অনলাইনে ইসলামবিরোধী কোনো কন্টেন্ট দেখলে যা করতে হবে

আপনারা কাঠের লাকড়ি দিয়ে জ্বালানো চুলা দেখেছেন নিশ্চয়। গ্যাসের চুলা বা ইলেক্ট্রিক চুলা যেমন সুইচ টিপে সাথে সাথে বন্ধ করা যায়, লাকড়ির চুলা কিন্তু সেভাবে বন্ধ করা যায় না। রান্না শেষ হয়ে গেলেও সেখান থেকে হাল্কা ধোয়া বের হতে থাকে, সময়ের সাথে সাথে আগুনের তেজ কমে আসে, অবশেষে একসময় আগুনটি নিভে যায়।

লাকড়ির চুলার আগুন পুরোপুরি নিভে যাওয়ার আগের সময়টা বেশ ইন্টারেস্টিং। তখন চাইলে আপনি ওই আগুনকে আবার উস্কে দিতে পারেন, আবার পাত্তা না দিয়ে ফেলেও রাখতে পারেন। পাত্তা দিলে আগুন আবার জ্বলবে, না দিলে আর জ্বলবে না।

এই সময়টাতে আগুনকে পাত্তা দিতে চাইলে আপনাকে অবশ্য হাল্কা কিছু কষ্ট স্বীকার করতে হবে। কষ্ট না করলে কি আর কেষ্ট মেলে? আপনার হাতে থাকতে হবে ইঞ্চি-খানেক ব্যাসের একটি নল, কিছু তুষ বা শুকনো পাতা বা পাটখড়ি। এক হাত দিয়ে নলটাকে ধরে ধিকি ধিকি করে জ্বলা কাঠকয়লাতে ফু দিতে হবে আর অন্য হাত দিয়ে তুষ, পাতা বা পাঠখড়ি ওই কয়লার উপর ফেলতে হবে। ফু দেয়ার সময় আপনি যদি কয়লায় কিছু ঘোটা দিতে পারেন তবে আগুন আরও তাড়াতাড়ি জ্বলে উঠবে।

আমাদের সামাজিক জীবনেও অনেক সময় অনেক আগুন নিভু নিভু কাঠকয়লার মতো সুপ্ত অবস্থায় থাকে, একে পাত্তা দিলেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। এই আগুন জ্বালানো বা নেভানোর ক্ষমতা আমাদেরই হাতে।

এই কিছুদিন আগের কথাই ধরুন। আমেরিকার কিছু অখ্যাত আহাম্মক মিলে “ইনোসেন্স অফ মুসলিমস” নামে একটি সিনেমা বানাল। উদ্দেশ্য আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করা। ছবিটার একটা ট্রেইলার জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউবে ছেড়ে দেয়া হলো। মাসখানেক ধরে অখ্যাত আহাম্মকদের বানানো কুখ্যাত এই ভিডিওটি লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেল। আগুনটা তখন ধিকি ধিকি করে জ্বলছিল। এমন সময় কিছু লোকের মনে হলো এই নিভু নিভু আগুনে একটু ঘোটা দেয়া দরকার। যেমন ভাবা তেমন কাজ। বুঝে হোক বা না বুঝে হোক মিসরের আল-নূর পার্টির সমর্থক বলে পরিচিত আল-নাস টিভি পবিত্র কর্তব্য মনে করে ভিডিওটি আরবিতে ডাবিং করে প্রচার করে দিল, আর সাথে এই মন্তব্যও জুড়ে দিল যে এটা কপ্টিক খ্রিস্টানদেরই কাজ। ঘোটা দেয়ার সাথে সাথেই আগুন জ্বলে উঠল। ক্ষুব্ধ জনতা বেশ কয়েকটি দেশে আমেরিকান দূতাবাস এবং কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা করল, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে কিছু প্রাণহানি হলো, যার মধ্যে বেনগাজির হামলায় লিবিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের হত্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে বেশিরভাগ ঘটনায় মুসলিমদেরই প্রাণ দিতে হয়েছে। কোথাকার কোন আহাম্মকের বানানো ফালতু একটা সিনেমার জন্য এতগুলো লোককে অকালে জীবন দিতে হলো।

ওই আহাম্মক আর তার মতো ভাবাদর্শের লোকেরা অবশ্য এটিই চেয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা আবারও বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করার চেষ্টা করল যে মুসলিমরা হলো অসভ্য, বর্বর, অসহিষ্ণু। কিছু অতি উৎসাহী মুসলিমের অপরিণামদর্শী তৎপরতায় তাদের মিশন সফল হলো। এইসব ঘটনায় হালে পানি পেয়ে ফ্রান্সের একটি পত্রিকা কিছু আপত্তিকর কার্টুনও ছেপে ফেলল।

