রমাদ়ান প্রস্তুতি (অনুবাদ)

coffe_and_dates

#১ — ভিন্ন কিছু করুন

রমাদ়ানে আমরা এমন অনেক কিছুই করি যা ঠিক নয়। এই যেমন বেশি খাওয়া-দাওয়া করা। তাড়াতাড়ি তারাউইহ সলাত (তারাবির নামায) শেষ করা। পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধবদের সাথে তাল মেলানোর জন্য এমনটা করে থাকি আমরা।

আসন্ন রমাদ়ানের জন্য আপনাদের প্রতি আমার প্রথম উপদেশ হচ্ছে, অন্যের চোখে আজিব কিংবা ভিন্ন হতে আমরা যেন ভয় না পাই।

রমাদ়ান হচ্ছে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সময়। আর এ জন্য প্রথম ধাপ হচ্ছে সবকিছুর উপরে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া।

ভিন্ন কিছু করুন। নজর দিন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে। খেয়াল রাখুন, আপনার এই রমাদ়ানটাও যেন গতানুগতিক অন্যান্য রমাদ়ানের মতো না হয়।

#২ — মাক়াসিদ বুঝুন

আমাদের প্রতিটা রমাদ়নই যে গতানুগতিকভাবে যায় তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, রমাদ়ান মাসে সিয়াম ও অন্যান্য ‘ইবাদাতের মূল মাক়াসিদ (লক্ষ্য, প্রজ্ঞা ও উদ্দেশ্য) আমরা বুঝতে পারি না।

রোজা রাখার মাধ্যমে আমাদের ঈমান রিচার্জ হবে, তাক়ওয়া (আল্লাহর ব্যাপরে সদা-সচেতনতা) বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক মজবুত হবে—এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। এ ব্যাপারগুলোকে যদি আমরা রমাদ়ানে আমাদের মূল লক্ষ্য বানাতে না পারি, তাহলে আরও একটি আচারসর্বস্ব রমাদ়ান অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। এবারের রমাদ়ানকে গেল বছরের রমাদ়ান থেকে ভিন্নতর করার জন্য আমাদের ‘ইবাদাতগুলোকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন আমরা এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারি।

লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য যা যা করা দরকার:

ক. পাপাচার ও যেসব কাজ আমাদের সময় নষ্ট করে সেগুলো থেকেও সিয়াম পালন করা। কারণ সিয়াম মানেই বিরত থাকা।

খ. যথাযথ মনোযোগ দিয়ে বুঝে বুঝে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রেখে তারাউইহ ও তাহাজ্জুদ সলাতগুলো আদায় করা।

গ. বুঝে বুঝে, চিন্তাভাবনা করে ক়ুর’আন আবৃত্তি করা। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক জোরদার করার সুযোগ হিসেবে একে ব্যবহার করা।

#৩ — লক্ষ্য নির্ধারণ করুন… এখনি!

আত্ম-উন্নয়নের কোনো পরিকল্পনা ছাড়া রমাদ়ান কাটানোর মানে হচ্ছে বলার মতো কোনো পরিবর্তন ছাড়াই রমাদ়ান মাস পার করা। কাজেই এ মাসের জন্য এক্ষুনি আপনার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নির্ধারণ করুন।

লক্ষ্যগুলো হতে হবে এমন যাতে এগুলো আপনার আত্মিক উন্নয়ন ঘটায়। আপনার জীবনে স্থায়ী কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসে। শুধু রমাদ়ানে দাড়ি বড় করব, কিংবা হিজাব (পরিপূর্ণ পর্দা) করব, আর চান রাত থেকেই তা ছেড়ে দেব—এগুলো মোটেই কোনো ভালো লক্ষ্য না। নিজেদের স্থায়ী উন্নয়নের জন্য আমরা যে লক্ষ্যই নির্ধারণ করি না কেন, সে ব্যাপারে আমাদের সৎ হতে হবে। মনের মধ্যে এমন কোনো মন্ত্রণা রাখা চলবে না যে, আমরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাব।

রমাদ়ানে যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা যায় সে ব্যাপারে কিছু আইডিয়া:

