বিক্ষিপ্ত কথোপকথন

“রাতে ঘুমান কেমনে শাহরিয়ার ভাই” – বন্ধুপ্রতিম এক্স-কলিগকে আমার প্রশ্ন গুগল টক-এ! কেন? প্রশ্নের আকস্মিকতায় ভদ্রলোক খানিকটা বিহ্বল! কথা হচ্ছিলো ডকিন্স সাহেবের সাথে আল-জাযিরা টিভিতে মেহদি হাসানের সাম্প্রতিক ইন্টারভিউ আর গার্ডিয়ান-এ ওইদিনই প্রকাশিত একটা লেখা নিয়ে; যেখানে শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞানী হিগস সাহেব ডকিন্স মহাশয়কে মৌলবাদী বলেছেন! আমরা দুইজনই মেহদি হাসানের ইন্টারভিউ পারফর্মেন্সে মুগ্ধ! আমি আগে থেকেই মেহদির লেখালেখির সাথে পরিচিত গার্ডিয়ান আর নিউ স্টেটসম্যান-এর সূত্রে। শাহরিয়ার ভাইকে বলছিলাম সেই কথা। বলছিলাম তাকে মেহদি হাসানের উপর ডক্টর তারিক রামাদানের প্রভাব রয়েছে। ডক্টর রামাদানের ইউরোপিয়ান মুসলিম আইডেন্টিটি তত্ত্বের আমি একজন মুগ্ধ ভক্ত হওয়ায় মেহদি হাসানের পারফর্মেন্সে আমি হয়তোবা একটু বেশিই খুশি হয়েছি!

শাহরিয়ার ভাই বললেন আমাদেরও ডক্টর রামাদানের লোকাল ভার্সন দরকার! যারা মুসলিম আইডেন্টিটি নিয়ে কাজ করবে।

আমাদের আরো অনেক কিছুই প্রয়োজন, বললাম আমি। সবথেকে বেশি প্রয়োজন perspective-এর!

কিরকম? তার প্রশ্ন। 

lighthouseরাতে ঘুমান কেমনে শাহরিয়ার ভাই – আমার আচমকা আক্রমণ! আপনার পাশের বস্তিতে যে লোক তার বউ-বাচ্চা নিয়ে তীব্র শীতে কষ্ট পাচ্ছে তার খোঁজ কি নিয়েছেন? আমি নিয়েছি? কি ধরনের মুসলমান আমরা! সিরিয়া, ফিলিস্তিন নিয়ে আমরা অশ্রু ঝরাই, মিসর নিয়ে বিতর্কে নামি; সাপ্তাহিক হালাকা করি নিয়ম করে, বিভিন্ন ধর্মীয় কোর্স এটেন্ড করি গাঁটের পয়সা খরচ করে – বিদ্যার জাহাজ হয়ে সেটা জাহির করি সালাফি- সুফি- আর তাবলীগ এর চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করে! ওয়াল্লাহি, উম্মাহ-র দায়ভার আমার একার না! আপনারও না। কিন্তু আমার- আপনার প্রতিবেশী কিন্তু আমার আপনার ডাইরেক্ট রেস্পন্সিবিলিটি। এতোখানিই রেস্পন্সিবিলিটি যে সাহাবারা আশঙ্কা করছিলেন প্রতিবেশীকে না রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। এতোখানিই রেস্পন্সিবিলিটি যে প্রতিবেশীকে ক্ষুধায় কষ্ট পেলে আমার আপনার মুসলমানিত্ত নাকচ করেছেন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। শাহরিয়ার ভাই, ধর্মের এই perspective টা আজকে পুরাপুরি হারিয়ে গেছে। এইটার পুনরূজ্জীবন, রিভাইভাল, আমাদের সবথেকে বেশি প্রয়োজন!

শাহরিয়ার ভাই একমত: আমরা আসলে দ্বীন শিখছি ভুলভাবে!

আমি ইমোশনাল! কিছুটা উত্তেজিতও! “আপনার আমার ব্যাংক ব্যাল্যান্স অনেক, তারপরেও আমরা কেনো এতো হাড় কিপ্টা? ওয়াল্লাহি, এইভাবে কেমন করে আমার রাব্ব-এর সামনে দাঁড়াব আমি? আপনি? কি জবাব দিবেন তাঁর প্রশ্নের যখন specifically প্রতিবেশীকে নিয়ে প্রশ্ন করবেন তিনি? আমাদের জাহাজ বোঝাই জ্ঞান কি কোন কাজে দিবে তখন? আমরা অযথা সময় নষ্ট করছি শাহরিয়ার ভাই, আমরা আমাদের সারাটা জীবন নষ্ট করছি! কিসের ঘোরে আল্লাহ মালুম!”