এ তো গেল মুদ্রার একটি পিঠ। মুদ্রার অপর পিঠেও এই আহাম্মকেরা সফল। আল-নাস টিভিতে প্রচারের আগে এই সিনেমা সম্পর্কে তার নির্মাতা আর তাদের কিছু সাঙ্গ-পাঙ্গ আর বন্ধু-বান্ধব ছাড়া কেউ কিছুই জানত না। এটি ছিল ইউটিউবে আপলোড করা বাকী বেশিরভাগ ভিডিওর মতই – অখ্যাত, অজনপ্রিয়। প্রচারের ফলে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে অনেকেই ভিডিওটি দেখল, অন্যদের সাথে শেয়ার করল। কিছুদিনের মধ্যে এটি একটি মিলিয়ন হিট ভিডিওতে পরিণত হলো। অতি উৎসাহী মুসলিমেরা মিলে ভিডিওটির সফল মার্কেটিং করে দিলো।

“ইনোসেন্স অফ মুসলিমস”-এর ঘটনাটি একটি উদাহরণ মাত্র। এরকম ঘটনা এর আগেও ঘটেছে, ভবিষ্যতেও হয়ত ঘটবে। প্রতিবারই কিছু অতি উৎসাহী মুসলিমের কর্মতৎপরতায় আহাম্মকেরা সফল হয়েছে। আমাদের একটু ভেবে দেখে দরকার। আর কতবার, আর কতকাল মুসলিম জাতি কতিপায় শঠ আহাম্মকের খেলার পাত্র-পাত্রীতে পরিণত হবে? আর কতবার? আর কতকাল?

এই লেখায় আমি ফিকাহশাস্ত্র নিয়ে কোনো আলোচনা করতে আগ্রহী নই। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে কেউ ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করলে তার শাস্তি কী হতে পারে, বা আদৌ কোনো শাস্তি হতে পারে কি না, তা কোনো যোগ্যতাসম্পন্ন মুফতি সাহেবই বলতে পারবেন। আর যদি শাস্তি প্রযোজ্য হয়ও, তবে তা প্রয়োগ করার ক্ষমতা মুফতি সাহেবেরও নেই, আমজনতার কথা তো বাদই দিলাম। কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা বিচারক ছাড়া দন্ড প্রদানের ক্ষমতা কেউ রাখেন না। আমার জানা মতে কোনো রাষ্ট্র প্রকাশ্যভাবে এই হত্যাকান্ডগুলোকে অনুমোদন বা পৃষ্ঠপোষকতা করেনি।

০০০

আমরা বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগে বাস করছি। প্রযুক্তি এখন আর হাতে গোনা কিছু লোকের একক সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন পৌছে গেছে মোবাইল ফোন। রাখাল এখন আর বাঁশি বাজিয়ে সময় কাটায় না, তার কানেও থাকে হেডফোন। মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট এখন তার হাতের মুঠোয়। বিশ থেকে তিরিশ টাকা খরচ করলে গ্রামের হাট থেকেই এখন এক গিগাবাইট গান পাওয়া যায়। ব্লুটুথের সুবাদে অজ পাড়া-গাঁয়ের লোকজনও এখন কন্টেন্ট আদান-প্রদান করতে পারে। প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের এই যুগে আমাদেরকে অনেক বেশি সচেতন আর সংবেদনশীল হতে হবে।

০০০

Generic-internet-picইন্টারনেটে কোনো কন্টেন্ট কিভাবে ছড়ায় আশা করি আপনি তা জানেন। আমরা কোনো বিষয়ে আগ্রহী হলে সাধারণত কোনো সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে তা খোজার চেষ্টা করি বা আমাদের জানা হাতে গোনা কিছু ওয়েবসাইটে ঢু মেরে দেখি। সার্চ ইঞ্জিনে আমরা সচরাচর প্রথম এক-দুই পেইজের বেশি যাই না, অর্থাৎ সার্চ ইঞ্জিন আমাদেরকে যে পথে চালায়, আমরা সেদিকেই চলি। যে ওয়েবপেইজে ট্রাফিক যত বেশি, সে পেইজটি সার্চ ইঞ্জিনের রেজাল্টে আগে আসার সম্ভাবনা তত বেশি। ব্যতিক্রমও অবশ্য আছে। টাকা খরচ করলে সার্চ রেজাল্টে আগে আসা সম্ভব, তবে তেমন ওয়েবসাইটের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক অনেক কম।