ক. ছাড়তে সমস্যা হচ্ছে এমন কোনো বদঅভ্যাস ছেড়ে দিন।

খ. অবহেলা করছেন এমন কোনো [ধর্মীয়] বাধ্যবাধকতা পালন শুরু করুন।

গ. আপনার প্রতিদিনের ফার্দ় (ফরয বা অবশ্যকরণীয়) ‘ইবাদাতে মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) কিছু ‘ইবাদাতের ধরন যোগ করুন।

ঘ. নির্দিষ্ট কোনো বই পড়া শেষ করুন, বা কোনো কোর্স (যেমন: তাফসীর কোর্স) শেষ করুন।

ঙ. ইসলামের যে বিষয়ে আপনার জানার ঘাটতি আছে সে ব্যাপারে আপনার পড়াশোনা বাড়ান।

কোথায় আমাদের উন্নতি দরকার সেটা আমাদের চেয়ে ভালো আর কে জানে? নিজের সাথে সৎ থাকুন। এমন কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করুন যেটা পূরণ করলে তাক়ওয়ার উচ্চ পর্যায়ে থেকে আপনি আপনার রমাদ়ান শেষ করতে পারবেন।

#৪ — পাপ থেকে সিয়াম পালন করুন

নাবি মুহাম্মাদ (তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও এ ধরনের কাজ ছাড়তে পারে না, এ ধরনের লোকের খাবার ও পানীয় পরিত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” [আল-বুখারি]

জানি না কী কারণে আমরা এটা মনে করি যে, সিয়াম পালনের মূল উদ্দেশ্য তাক়ওয়া অর্জনের জন্য কেবল খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকলেই চলবে। পাপ কাজগুলো ছাড়ার দরকার নেই।

অথচ পানাহার থেকে বিরত থাকার এই কাজটি আমাদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন এক ট্রেনিং হওয়ার কথা ছিল যে-ট্রেনিং আমাদেরকে পাপ কাজে প্রলুব্ধ হওয়া থেকে বিরত রাখতে শেখাবে।

রমাদ়ানে সচরাচর যেসব পাপ কাজগুলো দেখা যায়:

ক. সিগারেট ইফতার — সিগারেট খেয়ে ইফতার শুরু করা সিয়াম পালনের মূল উদ্দেশ্যের উপর অশ্রদ্ধা দেখানোর নামান্তর।

খ. সময় কাটানোর জন্য পরনিন্দা ও গুজব করে বেড়ানো।

গ. ইফতারের সময় যেন তাড়াতাড়ি আসে সেজন্য সলাতের সময়টা ঘুমিয়ে কাটানো। (ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ পূর্ণ করার জন্য দ্বিতীয় স্তম্ভ ছেড়ে দেওয়ার কোনো মানেই হয় না।)

ঘ. রোজা রাখছি বলে মেজাজ চড়ে ওঠা। (এটা কোনো বৈধ অজুহাত না)

ঙ. সময় পার করার জন্য অতিরিক্ত টিভি দেখা।

এবারের রমাদ়ান থেকে নিজেকে বদলে ফেলুন। শুধু না খেয়ে উপবাস থাকা নয়, বিরত থাকুন পাপ কাজ থেকেও।

#৫ — সেহরির সময় হালকা খাবার খান

সেহরি খাওয়ার বেলায় দুটো প্রান্তিক প্রবণতা দেখা যায়: একদল অতিরিক্ত খানাপিনা করেন, আরকেদল সেহরি খাওয়াই বাদ দিয়ে দেন।

অতিভোজন সিয়ামের কিছু বারাকাহ (বরকত) ও উপকারকে হটিয়ে দেয়। ব্যাপারটা অনেকটা ধর্মীয় স্যান্ডউইচের মতো হয়ে পড়ে। দু’বেলা পেট পুরে খাওয়া, মাঝে একটু উপোস থাকা।

সেহরির সময়টা সারাদিনের মধ্যে অন্যতম বারাকাহপূর্ণ সময়। যারা একেবারেই সেহরি করেন না, তারা কিন্তু এই বারাকাহটা হারাচ্ছেন। এটা এমন একটা সময় যখন দু‘আ কবুল হয়। তো কেন শুধু শুধু এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া করবেন?

