পৃথিবী জুড়ে পড়ন্ত বেলার পদধ্বনি

শায়খ হামযা ইউসুফের একটি লেকচারের ছায়া অবলম্বনে, একেবারেই আমার নিজের ভাষায় রচিত। লেখাটি মূল লেকচারের হুবহু অনুলিপি বা প্রতিলিপি নয়।  

এক অস্থির সময়ে আমরা এই পৃথিবীতে অবস্থান করছি। আমাদের চোখের সামনে প্রকৃতির জগতে অস্বাভাবিক সব পরিবর্তন ঘটে চলেছে। মানুষের মূল্যবোধ ও জীবনধারা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ওদিকে, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন অনেকে বলতে শুরু করেছেন যে, বিভিন্ন হাদিসে শেষ যুগের যেসব আলামত বর্ণনা করা হয়েছে, তা একের পর এক আমাদের সামনে ঘটে চলেছে। সবকিছু মিলিয়ে, আমরা এখন এক সংকটাপন্ন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।

মানবজাতির সামষ্টিক ব্যর্থতার ফলাফল হিসেবেই এই বিপর্যয়গুলো আমাদের ওপর নেমে এসেছে, কেননা “মানুষ নিজ হাতে যা কামায়, তার ফলে স্থলে ও জলে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে” [কুরআন, ৩০:৪১]। এর মাধ্যমে আমাদেরকে শাস্তি দেওয়া আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়, বরং “আল্লাহ তাদেরকে তাদের কতক কৃতকর্মের স্বাদ গ্রহণ করাবেন সে জন্য; হয়ত (এর ফলে) তারা ফিরে আসবে।” [কুরআন, ৩০:৪১]

দুঃখজনকভাবে, আমরা অনেকেই আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ভুলতে বসেছি। ইমাম রাগিব ইসফাহানির (মৃত্যু ৫০২ হিজরি) মতে মূলত তিনটি উদ্দেশ্যে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে— 

প্রথমত, এই দুনিয়া আবাদ করার জন্য আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যেমনটি আল্লাহ বলছেন—

“তিনিই তোমাদেরকে ভূমি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে তোমাদেরকে বসবাস করিয়েছেন।” [কুরআন, ১১:৬১]

অতএব, এই দুনিয়াকে বসবাসের উপযোগী রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া এই দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহর ইবাদাত করার জন্য আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যেমনটি আল্লাহ বলছেন—

“আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদাত করবে।” [কুরআন, ৫১:৫৬]

আমাদের মহান প্রভুকে চেনার মতো করে চিনতে পারা এবং যুগপতভাবে ভয়, আশা ও ভালোবাসা সহকারে আমাদের সবকিছু তাঁর নিকট সঁপে দিতে পারাও ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি, দুনিয়া আবাদ করার জন্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা যেসব কাজ করি তা যদি আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করি তাহলে সেগুলোও ইবাদাত বলে গণ্য হবে।

তৃতীয়ত, যমিনের বুকে খিলাফতের দায়িত্ব দিয়ে আমাদেরকে প্রেরণ করা হয়েছে। আল্লাহ যখন মানুষ সৃষ্টি করতে চাইলেন তখন তিনি ফেরেশতাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন—

“আমি পৃথিবীতে এক খলিফা বানাতে চাই।” [কুরআন, ২:৩০]

এটি অনেক বড় এক দায়িত্ব, যেমনটি দাউদ (আলাইহিস সালাম)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেছেন, “হে দাউদ! আমি পৃথিবীতে তোমাকে খলিফা বানিয়েছি। সুতরাং তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার করো এবং খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না।” [কুরআন, ৩৮:২৬] আমাদের খিলাফতের এই দায়িত্বটি মূলত দুই প্রকার: (ক) নিজেকে শাসন করা এবং (খ) অন্যকে শাসন করা। আমাদের নিজেদের প্রবৃত্তিকে সঠিকভাবে শাসন করতে সক্ষম না হলে, আমরা অন্যকেও ঠিকভাবে শাসন করতে সক্ষম হবো না।

