সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৫৪-৫৫): আল্লাহর সন্তুষ্টি বনাম মানুষের সন্তুষ্টি

droplet of water

সূরা কাহফ থেকে পাওয়া কিছু দিকনির্দেশনার ওপর ধারাবাহিক আলোচনার বাইশতম কিস্তি

৫৪ – আমি মানুষের উপকারার্থে এই কুরআনে সব রকম বিষয়বস্তু বিভিন্নভাবে বিবৃত করেছি, কিন্তু মানুষ সর্বাপেক্ষা বেশি তর্কপ্রিয়।

৫৫ – মানুষের কাছে যখন হিদায়াত এসে গেছে, তখন ঈমান আনয়ন ও নিজেদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা হতে তাদেরকে এ ছাড়া (অর্থাৎ, এই দাবী ছাড়া) অন্য কিছুই বিরত রাখছে না যে, তাদের ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তীদের অনুরূপ ঘটনা ঘটুক অথবা আযাব তাদের একেবারে সামনে এসে যাক।

প্রতিটি মানুষই আলাদা। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ‘সোনার চামচ মুখে দিয়ে’ এই পৃথিবীতে এসেছি, কেউ আবার ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ অবস্থার মধ্যে আমাদের শৈশবকাল অতিবাহিত করেছি। কৈশোরে আমরা কেউ কেউ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করতে পেরেছি, অনেকেই আবার সেই বয়সেই আয়-উপার্জনের জন্য পথে নেমেছি। শিক্ষা জীবন শেষ করার আগেই আমরা কেউ কেউ ব্যবসা বা চাকরির জগতে প্রবেশ করেছি, অনেকেই আবার বছরের পর বছর ধরে বেকারত্বের ঘানি টেনে চলেছি। পেশাগত জীবনে আমরা কেউ কেউ সফল হতে পেরেছি, অনেকেই পারিনি। আমাদের মধ্যে অনেকেই বিবাহিত জীবনে সুখী হয়েছি, আবার অনেকের কাছেই এই সুখ আজও মরীচিকা হয়ে রয়েছে। আমরা অনেকেই সন্তানের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছি, অনেকেই আজও নিঃসন্তান রয়ে গেছি। আমাদের কারও সন্তান মানুষ হয়েছে, আবার কারও সন্তান বখাটে বনে গেছে। বৃদ্ধ বয়সে এসে আমরা কেউ কেউ আনন্দে সময় কাটাতে পেরেছি, আবার অনেকের জন্যই বার্ধক্য হয়েছে দুর্বিষহ।

আমাদের প্রত্যেকের জীবনটা আলাদা। আমাদের প্রত্যেকের সংগ্রাম আলাদা। আমাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আলাদা। কিন্তু এর পরেও আমরা সবাই সুখী হতে চাই। আমরা সবাই ভালো থাকতে চাই। আমাদের স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাও তেমনটিই চান। তিনি চান আমরা যেন সুখী হতে পারি। তিনি চান আমরা যেন ভালো থাকতে পারি। দুনিয়ার এই জীবনের ভালো এবং বিশেষত মৃত্যু পরবর্তী জীবনের ভালো। আর সেজন্যই তিনি যুগে যুগে মানুষের কাছে নবী ও রাসুল পাঠিয়েছেন এবং তাঁদের ওপর আসমানী কিতাব নাযিল করেছেন। যারা আল্লাহর পাঠানো এই পথনির্দেশিকার অনুসরণ করবে তারা এই জীবনেও সুখ খুঁজে পাবে, আর মৃত্যু পরবর্তী জীবনের শান্তি তো তাদের জন্যই অপেক্ষা করছে।

এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর নাযিল করা হয় সর্বশেষ আসমানী কিতাব কুরআন। এই পৃথিবী যতদিন বাকী আছে ততদিন পর্যন্ত এই কুরআনই হলো আমাদের প্রকৃত পথনির্দেশিকা। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই তো আলাদা। তাই আমাদের সবার জন্যই এই কিতাবে বিভিন্ন রকম উদাহরণ, দৃষ্টান্ত ও যুক্তি দেওয়া হয়েছে। আমার বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করণীয় তার উত্তর কুরআন থেকে পাওয়া যাবেই। আমাদের প্রত্যেককে কুরআন সঠিক রাস্তা দেখাবেই। মহা পরহেজগার থেকে শুরু করে পতিত পাপী – সবার জন্যই কুরআন একটি পথনির্দেশিকা। এই কিতাব কাউকেই খালি হাতে ফিরিয়ে দেয় না। শুধু একটু খোলা মন নিয়ে বসতে হবে এবং কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা ও দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই শিক্ষাকে আমাদের নিজেদের জীবনে বাস্তবায়িত করতে হবে।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, অধিকাংশ মানুষ কুরআন থেকে শিক্ষা নিতে চায় না। স্বভাবগতভাবেই মানুষ তর্কপ্রিয়। যুক্তি, তর্ক ও প্রমাণের চাইতে ‘তালগাছটি আমার’ – এটিই হলো আমাদের অধিকাংশের মনোবৃত্তি। আমরা তর্কে হারতে চাই না। আমরা অন্যের কথা শুনতে চাই না। এমনকি অনেক সময় আমরা হক কথাও শুনতে চাই না। হোক তা কুরআন, বা অন্য যে কোনো হক কথা। আমাদের অনেকের জন্যই এই কলহপ্রিয়তা দীর্ঘমেয়াদে কাল হয়ে দাঁড়ায়।

মানুষ কেন এমনটি করে? কেন সে আল্লাহর কালাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? কেন সে গোয়ার্তুমির ওপর তার গোটা জীবনটা কাটিয়ে দেয়? শুনতে খারাপ লাগলেও আমরা সাধারণত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে লালিত কৃষ্টি, প্রথা, আচার, রসম, রেওয়াজ ইত্যাদি থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না। এজন্যই তো হক কথার চাইতে পূর্বপুরুষের অন্ধ অনুকরণ আমাদের কাছে বেশি প্রিয়। আর এর ফলেই তো আমরা অনেকেই আল্লাহর কালামকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আমাদের এতদিনকার লালিত আচার-প্রথা ধরে বসে থাকি। এরই ফলে আমরা যারা অমুসলিম পরিবারে জন্মেছি তারা অনেকেই বুঝি যে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসটি আসলেই যৌক্তিক, কিন্তু এর পরেও পিছুটান ছেড়ে ইসলামের ছায়াতলে শামিল হতে পারি না। আবার, আমরা যারা মুসলিম পরিবারে জন্মেছি তারা অনেকেই সমাজে ইসলামের যে অংশটুকু প্রচলিত শুধু সেটুকুই মেনে চলি, কিন্তু ইসলামের কোনো নিয়ম সমাজের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে গেলে আমরা ইসলামের সেই নিয়মটির বদলে সামাজিক প্রথাটিকেই অগ্রাধিকার দিয়ে বসি।

এসব করতে গিয়ে আমরা ভুলতে বসি যে আল্লাহ সবই দেখছেন, তাঁর কাছে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে এবং আখিরাতের চুড়ান্ত প্রতিদান তিনিই দেবেন। আমরা কেন ভুলে যাই? কারণ, আমরা তো আল্লাহকে সামনাসামনি দেখছি না বা আখিরাত তো আর আমাদের সামনে উপস্থিত নয়। আমরা কোনো যুক্তি ও প্রমাণ মানতে রাজি নই। চোখের সামনে যা দেখছি সেটিই আমাদের সামনে বাস্তবতা। আর আল্লাহ ও আখিরাত যেহেতু সামনাসামনি দেখছি না, তাই তা আমাদের কাছে অনেকটা ঝাপসা ধারণার মতো। এই যদি আমাদের অবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে বলতেই হচ্ছে যে আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর যেভাবে ঈমান আনা উচিৎ ছিলো আমরা সেভাবে ঈমান আনতে পারিনি। আর এর ফলেই আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির চাইতে মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

এখন, আমাদের সবারই একটু সময় নিয়ে ভেবে দেখা উচিৎ। একটু আত্মসমালোচনা করা উচিৎ। আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির চাইতে মানুষের সন্তুষ্টিকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে ফেলছি না তো? তেমনটি হয়ে থাকলে এখনই সময় আমাদের ঈমানকে মজবুত করার। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহায্য করুন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close