হাজ্জ অভিজ্ঞতা (তৃতীয় পর্ব): কষ্টের হাজ্জ নষ্ট করা থেকে সাবধান

প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব

হাজ্জ অভিজ্ঞতার তৃতীয় পর্বের, অর্থাৎ আজকের মেসেজটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বলতে পারেন কোটি টাকা মূল্যের পরামর্শ দিতে যাচ্ছি এখন। আগের দুটি পর্ব যদি নাও পড়েন, প্লিজ এটা অবশ্যই পড়বেন। :)

এক এক্কে এক

আপনার গ্রুপে এমন কেউ থাকতেই পারে যিনি হয়ত administrative কাজে বেশ দক্ষ। হতে পারে ঢাকা থেকে রওনার দিন হতে শুরু করে আপনারা বিভিন্ন সমস্যায় পড়েছিলেন এবং উনি খুব দক্ষতার সাথে সমাধান করেছেন। হতে পারে, কোথাও আপনাদের আরো অপেক্ষা করতে হতো কিন্তু উনার সিদ্ধান্তে পদক্ষেপ নেয়ায় আপনাদেরকে আর অপেক্ষা করতে হয়নি। হতে পারে উনি taxi/micro ভাড়া করেছেন বেশ কম দামে এবং আপনাদের সকলের লাভ হয়েছে। হতে পারে উনি বিভিন্ন বিষয়ে অনেক বুদ্ধি রাখেন। মোট কথা উনি উনার কর্মদক্ষতায় আপনাদের সকলকে মুগ্ধ করেছেন এবং উনি সত্যই অনেক দক্ষ ওই সকল বিষয়ে এবং এজন্য আপনারাও তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছেন। মানে উনি অনেকটাই লিডারশীপ পেয়ে গেছেন গ্রুপে।

এবার ধরে নিলাম আপনি সহি শুদ্ধ বিদআত মুক্ত হাজ্জ আদায় শিখেছেন। মক্কায় পৌঁছে উমরাহ করে অপেক্ষায় আছেন হাজ্জের দিন শুরু হবার জন্য। কিন্তু এমনটাও হতে পারে যে, যদিও ঐ ব্যক্তি তার administrative দক্ষতা, বুদ্ধি ও সৎপরামর্শ দিয়ে আপনাদের সকলের মন জয় করেছেন, কিন্তু তিনি সঠিক পদ্ধতিতে হাজ্জ আদায় করা শেখেননি। হতে পারে তিনি যেটা শিখেছেন তাতে শিরক আছে, বিদআত আছে। এখন ঘটনা হবে এই যে, যেহেতু উনি নিজ-কর্মদক্ষতায় অনেকটাই লিডারশীপ পেয়ে গেছেন, হাজ্জের দিনগুলিতেও সংগত কারণে উনি হাজ্জের নিয়ম কানুনেও লিডারশীপ দেবেন। আর তক্ষুনি ঘটবে মহা-সংঘাত। হতে পারে উনি হয়তো আপনার/আপনাদের থেকে বয়সে অনেক বড়। তখন হয়ত আপনি তাকে বলতে পারছেন না যে, তার জানায় মারাত্মক ভুল আছে। আবার যদিও বা হয়ত তাকে বললেন যে, তার জানা ভুল, তখন হয়ত তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া লেগে যাবে।

যদি আপনি আপনার জ্ঞানে কঠোর থাকেন, তাহলে তো সমস্যা নেই। কিন্তু যদি আপনি খুব নরম প্রকৃতির হন বা যদি এমন হয় যে, উনার কথা শুনে আপনি আপনার সঠিক জ্ঞান হতে সরে পড়লেন। এমনটাও হতে পারে আপনি হয়তো ভাববেন, উনার সাথে সম্পর্ক খারাপ করার কি দরকার, উনি যেভাবে বলছেন হয়ত সেটাই সঠিক। আবার হতে পারে, আপনি হয়ত ভাবলেন, উনি এত এত বিষয়ে কতো কত জ্ঞান রাখেন, নিশ্চই হাজ্জের বিষয়েও উনার কথাই সঠিক। ব্যাস… পুরা ধরা পড়লেন। কষ্টের হাজ্জটা নষ্ট করে ফেললেন।

আমি যে পরিস্থিতি বর্ণনা করলাম তা হয়ত আপনাদের অনেকের সাথেই ঘটবে না, কিন্তু যার সাথে ঘটবে তাকে আসলেই অনেক শক্ত থাকতে হবে। এটা একটা কঠিন পরীক্ষাও বলতে পারেন। আপনার টিম লিডার যদি authentic Islamic education-এ knowledgeable না হন তাহলে তিনি তার মতো করেই আপনাদের গাইড করবেন, এটাই স্বাভাবিক, তাই না?

