হাজ্জ অভিজ্ঞতা (প্রথম পর্ব): আমার মেয়েটা চোখের সামনে মারাই যাচ্ছিল প্রায়

আমরা চারজন একসাথে ছিলাম, কিন্তু হঠাৎ জুমানা পিছলে পড়ে এবং সাথে সাথে কেমন যেন চুপ হয়ে যায়। কথা বলতে পারছিল না, কিছু বলার চেষ্টা করছিল। নি:শ্বাসও নিতে পারছিল না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওর চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আমরা প্রচন্ড ভয় পেতে লাগলাম। ও একদম চুপ হয়ে গেল। ওর ঠোঁট নীল হয়ে গেল। আমি, ওদের মা এবং মেয়ে রামীছা, তিনজনেই প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলাম। বিশ্বাস করুন, আমরা মনে করেছিলাম জুমানা বোধহয় এখুনি মারা যাবে আমাদের চোখের সামনে, এই এখুনি। মা-বাবারা নিশ্চই বুঝতে পারছেন যে, একজন মা-বাবার জন্য বিষয়টি কতোটা ভয়ংকর যে, তারা মনে করছে তাদের সন্তান এখুনি মারা যাবে! পরবর্তীতে জুমানাও বলেছিলো যে, ওর নিজেরও মনে হচ্ছিলো ও তক্ষুনি মারা যাবে।

আল্লাহ্‌কেই ডেকে যাচ্ছিলাম। ওদিকে ওর যমজ বোন রামীছাও আল্লাহ্‌কে ডাকছে। মনে মনে ভাবছিলাম, এত হাজার হাজার মানুষের মাঝে একজনও কি ডক্টর নেই। কেন কেউ একজন নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে জানতে চাইছে না “What is wrong with your baby? Let me see.”

সঠিক মনে নেই কতটুকু সময় জুমানা অচেতন ছিলো। হতে পারে ৫ মিনিট। আমরা খুব আতংকিত ছিলাম! অন্যদের যেন অসুবিধা না হয়, তাই আমরা পথ ছেড়ে একদম সাইডে কোনায় সরে গিয়েছিলাম। আল্লাহ্‌কে ডেকেই যাচ্ছি। ওর নীল ঠোঁট আবার স্বাভাবিক হলো। এবার একটু কথা বললো জুমানা:

  • আমি ঠিক হয়ে গেছি আব্বু।
  • আল্‌হাম্‌দুলিল্লাহ্‌, আরো একটু শুয়ে থাকো আম্মু। একটু rest নাও। (আমার কোলে ওর মাথা।)
  • Rest নিতে হবে না। আমি একদম ঠিক হয়ে গেছি আব্বু।

তাও আমরা জোর করেই ওকে শুইয়ে রাখলাম, মেঝেতে আরো কিছুক্ষণ। আল্লাহ্‌র শুকরিয়া আদায় করছি। কিন্তু জুমানার সহ্য হচ্ছিলো না শুয়ে থাকতে। আবারো বলে:

  • আমি হাঁটতে পারবো আব্বু।
  • “না, তোমাকে হাটতে হবে না। আব্বুর কোলে উঠো।” ওদের আম্মু বললো।

আমারও সাহস হলো না ওকে হাটতে দিতে। ওকে কোলে নিয়েই সাঈ করা শুরু করে দিলাম। ওকে কোলে নিয়ে সাঈ করতে আমারও খুব কষ্ট হচ্ছিল। কারণ, সকালে ঢাকা হতে রওনা দিয়ে মক্কার হোটেলে পৌঁছেছিলাম রাত ১টার দিকে এবং উমরাহ করছিলাম আড়াইটা বা ভোর তিনটার দিকে। মানে প্রায় ১৮ ঘন্টার journey, মানে পুরা টায়ার্ড ছিলাম আমরা সবাই। ওদিকে আমরা দলছাড়া হয়ে গিয়েছিলাম তওয়াফ করার সময়েই। কারণ বউ আর ৭ বছরের দুই বাচ্চা নিয়ে তওয়াফ করতে গিয়ে আমরা পিছিয়ে পড়েছিলাম দল থেকে। দলছাড়া হবার জন্য অবশ্য আমরা ভীত ছিলাম না একদম। আমরা যথেষ্ট সাপোর্ট পেয়েছিলাম বিভিন্ন দেশের হাজীদের থেকে। আমাদের সাথে দুই যমজ বাচ্চা দেখে সকলেই পথ ছেড়ে দিচ্ছিলেন এবং ওদের দুজনকে অনেক আদর দিয়েছেন। আমাদেরকে অত্যন্ত ক্লান্ত দেখে কেউ কেউ বরং প্রোটেকশন দিচ্ছিলেন দু’পাশ হতে যেন আমরা দুই বাচ্চা নিয়ে সুন্দর করে তওয়াফ শেষ করতে পারি। আল্লাহ্‌ উনাদের সকলকে উত্তম পুরষ্কার দান করুন।

আমার মেয়েটা পিছলে পড়লো কেন?

