ধর্মীয় মতপার্থক্যমূলক বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশের পাঁচ গোল্ডেন রুল (অনুবাদ)

books-in-library

মির্যা ইয়াওয়ার বেগ-এর একটি লেখা থেকে অনুদিত

মতপার্থক্য বলতে কোনো বিষয়ের প্রতি কারও আগ্রহ বা নিবেদনকে বোঝায়। নির্বুদ্ধিতা কিংবা অজ্ঞতাকে নয়। কেবল আগ্রহী ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিরাই ভিন্নমত পোষণ করে।

পৃথিবীতে সম্ভবত মুসলিমরাই একমাত্র জাতি যারা ধর্মীয় বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মতপার্থক্য পোষণ করে। আমি নিশ্চিত আমার এই কথাটার সাথেও হয়তো কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করছেন।

সবচেয়ে ইতিবাচকভাবে মতপার্থক্যগুলো পোষণ করার ব্যাপারে আমাদেরই সবচেয়ে অভিজ্ঞ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা একেবারেই উলটো। যেভাবে আমরা আমাদের ভিন্নমতগুলো ব্যক্ত করি তাতে করে আমাদের হৃদয় ভেঙে যায়, পরস্পরের প্রতি রাগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আমরা অন্যকে অপমানিত করি, উস্কে দিই। বিনিময়ে আমরা আরও খারাপভাবে প্রতিউত্তর পাই।

তো এখানে আমরা দেখার চেষ্টা করব, কীভাবে ইতিবাচকভাবে আমরা আমাদের ভিন্নমতগুলো তুলে ধরতে পারি। 

পাঁচ গোল্ডেন রুল

১. আমার উপরের উদ্ধৃতিটি আবার বলছি: মতপার্থক্য বলতে কোনো বিষয়ের প্রতি কারও আগ্রহ বা নিবেদনকে বোঝায়। নির্বুদ্ধিতা কিংবা অজ্ঞতাকে নয়। কেবল আগ্রহী ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিরাই ভিন্নমত পোষণ করে।

কাজেই আপনি যদি ভিন্নমত পোষণ করতে চান, তাহলে বিষয়টির প্রতি প্রথমে অন্য ব্যক্তির আগ্রহ ও নিবেদনের সমাদর করুন। এভাবে শুরু করুন, “বিষয়টির প্রতি আপনার আগ্রহের জন্য আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক। আমরা যেন এমন কিছু করতে সমর্থ হই, যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন।”

২. সবসময় মনে রাখুন, যে বিষয়গুলো কুর’আন ও সুন্নাহতে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া নেই, সেসব বিষয়ে নিজের মতকেই একমাত্র সঠিক মত বলাটা ঠিক না। কারণ, না আপনি ওয়াহয়ি (ওহি) পাচ্ছেন, না তিনি। কাজেই এমনভাবে কথা বলবেন না যেন আপনি ওয়াহয়ি পাচ্ছেন। আপনি আপনার বুঝ অনুযায়ী কোনো মত দিয়েছেন। অপর ব্যক্তিও তার বুঝ অনুযায়ী কোনো মত দিয়েছে। আপনারা দুজনই সাধারণ মানুষ; কোনো নাবি (নবী) নন। এটা সবসময় মনে রাখুন।

আরও মনে রাখুন ফাকীহদের মূলনীতি: আমি মনে করি আমার অভিমত সঠিক, তবে এটা ভুল হওয়ারও আশঙ্কা আছে। এবং আমি মনে করি অন্য অভিমতটি ভুল, তবে সেটা সঠিক হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।

আল্লাহর ক্রোধ ও আমাদের উদ্ধতা থেকে নিরাপদ থাকার জন্য বিনয় ও নম্রতা হচ্ছে নিরাপত্তা-জাল।

৩. অন্য কোনো অভিমতকে আপনি ভুল মনে করলেও তার সমালোচনা করবেন না। যিনি সেই অভিমত দিয়েছেন, হতে পারে এটা তার বোঝার ভুল, কিংবা বিষয়টার বিশেষ কোনো দিকে তার হয়তো মনযোগের ঘাটতি ছিল। এটা এমন কোনো খারাপ কিছু না যাতে মনে হতে পারে যে, শয়তান ইসলাম ধ্বংসের পায়তারা করছে।