নাবি (তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক) বলেছেন, “নিঃসন্দেহে এটা (সেহরি) এমন এক বারাকাহ যেটা আল্লাহ তোমাদের দিয়েছেন। কাজেই একে ছেড়ে দিয়ো না।” (আন-নাসা’ই)

একটা আদর্শ সেহরির নমুনা হচ্ছে: নাস্তা ও ‘ইবাদাত। শক্তি যোগাবে এমন পুষ্টিকর খাবার, সাথে থাকবে কিছু পরিমাণ ক়ুর’আন আবৃত্তি, ক়ুর’আনের অর্থ নিয়ে ভাবনাচিন্তা, দু‘আ অথবা ক়িয়াম আল-লাইল (রাতের সলাত); আর সবশেষে ফাজ্‌রের সলাত।

এমনটা যদি করতে পারি তাহলে আমাদের প্রতিটা সকাল হবে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। অতীতের যে দিনগুলোতে আমরা বেশি খেয়ে এসেছি বা একেবারেই খাইনি, তার চেয়ে একদম অন্যরকম।

#৬ — হালকা ইফতার

সূর্যাস্তের পরে সিয়াম ভাঙার ব্যাপারটা আমাদের জন্য এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হওয়ার কথা। মাসজিদে কিংবা পরিবারের সাথে বসে দু‘আ করতে করতে আযানের জন্য অপেক্ষা, এরপর কিছু খেজুর ও যামযামের (যমযমের) পানি দিয়ে ইফতার, তারপর সলাত আদায় খুবই চমৎকার এক সময়।

কিন্তু অধিকাংশ ঘরেই দেখা যায় ইফতারের সময়টা যেন অসংযমের সময়। হরেক পদের খাবার দিয়ে যেন লাঞ্চের অভাব পূরণ করা হচ্ছে। সাথে রয়েছে অযথা গল্প-গুজব, মাগরিব সলাত পড়তে দেরি করা, কখনো বা ছেড়েই দেওয়া। এসব কাজ সারাদিন সিয়াম পালনের পুরো উদ্দেশ্যকেই নষ্ট করে ফেলে।

নিচের কাজগুলোর মাধ্যমে আপনি আপনার রমাদ়ান ও ইফতারকে ভিন্ন মাত্রা দিতে পারেন:

ক. আযানের জন্য যে সময়টা অপেক্ষা করছেন সে সময়টা ক়ুর’আন আবৃত্তি, পারিবারিক হালাক়া (ইসলামিক আলোচনা) অথবা দু‘আ করে কাটাতে পারেন।

খ. হালকা ইফতার করে মাগরিবের সলাত আদায়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

গ. মাগরিবের সলাতের পর পরিমিত মাত্রায় খাওয়াদাওয়া করা। এর ফলে তারাউইহর সময়টায় আপনি অলস হবেন না, কিংবা ঢেকুর তুলতে তুলতে পার করবেন না।

সঠিকভাবে ইফতার করাটা আমাদের সত্যিই সাহায্য করে রমাদ়ান মাসের আধ্যাত্মিক বারাকাহ অনুভব করতে।

#৭ — ক়ুর’আনের বার্তার দিকে মনোযোগ দিন

আমাদের উপমহাদেশের একটা কালচারাল প্র্যাকটিস হচ্ছে রমাদ়ানে যত পারো ক়ুর’আন খতম করো—কিছু না বুঝেই। খতম দেওয়ার উদ্দেশ্যে এ ধরনের অতিদ্রুত ক়ুর’আন পাঠকে এমন এক ধর্মীয় প্রথায় পরিণত করা হয়েছে যেটা কিনা ক়ুর’আনের মূল উদ্দেশ্যেরই বিপরীত।

