সময়কে বাগে আনবেন কীভাবে? (অনুবাদ)

সময়ের ফোঁড়ে যারা এফোঁড়-ওফোঁড়, তাদের জন্য শাইখ ইসমাইল কামদারের সাত ফোঁড়ন…

মূল: শাইখ ইসমাইল কামদার, http://muslimmatters.org/2012/06/01/top-seven-time-management-tips/

time-management

কিছুদিন আগে আমার ফেসবুক পেইজে সময় নিয়ন্ত্রণের ওপর ধারাবাহিকভাবে কতগুলো পোস্ট দিয়েছিলাম। ভাবলাম সেই পোস্টগুলোকে একসাথে জমা করে ফেলি যাতে করে ইনশা আল্লাহ সবাই উপকৃত হতে পারে। আর কথা না-বাড়িয়ে, সময় নিয়ন্ত্রণের জন্য আমি যে কৌশলগুলো প্রয়োগ করি এবং যেগুলো আমার জন্য বেশ কাজে এসেছে—আলহ়ামদুলিল্লাহ—সেগুলো এখানে তুলে ধরছি। 

কৌশল #১: ছোট ছোট সময় ভাগ করে কাজ করা

এক বসায় কখনো কোনো কাজ শেষ করতে যাবেন না, বিশেষ করে কাজটা যদি অনেক সময় সাপেক্ষ হয়। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজটা শেষ করার জন্য ছোট ছোট সময় ভাগ করে নিন। এতে করে অন্যান্য কাজকর্মেও কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।

প্রথম উদাহরণ: ধরা যাক মে মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে কোনো অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে হবে। গবেষণা, খসড়া প্রস্তুত, লেখালেখি, তথ্যসূত্র সংযোজন ও সম্পাদনার জন্য প্রতিদিন এক ঘণ্টার একটা সময় ঠিক করে নিন; বোঝা হয়ে চাপার আগেই দেখবেন কাজটা শেষ হয়ে গেছে।

দ্বিতীয় উদাহরণ: ধরুন, আপনি দু’শো পৃষ্ঠার কোনো বই পড়বেন। প্রতিদিন বিশ পৃষ্ঠা করে পড়লে মাত্র দশদিনেই বইটা পড়া শেষ হয়ে যাবে। বাকি কাজগুলো সমাধা করতে বাড়তি কোনো ঝামেলাও পোহাতে হচ্ছে না এতে।

কৌশল #২: শৃঙ্খলাই মূল চাবিকাঠি

ইহকাল-পরকাল, উভয় দুনিয়াতে যে-কোনো কাজেই সফল হওয়ার জন্য শৃঙ্খলা রক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সময় নিয়ন্ত্রণের বেলায়ও এই কথা প্রযোজ্য। সময় মেনে চলুন, শিডিউল ঠিক রাখুন। যে-কাজ আগে করার কথা সেটাই আগে শেষ করুন।

আলহ়ামদুলিল্লাহ, প্রতিদিন পাঁচ বার সময়মতো সালাত আদায়ের মাধ্যমে—বিশেষ করে খুশূ’ ধরে রেখেইসলাম আমাদের শেখায় কীভাবে নিয়ম মেনে চলতে হয়। সেই সঙ্গে হ়াজ্জ, সিয়াম এবং আমাদের ধর্মের অন্যান্য কাজগুলোও আমাদের শৃঙ্খলা মেনে চলা শেখায়। এগুলো থেকে নিয়মানুবর্তিতার যে শিক্ষা আমরা পাই, আমাদের উচিত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই শিক্ষা প্রয়োগ করা। বিশেষ করে সময় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তো বটেই।

শিডিউল, চেকলিস্ট ইত্যাদি বানাতে যতটা না-নিয়মানুবর্তী হতে হয়, তার চেয়েও বেশি নিয়মানুবর্তিতার প্রয়োজন সেই শিডিউল ঠিকঠাকভাবে মেনে চলার জন্য। অযথা ফোনালাপ কিংবা মনোযোগ নষ্টকারী বিষয়গুলো এড়ানোর জন্য কঠোর নিয়ামানুবর্তিতার বিকল্প নেই। প্রত্যেকটা মুসলিমেরই উচিত সময় মেনে চলার এই অভ্যাস গড়ে তোলা।

কৌশল #৩: সময়ের অপচয় রোধ করা

সারাদিনের কাজের ওপর যারা খুব একটা খেয়াল রাখেন না, তাদের অধিকাংশ সময়ই আজেবাজে কাজে নষ্ট হয়ে যায় (আল-কুরআনে এই ধরনের কাজকে বলা হয়েছে লাগ্‌ও)। সময়ের অপচয় রোধ করার জন্য সবচেয়ে সহজে যে কাজটা আপনি করতে পারেন: প্রতিদিন যে-যে কাজগুলো আপনি করেন, পরবর্তী কয়েকদিন ধরে এর একটা তালিকা তৈরি করুন। তালিকায় চোখ বোলালে আপনি অবাক হয়ে যাবেন যে, প্রতিদিন কত সময় কত আজেবাজে কাজে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে; এই কাজগুলো না আপনার ইহকালীন কোনো কাজে আসছে আর না আসছে পরকালীন কাজে।

বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য যতটুকু সময়ের প্রয়োজন, ততটুকু রেখে, আজেবাজে যেসব কাজে সময়ের অপচয় হয় সেগুলো বন্ধ করে দিন। এর ফলে প্রতিদিন অন্যান্য ভালো ভালো কাজের জন্য আপনি আরও কিছু সময় বের করে নিতে পারবেন।

সময় নষ্ট হওয়ার সাধারণ কিছু কারণ:

১. ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় ওয়েবসাইটগুলোতে অতিরিক্ত সময় নষ্ট করা।

২. ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ফোনে আলাপ করা (অনেক সময় দেখা যায় এতে পরনিন্দার মতো পাপও হচ্ছে)।

৩. টেলিভিশন ও ভিডিও গেমস।

৪. অতিরিক্ত ঘুম।

উল্লিখিত কাজগুলো করতে প্রতিদিন ঠিক যতটুকু সময় দরকার, অতটুকু রেখে (যেমন—ঘুমের জন্য ৬-৮ ঘণ্টা, বিনোদনের জন্য ২-৩ ঘণ্টা), অতিরিক্ত সময়টা কেটে নিলে, অন্যান্য দরকারি কাজগুলোর জন্য আমরা সময় বের করে নিতে পারি।

“বিশ্বাসীরাই সফল…যারা লাগ্‌ও (ফালতু কথা ও কাজ) থেকে বিরত;” [সূরা মু’মিনূন ২৩:১,৩]

কৌশল #৪: শিডিউল তৈরি করা

দৈনিক শিডিউল তৈরি করার চেয়ে আমি সাপ্তাহিক শিডিউল তৈরি করা বেশি পছন্দ করি। কারণ, এতে করে ভবিষ্যত কাজগুলোর সময়সূচি ঠিক করার জন্য আগে থেকেই অনেক সময় পাওয়া যায়। অগ্রিম পরিকল্পনারও সুযোগ পাওয়া যায় এতে।

সাপ্তাহিক শিডিউলের ব্যাপারে স্টিফেন কভে (Stephen Covey) বলেন, “দৈনিক পরিকল্পনা করার চেয়ে, সাপ্তাহিক পরিকল্পনা করলে, যে কাজগুলো করা হবে সেগুলোর সময়সূচি নির্ধারণের বেলায় বেশি সময় পাওয়া যায়, এতে শিডিউল তৈরি করতেও সুবিধা হয়…ব্যবসা, শিক্ষা এবং সমাজের অধিকাংশ কাজগুলোর পরিকল্পনা সাপ্তাহিক একটা লক্ষ্যমাত্রা রেখেই করা হয়। সপ্তাহের কিছু দিন কাজের জন্য ঠিক করুন, আর বাকি দিনগুলো রাখুন বিশ্রাম বা আরাম-আয়েশের জন্য।” (7 Habits of Highly Effective People, p. 161)

সাপ্তাহিক শিডিউল তৈরির ক্ষেত্রে আপনি এক্স-অক্ষে (X-axis) প্রতিটা দিন রাখতে পারেন, আর আধা ঘণ্টা করে, দিনের প্রতিটা ঘণ্টা আপনি ওয়াই-অক্ষে (Y-axis) রাখতে পারেন। এই শিডিউলে দিনের ২৪ ঘণ্টাই রাখবেন। ঘুমানো, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো আর সালাহ আদায়ের মতো কিছু সময় আগে থেকেই পূরণ করে রাখুন।

একটা সপ্তাহ কীভাবে যাবে, এ ধরনের শিডিউল তৈরি করলে সে সম্পর্কে আগেভাগেই একটা আভাস পাওয়া যায়; বাঁচা যায় অতিরিক্ত ঘুম ও সময় অপচয়কারী ইত্যাদি বাজে অভ্যাস থেকে।

হঠাৎ কোনো প্রয়োজন হলে শিডিউল যেন কিছুটা বদলানো যায়, শিডিউল তৈরি করার সময় সেটাও মাথায় রাখা উচিত। এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হচ্ছে, প্রতিদিন অন্তত একটা ঘণ্টা খালি রেখে দেওয়া। যাতে প্রয়োজন পড়লে, অন্যান্য কাজগুলো আগেপিছে সরিয়ে নেওয়া যায়।

স্টিফেন কভে’র বইটার “অভ্যাস ৩ : আগের কাজ আগে” অধ্যায় থেকে সাপ্তাহিক সময়সূচি তৈরি ও কোন কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জেনে নিতে পারেন।

কৌশল #৫: সালাতকে ঘিরে দিনের কর্মসূচী তৈরি করুন

অনেক মুসলিমই এই ভুলটা করেন যে, তারা তাদের দৈনিক শিডিউলের মধ্যে সালাতকে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের অভিযোগ, তারা সালাত পড়ার সময় পান না।

দুই ক্ষেত্রে তারা এখানে ভুল করছেন:

