হাজ্জ কিভাবে করবেন?

অনেক বই আছে, জটিল ভাষায় অনেক বর্ণনা আছে। কিন্তু খুব অল্প কথায় জানতে চাইলে পুরো বিষয়টা কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে যায়। তাই চেষ্টা করব খুব সংক্ষেপে হজের পদ্ধতি বর্ণনা করতে।

১) প্রথমে জেনে নেই কয়েকটি জায়গার নাম: জেদ্দা, মক্কা, মিনা, আরাফাহ, মুজদালিফা, জামারাহ এবং মদীনা।

২) এবার জেনে নেই কয়েকটি আমলের নাম: ইহরাম, ওমরাহ, তাওয়াফ, সায়ী, উকুফ, রমি, হাদী।

৩) মক্কায়, মাসজিদুল হারামের ভিতরে অবস্থিত কয়েকটি জায়গার নামও জেনে নেওয়া প্রয়োজন: কাবা, জমজম, মাকামে ইব্রাহিম, হাজরে আসওয়াদ, রুকনে ইয়ামেনি, হাতিমে কাবা, সাফা, মারওয়া।

এবার আসুন জেনে নেই, কবে কবে কিভাবে কী হবে।১ 

Hajj scene at Mina

৮ জিলহজ্জ: ফজরের সালাতের পর মক্কা থেকে নতুন করে ইহরাম করে চলে যাবেন মিনা। ওখানে সবার জন্য এসি তাবুর ব্যবস্থা আছে। আপনার এজেন্সি আপনাকে তাঁবু পর্যন্ত নিয়ে যাবে। এখানে আজ আর কোনো কাজ নেই। শুধু সালাত আদায় করুন ৫ ওয়াক্ত। ইবাদতে মশগুল থাকুন। গল্পগুজবে অংশ নেবেন না। বিশ্রাম করুন।

৯ জিলহজ্জ: মিনা থেকে ফজরের সালাত আদায় করে চলে আসুন আরাফাতের ময়দানে। এখানে তাঁবু থাকবে আপনার এজেন্সির। তবে এসি তো দূরের কথা, মোবাইল চার্জ দেবারও কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। মসজিদে নামিরা থেকে খুতবা হবে যোহরের সালাতের আগে। সাথে FM রেডিও থাকলে খুতবা শুনুন। না থাকলে বিশ্রাম করুন। যোহরের আজান হলে যোহর এবং আসর এক সাথে ২ রাকাত ২ রাকাত করে আদায় করে নিন। মনে রাখবেন, আরাফাতে আসরের কোনো আজান হবে না। এখানে যোহর ও আসর এক আজানে, দুই ইকামতে, ২ রাকাত ২ রাকাত করে আদায় করতে হবে। এরপর শুরু হলো উকুফে আরাফাত। সূর্য পুরোপুরি ডুবে যাওয়া পর্যন্ত দোআ করতে থাকুন। আল্লাহর কাছে চাইতে থাকুন। যা ইচ্ছা তাই চান। নিজের জন্য, সবার জন্য ইচ্ছেমত চাইতে থাকুন। সূর্য পুরোপুরি ডুবে গেলে মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। ভুলেও মাগরিব আরাফাতে পড়বেন না। মুজদালিফায় পৌছে যত রাতই হোক, মাগরিব (৩ রাকাত) ও এশা (২ রাকাত) পড়ুন। এটাই নিয়ম। সালাত আদায় হয়ে গেলে ঘুমিয়ে পড়ুন।

১০ জিলহজ্জ: ফজরের সালাত আদায় করে মুজাদালিফা থেকে চলে আসুন জামারায়। শুধু “জামারাতুল আকবার” অর্থাৎ বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করে সোজা মক্কায় চলে আসুন। হাদী (অর্থাৎ কুরবানির পশু) জবাই করুন। কিংবা কাউকে দায়িত্ব দেয়া থাকলে খবর নিন জবাই হয়েছে কিনা। জবাই হয়ে গেলে মাথা কামিয়ে ফেলুন। গোসল করে নতুন জামা পরে চলে আসুন মাসজিদুল হারামে। ফরয তাওয়াফ করুন। তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পিছনে যেকোনো জায়াগায় ২ রাকাত সালাত আদায় করুন। প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরুন, পরের রাকাতে ইখলাস। এরপর পেটপুরে জমজম পান করুন। কিছুটা মাথায় দিন। (ভুলেও ঠান্ডা পানি ব্যবহার করবেন না।  “Not Cold” লেখা কন্টেইনার থেকে পানি নিন।) এবার সাফা মারওয়া সায়ী করুন। ব্যাস, আজকের কাজ শেষ। মধ্যরাতের আগেই মিনায় তাঁবুতে ফিরে যান।

