখন পূর্ববর্তী সময়ের সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য যুক্তিসংগত ব্যাখ্যাও অনেক সময় অযৌক্তিক বলে মনে হয়।সর্বোপরি, আমাদের জীবনের কোলাহল এবং গতি বেড়ে যাওয়ার কারণে একটি বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তা না করে কিংবা কোনও কিছুর ব্যাপারে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা না করেই সেটি সম্পর্কে নিজের মনগড়া কিছু মন্তব্য ছুড়ে দেওয়ার ভয়ংকর প্রবণতা সংক্রামক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

Orientalist-দের ইসলাম গবেষণা

অন্ধকার যুগ (Dark Ages) থেকে বেরিয়ে এসে ইউরোপের আলোর পথে চলা এবং তার পরবর্তী সময়ে১৬০০-১৮০০ শতাব্দীতে তাদের বুদ্ধিভিত্তিক অগ্রগতি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী গণজাগরন (movement), যা কিনা ইউরোপের দেশগুলোর এবং তাদের জনগণের মধ্যে নিয়ে এসেছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান, সুক্ষ চিন্তাধারাএবং বুদ্ধিভিত্তিক সমাজ পরিচালনার মতো আধুনিক সব বিষয়। এসবের বেশীরভাগ জিনিসই এসেছিল মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশের ইতিহাস থেকে। মুসলমানরা যখন ইসলাম ধর্মের আমন্ত্রণ দিতে পাড়ি জমিয়েছিল স্পেন, সিসিলি, এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, ঠিক সেই সময় থেকেই এর শুরু।

ইউরোপের এই বুদ্ধিভিত্তিক উত্থান যখন হচ্ছিল, ঠিক তখনই তারা ধীরে ধীরে মুসলিম বিশ্বের উপর নিয়ে আসছিল ইউরোপীয় সম্রাজ্যবাদ (European Imperialism) এবং কলোনীকরণ (colonialism), যার ফলশ্রুতিতে ইউরোপিয়ান দেশ যেমন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, এবং রাশিয়া সময়ের সাথে সাথে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশ দখল করে নিয়েছিল এবং নিজেদের মধ্যে ভাগ করে কলোনী তৈরী করেছিল শাসনের সুবিধার্থে। আর তাই এই বুদ্ধিভিত্তিক অগ্রগতি যখন মুসলিমদের উপর সম্রাজ্যবাদ বিস্তারের সাথে সাথেই হচ্ছিল, তখন সেটি ইউরোপিয়ানদের আরো বেশী আগ্রহী করে তুলেছিল এক বিশেষ ধরনের ইসলাম গবেষনায়, যা কিনা ইউরোপিয়ানদের দৃষ্টিতে অনেক গুরুত্বপূর্ন একটি পড়াশোনার বিষয় ছিল। এই গবেষণার অন্তর্ভূক্ত ছিল ইসলামের ইতিহাস, বিশ্বাস, এবং তার শিক্ষা ও আইন-কানুন। এই মুভমেন্ট Orientalism নামে পরিচিত। কিন্তু, Orientalism-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল এই পুরো গবেষণাই হয়েছে ইসলাম সম্পর্কে ইউরোপিয়ানদের ধারণা এবং পড়াশোনার উপর ভিত্তি করে। ইসলামের ইতিহাসে এর আগে পর্যন্ত যত গবেষণা হয়েছিল, এবং নবী মুহাম্মাদের ﷺ সময় থেকে তখন পর্যন্ত বড় বড় মুসলিম চিন্তাবিদ যেসব কাজ করে গিয়েছিলেন, তার কিছুই Orientalism-এর আওতার মধ্যে ছিল না।