তার মানে হলো আমরা যত বেশি ইসলামবিরোধী ওয়েবপেইজগুলোতে ভিসিট করব, তাদের হিট কাউন্ট ততো বেশি হবে, ফলে সার্চ ইঞ্জিনের রেজাল্টে তাদের নাম আগে আসতে থাকবে। এতে করে আরো বেশি লোক ওই ওয়েবপেইজগুলোতে ভিসিট করবে। বেশিরভাগ সময়ে আমাদের অতি উৎসাহী আচরণে ইসলামবিরোধী ওয়েবপেইজগুলো জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

সোশাল মিডিয়ার উদ্ভবের আগে এটিই ছিল ইন্টারনেটে কন্টেন্ট ছড়ানোর মূল উপায়। এখন সময় পাল্টেছে, সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে কন্টেন্টই এখন আমাদের কাছে এসে হাজির হচ্ছে। এখন চাইলে যে কোনো কন্টেন্ট সহজেই অন্যদের সাথে শেয়ার করা যায়, ফলে অল্প দিনের মধ্যেই কোনো ওয়েবপেইজে মিলিয়ন হিট সম্ভব। “ইনোসেন্স অফ মুসলিমস”-এর ইউটিউব ভিডিওটি এর একটি উদাহরণ।

আমরা যত বেশি “লাইক” বাটন প্রেস করব, যত বেশি “শেয়ার” করব, কোনো কন্টেন্ট তত বেশি ছড়াবে, মূল সাইটে হিট তত বেশি হবে, ফলশ্রুতিতে সেটি সার্চ ইঞ্জিনের রেজাল্টে আগে আসবে, সেখান থেকে আরও বেশি ছড়াবে। এটি একটি চক্রের মতো। এই চক্রের ফাঁদে পড়ে আমরা অনেক সময় না বুঝেই ইসলামবিরোধী অনেক ওয়েবপেইজকে জনপ্রিয় করে দিচ্ছি। সময় এসেছে সচেতন হওয়ার। সময় এসেছে এই চক্র ভাঙ্গার। এই চক্র আমাদেরকেই ভাঙ্গতে হবে।

০০০

ইসলামের বিরুদ্ধে উস্কানিদাতাদের চক্র ভাঙ্গার ফর্মুলা:

১ – আপনি যদি ইসলামবিরোধী ওয়েবপেইজের লিঙ্কযুক্ত কোনো ইমেইল পান তবে লিঙ্কটিতে না ঢুকে সঙ্গে সঙ্গে ইমেইলটি ডিলিট করে দিন। কাউকে ভুলেও ফরোয়ার্ড করবেন না।

২ – সোশাল মিডিয়া যেমন ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি ব্যবহারের সময় সাবধানতা অবলম্বন করুন। মনে রাখবেন, সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়ানো সব তথ্য সব সময় সঠিক নাও হতে পারে।

৩ – সোশাল মিডিয়াতে ইসলামবিরোধী কোনো লিঙ্ক পেলে চারটি কাজ করবেন:

প্রথমত, লিঙ্কটিতে ক্লিক করবেন না।

দ্বিতীয়ত, লিঙ্কটি “শেয়ার” করবেন না।

তৃতীয়ত, লিঙ্কটিকে “লাইক” করবেন না।

চতুর্থত, লিঙ্কটি নিয়ে কোনো “কমেন্ট” করবেন না।

৪ – অপ্রয়োজনীয় কৌতুহল বর্জন করুন। কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে খামখা ইসলামবিরোধী কন্টেন্টের হিট কাউন্ট বাড়ানো থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকুন।

আমরা যদি পাত্তা না দেই তবে প্রযুক্তির প্রসারের এই যুগে ইসলামবিরোধী “ক্রিয়েটিভ” লোকদের আগ্রহে ধীরে ধীরে ভাটা পড়বে। আপনি যদি তাদের পাতা সুপ্ত আগুনে ফু দেয়া থেকে বিরত থাকেন তবে তাদের নিভু নিভু আগুন আর জ্বলবে না, মানুষের আগ্রহের অভাবে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে একসময় তা নিভে যাবে।

আসুন আগুনে ফু দেয়া নলটাকে তুলে রাখি, পরিবর্তে নিজেদেরকে ভালো মুসলিম বানানোর ব্যাপারে যত্নবান হই।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s