সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৫২-৫৩): আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা থেকে সাবধান

Chinese Incense

সূরা কাহফ থেকে পাওয়া কিছু দিকনির্দেশনার ওপর ধারাবাহিক আলোচনার একুশতম কিস্তি

৫২ – এবং সেই দিনকে স্মরণ কর, যখন আল্লাহ (মুশরিকদেরকে) বলবেন, তোমরা যাদেরকে আমার প্রভুত্বের শরীক মনে করছ তাদেরকে ডাক। সুতরাং তারা ডাকবে। কিন্তু তারা তাদেরকে কোনো সাড়া দেবে না। আমি তাদের মাঝখানে এক ধ্বংসকর অন্তরাল খাঁড়া করে দেব।

৫৩ – অপরাধীরা আগুন দেখে বুঝতে পারবে, তাদেরকে তাতে পতিত হতে হবে। তারা তা থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ পাবে না।

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই স্রষ্টায় বিশ্বাস করে। কিন্তু সেই স্রষ্টা আসলে কেমন? কী তাঁর বৈশিষ্ট? যুগে যুগে মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরেছে। কেউ সঠিক পথের দিশা পেয়েছে, আবার অনেকেই দিশেহারা রয়ে গেছে। এই দিশেহারা মানুষরা স্রষ্টায় বিশ্বাস করে ঠিকই, কিন্তু তারা তাঁকে সঠিকভাবে চিনতে ব্যর্থ হয়েছে। কেন তারা তাদের স্রষ্টাকে ঠিকভাবে চিনতে পারল না? আশা করি, কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে। 

মনে করুন, আপনি একজন ট্যাক্সি চালক। ট্যাক্সি চালিয়ে যে ভাড়া পাওয়া যায় সেই টাকায় আপনার সংসার চলে। একদিন ট্যাক্সি নষ্ট থাকা মানে আপনার একদিনের রোজগার শেষ। তাই আপনি আপনার ট্যাক্সির যত্ন নিতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেন না। হাজারও হোক এটিই হলো আপনার ‘অন্নদাতা’। এর যত্ন তো নিতেই হবে।

ট্যাক্সি চালিয়ে আপনি জীবিকা নির্বাহ করেন, ভালো কথা। আপনি এর যত্ন নেবেন, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। কিন্ত তাই বলে এটি আপনার অন্নদাতা হয়ে গেল? এই তো আপনি আপনার আসল অন্নদাতা আল্লাহর সাথে শিরক করে বসলেন। আপনাকে তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আপনাকে তো তিনিই সুস্থতা দিয়েছেন। ট্যাক্সি বানাতে যে বুদ্ধি লাগে সেই জ্ঞান ও বুদ্ধি মানুষকে তো তিনিই দিয়েছেন। ট্যাক্সি চালাতে যে তেল লাগে তা মাটি থেকে উত্তোলন করে পরিশোধন করার বুদ্ধি ও জ্ঞান তো তিনিই দিয়েছেন। যে রাস্তায় আপনি সাই সাই করে ট্যাক্সি চালান সেই রাস্তা বানাবার উপকরণ তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তিনিই তো মানুষের জন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার প্রয়োজন সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তা না হলে কেউ টাকা খরচ করে আপনার ট্যাক্সিতে চড়ত কি? যে আল্লাহ আপনার জীবিকা অর্জনের জন্য সহায়ক করে এত কিছু করে দিলেন সেই তাঁরই সাথে আপনি শরীক করে বসছেন?

অথবা ধরুন, আপনি বাসে করে কোথাও যাচ্ছেন। হঠাৎ ধাঁই করে এক গরু রাস্তায় চলে এল। চালক হতভম্ব। দুর্ঘটনা হতে হতেও হলো না। গাড়ির চাকা আর এক ইঞ্চি সরে গেলেই নিচের খাঁদে পড়তে হতো। গোটা বাসের সব যাত্রী জানে বেঁচে গেল। সবাই চালকের প্রশংসায় উচ্চকন্ঠ। “অভিজ্ঞ চালক বলেই আজ বাঁচা গেল। নইলে তো নিশ্চিত মরণ ছিলো!” এই কথাটি বললেন তো আপনি আল্লাহর সাথে শরীক করে বসলেন। জীবন ও মরণের মালিক তো আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নয়। আপনার ভাগ্যে যদি ওখানে ওইভাবে মৃত্যু লেখা থাকত তবে কোন চালকের সাধ্য ছিলো তা ঠেকায়?

