কেমন হতো যদি আল্লাহ্‌ দাম্ভিক হতেন?

মিয়া বাড়ি- মুন্সি বাড়ির একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতার গল্প এখন বহু ব্যবহারে সস্তা ক্লিশে (cliche)-তে পরিণত হয়ে গেছে। তাও আবার শুনুন- লেখার খাতিরে একটু কাস্টোমাইজ করে নিয়েছি!

গরিব কৃষক শামসু মিয়ার মেয়ের বিয়ে। জমি-জিরেত বেচেও বেচারা প্রয়োজনীয় টাকা যোগাড় করতে পারলেন না। বউয়ের সাথে পরামর্শ করে তিনি গেলেন মিয়া বাড়ির বড় কর্তার দ্বারে- একটু সাহায্যের আশায়। বড় কর্তা হাজারো ঝামেলার কথা শুনালেন- ব্যবসায় মন্দা, ক্ষরায় ফসল নষ্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই বলে একদম খালি হাতে ফেরালেন না তিনি; ১০০ টাকার একটা নোট দিলেন শামসুর হাতে।

হতাশ হলেও শামসু উদ্যম হারালেন না। গেলেন গ্রামের আরেক বড় গেরস্থ মুন্সী সাহেবের কাছে। মুন্সী সাহেব আবার দানশীল হিসেবে খ্যাত। কাউকেই খালি হাতে ফেরান না; তার বড় অংকের দানেইতো মসজিদের উঁচু মিনার তৈরি হল গেল শীতে। তিনি নিশ্চয় মিয়া বাড়ির কর্তার মত কিপ্টেমি করবেন না।

মুন্সী সাহেব পানের পিক ফেলে জিগ্যেস করলেন- ‘হ্যাঁরে শামসু, মিয়া বাড়ি গেসিলি নাকি? কি পাইলি?’ শামসু যা পাইসে বলল। মুন্সী সাহেব বিশাল গোস্যা! ‘ওই ফকিরনীর পুতের কাছে গেসিলি ক্যান তুই আমার কাছে আসার আগে? তোর কি হেরে আমার থেকে বেশি ধনী মনে হয়? না হে আমার থেকে বেশি দান খয়রাত করে? বড় বেয়াদব হইসস তুই। ভাবসিলাম তর মেয়ের বিয়েতে ৫০০ টা টাকা দিমু। যা ভাগ, অহন আর কিছুই দিমু না। তোর এই অপমান আমি ভুলুম না, বেটা চাষা।’

কতো গর্ব, কতো দম্ভ আমাদের। যে আমার জন্ম মুহূর্তে আমার বাবা-মাকে পবিত্রতা অর্জনের জন্য ফরজ গোসল করতে হয়েছিল, যে আমার শেষ ঠিকানা মাটির এক গর্তে, যে আমার মুখে ছুঁড়ে মারা হবে মুঠো মুঠো মাটি, সেই আমি দম্ভের ভারে হাঁটতেই পারি না! (courtesy: মীর্জা ইয়াওয়ার বেগ)

অথচ আমাদের স্রষ্টা? কেমন হতো যদি আমাদের আল্লাহ্‌ দাম্ভিক হতেন? কী হতো যদি আমরা নিজের সকল চেষ্টা শেষে (after exhausting all means) আল্লাহ্‌র দ্বারস্থ হতাম আর আল্লাহ্‌ আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন?

শাইখ আব্দুল কাদির আল জিলানী (মৃত্যু ৫৬১ হি/ ১১৬৬ খ্রি:) ছিলেন তৎকালীন বাগদাদের প্রধানতম হাম্বালী স্কলার। একইসাথে তিনি ছিলেন যুগসেরা আধ্যাত্মিক গুরু। ফুতুহ আল- গাইব  নামে তার বক্তৃতার একটি বিখ্যাত সংকলন আছে। সেই সংকলনের তৃতীয় বক্তৃতা তিনি শুরু করেছেন এভাবে-

