হাজ্জ অভিজ্ঞতা (দ্বিতীয় পর্ব): প্রায় এক মাসের ট্রেনিং প্রোগ্রাম

প্রথম পর্ব

প্রথম পর্বেই বলেছি যে, আমি ধরে নিচ্ছি আপনারা authentic source হতে বিদআত মুক্ত সহি নিয়মে হাজ্জ আদায় করা শিখেছেন। মনে রাখবেন, যাচ্ছেন হাজ্জের জন্য, তাই হাজ্জটা যেন শুদ্ধ হয়, তারপর অন্যগুলিতে মনোযোগ।

বরকতময় মাস

মুসলমানদের জন্য রমাদান মাসটা অনেক বড় একটা ট্রেনিং-এর মাস। রমাদানের এক মাসে চাইলে জীবনটাকেই বদলে ফেলা যায়, তাই না? অপর দিকে বাংলাদেশ হতে অধিকাংশ হাজী সাহেবরা সাধারণত ৩০/৪০ দিনের প্যাকেজ প্রোগ্রামে হাজ্জে গিয়ে থাকেন। হাজ্জের এই লম্বা সময়টায় অফিস নেই, ব্যবসা নেই, স্কুল-কলেজ নেই, বাচ্চার homework নেই, ঘরের কাজ নেই, বাজার-ঘাট নেই, রান্না-বান্না নেই, সন্তান লালন পালন নেই, আরো অনেক দায়িত্ব নেই, বলতে গেলে ২৪টা ঘণ্টাই ফ্রি সময়। প্রতিদিন নফল তাওয়াফ করার পরেও যতটুকু ফ্রি সময় থাকে, খুব উপযুক্তভাবে কাটানো উচিত। হাজ্জের পুরো সময়টা খুব সুন্দর করে utilize করতে পারলে জীবনটাই পাল্টে ফেলা সম্ভব, বিশ্বাস করুন।

সিলেবাস

মসজিদে গিয়ে ৫ ওয়াক্ত সলাত আদায় করা, নফল তওয়াফ করা, একটু বিশ্রাম নেয়া, গোসল খাওয়া-দাওয়া ঘুম দিয়েও প্রচুর সময় হাতে থাকবে। এই সময়টার জন্য একটা সিলেবাস তৈরি করে নিন বাংলাদেশে থাকতেই। বাছাই করে কিছু বই নিন। আমি নিজের জন্য এবং আমার মেয়ে-দুটোর জন্যও যথেষ্ট বই খাতা নিয়েছিলাম।

বলতে গেলে প্রতিটা দিন কিছু না কিছু পড়ে শুনিয়েছি মেয়ে-দু’টোকে। বলতে গেলে প্রতিদিন আমার মেয়ে-দু’টোর সাথে নানা বিষয়ে আলোচনা করেছি একাধিকবার। ওদের নিয়ে কুরআন হাদিস পড়েছি এবং সেগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও করেছি। ওদের প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করেছি। একটা মাস প্রতিদিন এমনটি করায় আমাদেরও একটা অভ্যাস হয়ে গেছে এবং বাচ্চারাও আনন্দ পায়। আমরা এখনও নিয়মিত এই কাজটা করে যাচ্ছি। এই ধাক্কায় আপনার সন্তানকেও আপনি দিতে পারবেন অনেক জ্ঞান, সেটা প্রাকটিস করার সুযোগ আর দিতে পারবেন একটা সুঅভ্যাস।

