আল্লাহর স্মরণ সম্মন্ধে ইবন জুযায়ী (অনুবাদ)

আধ্যাত্মিক জীবনের বিশেষজ্ঞরা আমাদের বলেন যে আল্লাহর স্মরণ বা যিক্‌র হলো পারলৌকিক পথের ভিত্তিপ্রস্তর, আত্মশুদ্ধির (wilayah) চাবিকাঠি, অন্বেষকের হাতিয়ার। প্রকৃতপক্ষে, এটা সকল ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য; যেমনটি কুরআনে এসেছে, “আমার স্মরণার্থে সালাত আদায় করো।” (সূরা ত্বা-হা, ২০:১৪)

যিক্‌র হলো অন্তরে সেই একক সত্ত্বার অস্তিত্ব অনুভব করা যাকে স্মরণ করা হচ্ছে; এ জন্য প্রয়োজন অখণ্ড মনোযোগ আর অবিচল অভিনিবেশ। মুখে যা উচ্চারিত হচ্ছে, অন্তরে তার অনুধাবন থাকতে হবে। কারণ সর্বোত্তম ও সর্বাধিক ফলপ্রসূ হলো সেই যিক্‌র, যেখানে জিহ্বা আর অন্তর একযোগে ব্যবহৃত হয়; যদি তা না হয় তবে কেবল অন্তর; আর তাও যদি না-হয় তাহলে কেবল জিহ্বা!

“আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।” (সূরা বাকারা, ২:১৫২)- এই আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবন জুযায়ী (তাঁর সাক্ষাৎ আপনারা আমার পূর্ববর্তী লেখায় ইতিমধ্যেই পেয়েছেন) তাঁর স্বভাবসুলভ সংক্ষিপ্ত কায়দায় আমাদের বলে দেন যিক্‌র-এর বাস্তবতা; তিনি লিখেছেন,

subhanallahi wa bihamdihi‘যদিও কিছু হাদীসে অন্য ইবাদাতকে—যেমন সালাতকে—শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়েছে, তবু জেনে রাখুন আল্লাহর স্মরণ (যিক্‌র) হচ্ছে সকল কাজের শ্রেষ্ঠ কাজ। এর কারণ নিহিত রয়েছে যিকর-এর অর্থে, আর আল্লাহর সান্নিধ্য (hudur) লাভের মাহাত্মে।

তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহর স্মরণের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়: 

প্রথমত, অন্য সকল কাজের উপর এর শ্রেষ্ঠত্ব সংক্রান্ত টেক্সট থেকে। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের জানাবো না তোমাদের কোন কাজ সর্বোত্তম? কোন কাজ তোমাদেরকে তোমাদের সার্বভৌম প্রভুর সম্মুখে সর্বোচ্চ পরিশুদ্ধ করে? কী তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে আর কী স্বর্ণ-রৌপ্য বিলিয়ে দেওয়া অপেক্ষা উত্তম; শত্রুর মোকাবেলায় যুদ্ধ করে তাদের হত্যা করা অথবা নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া অপেক্ষা উত্তম?’ তারা (সাহাবীরা) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের জানিয়ে দিন! তিনি উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহর যিকর।’ (তিরমিযী, ৩৩৭৭)

আল্লাহর রাসুলকে—সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—একবার জিগ্যেস করা হলো, কোন কাজ সর্বোত্তম? তিনি উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহর স্মরণ।’ তাকে বলা হলো, আল্লাহর স্মরণ কি তাঁর পথে জিহাদ অপেক্ষাও উত্তম? তিনি বললেন, ‘শত্রুকে আঘাত করতে করতে যদি তার তরবারী ভেঙে যায় আর রক্ত প্রবাহিত হয়, আল্লাহকে স্মরণকারীর মর্যাদা তার চেয়েও উন্নত।’ (তিরমিযী, ৩৩৭৬)

দ্বিতীয়ত, মহান আল্লাহ যখনই আমাদেরকে তাঁকে স্মরণ করার আদেশ দিয়েছেন, অথবা তাঁর প্রশংসা করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তখনই উচ্ছ্বাসিত আর অজস্র শর্তদ্বয় জুড়ে দিয়েছেন— ‘আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো।’ (সূরা আল আহযাব ৩৩:৪১), ‘যারা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে…’। (সূরা আল আহযাব ৩৩:৩৫) অন্য কোনো ইবাদাতের সাথে এমন শর্ত আরোপ করা হয়নি।

তৃতীয়ত, আল্লাহকে স্মরণের এমন একটি দিক রয়েছে যা অন্য কোনো ইবাদাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; তা হলো: সর্বোচ্চ উপস্থিতিতে অবস্থান করা (hudur fi’l-hadrat al-‘aliyyah) এবং সান্নিধ্য লাভ করা- যার বর্ণনা আমরা পাই সেইসব হাদীসে যেগুলো আল্লাহর কাছে “বসা” এবং “অবস্থান করা”-র কথা বলে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি বসি তার সাথে যে আমাকে স্মরণ করে।’ আরও, ‘আমার বান্দাহ আমাকে যেরূপ ভাবে, আমি সেইরূপ এবং আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে’। (বুখারী, ৭৫৩৬)

আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে মানুষ দু’য়ের একটি পদমর্যাদা প্রাপ্তির চেষ্টা করে। সাধারণ মুসলিম এর মাধ্যমে পুরষ্কার অর্জন করতে চায় (iktisab al-‘ujur)। আর মর্যাদাবান (elite) মুসলিম আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে চায়, তাঁর উপস্থিতিতে থাকতে চায় (al-qurb wa’l-hudur)। দুই অবস্থানের মধ্যে কী প্রকাণ্ড ফারাক! কী বিশাল বিভেদ পর্দার আড়াল থেকে যে পুরস্কার পায় তার সাথে অন্যজনের, যে কিনা সান্নিধ্য লাভ করে মর্যাদাবান সাধকে পরিণত হয়!’

(http://thehumblei.com/2012/08/20/ibn-juzayy-on-remembrance-of-god/ থেকে অনূদিত)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s