এ বছরে ক়ুর’আন পাঠের গতি কমান, যতটুকুই তিলাওয়াত করুন না কেন বুঝে তিলাওয়াত করুন। কী পড়লেন সেটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করুন। আপনার দৈনন্দিন জীবনে ক়ুর’আনের অর্থ প্রয়োগ করুন। দেখবেন জীবন পাল্টে যাবে।

এবারের রমাদ়ানে নিচের যেকোনো একটা পদ্ধতি অনুসরণ করার চেষ্টা করুন:

ক. অনুবাদসহ প্রতিদিন ক়ুর’আনের একটি করে জুয (পারা) শেষ করুন।

খ. কোনো একটা তাফসীরের বই পুরোটা শেষ করুন।

গ. প্রতিদিন অনলাইনে কিংবা অভিজ্ঞ কারও কাছে যেয়ে কোনো তাফসীর সিরিজ শেষ করুন।

ঘ. প্রতিদিন ক়ুর’আনের যে আয়াতগুলো তিলাওয়াত করা হলো সেটা ও তার প্রয়োগ নিয়ে পরিবারের সাথে আলোচনা করুন।

“রমাদ়ান মাসে ক়ুর’আন অবতীর্ণ করা হয়েছে মানবজাতির দিকনির্দেশনা হিসেবে…” (সূরাহ আল-বাক়ারাহ, ২:১৮৫)

কাজেই শুধু বারাকাহ লাভের জন্য নয়, ক়ুর’আন পড়ুন নিজের জীবনে তার বাস্তব প্রতিফলনের জন্য।

#৮ — যথাযথভাবে তারাউঈহ (তারাবি) পড়ুন

অধিকাংশ দেশেই বর্তমানে তারাউঈহকে যে পর্যায়ে নামানো হয়েছে:

ক. সলাতে খুশূ ছাড়া কিছু না-বুঝেই অতিদ্রুত কোনোমতে শেষ করা।

খ. পুরো রমাদ়ান জুড়ে তারাউইহ ৮ না ২০ সেটা নিয়ে বিতর্ক করা।

গ. তারউইহর নাম করে বের হয়ে মাসজিদের বাইরে সময় পার করা এবং ধূমপান, গাল-গল্প করে সময় কাটানো।

উপরের প্রতিটা পরিস্থিতিতেই তারাউঈহ সলাতের মূল উদ্দেশ্য বিনষ্ট হয়। ফলাফল: তারাউঈহ থেকে কোনো কল্যাণ না নিয়েই শূন্য হাতে বাড়ি ফেরা।

এ বছরের তারাউঈহকে আরও কল্যাণকর করার জন্য কিছু টিপস:

ক. তারাউঈহ পড়ার জন্য সেরা মাসজিদ বেছে নিন। যদি ভালো কোনো মাসজিদ না থাকে তাহলে বাসায় পড়ুন, অথবা বন্ধুদের সাথে একত্রে পড়ুন।

খ. প্রতিদিন তারাউঈহতে যে আয়াতগুলো পড়া হবে আগে থেকেই সেই আয়াতগুলোর অনুবাদ পড়ে নিন।

গ. রাকা‘আত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে চলুন। নজর দিন আপনার সলাতের মান ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক জোরদার করার দিকে।

ঘ. সলাতের মধ্যে যদি দেখেন যে আপনার মনোযোগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তাহলে যে আয়াতগুলো তিলাওয়াত করা হচ্ছে সেগুলোর অর্থের দিকে খেয়াল করুন, এই আয়াতগুলো থেকে আপনি কী শিক্ষা নিতে পারেন এবং কীভাবে নিজের জীবনে সেগুলো প্রয়োগ করতে পারেন সেদিকে মনোনিবেশ করুন।

একটা ব্যাপার মনে রাখবেন, কত রাক‘আত পড়লেন তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্ক কতটা মজবুত হলো এবং এ থেকে আপনি কতটা কল্যাণ নিতে পারলেন।

Islamic Online University-এর হেডটিউটোরিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট Abu Muawiyah Ismail Kamdar-এর ফেসবুক পেইজ থেকে সংগৃহীত ও অনুদিত।  

 

Advertisements

1 thought on “রমাদ়ান প্রস্তুতি (অনুবাদ)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close