যখন বান্দা কোনো দুঃখ-কষ্টের পরীক্ষায় পড়ে, তখন প্রথমতঃ সে নিজে থেকে সেই পরীক্ষার সাথে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে। যদি নিজে নিজে পরীক্ষা থেকে বের হয়ে আসতে না পারে, তবে সে অন্যের সাহায্য চায়- ক্ষমতাবানদের সাহায্য চায়, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাহায্য চায়, বিত্তবান বা প্রভাবশালীদের সাহায্য চায়; অথবা রোগ হলে ডাক্তারের সাহায্য চায়। এর পরেও যদি নিবৃতি না পায়, তখন সে প্রশংসার ডালি নিয়ে আল্লাহ্‌র দরবারে হাত তোলে, কাকুতি মিনতি করে বিপদমুক্তির জন্য। যতক্ষণ সে নিজেকে বিপদের মোকাবেলায় যথেষ্ট মনে করে, ততক্ষণ সে অন্য কোনো মানুষের সাহায্য চায় না। আর যতক্ষণ সে অন্য মানুষের উপর নির্ভর করতে পারে, ততক্ষণ সে আল্লাহ্‌র শরণাপন্ন হয় না।

???????????????????????????????????????????????????????শেষ ভরসা হিসেবে আল্লাহ্‌র শরণাপন্ন হওয়া, সবাই ভুলে গেলে পরে আল্লাহ্‌কে মনে পড়া বা কেবল নৌকাডুবির মুহূর্তে আল্লাহ্‌র কাছে হাত তোলা- এগুলো মোটেও কোনো কাজের কথা না। আল্লাহ্‌ যদি আমাদের মত দাম্ভিক হতেন, তাহলে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের দিকে ফিরেও তাকাতেন না। কিন্তু আল্লাহ্‌ তো দাম্ভিক নন, বরং পরম দয়ালু, দরদী আর ক্ষমাশীল। সকল দরজা বন্ধ দেখে, অন্য উপায় না পেয়ে যখন তার দরজায় যাই, সেই তখনও তিনি আমাদের গ্রহণ করেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন না- অন্যের দরজায় কেন আগে গেলে? কেন আমার কাছেই প্রথমে আসলে না? কেন কানা গলির শেষ মাথায় এসে, দেয়ালে পিঠ ঠেকার পরে আমার কাছে আসলে? শুধুমাত্র জাহান্নামের আগুনের ভয়ে আল্লাহ্‌কে স্মরণ করা কোনোমতেই তাঁর মহিমা ঘোষণা করে না। আল্লাহ্‌ কিন্তু এইটুকুও সাদরে গ্রহণ করেন। এতোই তাঁর করুনা, দয়া। তাঁর মহিমার অবনমনকেও তিনি ক্ষমা করে দেন, ছেড়ে দেন।

2:186

“আর হে নবী! আমার বান্দা যদি তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, (তাহলে তাদেরকে বলে দাও), আমি তাদের কাছেই আছি। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই।” (সূরা আল বাক্বারা, আয়াত ১৮৬)

এই একই বক্তৃতায় শাইখ আব্দুল কাদির আল জিলানী সেই মুহূর্তের কথা বলেন যে মুহূর্তে বান্দার স্বাবলম্বিতার মিথ্যা বিভ্রম চুরমার হয়ে যায়, (বান্দার নিজের স্বার্থে তার এই বিভ্রম ভাঙতেই হবে) আর সে বুঝতে পারে আল্লাহ্‌ ছাড়া তার আর কোনো সাহায্যকারী নেই- বান্দার সেই অসহায় ভঙ্গুর অবস্থায় আল্লাহ্‌ তার ডাক শুনেন- তাকে ক্ষমা আর মমতার ছায়ায় স্থান দেন। কারণ আল্লাহ্‌ তার বান্দাকে সাদরে গ্রহণ করেন, তা সে যেভাবেই তার কাছে আসুক না কেন। অনুরক্ত ভালোবাসায় নত না হয়ে সে যদি তাঁর কাছে বিপদ-আপদে পড়েও আসে, অথবা তাঁর মহিমার অবমাননা করে যদি শুধু জাহান্নামের আগুনের ভয়েও হাজির হয়, তিনি তাকে ফিরিয়ে দেন না- সাদরে গ্রহণ করেন!

মূল লেখা: http://thehumblei.com/2012/08/25/if-god-were-proud/

লেখকের সদয় অনুমতি নিয়ে রূপান্তরিত

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close