এভাবে অনেক মানুষ উঠতে-বসতে আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে বসে। হয়ত আমি বা আপনিও করে বসি। এগুলো হলো চিন্তা-চেতনাগত শিরক, যা আমাদের কথা-বার্তা বা কাজ-কর্মের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।

আরেক প্রকার শিরক আছে যেখানে আমরা কোনো ব্যক্তি, প্রতিমা বা প্রকৃতিকে আল্লাহর সমকক্ষ বলে গণ্য করে ফেলি। অর্থাৎ কেবলমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ যা করতে সক্ষম নয় আমরা তা এদের কাছে চেয়ে বসি বা তেমন কিছু এদের কাছ থেকে আশা করি। এগুলো হলো বিশ্বাসগত শিরক, যা আমাদের আচার-আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।

কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর সাথে শরীক বলে সাব্যস্ত করার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো নবী ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে আল্লাহর সন্তান বলে বিশ্বাস করা এবং মনে করা যে তিনি আমাদের যাবতীয় পাপের বোঝা নিজের কাঁধে নিয়ে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে গোটা মানবজাতিকে দায়মুক্ত করে গেছেন। এর চেয়ে বড় শিরক আর কী হতে পারে? ঈসা (আলাইহিস সালাম) ছিলেন একজন মানুষ, একজন নবী, একজন রাসুল। তিনি জন্ম নিয়েছেন। তিনি মৃত্যুবরণ করবেন। আল্লাহ জন্মাননি, তিনি মারাও যাবেন না, কেননা একমাত্র তিনিই চিরঞ্জীব। আল্লাহ কারও থেকে জন্ম নেননি, তিনি কাউকে জন্মও দেননি। তিনি কোনো মানুষের শরীরে ভরও করেননি। তিনি ছিলেন, আছেন ও থাকবেন। তিনি সন্তানের প্রয়োজনীয়তা থেকে মুক্ত। তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এ কেমন বিশ্বাস যেখানে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাঁরই এক বান্দাকে মুক্তিদাতা প্রভু হিসেবে মেনে নেওয়া হয়? ঈসা (আলাইহিস সালাম) এই অসার দাবী থেকে পুরোপুরি মুক্ত। তিনি এমন আজগুবি বিশ্বাস প্রচারই করেননি। কিছু সুবিধাবাদী মানুষ এসব কথা তাঁর নামে বানিয়ে প্রচার করেছে, আর মানুষও তা বোকার মতো বিশ্বাস করেছে। হাশরের ময়দানে ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে প্রভু হিসেবে যতই ডাকা হোক না কেন, তিনি সেই ডাকে সাড়া দেবেন না। আল্লাহর অন্যান্য বান্দার মতো তিনিও সেদিন বিচারের জন্য অপেক্ষা করবেন।

এ তো গেল কিছু মানুষকে আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করার কথা। এবার আসি প্রতিমা পূজার কথায়। এই বিশ্বাসটিও যুগে যুগে অসংখ্য মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে। প্রাচীন আরবে লাত, মানাত বা উজ্জাকে পূজা করা হতো। মানুষ মনে করত যে কল্যাণ বা অকল্যাণ এদের তরফ থেকেই আসে। এদের কাছে নজরানা পেশ করা হতো। পশু বলি দেওয়া হতো। এমনকি নরবলি পর্যন্ত দেওয়া হতো। কিন্তু মানুষের নিজেদের হাতে গড়া একটি মুর্তি, যাকে চাইলে ভেঙে ফেলা যায়, যাকে চাইলে ‘বিসর্জন’ দেওয়া যায়, সেটি আবার মানুষের কল্যাণ বা অকল্যাণের মালিক হয় কিভাবে? যে প্রতিমা নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারে না সে মানুষকে রক্ষা করবে কিভাবে? যার সামনে দেওয়া প্রসাদ পিঁপড়া, মাছি বা অন্যান্য জন্তু-জানোয়ার খেয়ে যায় কিন্তু সে কিছুই করতে পারে না সে মানুষের জন্য আদৌ কিছু করতে সক্ষম কি? এ তো এক বুদ্ধি বিবর্জিত বিশ্বাস। এই দুনিয়াতে যেমন তারা আমাদের ডাকে সাড়া দেয় না, তেমনি শেষ বিচারের দিনেও তারা আমাদের ডাকে সাড়া দেবে না। আমাদের হাঁকডাক আজও তাদের কানে পৌঁছে না, সেদিনও পৌঁছাবে না। আফসোস তাদের জন্য যারা মানুষেরই হাতে গড়া এসব প্রতিমাকে আল্লাহর সাথে শরীক বলে সাব্যস্ত করেছে।