দুই এক্কে দুই

উনার কথা বাদ দিলাম। এমনটাও হয় যে, ওখানে গিয়ে খুব ঘনিষ্ঠ ও কাছের আত্মীয়, বন্ধু বা কলিগ-এর সাথে দেখা হলো। হাজ্জের নিয়ম নিয়ে কথা উঠতেই উনি হয়ত এমন একটা পদ্ধতির কথা বললেন যেটা সঠিক তো দূরের কথা, ঈমানের বিপরীত। হতে পারে উনি আপনার আপন চাচা। আপনি বয়সে অনেক ছোট। এবার আপনি পড়ে যাবেন মহা বিপদে। যদি আপনি দুর্বল প্রকৃতির হন, তাহলে দেখা যাবে আপনিও আপনার চাচার সাথে ভুল নিয়মে হাজ্জ আদায় করে ফিরবেন।

আরো কিছু পরিস্থিতি বলি। সেই লোকটা প্রথমজনের মতো administrative কাজে দক্ষই হোক, বা দ্বিতীয়জনের মতো আপনার চাচাই হোক, যদি এমন হয় যে, উনি পূর্বেও একাধিকবার হাজ্জ আদায় করেছেন (আসলে উনি প্রতিবার ভুল মিশ্রিত পদ্ধতিতেই হাজ্জ আদায় করেছেন), তখন তার কথাবার্তায় প্রচুর আত্মবিশ্বাস থাকে, আর তার অতিআত্নবিশ্বাস আপনাকে অতি দুর্বল করে দিতেও পারে। আপনি নিজেই হয়ত ভেবে বসলেন, “উনি একাধিকবার হাজ্জ আদায় করেছেন, উনিই নিশ্চই সঠিক বলছেন। আর তাছাড়া জীবনে আবার হাজ্জ করতে আসতে পারব কি না জানি না। থাক, উনি যেমন বলছেন তেমন করেই করি।”  ব্যাস কষ্টের হাজ্জটা একদম নষ্ট করতে বসলেন, যদিও কিনা আপনি সহি শুদ্ধ পদ্ধতিতে হাজ্জ আদায় শিখেছিলেন।

তিন এক্কে তিন

এবার ধরে নিলাম যে নির্দিষ্ট কেউ আপনাকে প্রভাবিত করেনি। কিন্তু আপনি নিজেই ওখানকার হাজার হাজার হাজীদের কর্মকান্ড দেখে প্রভাবিত হয়ে যেতে পারেন। যেমন প্রতিদিন তওয়াফ করতে গিয়ে দেখলেন অনেকেই তাদের টুপি, জায়নামাজ, গামছা, রুমাল ইত্যাদি কাবাঘরে, মাকামে ইব্রাহিমে ঘষছে ওটাকে বিশেষ বরকতময় করার জন্য। আপনি হয়ত ভাবলেন “আমার আলেম তো এই কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলো। নিশ্চই এরা সঠিক কাজটাই করছে।” ব্যাস, ভাবলেন তো গেলেন, একটু পরে আপনিও ঘষাঘষি শুরু করে দিলেন। আপনি হয়ত ওদের চাইতে একটু বেশিই কিছু ঘষা শুরু করলেন, আর তখন আপনাকে দেখে আরেকজন উৎসাহিত হলো। আর এই সকল নানা ধরণের শিরক/বিদআত শুধু কাবাঘর কেন্দ্রিক হয়, তা কিন্তু নয়। মদিনাতেও নানা ধরনের শিরক/বিদআত করে বসেন হাজীগণ। এগুলি দেখে বিভ্রান্ত হয়ে আপনিও তাতে জড়িয়ে পড়তে যাবেন না।

কিছু ভুল কাজের লিস্ট:

(১) কাবা ঘরে ঘষাঘষি করে উক্ত জিনিষটাকে বরকতময় করা। (আমার রেকর্ড করা একটা ভিডিও হতে একটা ছবি এটি। অনেকে এমনও করে যে, কাবা ঘরের কাছে যেতে না পারলে দূর থেকেই জায়নামাজ, পোশাক, টুপি ছুঁড়ে মারে যেন সেটা কাবাঘরের দেয়ালে লাগে। তাদের মতে লাগলেই বরকতময় হয়ে যায়। কেউ কেউ জায়নামাজ উপরে ছুঁড়ে মারে কাবা ঘরের গিলাফকে স্পর্শ করার জন্য।)