Orientalism-এর গবেষণার সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ ছিল কুরআনের ইতিহাস এবং তার origin নিয়ে পড়াশোনা। যেহেতু মুসলিম বিশ্বে এটি এককথায় সর্বস্বীকৃত যে ইহুদীদের তাওরাত (Torah) এবং খ্রিস্টানদের ইনজিল (New Testament) সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে, ইউরোপীয় গবেষকরাও খুব সহজেই এই ধারণায় চলে এসেছিলেন যে, এই একই ব্যাপার কুরআনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এবং এই prejudiced বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে তাদের সবধরনের গবেষণা চলত শুধুমাত্র একটি বিষয়কে প্রমাণ করবার জন্য, আর তা হল – কুরআন অপরিবর্তিত অবস্থায় নেই এবং অন্য ধর্মগ্রন্থগুলোর মতোই কুরআনকেও মানুষ পরিবর্তন করেছে ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা অনিচ্ছায়। এসব গবেষণা এমন সব কাজের জন্ম দিয়েছিল যার একটু গভীরে গেলেই দেখা যাবে যে সেগুলোর উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ, এবং নিচুস্তরের গবেষণার উপাদান ও পদ্ধতি অবলম্বন করে তাদের সেই উপসংহারসমূহ টানা হয়েছিল।

প্রিয় পাঠক, এই পর্যায়ে এসে দয়া করে ভেবে নেবেন না যে Orientalism-এর সম্পর্কে এসব কথা আমরা শুধু বলেই যাব আর আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা কিংবা প্রমাণ করবার চেষ্টা করব না। বরং এই লেখার বাকিটুকু জুড়েই থাকবে কুরআনের origin, একে সবখানে ছড়িয়ে দেওয়া (transmission), এবং এর সংকলন কিংবা compilation-এর সর্বজনস্বীকৃত এবং ইতিহাসবিদদের দ্বারা সঠিক হিসেবে গ্রহণ করা ইতিহাস – যা আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে কেন পৃথিবীর ১৭০ কোটি মুসলিম বিশ্বাস করে যে তাদের ঘরে থাকা কুরআন-এর copy-টি, কিংবা তাদের মুখস্ত করে রাখা কুরআন, কিংবা online-এ digitally সংরক্ষিত কুরআন মুহাম্মদ ﷺ-এর সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অপরিবর্তিত এবং এর একটি দাড়ি-কমাও (punctuation) এখনো পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়নি, আর কখনোই হওয়া সম্ভবও নয়।

রক্ষা করার অঙ্গীকার

প্রতিটি মুসলিম বিশ্বাস করেন যে আল্লাহ নিজেই কুর’আনকে সংরক্ষণ এবং অপরিবর্তিত অবস্থায় রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছেন। আর এই অঙ্গীকার আল্লাহ রেখে দিয়েছেন খোদ কুর’আনের অংশ হিসেবেই –

“কোনও সন্দেহ নেই আমিই কুর’আনকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছি, এবং নিঃসন্দেহে আমিই এর রক্ষাকারী।” [সূরা আল-হিজর, আয়াত ৯]

কুর’আনের অপরিবর্তিত থাকার ব্যাপারে সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে এবং নিশ্চিন্ত থাকতে মুসলিমদের জন্য এই আয়াতটি একাই যথেষ্ট, কারণ আল্লাহ নিজেই কুর’আন রক্ষা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অতএব, আগের পাঠানো আল্লাহর বাণীর সংকলনগুলো যেভাবে মানুষ বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত করতে করতে একটা সময়ে এসে প্রকৃত বাণী কী সেটাই হারিয়ে ফেলেছে, সেরকম কিছু কুর’আনের ক্ষেত্রে হবে না – এটাই আল্লাহর অঙ্গীকার। অবশ্য যারা কুর’আনের authenticity নিয়েই প্রশ্ন করেন, এবং যারা এখনো পর্যন্ত বিশ্বাস করেননা যে কুর’আন সৃষ্টিকর্তার বাণী, কিংবা যারা এই ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না যে কুর’আন সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকেই এসেছে কিনা, তাদের জন্য এই আয়াত মোটেই যথেষ্ট প্রমাণ হতে পারে না। আর তাই এখান থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের academic আলোচনা।

