সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৫০-৫১): আপনার আসল শত্রুকে চিনে নিন

Dark_Moon_Max_Frear_2008

সূরা কাহফ থেকে পাওয়া কিছু দিকনির্দেশনার ওপর ধারাবাহিক আলোচনার বিশতম কিস্তি 

৫০ – সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম, আদমের সামনে সিজদা কর। তখন সকলেই সিজদা করল – এক ইবলীস ছাড়া। সে ছিল জিনদের একজন। সে তার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল। তারপরও কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে ও তার বংশধরদেরকে নিজেদের অভিভাবক বানাচ্ছ, অথচ তারা তোমাদের শত্রু? (এটা) কতই না নিকৃষ্ট পরিবর্তন, যা জালেমগণ লাভ করেছে।

৫১- আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকালেও তাদেরকে হাজির করিনি আর খোদ তাদেরকে সৃষ্টি করার সময়ও না। আমি এমন নই যে, পথভ্রষ্টকারীদেরকে নিজের সহযোগী বানাব।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর সৃষ্টিজগতের মধ্যে কাউকে বোধশক্তি দিয়েছেন, আবার কাউকে দেননি। মাটি, পানি, বাতাস এবং যাবতীয় জড় পদার্থ এই প্রথম প্রকার সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। তারা প্রতিনিয়ত আল্লাহর গুণকীর্তন করে চলেছে, যদিও আমরা তা বুঝতে পারছি না। অন্যদিকে, মানুষ, জিন, ফেরেশতা ও যাবতীয় প্রাণী দ্বিতীয় প্রকার সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। এদের মধ্যে মানুষ ও প্রাণীকূলকে আমরা দেখতে পাই, কিন্তু জিন ও ফেরেশতাদেরকে আমরা দেখতে পাই না।

এদিকে, প্রতিটি প্রাণীকে তার জীবনধারণের জন্য যা যা দরকার তা দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে। জীবনধারণের জন্য যতটুকু বোধশক্তি দরকার তাও তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। এরা জন্মগ্রহণ করছে, বেড়ে উঠছে, বংশবৃদ্ধি করছে এবং অবশেষে মারা যাচ্ছে। এরাও নিজেদের মতো করে আল্লাহর গুণকীর্তন করে চলেছে। কিন্তু এদেরকে কোনো বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়নি। তাই এদের কোনো জবাবদিহিতাও নেই। এদের কোনো হিসাব নেই। এদের কোনো জান্নাত বা জাহান্নাম নেই।

ফেরেশতাদেরও কোনো জান্নাত বা জাহান্নাম নেই। তাঁরা আল্লাহর বিশেষ এক সৃষ্টি। তাঁদের প্রত্যেকেই বিশেষ বিশেষ কাজে নিয়োজিত আছেন। তাঁরা কখনোই আল্লাহর অবাধ্য হন না। যেহেতু সৃষ্টিগতভাবে তাঁরা সবসময় আল্লাহর বাধ্য, তাই তাঁদের কোনো হিসাব বা জবাবদিহিতা নেই।

অন্যদিকে, মানুষ ও জিনকে আল্লাহর বাধ্য বা অবাধ্য হওয়ার স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমাদের সামনে এখন দু’টি রাস্তা খোলা আছে। আমরা যদি আমাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যকে ভুলে গিয়ে আমাদের জীবনটাকে কেবলমাত্র জীবিকা অর্জন, খাওয়া-দাওয়া, বংশ বিস্তার আর আমোদ-ফুর্তির পিছনে কাটিয়ে দেই তাহলে একটি পশুর সাথে আমাদের পার্থক্য কোথায়? আর আমরা যদি নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে এগুলোর পিছনে লেগে থাকি তাহলে আমরা নিজেদেরকে পশুর চাইতেও নিচে নামিয়ে আনলাম, কেননা কোনো হিংস্র পশুও খিদে না পেলে বা আক্রান্ত হওয়ার আশংকা না করলে কাউকে আক্রমণ করে না। আর আমরা যদি আমাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যকে ভুলে না গিয়ে থাকি তাহলে আমাদের জীবন হবে আল্লাহকে ভালোবেসে, তাঁকে ভয় করে, তাঁরই ওপর ভরসা করে তাঁর বাধ্য হয়ে চলা বান্দার জীবন। তখন আমাদের স্বভাব হবে ফেরেশতাদের মতো। কিন্তু, যেহেতু আমরা আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার সুযোগ থাকার পরেও স্বেচ্ছায় তাঁকে মেনে চলেছি, তাই আমাদের জন্য থাকছে মহা প্রতিদান। আমাদের জন্য থাকছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর পুরস্কার হিসেবে থাকছে জান্নাত।