যারা পরিবারের নানা বয়সের সদস্য নিয়ে যাচ্ছেন তারা খুব চমৎকার ভাবে time utilize করতে পারবেন, পারা উচিত। অনেক সময় এমন হয়েছে যে, দিনের বেলায় আমরা একটু ঘুমাতে চাইছি কিন্তু মেয়ে-দুটো ঘুমাবে না। বাচ্চাদের জন্য রং পেন্সিল, খাতা, ইসলামিক কালার বুক ইত্যাদি নিয়ে গিয়েছি। ওরাও সুন্দর করে অবসর সময় কাটাতে পেরেছে। যারা একা একা যাবেন তারাও চাইলে আরো অধিক সময় শুধু নিজের জ্ঞান বৃদ্ধির জন্যই utilize করতে পারবেন। (বাচ্চাদের জন্য কী কী বই নিতে পারেন বা কোথা হতে ইসলামিক কালার বুক ডাউনলোড করতে পারবেন তা দেখার জন্য আমার লেখা এই নোটটি ভিজিট করুন: https://www.facebook.com/notes/10151504070730100)

কী নেবেন?

খুব বেশি কিছু নয়:

  • বই নেবেন, নোট নেবার জন্য খাতা কলম পেন্সিল নেবেন।
  • সব সময় লিখার জন্য ছোট্ট একটা পকেট ডায়রি নেবেন।
  • মোবাইলে, ট্যাবে কয়েক গিগা অডিও/ভিডিও লেকচার ডাউনলোড করে নিতে পারেন।
  • কিছু রিয়াল বরাদ্দ রাখবেন ওখান থেকেও বই কেনার জন্য। ওখানকার লাইব্রেরিগুলি ঘুরবেন এবং নিজের জন্য ও বাচ্চাদের জন্যও বই কিনবেন। এই বইটা ওদের পছন্দে মক্কা থেকে কিনেছিলাম ২০ রিয়েলে কিন্তু পরে মদিনায় দেখেছিলাম ১৫ রিয়ালে।200 Golden Hadith
  • এই বইগুলি আমি নিয়েছিলাম এবং কিছু বই airport-এ উপহার হিসাবে পাওয়া। মেয়ে-দু’টো লাইব্রেরি লাইব্রেরি খেলছিলো সমস্ত বইগুলি সাজিয়ে।Kids books

জ্ঞান অর্জন বনাম প্রাকটিস

ধরে নিলাম অবসর সময়গুলি properly utilize করে জ্ঞান বাড়াচ্ছেন। কিন্তু পাশাপাশি পুরো মাসটায় আপনি চাইলে প্রতিদিন টুকটাক সেবাও করতে পারবেন আপনার সহ-হাজীদের। এটাও তো সত্য যে, বাংলাদেশ হতে প্রচুর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হাজ্জ আদায় করেন। অনুমান করেই বলা যায় আপনার গ্রুপেও একাধিক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থাকবেন। বাংলাদেশ হতে রওনা দেবার সময় হতে শুরু করে আবার ফিরে আসা পর্যন্ত আপনি তাদের অনেক সেবা করার সুযোগ পাবেন। যেমন:

  • তাদের লাগেজ বহনে সাহায্য করা।
  • প্লেনে তাদের ফর্ম পূরণ করে দেয়া।
  • টয়লেট ও অজুর জায়গায় চিনিয়ে দেয়া।
  • তাদের কাপড় চোপড় ধুয়ে দেয়া বা তাদের শুকনা কাপড় ছাদ হতে এনে দেয়া।
  • তাদের জন্য জমজম পানি সংগ্রহ করে দেয়া।
  • তাদের সাথে থেকে তওয়াফ ও সাঈতে সাহায্য করা।
  • তারা অসুস্থতা বোধ করলে সেবা দেয়া।
  • তাকে ঔষধ সেবনে সাহায্য করবেন বা তাকে ঔষধ সেবনের কথা মনে করিয়ে দেবেন।
  • যদি আপনার গ্রুপে এমন কেউ থাকেন যিনি হুইল চেয়ারে চলাচল করেন, তবে তাকেও সাহায্য করতে পারবেন। (নিরাপদ হুইল চেয়ারের বিষয়ে জানতে ১ম-পর্বটি দেখুন)
  • মক্কা হতে মদিনা বা ফাইনালি ঢাকায় ফেরার সময় সহ-হাজি বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের লাগেজ ঠিক মতো নিয়েছে কিনা একটু খেয়াল রাখবেন।