আমি চালিয়েই যাই: “আমার বাসার বয়স্ক কাজের বুয়া কয়দিন পরপরই কামাই করছে। একদিন আসে, দুইদিন আসে না। আমরা বিরক্ত। মহিলার দাবী তার বারবার জ্বর আসছে। আত্মমগ্ন আমরা একটুখানি ভাবলাম না, এই মহিলার ঘরে শীতের কাপড় আছে তো? কম্বলের ওম আমাদের এতোই সুখে রেখেছে যে চোখে পর্যন্ত মেদ জমে যাচ্ছে মনে হয়! নাহলে এই প্রশ্ন কেনো একবারও করলাম না আমরা? কেনো উনাকে আমাদের কাছে কাঁথা চাইতে হলো? উনার হাত পাতার আগেই কি আমাদের হাত বাড়ানোর কথা ছিলো না? সেটাই তো সম্মানজনক হতো; সেটাইকি আমাদের করণীয় ছিলো না? আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত শাহরিয়ার ভাই, আন্তরিক তাওবা করে আল্লাহ-র উপর তাওয়াককুল করা উচিত।” আমি থামি!

“আমার বিবিএ ডিগ্রী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর কর্পোরেট-এর পরিবেশ আসলে আমাকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে”- শাহরিয়ার ভাইয়ের সরল স্বীকারোক্তি!

“কিন্তু এটা কোনো ওজুহাত হতে পারে না; আপনার ধর্ম তো আপনাকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা!”, আমার উত্তর।

“কেন বুঝলামনা, সেইটাও হয় নাই!”

“ইমাম সুহাইব ওয়েব একটা গল্প বলেছিলেন তাঁর কোনো এক লেকচারে। উনার এক ক্লাসমেট ছিলেন আল আযহার-এ। একদিন খুব বিদ্ধস্থ অবস্থায় ক্লাসে হাজির। দেখেই বুঝা যাচ্ছিলো খুব পরিশ্রান্ত। শাইখ জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছিলো? উনি বল্লেনঃ ক্লাসে আসার পথে রাস্তায় এক বৃদ্ধ লোকের সাথে দেখা। বৃদ্ধ এতোই ভারী কিছু একটা বইছিলেন যে কুঁজো হয়ে তার মাথা হাঁটু ছুই ছুই। আমি উনার সেই বোঝা বয়ে উনার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে এসেছি! শাইখ খুশি হলেন; উনাকে সম্মান জানালেন। আর ক্লাসকে বল্লেন: যে জ্ঞান তোমাকে মানুষের কাছে নেয় না, তা জ্ঞান না। চিন্তা করে দেখেন শাহরিয়ার ভাই, আপনি আমি কি আমাদের তথাকথিত ফর্মাল ড্রেস-এ পারবো এই কাজ করতে? অথচ একজন আযহারী তাঁর full আযহারী বেশভূষায় কিন্তু ঠিকই তা পেরেছেন। আমরা আসলে জ্ঞানীর ভেক ধরা মূর্খ; সাধুবেশী ভণ্ড!”

শাহরিয়ার ভাই বল্লেন: আমরা জ্ঞানী কখনোই না! আমরা শুধু কিছু তত্ত্ব- তথ্য আত্মস্থ করেছি, সেগুলো জ্ঞানে রূপান্তরিত হয়নি একটুও! Knowledge demands action! আমাদের ইউনুস সাহেব ঠিকই বলেছেন:

Money is a means, it cannot be an end. Helping others is the only way to put your signature on the planet.

১০০% হক কথা, আমি সম্মতি দেই।

অফিস শেষে বাড়ি ফেরার তাড়া! কথোপকথন সমাপ্ত! কিন্তু অ্যাকশান-এর কি কিছু হলো?

বাড়ি ফেরার পথে ২৫ খানা কম্বল কিনলাম। ২টা পেলেন বুয়া। দারোয়ান- কেয়ারটেকার ৩ জনে ৩ টা। বাকি ২০ খানা প্রতিবেশী। মোযাম্মেল যখন গভীর রাতে ছাপড়া ঘরগুলোর দরজা ধাক্কিয়ে মানুষজনের ঘুম ভাঙ্গিয়ে ওগুলো দিলো, আমি দূরে দাঁড়িয়ে কাঁদলাম। Forgive me my Lord, for I’ve sinned.

আমার দৌড় ওইটুকুনই,

গান লেখা আর সুর বুলানো!

আমার নিবাস পাকা বাড়ি,

আমার পেশা মন ভুলানো! – কবির সুমন

বিঃ দ্রঃ I’d request for some “perspective”, before you become critical of me!

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১২ সালের ২৮শে ডিসেম্বর তারিখে অধুনালুপ্ত “হৃদয়ে ইসলাম” ব্লগে।   

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close