অসাম্প্রদায়িকতার শেকড় সন্ধানে (পর্ব ১): মরুর প্রান্তরে মানবতার জয়গান

তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতার ব্যানারে সাম্প্রদায়িকতার মুখোশধারী লোকেরা যখন ‘বাহ! বাহ!’ আর অন্যের সহানুভূতি আদায়ে ব্যস্ত, তখন দূর থেকে দেখলে তাদের কথাগুলোকে বেশ ভালোই মনে হয়, কিন্তু একটু পরখ করে দেখলেই বোঝা যায় যে আসলে এ সবকিছুই ভণ্ডামি আর পকেট ভারী করার মতলব। এদিকে কিছু নওজোয়ান মুসলিম অন্য ধর্মের উপাসনালয়ে আঘাত করে আর অ্যাম্বেসির সামনে কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে তাদের নিজেদের ‘ইসলাম’ জাহির করে বেশ আত্মতুষ্টিতে ভোগে; যেন অসাম্প্রদিয়কতার সংজ্ঞা তাদের অজানা। অথচ ইসলামের সঠিক ইতিহাস দেখলে আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে এসব রক্ত গরম করা কাজ নিছক লোক দেখানো ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমি আমার দুই পর্বের এই লেখায় আপনাকে এমন এক ভ্রমণে নিয়ে যাব এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ-এর আলোকে এমন কিছু চিত্র তুলে ধরব যেখানে আপনি সাম্প্রদায়িকতার একটু চিহ্নও দেখতে পাবেন না। আপনি এমন এক সমাজ দেখবেন যেখানে ছিল বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী লোকজন, যাদের হাতে নির্যাতিত হয়েও রাসূলুল্লাহ (সা.) সব সময়ই তাদের সাথে উত্তম আচরণ করেছেন এবং শুধুমাত্র তাঁর আচরণে মুগ্ধ হয়েই অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আজকের ইসলাম প্রচারকদের জন্য এটা এক অনন্য উদাহরণ।

অসাম্প্রদায়িকতা বলতে আমি যা বুঝি তা হলো — ‘কোনো একটি বিশেষ দল বা মতকে প্রাধান্য না দিয়ে সবাই মিলেমিশে একসাথে একই সমাজে বসবাস করা এবং পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নিরাপদে ও শান্তিতে জীবনধারণ করা।’ আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে অসাম্প্রদায়িকতার সুন্দর একটা উদাহরণ দিয়েছেন এই বলে যে – 

“তোমাকে আমি সারা বিশ্ববাসীর জন্য রহমতরূপেই পাঠিয়েছি।” [কুর’আন ২১:১০৭]

মূলত, আমি আমার দুই পর্বের এই লেখায় যেটা প্রমাণ করতে চাইছি সেটা হলো আপনি ভাববেন না যে আপনিই একমাত্র অসাম্প্রদায়িক বা অসাম্প্রদায়িকতার এই ব্যাপারটি নতুন আবিষ্কৃত কোনো মতবাদ যার দরুন আপনি নোবেল পুরস্কারের দাবিদার। রাসূলুল্লাহ (সা.) আজ থেকে ১৪০০ বছরেরও আগে শুধু তত্ত্ব নয় বরং তাঁর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অসংখ্য কাজের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার সফল বাস্তবায়ন করে গেছেন। এখানে আমি সেই চিত্রটিই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করব, ইনশা আল্লাহ।

Mecca-old-pictureতাহলে চলুন, মক্কার পথে আমাদের ভ্রমণ শুরু করে দেখে আসা যাক অসাম্প্রদায়িকতার প্র্যাকটিকাল কিছু উদাহরণ:—

সবার ব্যাপারে সমান আমানতদারি: রাসূলুল্লাহ (সা.) তখনও নবী হননি কিন্তু তারপরও তিনি সবার মাঝে আল-আমীন (বিশ্বাসী) হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যার কারণে অনেকেই তাঁর কাছে মূল্যবান জিনিস আমানত হিসেবে রাখতেন। মক্কা ছেড়ে যাওয়ার সময় তিনি কি অসাধারণ আমানতদারির পরিচয় দিয়ে গেলেন আলী (রা.)-কে সব মালামাল যথাযথভাবে ফিরিয়ে দিতে বলে গিয়ে। আমানত রক্ষা করার কি অসাধারণ দৃষ্টান্ত! একটু ভেবে দেখুন, সব গোত্রের লোকদের সম্পদই তিনি ঠিকঠাকভাবেই ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে গেলেন। সাম্প্রদায়িকতার সামান্য চিহ্ন থাকলেও এমন নজির পাওয়া সম্ভব নয়। আর এখন আমরা কেউ কেউ আমাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে অর্থ চুরি করে বড় বড় প্রকল্পের সমাধি দিয়ে মাঠে-ময়দানে নিজেদেরকে অসাম্প্রদায়িক বলে চেঁচাতে থাকি।

সুন্দর চরিত্রের আসাধারণ সব ব্যবহার: একজন মানুষের ব্যবহার কত সুন্দর হতে পারে, এর একটি ঘটনা শুধু সংক্ষেপে উল্লেখ করি—“নবীজির চলার পথে এক বুড়ি মহিলা সব সময় বাধা দিতেন, একদিন তিনি বাধা দেখতে না পেয়ে তাঁর বাসায় চলে যান, তখন ওই বুড়ি মহিলা বললেন যে, আমার ছেলে বাসার মুখোমুখি থাকে, অথচ কখনো আমাকে দেখতে আসেনি আর আপনি এলেন আমার এত খারাপ আচরণ সত্ত্বেও, সেই মহিলা তখনই ইসলাম গ্রহণ করে ফেললেন।”

