অসাম্প্রদায়িকতার শেকড় সন্ধানে (পর্ব ২): শান্তির শহরে, প্রীতির বন্ধনে

প্রথম পর্ব

 

masjid_al_nabawi_old_pic

ইসলামের বিধিবিধানগুলো পালন ও ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবারা মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনার আউস ও খাজরাজ — এই দুই সম্প্রদায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে মদিনায় স্বাগতম জানান। এরা রাজি হন যে, তারা শত্রুপক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবাদের রক্ষা করবেন। কিন্তু রাসুল (সা.) মদিনায় এসে এই দুই গোষ্ঠী বাদেও আরও অনেক সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব দেখতে পান।

তাই মক্কা থেকে শান্তির দেশ মদিনায় এলে আমরা দেখব অসাম্প্রদায়িকতার সব স্ট্র্যাটেজিক বাস্তবায়ন। এখানে আমাদের সামাজিক জীবন থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রের জন্যই ব্যাপক শিক্ষা লক্ষণীয়। চলুন ঘুরে আসা যাক। 

মদিনা চুক্তির বিষয়: আপনি যখন শুরুর দিকের মদিনার সমাজের গঠণটাকে দেখবেন তখন আপনি পাবেন তিন ধরণের ধর্মের মানুষ যেমন- মুসলিম, বহু-উপাস্যে বিশ্বাসী (মুশরিক) এবং ইহুদি। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা:) কতই-না সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য উপায়ে সেই ডায়নামিক সমাজের মধ্যে শান্তি বজায় রেখেছিলেন একটি চুক্তির মাধ্যমে, যার অনেক বিষয় আজকের তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠণের বোদ্ধা এবং নওজওয়ান রক্তগরম মুসলিমদের জন্য হতে পারে অনন্য এক দৃষ্টান্ত। এখানে আমি Al-Kauthar Institute এর “The Victorious One” কোর্স থেকে Treaty of Madinah বা মদিনা চুক্তি সনদের পয়েন্টগুলো উল্লেখ করলাম:

The Jews of Bani ‘Awf are one community with the believers. The Jews will profess their religion and the Muslim theirs.
The Jews shall be responsible for their expenditure, and the Muslims for theirs.
If attacked by a 3rd party, each shall come to the assistance of the other.
Each party shall hold counsel with the other. Mutual relation shall be founded on righteousness; sin is totally excluded.
Neither shall commit sins to the prejudice of the other.
The wronged party shall be aided.
The Jews shall contribute to the cost of war so long as they are fighting alongside the believers.
Madinah shall remain sacred and inviolable for all that join this treaty.
Should any disagreement arise between the signatories to this treaty, then Allah, the All-High and His Messenger shall settle the dispute.
The signatories to this treaty shall boycott Quraysh commercially; they shall also abstain from extending any support to them.
Each shall contribute to defending Madinah, in case of a foreign attack, in its respective area.
This treaty shall not hinder either party from seeking lawful revenge.

মুনাফিকদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন: মদিনাতে কিছু গোত্রের নেতা মুনাফিক ছিলেন যারা তাদের নিজেদের মুসলিম বলতেন কিন্তু আড়ালে মুসলিমদের ক্ষতি করার চেষ্টা করতেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এসব মুনাফিকদের নাম জানিয়ে দিয়েছিলেন এবং হুযায়ফাহ (রা.)-এর কাছে এসব মুনাফিকদের নামের একটি তালিকাও থাকত। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন তখন তিনি এইসব গোত্রের নেতাদের সাথেও আলোচনা করতেন এবং তাদের পরামর্শ নিতেন, যদিও তিনি জানতেন যে তারা ইসলামের ক্ষতি করছে। আপনার ক্ষতি হবে জেনেও কখনো কি আপনি এরকম লোকের সাথে আলোচনা করবেন? আজকাল আমাদের দেশের নেতাদের দিকেই দেখুন। তারা তো ‘গণতন্ত্র চর্চা’ করছেন, তবুও একজন আরেকজনকে সহ্য করতে পারেন না; আর আলোচনা তো দূরের কথা। কিন্তু নিজেদের আবার সাম্প্রদায়িক বলতে তারা নারাজ।