১১ ও ১২ জিলহজ্জ: মিনা থেকে যোহরের পর জামারায় যান। তিনটি জামারাতেই একে একে পাথর নিক্ষেপ করুন। (পাথরের আকার হতে হবে বুটের দানা বা সিমের বিচির সমান, এর চেয়ে বড় পাথর নেবেন না।) ছোট ও মেজ জামারায় পাথর নিক্ষেপ হলে কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করুন। মনে রাখবেন, বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপের পর কোনো দোয়া নেই। বড় জামারায়, মানে শেষটিতে কঙ্কর নিক্ষেপ হয়ে গেলে ১১ তারিখ চলে আসুন মিনায়, তাঁবুতে, আর ১২ তারিখ চলে যান মক্কায়। ব্যাস, হজ শেষ। অবশ্য মাগরিবের আগে যদি মিনার সীমানা ত্যাগ করতে না পারেন তাহলে কিন্তু ১২ তারিখ রাতেও আপনাকে মিনার তাঁবুতে থেকে ১৩ তারিখ যোহরের পরে আবার পাথর নিক্ষেপ করে মিনা ত্যাগ করতে হবে।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে: http://ashique.info/2013/04/14/hajjprep-2/ 

———————————————————————————————–

সম্পাদকের মন্তব্য:

এখানে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবেই হজ পালন করা উত্তম। তবে যেহেতু আপনি একটি এজেন্সির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করছেন তাই কাজগুলো কিছুটা আগে-পিছে হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের অধিকাংশ হজ এজেন্সি ৮ জিলহজ্জ সকালের পরিবর্তে ৭ জিলহজ্জ রাতেই হাজী সাহেবদেরকে মিনায় নিয়ে যায়। একইভাবে, অনেক এজেন্সি ৯ জিলহজ্জ সকালের পরিবর্তে ৮ জিলহজ্জ রাতেই হাজী সাহেবদেরকে আরাফাতের ময়দানে নিয়ে যায়। হজের কোনো ফরয বা ওয়াজিব কাজ ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকলে এজেন্সির সার্বিক তত্ত্বাবধানে হজ সম্পন্ন করে ফেলাটাই ভালো।

হানাফি মাযহাবের আলিমদের মতে হজের ফরয তিনটি। এগুলো হলো:

১) ইহরাম বাঁধা (হজ ও উমরার ইহরামের সাথে সংশ্লিষ্ট নিয়মগুলো আগে থেকেই ভালো করে জেনে নেবেন);

২) উকুফে আরাফাত বা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান (৯ জিলহজ্জ দ্বিপ্রহরের পর হতে ১০ জিলহজ্জ সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আরাফাতের ময়দানের যে কোনো অংশে এক মুহুর্তের জন্য হলেও অবস্থান করা);

৩) তাওয়াফে যিয়ারত বা ফরয তাওয়াফ (১০ জিলহজ্জ মাথা মুন্ডন করে বা চুল ছাটার মাধ্যমে ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার পর থেকে ১২ জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পূর্বে যে কোনো সময়ে এই তাওয়াফ সম্পন্ন করতে হবে)।

হজের এই তিনটি ফরয কাজ উপরে বর্ণিত ক্রম অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা ওয়াজিব। এই তিনটি ফরয কাজের কোনো একটি বাদ পড়লে হজ বাতিল হয়ে যাবে এবং তা পুনরায় আদায় করতে হবে

আর হানাফি মাযহাব অনুযায়ী হজের ওয়াজিবসমূহ হলো:

১) ৯ জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর আরাফাত থেকে রওনা হয়ে রাতে মুজদালিফায় এসে সুবহে সাদিকের পর সূর্যোদয়ের পূর্বে কিছু সময় অপেক্ষা করা;

২) ১০ জিলহজ্জ মিনায় বড় জামারায় ৭টি এবং ১১ ও ১২ জিলহজ্জ প্রতিদিন ক্রমান্বয়ে ছোট, মেজ ও বড় জামারায় ৭টি করে (৩ X ৭ = ২১টি) কঙ্কর নিক্ষেপ করা;

৩) তামাত্তু ও কিরান হজ আদায়কারীর জন্য [১০ জিলহজ্জ মিনায় বড় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপের পর] পশু কুরবানি করা;

৪) [১০ জিলহজ্জ মিনায় বড় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ ও এরপর পশু কুরবানি শেষে] মাথা মুন্ডানো বা চুল ছাটা [এবং এর মাধ্যমে ইহরাম থেকে হালাল হওয়া];

৫) ফরয তাওয়াফ সম্পন্ন করে সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সায়ী করা;

৬) মক্কার হারামের সীমানার বাইরে থেকে আগত হাজীদের জন্য [মক্কা ত্যাগের পূর্বে] বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন করা।

ভুলবশত হজের কোনো ওয়াজিব বাদ গেলে দম ওয়াজিব হবে।

এছাড়াও হজের বিভিন্ন কাজ, যেমন ইহরাম বা তাওয়াফের সাথে সংশ্লিষ্ট আলাদা আলাদা ওয়াজিব রয়েছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s