নবী’র ﷺ সাথীদের প্রতি বর্ণিত কুর’আন

কুর’আন পৃথিবীতে একসাথে পুরোটা নেমে আসেনি। ইতিহাসবিদদের ভাষায়, এটাকে কোনও একটা পৃথক ঘটনা হিসেবে অভিহিত করারও কোনো সুযোগ নেই। কুর’আনের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন সময়ে পৃথক পৃথক ঘটনার প্রেক্ষিতে নবী মুহাম্মাদ ﷺ–এর কাছে পাঠানো হতো ফেরেশতা জিবরীল(তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক)-এর মাধ্যমে। এটা হয়েছে তাঁর ২৩ বছরের মক্কা এবং মদিনার নবী-জীবনের পুরোটা জুড়েই, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। একদম প্রথম থেকেই নবী ﷺ তাঁর সাথীদের নিযুক্ত করেছিলেন কুর’আনের নতুন কোনও অংশ আসবার সাথে সাথেই যেন সেটি মুখস্ত করে ফেলা হয়, এবং একই সাথে লিখিত অবস্থায়ও রাখা হয়। নিযুক্ত কুর’আন লিপিবদ্ধকরীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মুয়াউইইয়া ইবন আবু সুফিয়ান এবং যাইদ বিন সাবিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নতুন আয়াত নাযিল হবার সাথে সাথেই সেগুলো মুখস্ত করে ফেলার সাথে সাথে লিখে ফেলা হতো পশুর হাড়, গাছের পাতা কিংবা বাকলে, কারণ চীন দেশ থেকে তখনও কাগজ আমদানী করা শুরু হয়নি। এখানে উল্লেখ্য যে মুহাম্মাদ ﷺ সবসময়ই কোনো আয়াত লিখবার সাথে সাথে সেটি তাঁর সামনেই লিপিবদ্ধকারীকে এবং অন্যান্য সাথীদেরকে আবার পড়ে শোনাতে বলতেন, যাতে এটা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা যায় যে লেখার সময় বাণীতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসেনি[১]।

নির্ভুলভাবে কুর’আন লিপিবদ্ধ হওয়া নিশ্চিত করতে মুহাম্মাদ ﷺ একই লিপিতে কুর’আনের সাথে অন্য কিছু সংরক্ষণ/লিখে রাখতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন – এমনকি তাঁর নিজের কথাও (হাদীস) নয়। কুর’আন লিখে রাখা হয়েছে এমন লিপিগুলোর সম্পর্কে বলতে গিয়ে মুহাম্মাদ ﷺ বলেন, “এবং যে ব্যাক্তি, সে যেই হোক, কুর’আনের বাণীর সাথে আমার কোনো কিছু (উদ্ধৃতি, কাহিনী, উপদেশ) লিখেছে, তার উচিত সেটা এখনই মুছে ফেলা।“[২] এটা করা হয়েছিল নিশ্চিত করতে যে কুর’আনের বাণীর সাথে অন্য কোনো শব্দ যাতে মিশে না যায় আর ভুলবশত কেউ যেন মনে না করে যে এটা সৃষ্টিকর্তার বাণীর অংশ।