যুদ্ধকালীন নির্দেশনা: ইসলামের ইতিহাসে যেসব যুদ্ধ হয়েছিল সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কিছু নির্দেশনা থাকত। যেমন, কারও ফসলের ক্ষতি করা যাবে না; নারী, বৃদ্ধ ও শিশুদের ওপর অত্যাচার করা যাবে না; শত্রু পক্ষের কেউ যদি যুদ্ধ থেকে নিজ ইচ্ছায় পিছিয়ে যায় তবে তাকে আর আঘাত করা যাবে না ইত্যাদি। সর্বোপরি, যুদ্ধের ময়দানেও মানুষের সর্বোত্তম ভালোমন্দ বিবেচনা মাথায় রেখে যে কোনো কাজ করতে হবে। একটু ভেবে দেখুন, আজকাল যারা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ তারাও হয়তো এত ফাইন লাইন ড্র করতে পারবেন না, কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা অন্য কোনো ইস্যুতে। প্রসঙ্গত কুরআনের সূরা আত-তাওবাহ-এর একটি আয়াত (৯:১২৮) এখানে তুলে ধরলাম –

 

“তোমারদের কাছে তোমাদেরই মধ্য থেকে এক রাসূল এসেছেন, তোমাদের কোনোরকম কষ্ট ভোগ তাঁর কাছে দু:সহ, তিনি তোমাদের একান্ত কল্যাণকামী, বিশ্বাসীদের প্রতি তিনি হচ্ছেন স্নেহপরায়ণ ও পরম দয়ালু”

সাধারণ ক্ষমার ঘোষনা: মক্কা বিজয়ের পর ক্ষমতা পেয়েও মুশরিকদের ক্ষমা করার উদারতা দেখলে আপনি হয়ত ভাববেন এও কি সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব! রাসুলুল্লাহ (সা.) তাই করেছিলেন, এটা কি অসাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টান্ত নয়? আর আমরা আজকাল একদল আরেকদলের ওপর বিজয় অর্জন করলে তার ওপর চড়াও হয়ে উঠতে পারলেই যেন শান্তি! প্রতিশোধের আগুন আমাদের শরীরে জ্বলে, তবুও নাকি আমরা অসাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করেই চলেছি। না জানি কেমন বিষাক্ত এই বীজ যা ক্যাকটাসের মতো গাছের জন্ম দেবে কোনো এক দিন।

উমার (রা.)-এর ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত: আপনি যদি সাধারণ মানুষদের মধ্যে একজন সফল নেতা দেখতে চান, তাহলে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা (সর্বোচ্চ মুসলিম শাসকের উপাধি) উমারকে দেখুন। বড় বড় যুদ্ধে জয়ী হয়েও অসাধারণভাবে বিভিন্ন দেশ এবং সম্প্রদায়ের মানুষদের মাঝে ন্যায়বিচারের উজ্জ্বল সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তিনি। উমার (রা.)-এর জীবনী নিয়ে বের হওয়া আরবি সিরিয়ালটি (ইংরেজি সাবটাইটেলসহ) দেখতে পারেন, বিশেষ করে শেষ ১০টি পর্ব, যেখানে উমারের শাসনের সময়ের এই ব্যাপারগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, অসাম্প্রদায়িকতার প্রকৃত মানে বুঝতে এটি আপনার জন্য সহায়ক হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি উপদেশ: সর্বশেষে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি উপদেশ এখানে উল্লেখ করছি, নিঃসন্দেহে এটা অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে এবং জান্নাতে যাওয়ার জন্য একটি উপায়ও বটে – “হে মানুষ, সালামের প্রচার করো, অন্যকে খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করো, রাতে সালাত পড়ো যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে, এবং (এর প্রতিদান হিসেবে) শান্তির সাথে জান্নাতে প্রবেশ করো।”

উল্লিখিত হাদীসে, প্রথম তিনটি বিষয় (সালাম, খাওয়ানো, আত্মীয়তা) যে কোনো সম্প্রদায়ের সাথেই আপনি বাস্তবায়ন করতে পারেন, চতুর্থ বিষয়টি (সালাত) হচ্ছে একজন ঈমানদারের আমলের সাথে যুক্ত। আর হাদীসটির একেবারে শেষে একজন সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক ঈমানদারের জন্য প্রতিদানের কথা বলা হয়েছে, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাত ছাড়া উত্তম পুরস্কার আর কিই-বা হতে পারে?

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সবাইকে এরকম সব সুন্দর চিন্তার অধিকারী করুন এবং সত্যিকার শান্তি ফিরিয়ে দিন। আমিন।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি তারিখে অধুনালুপ্ত “হৃদয়ে ইসলাম” ব্লগে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close