কারণ কেউ সাফা হতে মারওয়া সাঈ করতে করতে পানি পান করেছিল এবং কিছু পানি মেঝেতে পড়েছিল, সেটা মোছা হয়নি, আর সেই পানিতে আমার মেয়ে পিছলে পড়ে। হয়ত আরো অনেকের সাথেই এই ঘটনা ঘটেছে।

অতি ছোট্ট এই ঘটনা হতে বুঝতেই পারছেন যে, লক্ষ লক্ষ মানুষ যেখানে একত্রিত হয়, সেখানে ছোট ছোট কাজেও আমাদের খুব সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। শুধু পানিই নয়, খাবার বা ফলের ছোকলাও খুব ভয়ংকর হতে পারে! আমি খুব বেশি কথা বলব না এই বিষয়ে। শুধু আবারো বলি “লক্ষ লক্ষ মানুষ যেখানে একত্রিত হয়, সেখানে ছোট ছোট কাজেও আমাদের খুব সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।”

  • থুতু-কফ ফেলতে গেলেও আপনাকে খুব খেয়াল করেই ফেলতে হবে।
  • আপনার তাড়া আছে? তাড়াতাড়ি হাটতে গেলেও খেয়াল করতে হবে অন্যকে কতটুকু কষ্ট দিয়ে ফেললেন।
  • আপনি হুইল চেয়ারে বসা? বা আপনার বৃদ্ধ মা-বাবাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে ঠেলছেন? আপনি হয়ত ভাবছেন আপনার অধিক অধিকার পথ চলায় অন্যদের চাইতে। কিন্তু আপনার হুইল চেয়ারের কারণে ডজন ডজন মানুষের পা কেটে যাচ্ছে, সেই খবর হয়ত আপনি রাখছেন না বা খেয়াল করলেও আপনি সচেতন হচ্ছেন না।
  • আমি দেখেছি এমন হুইল চেয়ার দ্বারা প্রচুর হাজীর পা কেটে রক্ত ঝরতে। আমি নিজেও ব্যথা পেয়েছিলাম এমন হুইল চেয়ার দ্বারা।

wheel chair not recommended

  • নিচের ছবিটি দেখুন। এমন হুইল চেয়ার নিরাপদ। এটার ফুট-রেস্ট ফোম দ্বারা মোড়ান বিধায় সামনের পথচারির পায়ে লাগলেও হয়ত সে সামান্য একটু আঘাত পায়, কিন্তু তার পা কাটবে না।

wheel chair recommended

একবার ভেবে দেখুন তো, আপনার একটু ভুলের জন্য যদি কারো চরম ক্ষতি হয়, সেটা কেমন হবে? পরবর্তীতে আমার মনে হয়েছিল যে, যদিও আমার মেয়ে বেঁচে গেছে কিন্তু প্রতি ওয়াক্তে যতো মানুষের জানাযার সলাত আদায় করেছি তাদের মাঝে হয়তো এমন কেউও ছিলেন যিনি সামান্য পানিতে পিছলে পড়ে মরে গেছেন।

কী করা উচিত?

  • তওয়াফ ও সাঈর সময় অবশ্যই পানি পান করার জায়গাতেই পান করবেন। সেখানে ক্লিনারও থাকে সর্বক্ষন। তারা সারাক্ষণ পরিষ্কার করে, পানি মোছে।
  • যদি দেখেন পানি পড়ে আছে, তো নিজ দায়িত্বে মুছুন বা আশেপাশে ক্লিনার দেখতে পেলে তাকে ডাকুন। কিন্তু অন্যকে পিছলে পড়ার সুযোগ রেখে চলে যাবেন না।