এটা উপলব্ধি করা এবং মনে রাখা জরুরী যে কুর’আনের লিখিত লিপিবদ্ধকরণ কখনোই কুর’আন সংরক্ষণ করার প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়নি। সপ্তম শতাব্দীর আরব দেশগুলো ছিল একটি মৌখিক সংস্কৃতির সমাজ[৩] ব্যবস্থার অধীনে। আরবের খুব কম সংখ্যক মানুষ তখন লিখতে কিংবা পড়তে পারতো, তাই বড় বড় সব কবিতা, গানের কথা, চিঠি, এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন বার্তা সংরক্ষণ করে রাখার ক্ষেত্রে মুখস্ত করা কিংবা স্মৃতিতে ধারণ করে রাখা অনেক গুরুত্ব বহন করত। ইসলাম আসবার আগে থেকেই মক্কা ছিলো আরবী কাব্যের কেন্দ্রস্থল। সেখানে নিয়মিত বার্ষিক সাংস্কৃতিক উত্‍সব অনুষ্ঠিত হতো যার মাধ্যমে পুরো আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বড় বড় সব কবিদের মিলনমেলায় পরিণত হতো মক্কা নগরী। উচ্ছসিত দর্শক এবং ভক্তরা তাদের প্রিয় কবিদের আবৃত্তি করা কবিতা সেখানেই নির্ভুলভাবে মুখস্ত করে রাখতেন এবং সেগুলো বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ তাদের বিনোদনের খোরাক হয়ে থাকত।

অতএব, এই ধরণের একটি মৌখিক তথ্য সংরক্ষনের সমাজে বসবাস করে অভ্যস্ত হবার কারণে, নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর সাথীরা কুর’আনের বাণীগুলোকে মুখস্ত করে তাদের স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে রাখতেন। আর এটাই ছিলো তাদের কুর’আন সংরক্ষণ করার প্রধান মাধ্যম। তাদের বংশগত এবং স্বাভাবিক মনে রাখবার ক্ষমতার পাশাপাশি কুর’আনের ছন্দময় রচনাশৈলী কুর’আনের বাণীগুলোকে তাদের স্মৃতিতে নির্ভুলভাবে ধরে রাখা আরও অনেক বেশী সহজতর করে তুলেছিল। আজকাল অনেকেই মনে করেন কিভাবে মুখে মুখে সংরক্ষিত বাণী এত নির্ভরযোগ্য হতে পারে যেখানে মানুষের স্মৃতি কখনোই পুরোপুরি নির্ভরযোগ্যতা দেয় না? এটা ঠিক যে মানুষের স্মৃতিতে ধারণ করে রাখা তথ্য ব্যবহার করার সময়ে সেটি তার গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে, তবে এই সমস্যা অনেক বেশী পরিমাণ মানুষের স্মৃতিতে একসাথে সংরক্ষণের মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আমাদের আধুনিক যুগের ক্লাউড কম্পিউটিং (Cloud Computing) নামের এই সুবিশাল প্রযুক্তি এবং তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা ঠিক এভাবেই কাজ করে। এই প্রযুক্তিতে অনেকগুলো সস্তা এবং অনির্ভরযোগ্য কম্পিউটার একসাথে ব্যবহার করা হয়, যাতে করে ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলোর একটিতে কোনো সমস্যা হলে অন্য কোনো কম্পিউটার (node) সেই সমস্যা শুধরে নিতে পারে।

