উপাসনা না দাসত্ব? (অনুবাদ)

উস্তাদ নুমান আলী খানের একটি লেকচার থেকে অনুদিত, যেখানে তিনি সূরা কাফিরূন-এর দ্বিতীয় আয়াতটি ব্যাখ্যা করেছেন।  

আমি আপনাদেরকে আরবি শব্দ “ইবাদাহ” বা এর মাছদার “উবুদিয়া”-এর অর্থ বোঝাতে চাই। শব্দটি দ্বারা দু’টি জিনিস বোঝায়, যদি আমি এর যেকোনো একটি অর্থ ব্যবহার করে অনুবাদ করি তাহলে অনুবাদটি হবে অসম্পূর্ণ। এটা ক্লাসিকাল আরবির বিপরীতে ইংরেজি বা বাংলার সীমাবদ্বতা। ক্লাসিকাল আরবির একটি শব্দ দিয়ে একই সময়ে অনেকগুলো অর্থ প্রকাশ করা হতো। যদি আমরা এই ধারণাটি (ইবাদা শব্দটি) আংশিক বাংলা অর্থ দিয়ে অনুবাদ করি, তাহলে বিভ্রান্তিতে পড়ে যাই। যে দু’টি পদ আরবি শব্দ ইবাদার পরিপূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে তাহলো – উপাসনা এবং দাসত্ব। অধিকাংশ সময় আমরা যেকোনো একটি অর্থ গ্রহণ করি। বাংলায় দু’টি আলাদা বিষয়, কিন্তু আরবি একটি শব্দ ইবাদা দ্বারা উভয়টিই বোঝায়। সুতরাং যখন রাসুল (স) বলেন, ‘লা আ’বুদু মা তা’বুদুন’ – এর অর্থ শুধু এটা নয় যে, আমি উপাসনা করব না, বরং এর অর্থ এটাও যে, আমি গোলাম হব না , আমি দাস হব না।

man-prayingসংক্ষিপ্তভাবে আমি আপনাদেরকে উপাসনা এবং দাসত্বের পার্থক্য স্মরণ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করব। যখন মাগরিবের নামাজের সময় হয়, আমরা আল্লাহর উপাসনা করি। আবার যখন এশার নামাজের সময় হবে, আমরা উপাসনা করব। কিন্তু এই দুই নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে আমরা কী? আল্লাহর দাস। যখন আপনি ঘুমাচ্ছেন আপনি উপাসনা করছেন না, কিন্তু তখনও আপনি আল্লাহর একজন দাস। যখন আপনি ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন, গাড়ি চালিয়ে কাজে যাচ্ছেন, দাঁত ব্রাশ করছেন, নাস্তা করছেন, গাড়ি পার্ক করছেন – যদিও এই সময় আপনি কুরআন তিলাওয়াত করছেন না বা  কোনো উপাসনার কাজ করছেন না – কিন্তু এই সময়েও আপনি আল্লাহর একজন দাস।

অন্য কথায় উপাসনা হলো – কিছু সুনির্দিষ্ট কাজের নাম। রোজা রাখা, নামাজ পড়া, হজ্জ পালন করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, দান করা – এসব কাজ হলো উপাসনা। কিন্তু একজন দাস সবসময়ই একজন দাস। সে এই কাজগুলো পালন করুক আর নাই করুক। এই ধারণাটি খুবই শক্তিশালী। এর মানে হলো – আমাদেরকে জীবন যাপন করতে হবে সেভাবে- যেভাবে আল্লাহ জীবন যাপন করতে বলেছেন। শুধুমাত্র জুমার নামাজ পড়া বা খুতবা শোনার সময়ই নয়। আমরা দুই নামাজের মধ্যবর্তী সময়েও আল্লাহর বান্দা।

সূরা বাকারার ২৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন:

“সমস্ত নামাযের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে। আর আল্লাহর সামনে একান্ত আদবের সাথে দাঁড়াও।”

কোনো কোনো তাফসীরকারকের মতে  الصَّلَاةِ الْوُسْطَىٰ  মানে হলো — দুই নামাজের মধ্যবর্তী সময় আল্লাহর সাথে সম্পর্ক যুক্ত থাকা।

আপনারা জানেন, অধিকাংশ সময় লোকজনের কী হয়? লোকজন আল্লাহর উপাসনা করে কিন্তু তার দাসের মত আচরণ করে না। কারো কারো মদের দোকান আছে, আবার প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ পড়তে আসে। সে আল্লাহর উপাসনা করে, কিন্তু সুস্পষ্টরূপে সে কার মতো আচরণ করে না? আল্লাহর দাস। সে আল্লাহর নির্দেশ পালন করছে না। যেহেতু আমাদের কাছে ইবাদতের এই আংশিক অনুবাদ আছে, এতে কি ঘটে আপনারা জানেন, আমরা নিজেদেরকে এই বলে সান্তনা দেই যে , অন্তত:পক্ষে আমিতো আল্লাহর উপাসনা করছি। সুতরাং কাজ শেষ। না, আপনি আল্লাহর উপাসনা করেন কিন্তু এখনো আপনি আল্লাহর বান্দা নন। উপাসনা হলো একটি অংশ আর দাসত্ব হলো অন্য অংশ। উপাসনা এবং দাসত্ব উভয়ই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।

এখন আরবদের দুটো সমস্যা ছিলো:

এক. তারা আল্লাহর উপাসনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। কিন্তু আপনারা জানেন তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী ছিল?