কাজেই আপনার সেই ভাইয়ের জন্য আপনি নিজেই অজুহাত দাঁড় করান। রাসূলুল্লাহও (সা.) তাই করেছিলেন। তিনি সমালোচনা করেননি। উপদেশ দিয়েছেন। ফালতু, বোকা, মাথামোটা সংকীর্ণমনা এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করবেন না। কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করবেন না। কারণ এতে করে আপনি তার চোখে এমনভাবে উপস্থাপিত হবেন যে, আপনি তাকে যা বলতে চাচ্ছেন সেটা বলার সব সম্ভাবনা তখন ভণ্ডুল হয়ে যাবে।

৪. কোনো বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত প্রমাণসহ, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করুন।

অন্য মতটি কে দিল, বা সে মতটিও আপনার উল্লেখ করার দরকার নেই। যে চায় সে প্রয়োজন মনে করলে নিজেই দেখে নেবে অন্য মতটা কী বা কার। আপনি এখানে কারও সাথে নিজেকে তুলনা করতে নামছেন না। বা এটাও প্রমাণ করতে নামছেন না যে, আপনি কার থেকে কত স্মার্ট। কাজেই আপনি কেবল আপনার অভিমতটাই তুলে ধরুন।

নিজের ইখলাস ও নিয়্যাতকে আগলে রাখুন। ভয় করুন আল্লাহর অসন্তুষ্টিকে। পাছে তিনি যদি আপনার এই কাজকে অহংকার হিসেবে বিবেচনা করেন তাহলেই সেরেছে!

রাসূলুল্লাহর (সা.) সেই হাদীসটা স্মরণ করুন, যেখানে তিনি বলেছেন যে, যে লোক তার অন্য মুসলিম ভাইয়ের সম্মানে হানা দেয়, অপমান করে, বিচারদিনে আল্লাহ তাকে অপদস্থ করবেন।  কাজেই আপনি যখন কোনো অভিমত দেবেন তখন এমনভাবে সেটা দিন যাতে কোনোভাবেই মনে না হয় যে আপনি কাউকে অপমান কিংবা অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে এগুলো বলছেন।

৫. সবশেষে অপর লোকটিকে তার অভিমত ও আগ্রহের জন্য ধন্যবাদ দিন। পরিশেষে আপনার শ্রোতাদের মনে করিয়ে দিন যে, কেবল আল্লাহই ভালো জানেন। এবং আমরা সবাই-ই মূলত তাঁকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে চলেছি অবিরত।

এই নিয়ম-না-মানা কেউ যদি এখন আপনার মত কিংবা আপনার বিরোধিতা করে, তাহলে কী করবেন? কিছুই না। কিছু বলবেনও না, করবেনও না। যারা অসম্মান করে তাদের পাত্তা দেবেন না। এটাই তাদের প্রাপ্য। তাদের এড়িয়ে যান।

আশা করি যারা কষ্ট করে লেখাটা পড়েছেন, লেখাটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছেন এবং এরই মধ্যে যাদের মনে দুএকটা ভিন্নমত মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তাদের সবার জন্য এই গোল্ডেন রুলগুলো কাজে দেবে।

ভিন্নমত প্রদানের অবকাশ আছে এমন বিষয়ে ভিন্নমতগুলো যদি মুসলিমদের মধ্যে ভাঙনের সৃষ্টি করে, তাহলে সেটা শয়তানের কাজ। এই উদ্দেশ্য সাধনে আমরা যেন শয়তানকে কোনোভাবেই সাহায্য না করি।

মূল লেখার লিংক: http://muslimmatters.org/2014/07/04/ramadans-5-golden-rules-of-difference-of-opinion/  

Advertisements

5 thoughts on “ধর্মীয় মতপার্থক্যমূলক বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশের পাঁচ গোল্ডেন রুল (অনুবাদ)

  1. পিংব্যাকঃ মাজহাবী-সালাফী দ্বন্দ্ব: উভয় পক্ষের পক্ষে ও বিপক্ষে যত কথা | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ কেন আমি সালাফি হয়েছিলাম, কেনইবা আবার হানাফি হলাম | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ আহলে হাদিস ও হানাফিদের মধ্যেকার মনোমালিন্য: আমি যা দেখেছি এবং যেমনটি দেখে যেতে চাই | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s