০০০

যেহেতু আমরা আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে ভুলতে বসেছি, তাই দুনিয়া আবাদ করতে গিয়ে আমরা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছি না, খিলাফতের দায়িত্বও আমরা পালন করছি না। ফলে, যমিনের বুকে ফাসাদ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবেশ দূষণ, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি হলো যমিনের বুকে ছড়িয়ে পড়া ফাসাদ। এখন আমরা এরকম কয়েকটি ফাসাদের উদাহরণ দেখব।

wildfire

দাবানল: বৈশ্বিক উষ্ণতার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দাবানলের তীব্রতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮০’র দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে দাবানলের সংখ্যা বেড়েছে আগেকার থেকে চার গুণ, যা আগের চেয়ে ছয় গুণ বেশি এলাকায় ছড়িয়েছে এবং এর স্থায়ীত্ব আগের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি সময় ধরে থেকেছে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার অনেক বনভূমি হুমকির মধ্যে আছে। রাশিয়া, স্পেন সহ অনেক দেশে দাবানল একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দাবানলের সূত্রপাত অনেক কারণেই হতে পারে, তবে গরমকালে তাপমাত্রা অত্যধিক বেশি থাকলে বা বৃষ্টিপাত কম হলে এই আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দাবানলের কারণে প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে বিস্তীর্ণ এলাকার গাছপালা, পশু-পাখি, ফসলি জমি, মানুষের বসতি ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

smoke-from-factory

বায়ু দূষণ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি হিসাব অনুযায়ী ২০১২ সালে সারা পৃথিবীতে আনুমানিক ৭০ লক্ষ মানুষ বায়ু দূষণের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন। সংস্থাটি বলছে যে, বর্তমান সময়ে বায়ু দূষণ হলো মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। সেই সাথে, কলকারখানা বা যানবাহন থেকে প্রতিনিয়ত যে ধোঁয়া বের হয়ে বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে পরিবেশের ওপর তার নেতিবাচক তো আছেই। মাত্রারিতিক্ত বায়ু দূষণের ফলে বিশ্বের অনেক শহর এবং শিল্প এলাকা মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, কিন্তু তার পরেও জীবিকার তাগিদে মানুষকে এসব জায়গায় থাকতে হচ্ছে।

মাটি ক্ষয়: আধুনিক কৃষিকাজ মাটি ক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। কৃষিকাজ করতে গিয়ে আমরা যেসব রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করছি তা মাটিতে গিয়ে জমা হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে মাটির অম্লতা (acidity) বাড়ছে। বাড়ছে মরুকরণের হার। ফলে, পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং বিপন্ন বা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের তালিকা দিনকে দিন লম্বা হচ্ছে।

একদিকে যখন বাঘ ও হাতির মতো শৌর্যমন্ডিত প্রাণীর সংখ্যা কমে চলেছে, অন্যদিকে তখন ইদুর বা তেলাপোকারা দেদারসে বংশবিস্তার করে যাচ্ছে। শৌর্যমন্ডিত প্রাণীর সংখ্যা কমার পাশাপাশি কমছে প্রকৃত পৌরুষের অধিকারী মানুষের সংখ্যাও। কিন্তু, ইদুর বা তেলাপোকার মতো সুযোগসন্ধানী ও উচ্ছিষ্টভোগী মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রকৃতির সাথে সাথে মানবজাতির ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

যমিনের পাশাপাশি ফাসাদ ছড়িয়ে পড়েছে পানিতেও। বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য নদী ও সাগরের পানিকে দূষিত করে ফেলেছে। সেই পানি আবার মানুষ ব্যবহার করছে। অনেক স্থানে সাগরের অম্লীকরণ (acidification) বাড়ছে। এই সব কিছু মিলিয়ে সামুদ্রিক বাস্তু জগতের (marine ecosystem) ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বৃহদাকৃতির সামুদ্রিক মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এদের মধ্যে কোনো কোনো প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। তবে, কমছে না জেলি-মাছের (jellyfish) সংখ্যা। এরা বেড়েই চলেছে। জেলি-মাছ আসলে কোনো মাছ নয়। এদের কোনো হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক বা শ্বাস-প্রশ্বাসের অঙ্গ নেই। এরপরেও এরা দিব্বি শিকার ধরে খাচ্ছে।

jellyfish

মানুষের মধ্যেও জেলি-মাছদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এদের অন্তর মরে গেছে। এরা এদের বিবেক-বুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়েছে। স্বাভাবিক মানুষের বৈশিষ্টসমূহকে এরা হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু, এদের লালসা ঠিকই আছে। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এরা সবই করতে পারে। মানুষকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তা এরা একেবারেই ভুলে গিয়েছে।

০০০

গোটা দুনিয়া জুড়ে পরিবেশের এই যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে এবং এর ফলে আমাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে তার কারণ কিন্তু আমরা নিজেরাই। এখন আমরা এই বিপর্যয়ের পিছনের কয়েকটি কারণ নিয়ে আলোচনা করব, যেখান থেকে আমাদের সবার সামনে পরিস্কার হয়ে যাবে যে, দোষ আমাদেরই।