কিন্তু আল্লাহকে পাওয়ার এই রাস্তায় আমাদের জন্য কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে আমাদের মতোই আল্লাহর বাধ্য বা অবাধ্য হওয়ার স্বাধীনতাপ্রাপ্ত আরেক সৃষ্টি, যার নাম হলো জিন। এদের মধ্যে কেউ আল্লাহর বাধ্য, কেউ আবার আল্লাহর অবাধ্য। ইবলীস বা শয়তান এই জিন জাতিরই অন্তর্ভুক্ত। মানবজাতির আদি পিতা আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টির পর আল্লাহ তাঁকে জ্ঞান ও মর্যাদা দিয়ে বিশেষভাবে সম্মানিত করলেন। ফেরেশতা ও জিন জাতিকে মানবজাতির আগেই সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের ওপর আদমের শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। ফেরেশতারা আল্লাহর এই আদেশ মেনে নিলেন। কিন্তু ইবলীস বেঁকে বসল। অহংকার তাকে পেয়ে বসল। সে তার ওপর আদমের শ্রেষ্ঠত্বকে মেনে নিতে অস্বীকার করল। সেই থেকে ইবলীস ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা মানুষের চিরশত্রু বনে গেল।

আল্লাহর অবাধ্য হয়ে ইবলীস তার নিজের ‘লেজ তো কাটলই’, সেই সাথে মানুষের ‘লেজ কাটার’ জন্যও সে ও তার সাগরেদরা উঠেপড়ে লাগল। আমাদের ‘লেজ কাটলেই’ সে খুশি। আর আমরা আল্লাহর বাধ্য হয়ে চললে সে অখুশি। সে প্রতিনিয়ত আমাদেরকে ফুসলানোর জন্য ফন্দি এঁটে যাচ্ছে। আমাদের সামনে সে একের পর এক ফাঁদ পেতে চলেছে। সে চায় আমরা যেন পা ফসকে সেই ফাঁদে পা দেই। আর পা পিছলে সেখানে পড়লেই সর্বনাশ। প্রথমে ছোট ফাঁদ, এরপরে বড় ফাঁদ – এরকম করে সে আমাদেরকে আল্লাহর অবাধ্য বানিয়ে ছাড়তে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

কিন্তু আল্লাহ তাঁর অসীম করুণায় ইবলীসের যাবতীয় ফন্দি-ফিকির আমাদের সামনে প্রকাশ করে দিয়েছেন। কিভাবে তার ফাঁদ থেকে বাঁচা যাবে তাও আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের মাধ্যমে ও তাঁর প্রেরিত রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। এরপরও আমাদের পা ফসকে যেতে পারে। কিন্তু আমরা যখনই বুঝতে পারব যে আমরা শয়তানের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি তখনই আমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। জন্ম থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত সেই আমাদের প্রধান শত্রু। তাই তার ফাঁদ থেকে আমাদেরকে সবসময় সাবধান থাকতে হবে।

শুধু ইবলীসের দোষ দিয়েই বা কি লাভ! আমরাই যে অনেক সময় তার মতো কাজ করে বসি। সে মাত্র একটি সিজদা দিতে অস্বীকার করেছিল। আল্লাহর একটি হুকুমকে মানতে সে অস্বীকার করেছিল। আর আমরা দিন-রাত আল্লাহর কতো আদেশ-নিষেধই অমান্য করে চলেছি। এর সবই যে আমরা শয়তানের ফুসলানিতে পড়ে করছি তা তো নয়, আমাদের নিজেদের প্রবৃত্তিও এর জন্য কোনো অংশে কম দায়ী নয়। এই দায় তো আমাদেরকে নিতেই হবে। আর তাছাড়া শয়তানও তো আমাদেরকে কোনো কিছু করতে বাধ্য করতে পারে না। আমরা যদি পশুর মতো চলি, বা নিজেদেরকে পশুর চাইতেও নিচে নামিয়ে আনি, তাহলে ইবলীসের সাথে আমাদের পার্থক্য রইল কোথায়?

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে আমাদের ভেতরকার যাবতীয় কুপ্রবৃত্তিকে দূর করে দিয়ে ফেরেশতাদের মতো সর্বদা তাঁর অনুগত হয়ে চলার তৌফিক দিন এবং তাঁর একান্ত অনুগত বান্দা হিসেবে কবুল করে নিন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s