আর এই সকল কাজের জন্য নিশ্চই আল্লাহ্‌ও অতি উত্তম পুরষ্কার দান করবেন ইন্‌শাআল্লাহ্‌।

“সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের উপর, আর প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করেছে, তাই পাবে।” [বুখারি ও মুসলিম]

ছোট ছোট প্রচুর হাদিস পালন করতে পারবেন। বলতে পারেন এটা একটা মোক্ষম সময়। এত এত মানুষের সাথে ওঠাবসা, মেলামেশা। তাই পুরো একটা মাস অন্যকে উপকার করার প্রচুর উপলক্ষ পাবেন। পুরো একটা মাস সকাল-দুপুর-রাত সব সময় কিছু না কিছু হাদিস পালন করার সুযোগ আসবেই। মোট কথা, যারা বৃদ্ধ তারা অনেক অসহায় থাকে। অনেক কিছুই ভুলে যায়। নিজের রুমটা পর্যন্ত খুঁজে পায় না। লিফট থেকে একদম ভিন্ন তলায় নেমে তার রুম খুঁজতেই থাকবে ঘন্টার পর ঘন্টা। উনাদের প্রতি দয়াবান হবেন।

“যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ দেখায় না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া-অনুগ্রহ দেখান না।” [মুসলিম]

কোন প্রকারের উপকার করবেন না?

হাজী সাহেবদের সুবিধার জন্য অনেকেই তাঁদেরকে জমজম পানি পান করায় বা খেজুর/খাবার খাওয়ায়। এটা ভালো কাজ। কিন্তু কেউ কেউ যেটা করেন তা এই যে, তওয়াফ বা সাঈ করছে এমন হাজীদের জন্য ডিসপোজেবল বা one time use গ্লাসে পানি ভরে দু’হাতে দুই গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চলন্ত তওয়াফ/সাঈকারী সেই গ্লাস নিয়ে পান করেন। আপাতদৃষ্টিতে এই কাজটা খুব ভালো কাজ মনে হলেও, আমার প্রথম পর্ব পড়ে নিশ্চই বুঝে গেছেন যে, এই কাজটা করার চাইতে না করাই অতি উত্তম। আর তার চাইতেও বড় কথা এই যে, পানি পান করার জন্য ওখানে চারপাশে নানা স্থানে প্রচুর নির্দিষ্ট জায়গা আছে। সুতরাং, যার যার নিজ দায়িত্বেই পানি পান করার কাজটা ছেড়ে দিন।

ধৈর্য ধারণ ও রাগ না করা

ধৈর্যশক্তি বাড়াবার জন্য রমাদান মাস ও হাজ্জের পুরো মাস, দু’টোই খুব কাজের দু’টো মাস। আপনার গ্রুপে এমন সহ-হাজী থাকতেই পারে যিনি হয়ত না বুঝেই অনেক ভুল কাজ করে বসবেন বারবার। তার জন্য আপনাদের ভ্রমণেও কম-বেশি সমস্যা হবে একাধিকবার। এমনকি তার জন্য বিপদেও পড়তে পারেন।

“ধৈর্যশীলতা (সবর) তো প্রথম আঘাতের সময়ই প্রকাশ পেয়ে থাকে।” [বুখারি ও মুসলিম]