দুই. তারা আল্লাহর দাস হতে অস্বীকার করেছিল।

এখানে দু’টো সমস্যার কথা বলা হয়েছে। আমাদেরকে তা সুস্পষ্ট করে তুলে ধরতে হবে। যখন তারা শুধুমাত্র আল্লাহকে সিজদা করতে এবং সকল প্রকার প্রতিমা-মূর্তি পূজা ত্যাগ করতে অস্বীকার করল, তখন  এটা কোন প্রকারের সমস্যা ছিলো? উপাসনাগত না দাসত্বসম্পর্কিত? এটা একটা উপাসনাকেন্দ্রিক সমস্যা। কিন্তু যখন তারা এতিমকে দান করতে অস্বীকার করলো, যখন তারা কন্যা সন্তানকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকতে প্রত্যাখ্যান করলো, যখন তারা অভাবীদের অন্ন দিতে অস্বীকার করলো, যখন তারা ন্যায় বিচার করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো, যখন তারা বিনা বিচারে খুন করা থেকে বিরত থাকতে অসম্মত হলো, যখন তারা দাসদেরকে নির্যাতন করতে থাকলো, যখন তারা এসব কিছু করতে থাকলো তখন তারা মূলত কি করতে অস্বীকার করলো? তারা আল্লাহর গোলামের মত আচরণ করতে অস্বীকার করলো।

আল্লাহর দাস হওয়া – উপাসনা এবং দাসত্ব – দুটোই অন্তর্ভুক্ত করে। এখন আয়াতটি বুঝতে চেষ্টা করুন।

আমি  গোলাম হবো না এবং আমি পূজা করব না তার, তোমরা যার উপাসনা এবং গোলামী করছ।

এই আয়াতে রাসুল (স)-কে তাদের সম্পর্কে কথা বলতে বলা হয়েছে, মুশরিকরা যার পূজা করে এবং যার গোলামী করে। এখন তারা কার উপাসনা করত এবং কার গোলামী করত? তারা একদিকে ছিল মূর্তিপূজারী, মিথ্যা খোদার পূজারী। আর অন্যদিকে তারা ছিল তাদের প্রবৃত্তির দাস।  দুটো বিষয়: ১. তারা মূর্তি পূজা করত এবং ২. তারা নিজেরা নিজেদের গোলাম ছিল। তারা নিজেদের নফসের দাস ছিলো। আর রাসুল (স) বলেন, আমি তোমাদের মূর্তির পূজা করতে অস্বীকার করছি এবং আমি একই সাথে আমার নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব করতেও অস্বীকার করছি। আমি উভয়ই প্রত্যাখ্যান করছি।

মুশরিকরা বলল যে তিনি প্রায় এক দশক যাবত আমাদের ধর্ম অস্বীকার করছেন। চলো তার সাথে একটা সমঝোতায় আসি, ভবিষ্যত এতে ভালো হবে আশা করি। সবসময় মুসলিম-অমুসলিম দ্বন্দে মক্কা হয়ে গিয়েছিল তখন অশান্তিময়। চলো একটা সমঝোতায় আসি, এতে জীবনযাপন শান্তিময় হয়ে উঠবে।  আমরা একবছরের জন্য আপনার  ধর্ম গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তারপর পরবর্তী বছর আপনি আমাদের ধর্ম  গ্রহণ করবেন। তারপর আমরা আবার আপনার ধর্ম গ্রহণ করব এবং পরের বছর আপনি আবার আমাদের। অন্য কথায়, আমরা সবাই এক সময়ের জন্য ইসলাম পালন করব, আবার অন্য সময়ের জন্য শিরক পালন করব। যদি আমরা সমঝোতা করি, তাহলে মক্কায় আর কোনো অশান্তি থাকবে না। আমাদের ভবিষ্যত হবে উন্নত।

লা আ’বুদু  — অধিকাংশ ব্যাকরণবিদ এর মতে — যেটা মুদারে — মুদারে বর্তমানের চেয়েও ভবিষ্যতের উপর গুরুত্বারোপ করে বেশি। অন্য কথায়, রাসুল (স) বলেন, তোমরা এত বেশি আশা করো না। আমি এটা করতে যাচ্ছি না, এটা কখনোই ঘটবে না। তোমরা যদি মনে কর এতে ভবিষ্যত ভালো হবে তবুও — তোমরা যার গোলাম এবং উপাসক, আমি কখনই তার গোলাম এবং উপাসক হব না।

সূত্র: https://www.facebook.com/notes/1436388243282464/  

ইংরেজিতে মূল লেকচারটি দেখুন এখানে:

Advertisements

3 thoughts on “উপাসনা না দাসত্ব? (অনুবাদ)

  1. পিংব্যাকঃ আরবি শব্দ “দ্বীন”-এর পাঁচটি অর্থ | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ অমুসলিম মাত্রই কি কাফির? | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ নামাজ না পড়েও ‘ভালো’ হওয়া যায় কি? | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s