সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৪৭-৪৯): আমলনামায় সবই লেখা হচ্ছে

sunset

সূরা কাহফ থেকে পাওয়া কিছু দিকনির্দেশনার ওপর ধারাবাহিক আলোচনার উনিষতম কিস্তি   

৪৭ – যেদিন আমি পাহাড়সমূহকে চলমান করে (সরিয়ে) দেব এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে (তা) একটি শূন্য প্রান্তর, (সেদিন) আমি তাদের (মানবকূল)-কে এক জায়গায় জড়ো করব। তাদের কোনো একজনকেও আমি বাদ দেব না।

৪৮ – তাদের (সবাই)-কে তোমার মালিকের সামনে সারিবদ্ধভাবে এনে হাজির করা হবে। (অতপর আমি বলব, আজ তো) তোমরা সবাই আমার কাছে এসে গেছ (ঠিক) যেমনি করে আমি তোমাদের প্রথমবার পয়দা করেছিলাম, কিন্তু তোমরা (অনেকেই) মনে করতে, আমি তোমাদের (দ্বিতীয় বার আমার সামনে হাজির করার) জন্যে কোনো সময়(সূচী) নির্ধারণ করে রাখিনি!

৪৯ – (অতপর তাদের সামনে) আমলনামা রাখা হবে, (তখন) নাফরমান ব্যক্তিদের তুমি দেখবে, সে আমলনামায় যা কিছু লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তারা (খুবই) আতংকগ্রস্ত থাকবে। তারা বলতে থাকবে, হায় দুর্ভাগ্য আমাদের, এ (আবার) কেমন গ্রন্থ! এ তো (দেখছি আমাদের জীবনের) ছোট কিংবা বড় প্রত্যেক বিষয়েরই হিসাব রেখেছে। তারা যা কিছু করেছে তার প্রতিটি বস্তুই তারা (সে গ্রন্থে) মজুদ দেখবে। তোমার মালিক (সেদিন) কারো ওপর বিন্দুমাত্র যুলুমও করবেন না।

ধরুন, আপনি একটি বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। যেভাবেই হোক, আপনারই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক মহিলা কর্মকর্তার কিছু ব্যক্তিগত ছবি ইমেইলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিগুলো আপনার অফিসিয়াল মেইলের ইনবক্সেও চলে এসেছে। আপনি কোনো কিছু চিন্তা না করে আপনার কিছু সহকর্মীকে ইমেইলটি ফরোয়ার্ড করে দিলেন। এভাবে করে পুরো অফিসে ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়ল। একসময় বিষয়টি সেই মহিলা কর্মকর্তার কানে গিয়ে পৌঁছল। তিনি প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ বিভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি অভিযোগ দাখিল করলেন।

এর প্রায় সপ্তাহ খানেক পরের ঘটনা। একদিন সকাল দশটার দিকে মানব সম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা আপনাকে ফোন করলেন। তখনই তার সাথে দেখা করতে হবে। আপনি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলেন। আপনাকে একটি মিটিং রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাটি আপনার হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিলেন। এতে বলে হয়েছে যে আপনি প্রতিষ্ঠানের আচরণ বিধি লঙ্ঘন করেছেন। প্রথমবার বলে আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হলো, এরপর এরকম হলে বিনা নোটিশে আপনাকে সরাসরি বরখাস্ত করা হবে। এই মুচলেকায় সই না করে আপনার কোনো উপায় ছিলো না। আপনি যে ইমেইলটি ফরোয়ার্ড করেছিলেন তার একটি স্ক্রিনশট (অর্থাৎ প্রমাণ) আপনাকে দেখিয়ে আপনার চাকরির ফাইলে স্থায়ীভাবে রেখে দেওয়া হলো।

আমাদের জীবনটা অনেকটা এই ঘটনার মতোই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ভালো ও মন্দ পার্থক্য করতে পারার ক্ষমতা দিয়ে আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। পাশাপাশি, ভালো ও মন্দ কী তা সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি তাঁর প্রেরিত রাসুলের মাধ্যমে আমাদের জন্য কিতাব নাযিল করেছেন। এই কিতাব, অর্থাৎ কুরআন হলো আমাদের ‘আচরণ বিধি’। আমরা এই ‘আচরণ বিধি’ ঠিকঠাকভাবে মেনে চলছি কি না তা দেখার জন্য তিনি আমাদের সবার কাছে লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতা পাঠিয়েছেন। এই ফেরেশতারা প্রতিনিয়ত আমাদের প্রতিটি কথা ও কাজের ‘স্ক্রিনশট’ নিয়ে যাচ্ছেন। এই ‘স্ক্রিনশটগুলো’ আমাদের আমলনামার ‘ফাইলে’ জমা হচ্ছে।

যে কোনো সময়ে আমাদের ডাক চলে আসতে পারে। হাশরের ময়দানের ‘মিটিং রুমে’ আমাদেরকে হাজির হতে হবে। সেখানে স্বয়ং আল্লাহ আমাদের প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব নেবেন। তখন আর পালাবার কোনো উপায় থাকবে না। আমাদের আমলনামার ‘ফাইলটি’ খোলা হবে। লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাদের নেওয়া প্রতিটি ‘স্ক্রিনশট’ (বা ছবি) আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। আমাদের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণগুলো এত শক্ত হবে যে “আমি তো এই কথাটি বলিনি” বা “আমি তো এই কাজটি করিনি” বলার কোনো উপায় থাকবে না।

সেই দিনে আল্লাহ তাঁর চুড়ান্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করবেন। কারও প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না। প্রত্যেকেই তাদের কৃতকর্মের ফল পাবে। আমাদের আমলনামার কোনো কোনো ‘স্ক্রিনশট’ এতই কঠিন হবে যে আল্লাহ চাইলে শুধুমাত্র এর জন্যই আমাদেরকে পাকড়াও করে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু সেই দিনে তিনি তাঁর অসীম দয়ারও প্রকাশ ঘটাবেন। আমাদের অনেককেই তিনি মাফ করে দেবেন। আমাদের আন্তরিক তওবার কারণে আমাদের অনেক খারাপ ‘স্ক্রিনশট’ তিনি ‘ডিলিট’ করে দেবেন (অর্থাৎ মুছে দেবেন)। সেদিন তাঁর দয়া ছাড়া কেউই জান্নাতে যেতে পারবে না।

তবে “আল্লাহ আমার প্রতি দয়া করবেন” এই আশা নিয়ে বসে থেকে যা খুশি তা করলে চলবে না। মনে রাখতে হবে যে, আমাদের আমলনামায় সবই জমা হচ্ছে। “আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দেবেনই” – এই নিশ্চয়তা যেহেতু আমরা কেউই পাইনি তাই আমাদের উচিৎ হবে সঠিভাবে ঈমান এনে আমাদের আমলনামার ‘স্ক্রিনশটগুলোকে’ যথাসম্ভব পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য চেষ্টা করে যাওয়া। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই উপলব্ধিটুকু দান করুন এবং সেই মোতাবেক আমাদের গোটা জীবনটাকে সাজানোর তৌফিক দিন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s