খুব একটা অবাক হবেন না যদি এমনটাও দেখেন যে, আপনার গ্রুপে এমন সহ-হাজীও আছে যিনি হাজ্জের নিয়ম কানুন বিন্দুমাত্র শিখে আসেননি। হতে পারে আপনাকেই উনি বেছে নেবেন এবং নানা ধরনের প্রশ্ন করবেন শেখার জন্য। ধৈর্য ধরে তাকে শেখাবেন। এমনটা বলে লাভ নেই “বলেন কি ভাই! কিছুই শিখে আসেন নাই?” ওদিকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কেউ হয়ত হারিয়ে যাবে কয়েক বার। আমার গ্রুপেও ছিলো। মোট কথা, আপনার সহ-হাজী দ্বারাই আপনি প্রচুর কষ্ট পেতে পারেন। কিন্তু সবসময় যদি ধৈর্য ধারণ করবেন, রাগ না করে তাকে ক্ষমা করে দিন, বরং উল্টা তাকে সাহায্য করুন যেন তিনি আর ভুল না করেন। হাজ্জ থেকে ফিরে এসে দেখবেন যে আপনার ধৈর্যশক্তি অনেক বেড়ে গেছে এবং এজন্য আপনি চমৎকার ভালো বোধ করবেন।

“কুস্তিতে জয়লাভ করার নাম বীর নয়, বীর হলো সে যে রাগের সময় নিজেকে সংবরন করতে পারে।” [বুখারি]

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল: “আমাকে কিছু উপদেশ দিন।” তিনি বললেন: “রাগ করো না”। লোকটি বার বার রাসূলের নিকট উপেদশ চায় আর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “রাগ করো না।”। [বুখারি]

বিশ্বাস করুন, এভাবে প্রায় একটা মাস প্রতিটা দিন যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আপনি অন্যকে সাহায্য করে যান এবং ধৈর্য ধারণ করে যান, ক্ষমা করে যান, আপনার স্বভাব-চরিত্রই বদলে যাবে, মানে জীবনটাই পাল্টে যাবে। রমাদান মাস এবং হাজ্জের পুরো সময়টাই জীবন পাল্টাবার একটা সুবর্ণ সুযোগ বলে আমি বিশ্বাস করি।

পোস্ট করার আগে বার বার লেখাটা পড়লাম এবং স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে, আমি বিষয়টিকে যতটা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরতে চেয়েছি ভাষাগত জ্ঞানের অভাবে সেভাবে তুলে ধরতে পারিনি। আর তাই “জীবনটা কে পাল্টে ফেলা সম্ভব” এই মেসেজটায় হয়তো আপনারা বিশ্বাস আনতে পারবেন না। প্লিজ নিজগুণে আমার মেসেজের গুরুত্ব বুঝে নিন।

ছবি:

(১) এই লাইব্রেরিতে আমার মেয়েদের ঢুকতে দেয়নি। এটা শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য। আমি একা ঢুকে ঘুরে দেখে এসেছিলাম। মদিনাতেও লাইব্রেরি আছে। সেটাও দেখে আসতে পারেন। মদিনাতে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলাম যে, আমার মেয়েরা এখানকার লাইব্রেরি দেখতে চায়। একজন অফিসার অনুমতি নেবার জন্য অনেক চেষ্টা করলেন কিন্তু ফাইনালি top level boss অনুমতি দেয়নি ৭ বছরের মেয়ে বিধায়। ৫ বছর হলে নাকি অনুমতি দিতো।

Library of Makkah Haram

(২) মক্কায় একটা মার্কেটে বইয়ের দোকানে বই পছন্দ করছে ওরা দু’জন।

Book shop in Makkah

(৩) নিচের ছবিতে যা দেখতে পারছেন, সেই টপিকে খুব চমৎকার একটা প্রোগ্রাম হচ্ছিলো মদিনায়। বাচ্চাদের নিয়ে দু’বার ঘুরে এসেছিলাম। আর আমি কয়েকবার গিয়েছিলাম।

Islamic book cover page

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে: https://www.facebook.com/notes/shiblee-mehdi/it-can-be-a-one-month-long-training-program-for-self-development-hajj-experience/10152599942180100  

 

Advertisements

One thought on “হাজ্জ অভিজ্ঞতা (দ্বিতীয় পর্ব): প্রায় এক মাসের ট্রেনিং প্রোগ্রাম

  1. পিংব্যাকঃ হাজ্জ অভিজ্ঞতা (তৃতীয় পর্ব): কষ্টের হাজ্জ নষ্ট করার উপায় | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s