এরকম আরেকটি বুদ্ধি বিবর্জিত বিশ্বাস হলো প্রকৃতির পূজা। কেউ আছে আগুনের পূজারি, কেউ সূর্যের পূজারি, কেউ আবার নদী, গাছপালা বা পাহাড়ের পূজারি। যে স্রষ্টা এদেরকে বানালেন সেই স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে তাঁরই সৃষ্টিকে তাঁর সমকক্ষ বলে সাব্যস্ত করা? কতই না অসার বিশ্বাস এগুলো।

আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করার মতো বড় পাপ আর নেই। এসব ছেড়ে দিয়ে খাঁটিভাবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর ওপর ঈমান না আনলে কোনো রক্ষা নেই। তাঁর সাথে কাউকে শরীক করলে এই দুনিয়াতে হয়ত আল্লাহ আমাদেরকে না খাইয়ে রাখবেন না, কিন্তু সেক্ষেত্রে আমাদের মৃত্যু পরবর্তী জীবনে অপেক্ষা করছে মর্মন্তুদ শাস্তি ও যন্ত্রণা। তাঁকে সঠিকভাবে চিনতে পারার ক্ষমতা আল্লাহ আমাদের সবাইকে দিয়েছেন। আরবিতে একে বলে ফিতরত। প্রতিটি শিশু ফিতরতের ওপরই জন্মগ্রহণ করে। সে যদি তার পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা একেবারেই প্রভাবিত না হয়ে বেড়ে উঠতে পারে তাহলে সে অবশ্যই আল্লাহকে সঠিকভাবে চিনতে পারবে। আর সেটি হবে নাই বা কেন? আমাদের স্রষ্টা আছেন। তিনি এক। তাঁর কোনো শরীক বা অংশীদার নেই। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তাঁর ইচ্ছাতেই সবকিছু হয়। তিনি সব দেখেন, শোনেন ও জানেন। কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই তিনি সবকিছু করতে সক্ষম। তিনি আমাদেরকে এমনি এমনি সৃষ্টি করেননি। আমাদেরকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য তাঁর কাছে আমাদেরকে একদিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। আমাদের ভালো বা খারাপ কাজের পরিণতি আমাদেরকে ভোগ করতে হবে। আমাদের ফিতরত যদি কলুষিত না হয়ে থাকে তাহলে আমরা এই বিষয়গুলো অবশ্যই অনুধাবন করতে সক্ষম হব।

এখন আমরা আমাদের এই ফিতরতের সঠিক ব্যবহার করছি কি? কোনো ব্যক্তি, প্রতিমা বা প্রকৃতির পূজার মধ্যে কল্যাণ নিহিত নেই, কল্যাণ তো ফিতরতের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহকে চেনার মতো করে চিনতে পারার মধ্যে। তিনিই আমাদের স্রষ্টা, আমরা তাঁরই ওপর নির্ভরশীল এবং তাঁর কাছেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবার অন্তরের ভেতরকার মরিচাসমূহকে দূর করে দিয়ে আমাদেরকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর রসে সিক্ত করে দিন।

Advertisements

One thought on “সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৫২-৫৩): আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা থেকে সাবধান

  1. পিংব্যাকঃ অমুসলিম মাত্রই কি কাফির? | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s