People rubbing belongings with Kaba

(২) জমজম পানিতে কাপড়-চোপড় ধোয়া, কাফনের কাপড় ধোয়া, ইহরামের কাপড় ধোয়া।

(৩) যারা খুব দুর্বল এবং হাজরে আসওয়াদের পাথরের কাছে যেতে পারে না বা কাবা ঘরকে স্পর্শ করতে পারে না, তারা মসজিদুল হারামের বিশাল বিশাল গেইট/দরজা ধরেও কাঁদে, আদর করে, চুমা দেয়।

(৪) যারা প্রতিদিন মসজিদুল হারাম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করেন তাদেরকে খুব সৌভাগ্যবান ব্যক্তি মনে করে তাদের সাথে বিশেষ নিয়তে কোলাকুলি করা বা হাত মিলানো।

(৫) মসজিদুল হারাম পরিষ্কার করার mop-কে (কাপড়ের বা সুতার ঝাড়ু) বরকতময় মনে করে সেটা হতে কিছুটা সুতা কেটে আনা। এবং পরবর্তীতে সেই সুতা চুবানো পানি দিয়ে চিকিৎসা দেয়া বা সেই সুতা চুবানো পানি পান করলে গর্ভে সুসন্তান আসবে এমন বিশ্বাস করা এবং সেই সুতা ধোয়া পানি মানুষকে বিতরণ করা।

(৬) মক্কা ও মদিনার মাটি, পাথর, গাছ, লতাপাতা, ফুল-ফল ইত্যাদিতে বিশেষ গুন আছে মনে করে সংগ্রহ করে আনা এবং পরবর্তীতে সেই মাটি পাথর দিয়ে বিশেষ কিছু করা।

(৭) মক্কা ও মদিনার গাছের ডালে ও পাতায় আল্লাহ নাম দেখে সেটাকে বিশেষ গাছ মনে করা এবং সেটার কাছে গিয়ে মনে মনে কিছু চাওয়া। (আশা করি আপনারা অবগত যে, এগুলি দক্ষ মালি দ্বারা কেটে কেটে তৈরী করা।)

Tree with Kalima

(৮) জামারায় নিক্ষিপ্ত করা পাথর ফ্লোরেও পড়ে থাকে। সেই পাথরকেও বিশেষ পাথর মনে করে সংগ্রহ করে আনা।

Stones from Jamarat

(৯) কাবাঘরের আশে পাশের কবুতরের ঝাঁককে বিশেষ কারো পালিত কবুতরের বংশধর মনে করে বিশেষ নিয়তে গম/দানা/খাবার কিনে খাওয়ানো। ছবিতে দেখতে পারছেন যে, একজন মহিলা প্যাকেটে পাখির খাবার বিক্রি করছেন।

Feeding birds in Makkah

(১০) ঐতিহাসিক স্থানগুলি ঘুরে ঘুরে দেখতে গিয়ে ঐতিহাসিক কিছু পাহাড়ও দেখা হয়ে যাবে। পাহাড় দেখতে গিয়ে অনেকেই পাহাড়গুলিকে বিশেষ বরকতময় মনে করে সেগুলিকে দুআ কবুলের স্থান মনে করে সেখানেই দাড়িয়ে দুআ করা শুরু করে দেয় এবং অধিক উৎসাহী অনেকেই উক্ত পাহাড়ে ওঠা সোয়াবের কাজ মনে করেন এবং উক্ত পাহাড়গুলিতে উঠে দু’রাকাত নফল সলাত আদায় করা আরো অধিক সোয়াবের কাজ মনে করেন।

Jabal Noor in Makkah

ভাববেন না যে, এখানে দশটা পয়েন্ট বলেছি বলে এই দশটাই top-ten tips. এগুলি সাধারণত বইপত্রে ছাপা হয় না। যদি authentic বই ঘাঁটেন তবে হাজ্জ, উমরাহ ও রসুল (সা)-এর কবর জিয়ারত নিয়ে প্রচুর জাল হাদিস ও ভুল বিশ্বাসের কাজকর্ম সম্পর্কে জানতে পারবেন। এমন একটা বই ডাউনলোড করতে পারেন এখান হতে:

http://www.themessagecanada.com/english/wp-content/uploads/2013/07/Hajj-Book-Bangla.pdf

যাই হোক, শেষের Ten-Tips পড়তে গিয়ে আর ছবি দেখতে গিয়ে এক এক্কে এক, দুই এক্কে দুই, তিন এক্কে তিনে যা বলেছি সেটা ভুলে যাবেন না। মনকে শক্ত রাখবেন। আল্লাহ যেন সকলের হাজ্জ আদায় সহজ করে দেন।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close