সুবহানাল্লাহ! কতটুকু অসাম্প্রদায়িক হলে এরকম ব্যবহার করা যায় একটু ভেবে দেখুন। আর আমরা এখন শুধু শহর এলাকায় বাসের গায়ে লিখে রাখি ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’, কিন্তু ব্যবহারের উন্নতির কোনো চিহ্ন নেই। এই পয়েন্টটি নিয়ে আমি কথা বলার যোগ্যতা রাখি না আর যিনি রাখেন তিনিও হয়তো মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্দর চরিত্রের অসাধারণ সব ব্যবহার নিয়ে লিখেও শেষ করতে পারবেন না। তাই কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলা একটি কথাই শুধু উল্লেখ করতে চাই—

“নিঃসন্দেহে আপনি মহান চরিত্রের উপর (প্রতিষ্ঠিত) রয়েছেন।” [কুর’আন ৬৮:৪]

কুরআনের এই আয়াতে নবীজিকে শুধু মহান চরিত্রের অধিকারী নয়, বরং সমস্ত সুন্দর চরিত্রের ওপর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্রের অবস্থানের কথাই সুনিশ্চিতভাবে বলা হচ্ছে। মানে তিনি সুন্দর চরিত্রের সব মাইলস্টোন, সীমা, লক্ষ্য, মান ইত্যাদি যা আছে সব অতিক্রম করেছেন এবং এসবের চাইতেও উঁচু মর্যাদার চরিত্রের ধারক। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী করুন, আমীন।

মূর্তির মাঝেও মুসলিমদের সহাবস্থান: মক্কায় কাবার চারপাশে একসময় ৩০০-টির বেশি মূর্তির উপস্থিতি ছিল। এতেও কিন্তু সাহাবাদের ঈমানের মধ্যে এতটুকুও কমতি ঘটেনি বা এসব নিয়ে তাঁরা কোনো বাড়াবাড়ি করেননি (মক্কা বিজয়ের পরেই শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশে সেই সব মূর্তি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল)। আর এখনকার মুসলিমদের মতো তাঁরা যদি শুধু সাম্প্রদায়িকতার ভান ধরে বসে থাকতেন, তাহলে হয়তো রাসূলুল্লাহ (সা.) হেরা গুহা থেকে আর নেমে আসতেন না ইসলামের প্রচার করতে। সাম্প্রতিক সময়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ের ওপর অযথা আঘাত হেনে আমরা যে বিরূপ আচরণ করেছি, প্রমাণ হিসেবে সেটাই যথেষ্ট যে আমাদের ভাবনা কত সংকীর্ণ। মদিনা চুক্তির বিস্তারিত দেখলে আপনি হয়তো আরো আশ্চর্য হয়ে যাবেন (যা পরের পর্বে আসছে)।

কুরাইশ কাফিরদের সাথে রাসূলুল্লাহর বিনয়: রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছ থেকে ইসলামের নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই তা প্রচার করা শুরু করলেন তাঁর পরিবার এবং ঘনিষ্ঠদের কাছে। তখনো যারা আল্লাহর একত্ববাদে অবিশ্বাসী ছিল তাদের সাথে তিনি সবসময় ভালো ব্যবহার করতেন, ধৈর্য ধরে ভদ্র আচরণ করতেন। যেখানে আমরা আজকে মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করি শুধু নিজের স্বার্থের জন্যে, আর পাঁচ বছর পরপর নির্দিষ্ট একটি সময়ে সবাই কেমন যেন অসাম্প্রদায়িক হয়ে যাই; বাহ! আর অন্য সময়ে বিশ্বজিতের মতো নিরীহ মানুষের প্রাণ হারাতে হয় বিনা কারণে এবং সবাই তাকিয়ে সেটা উপভোগ করে দর্শকের মতো, যেন কোনো সার্কাস চলছে।

দাসদের মুক্ত করা: মক্কার তৎকালীন সমাজে একজন দাসের কোনো মূল্যই ছিল না; সেখানে আবু বকর (রা.) ছিলেন দাসদের মুক্ত করার ক্ষেত্রে একজন উদার ব্যক্তিত্ব। নিজের অর্থ দিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য তিনি দাস মুক্ত করতেন, বিলাল (রা.) যার মধ্যে অন্যতম। আর আমাদের কাজ হচ্ছে বাসার কাজের মানুষদের ওপর অত্যাচার করা। কি উচ্চশিক্ষিত, কি হুজুর কিংবা ধনাঢ্য, সবাই এক্ষেত্রে একই কাতারে। যেন এসব কাজেরলোকগুলো মানুষ হয়ে জন্মে ভুল করেছেন।

আশা করি এই উদাহারণগুলো আপনার মনে একটু হলেও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির সঠিক পরিচয় তুলে ধরবে, ভালো কাজে উৎসাহ জোগাবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুন। আমীন।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের ৩০শে জানুয়ারি তারিখে অধুনালুপ্ত “হৃদয়ে ইসলাম” ব্লগে।

Advertisements

1 thought on “অসাম্প্রদায়িকতার শেকড় সন্ধানে (পর্ব ১): মরুর প্রান্তরে মানবতার জয়গান

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close