(১) নিচের এই ছবিতে দেখছেন যে, সাঈ করার স্থানে জমজম পানি সংগ্রহ ও পান করার নির্দিষ্ট জায়গা আছে।

place of sayee 1

(২) এই ছবিটি খুব ভালো করে খেয়াল করুন। সবুজ তীর চিহ্ন দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেছি যে, ওখানে জমজমের পানি পান করার দু’টি জায়গা দেখা যাচ্ছে। এবং সবুজ চিহ্নের দিক হতেই পানি পান করা উচিত। কিন্তু লাল চিহ্ন গুলি খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন যে, ওখানে যদিও রেলিং আছে তাও সামান্য ফাঁকা জায়গা আছে। তার মানে, লাল চিহ্নের পাশ হতে পানি পান করা সম্ভব নয়। এই সামান্য ফাঁকা জায়গাটুকুরই সুযোগ নেন অনেক হাজীগন (নীল চিহ্নত মানুষটিকে কল্পনা করুন একজন হাজী হিসাবে)। এবং তখন সাঈ করার এই পথ-দুটো প্রায় block হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এই বন্ধ জায়গা দিয়ে পানি সংগ্রহ করে ওখানেই পান করার কারণে ঠেলাঠেলিতে পানি পড়ে যায়। আর তার পরের ঘটনা তো আগেই পড়লেন।

place of sayee 2

(৩) সবুজ লাইট চিহ্নিত সাঈ করার এই স্থানে খবরদার পানি পান করবেন না বা পানি ফেলবেন না। এখানে অপেক্ষাকৃত দ্রুত দৌড়াতে হয়। আর এমন স্থানেই জুমানা পিছলে পড়েছিলো।

place of sayee 3

(৪) যারা সাথে বাচ্চা নিয়ে যাচ্ছেন, বাচ্চাদেরও ট্রেনিং দিয়ে রাখুন এই সকল বিষয়ে। শিশুরা বড়দের চাইতে আরো দক্ষতার সাথে নিয়ম মেনে চলে।

zamzam tap in the haram

(৫) চমৎকারভাবে আঁকা ছবিটিতে দেখতে পারছেন যে, হাজ্জের দিনগুলির অভিজ্ঞতা আমার মেয়ে দুটি পাতায় এঁকে প্রকাশ করেছে সংক্ষেপে। ডান পাশে হতে – মীনা, আরাফা, মুজদালিফা, পাথর সংগ্রহ, জামারায় পাথর মারা, তওয়াফ ও সাঈ করা। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ও এঁকেছে।

hajj sketch

ছবিগুলি হাজ্জ শেষ করে কিছুদিন পরে তোলা। ছবিতে ভীড় না দেখে ভাবনে না যে, এটাই স্বাভাবিক। যাই হোক, সামান্য পানি নিয়ে ও পান করা নিয়ে সম্ভবত একটু বেশিই কথা বলে ফেললাম। কারণটাও নিশ্চই বুঝতেই পারছেন। হাজার হলেও আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম এটা মনে করে যে, আমাদের একটা মেয়ে এখুনি আমাদের চোখের সামনে মারা যাচ্ছে।

যদিও মুখে মুখে পরিচিতদের পরামর্শ দিয়ে আসছি গত বছর হতেই তবে আমার উচিত ছিলো আরো আগেই এই বিষয়গুলি নিয়ে লিখা। বিগত কয়েক দিন ধরে বউ বলেই যাচ্ছে “হাজ্জ নিয়ে নাকি আপনি কি লিখবেন। কবে লিখবেন?” আজ এটা প্রকাশ করলাম। ইন্‌শাআল্লাহ্‌ আগামী কয়েক দিনেই বাকি কিছু অভিজ্ঞতা প্রকাশ করব। তবে যেহেতু আরো অনেকেই তাদের হাজ্জ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছেন, তাই আমিও similar কথাগুলি লিখলাম না। আপনারা দয়া করে সেগুলিও পড়ুন। যেহেতু হাজ্জের সময় খুব নিকটবর্তী, আশা করছি আপনারা বিদাত মুক্ত সহি নিয়ম কানুন জেনে নিয়েছেন। আল্লাহ্‌ যেন সকলের হাজ্জ আদায় সহজ করে দেন।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে: https://www.facebook.com/notes/10152597517930100/ 

Advertisements

2 thoughts on “হাজ্জ অভিজ্ঞতা (প্রথম পর্ব): আমার মেয়েটা চোখের সামনে মারাই যাচ্ছিল প্রায়

  1. পিংব্যাকঃ হাজ্জ অভিজ্ঞতা (দ্বিতীয় পর্ব): প্রায় এক মাসের ট্রেনিং প্রোগ্রাম | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ হাজ্জ অভিজ্ঞতা (তৃতীয় পর্ব): কষ্টের হাজ্জ নষ্ট করার উপায় | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s