নবী মুহাম্মাদ ﷺ যে শুধুমাত্র তাঁর গুটিকয়েক হাতে গোনা সাথীদের মধ্যে কুর’আনের বাণীগুলো প্রচার করতেন কিংবা পড়ে শোনতেন তা নয়। বরং এটি সবার শোনার জন্যই উন্মুক্ত ছিলো। আর সে কারনেই শত শত, হাজার হাজার মক্কাবাসী কুর’আনের বাণীগুলো তাদের স্মৃতিতে ধারণ করে রাখতেন, যাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে মদীনায় ভ্রমণ করেন। এভাবেই, মহানবীর ﷺ জীবদ্দশায়ই কুর’আনের সূরা এবং আয়াতগুলো বেশ দ্রুত আরবের কোণে কোণে পৌছে যায়। যারা নবীর মুখ থেকে কুর’আনের বাণী উচ্চারিত হতে শুনেছেন তারা যে তা শুধু মুখস্ত করে রেখেছিলেন তাই নয়, তারা অনেক দূরবর্তী গোত্রগুলো ভ্রমণ করতেন এবং সেখানে মানুষদের মধ্যে কুর’আনের বাণীগুলো পৌছে দিতেন। সেই গোত্রবাসীরাও সেগুলো তাদের স্মৃতিতে নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করে রাখতেন এবং তাদের বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের কাছে কুর’আনের বাণী পৌছে দিতেন। এভাবে একটা সময়ে এসে কুর’আন আরববাসীদের মধ্যে, বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসী সবার কাছেই, ‘মুতাওয়াতির’-এর সম্মান অর্জন করে। ‘মুতাওয়াতির’ সম্মানটি তখনকার কাব্য-মুখরিত আরব সমাজের মধ্যে অনেক নামকরা একটি সম্মানের নাম। এই সম্মানের অর্থ হচ্ছে কোনো একটি কাব্য, কিংবা মুখস্ত করে রাখা কোনো সাহিত্য, এত বেশী গোত্রের এত বেশী সংখ্যক মানুষ স্মৃতিতে ধারণ করে রেখেছে যে কোনও একটি গোত্র কিংবা মানুষের সংঘের পক্ষে এই বাণীগুলোর মধ্যে সামান্যতম পরিবর্তন আনাও সম্ভব ছিলো না। কারণ কোনো ধরণের পরিবর্তন আসলেই সেটি অন্য কোনো মানুষ কিংবা অন্য কোনো গোত্র থেকে কেউ না কেউ বুঝতে পারবে যে, এখানে কোনো পরিবর্তন করা হচ্ছে। মুহাম্মাদ ﷺ-এর কিছু কিছু উক্তি সর্বজনস্বীকৃত (সকল নামকরা ইতিহাসবিদদের মধ্যে) হয়েছে ‘মুতাওয়াতির’ হওয়ার মাধ্যমে, আর এখানে আমরা দেখলাম পুরো কুরআনই সবাই ‘মুতাওয়াতির’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আর সেটি সম্ভব হয়েছে নবীর ﷺ জীবদ্দশায় সমগ্র কুরআন এত বিশাল এলাকাজুড়ে এত বেশী মানুষের স্মৃতিতে সংরক্ষণ করা হয়ে গিয়েছিল বলেই।

০০০

এই ধারাবাহিকের আগামী খন্ডের আলোচ্য বিষয়: (১) নবীর ﷺ মৃত্যুর পর কুর’আনের সংকলন এবং (২) উসমান-এর মুস’হাফ।

০০০

পাদটীকাসমূহ:

[১] আল-সুলি, আদাব আল-কুত্তাব

[২] সাহীহ মুসলিম, আল-যুহদ:৭২

[৩] What Was Special About Pre-Islamic Arabia

গ্রন্থপঞ্জি:

১. Al-Azami, M.M. The History of the Quranic Text: From Revelation to Compilation. Leicester: UK Islamic Academy, 2003. Print.

২. Ochsenwald, William, and Sydney Fisher. The Middle East: A History. 6th. New York: McGraw-Hill, 2003. Print.

মূল আর্টিকেল: How Do We Know the Quran is Unchanged?

অনুবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে: Power Pens by Lifestyle is Islam

Advertisements

4 thoughts on “ইতিহাস সংরক্ষণের বিজ্ঞান এবং অপরিবর্তিত কুর’আন – প্রথম খন্ড (অনুবাদ)

  1. পিংব্যাকঃ ইতিহাস সংরক্ষণের বিজ্ঞান এবং অপরিবর্তিত কুর’আন – দ্বিতীয় খন্ড (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ ইতিহাস সংরক্ষণের বিজ্ঞান এবং অপরিবর্তিত কুর’আন – তৃতীয় খন্ড (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ একজন মুসলিম ও একজন সংশয়বাদীর মধ্যে ইসলামের সত্যতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ যেসব কারণে কুরআন মানুষের সৃষ্টি হতে পারে না | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s