১. সালাতের জন্য সময় তৈরি করার বদলে তারা তাদের শিডিউলে সালাতকে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

২. সালাহকে ঘিরে শিডিউল তৈরি করার বদলে তারা সালাতকেই উল্টো শিডিউলের মধ্যে পুরে দিতে চাচ্ছেন।

মুসলিম হিসেবে, যে কোনো কাজের আগে সালাহকেই আমাদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এজন্য শিডিউল তৈরির সময় আমাদের উচিত সালাতের সময়গুলো প্রথমে পূরণ করা ফেলা, যাতে করে এর সাথে অন্য কোনো কাজের বিরোধ না ঘটে। বরং আমি বলব, লাল ও মোটা অক্ষরে সালাতের সময় পূরণ করুন, যাতে করে দেখলেই বোঝা যায় যে, এই সময়ে আর অন্য কোনো কাজ করা যাবে না।

এটা করুন। করলে দেখবেন যে আপনি উল্টো সালাত ত্যাগ করারই কোনো সুযোগ পাবেন না, বি ইজ়নিল্লাহ।

কৌশল #৬: না বলার অভ্যাস করুন

কোন কোন কাজগুলো সবচেয়ে বেশি সময় খেয়ে নেয়, ভেবে দেখুন। সচরাচর সামাজিকতা রক্ষার কাজগুলোতেই বেশি সময় নিয়ে নেয়। হতে পারে সেটা দীর্ঘ সময় ধরে ফোনালাপ, তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদান, সামাজিক যোগাযোগের সাইট কিংবা ঘোরাঘোরি। ফালতু বাত করেই আমাদের দিনের বেশিরভাগ সময় চলে যায়।

এগুলো এড়ানোর একমাত্র উপায়: কেউ এ ধরনের কোনো কাজের প্রস্তাব দিলে, তাকে না-বলে দেওয়া…ভদ্রভাবে অবশ্যই। J

আমি বলছি না যে, আপনি কাউকে ফোন দেবেন না, বা কারও বাসায় বেড়াতে যাবেন না; কিন্তু কোনো ফোনালাপ যদি দীর্ঘ সময় নিয়ে নেয়, আপনার কাজের সময় নষ্ট করে, সেক্ষেত্রে, ‘আমার কাজ আছে’—এই কথা বলে ফোন রেখে দেওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। বরং মাঝে মধ্যে এমনটা বললে, লোকে দরকার ছাড়া আপনার সাথে আর যোগাযোগ করবে না। কিংবা আপনি যখন ফ্রি থাকবেন কেবল তখনই যোগাযোগ করবে।

লম্বা সময় ধরে চ্যাট ও অহেতুক কথাবার্তা না-বললে একদিকে যেমন আপনার সময় বাঁচবে—আপনি আরও বেশি ভালো ভালো কাজ করতে পারবেন—অন্যদিকে এতে করে আপনি পরনিন্দা, পরচর্চার মতো পাপের হাত থেকে রেহাই পাবেন।

কৌশল #৭: শখ

আমাদের সবার জীবনেই প্রতিদিন এমন একটা সময় আসে, বা প্রতি সপ্তাহে এমন একটা দিন আসে (কিংবা প্রতি বছরে এমন একটা মাস আসে) যখন আমরা ক্লান্ত হয়ে যাই, কোনো কাজে মন বসে না, শরীর একটু আরাম চায়, বিনোদিত হতে চায়। বিনোদন যতক্ষণ হালাল উপায়ে ও পরিমিত পরিমাণে হচ্ছে ততক্ষণ কোনো দোষ নেই।

তবে আরও ভালো হয় আমরা যদি একইসাথে ফলপ্রসূ এবং মজার এমন কোনো শখে অভ্যস্ত হতে পারি। এটা হতে পারে খেলাধুলা, বই পড়া, হতে পারে ভালো কোনো ভিডিও দেখা, শিক্ষামূলক বা পাজ্‌ল গেম খেলা ইত্যাদি।

ইনশা আল্লাহ আমরা যদি এ ধরনের ভালো ভালো চিত্তবিনোদনমূলক কাজে অভ্যস্ত হতে পারি, তাহলে আমাদের আন্দন্দের জন্য কাটানো সময়টাও স্রেফ সময় কাটানো জন্য সময় কাটানো না-হয়ে ফলপ্রসূ হবে!

এই ছিল আমার সময় নিয়ন্ত্রণের সাত কৌশল। আপনিও আপনার সময় নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন কৌশল নিচের কমেন্ট সেকশনে আমাদের জানাতে পারেন, এতে করে আমরাও উপকৃত হতে পারব।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি তারিখে অধুনালুপ্ত “হৃদয়ে ইসলাম” ব্লগে।

Advertisements

2 thoughts on “সময়কে বাগে আনবেন কীভাবে? (অনুবাদ)

  1. পিংব্যাকঃ কাজের সময়ে মনোযোগ ধরে রাখার চারটি কার্যকরী কৌশল | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (২): মাথা ঠান্ডা রেখে সামনে এগিয়ে যান | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s