সুদভিত্তিক অর্থনীতি: বর্তমানে আমরা দুনিয়া জুড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে জোয়ার দেখছি, তার পিছনে আছে সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ানো হচ্ছে। অতীতে নিজের পকেটে টাকা না থাকলে মানুষ সচরাচর কিছু কিনত না। এখন ব্যাংক থেকে সহজেই ঋণ পাওয়া যাচ্ছে। বাড়ি, গাড়ি, আসবাবপত্র, গয়নাগাটি, ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট, লেখাপড়া, ঘুরে বেড়ানো – এ সবই এখন ব্যাংকের ঋণের টাকায় করা যাচ্ছে। সহজেই অনেক শখ মেটানো যাচ্ছে, ফলে সাধারণ মানুষ খুশি। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না যে, সারা জীবন ধরে তারা ঋণের ঘানি টেনে চলেছে। এই ঋণ শোধ করার জন্য তাকে স্বাভাবিক প্রয়োজনের অতরিক্ত টাকা রোজগার করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে সে আবার নতুন ঋণ নিচ্ছে, ফলে তাকে আরও বেশি উপার্জন করতে হচ্ছে। এভাবে ঋণের দুষ্টচক্রে পড়ে সাধারণ মানুষ ব্যাংকের দাস হয়ে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। ওদিকে, কৃত্রিমভাবে অতিরিক্ত পণ্য ও সেবার চাহিদা তৈরি হওয়ার ফলে যোগানও বাড়াতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত কাঁচামাল আহরণ করতে গিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে, আরেকটি দুষ্টচক্র তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত সুদভিত্তিক এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি অভিশপ্ত। আল্লাহ বলছেন: “হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা যদি প্রকৃত মুমিন হয়ে থাক, তবে সুদের যে অংশই (কারও কাছে) অবশিষ্ট রয়ে গেছে তা ছেড়ে দাও। তবুও যদি তোমরা যদি এটা না কর তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।” [কুরআন, ২:২৭৮-২৭৯]

black-friday-shopper

লাগামহীন ভোগ: বর্তমান দুনিয়ায় আমরা প্রায় সবাই কিছু বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ধোঁকায় পড়ে গিয়েছি। আমাদের পরিধানের জন্য যথেষ্টই জামাকাপড় আছে, কিন্তু তাতেও আমাদের হচ্ছে না। লাগুক আর না লাগুক, কোনো উপলক্ষ এলেই আমরা নতুন জামাকাপড় কিনছি।  পেটে খিদে থাকুক বা না থাকুক, আমাদের পাতে খাবার থাকা চাই-ই চাই। স্বাভাবিকভাবেই, অনেক খাবার নষ্ট হচ্ছে। ফি বছর নতুন মডেলের টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন – এসবের কিছু না কিছু আমরা কিনছিই। এভাবে আমরা দেদারসে খরচ করে টাকা নষ্ট করছি, আবার বলে বেড়াচ্ছি যে, সংসারের খরচ কিছুতেই আটছে না।

কিন্তু, আমাদেরই আশেপাশে এমনও অনেক মানুষ আছেন যারা তাদের  জীবনধারণের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। অপ্রয়োজনীয় ভোগের খরচ করতে গিয়ে আর ব্যাংকের কিস্তি মেটাতেই আমাদের নাজেহাল দশা, এসব অভাবী মানুষের খবর নেওয়ার সময় আমাদের কোথায়?

জীবাশ্ম জ্বালানির (fossil fuel) অতিরিক্ত ব্যবহার: ভূগর্ভ থেকে আহরিত তেল, গ্যাস, কয়লা ইত্যাদি জ্বালানির ওপর বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য এসব জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার অনেকাংশে দায়ী। অ্যাসিড বৃষ্টি, সাগরের অম্লীকরণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদির পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো জীবাশ্ম জ্বালানির লাগামহীন ব্যবহার। প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ খুঁজতে গিয়ে অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে মানবসভ্যতার কবর আমরা আমাদের নিজেদের হাতেই খুঁড়ছি।

traffic-jam

ব্যক্তিগত গাড়ির প্রসার: ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী সারা বিশ্বে ব্যক্তিগত গাড়ির মোট সংখ্যা ছিলো ১০০ কোটি। এই বিপুল পরিমাণ গাড়ি চালাতে যে পরিমাণ তেল খরচ হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পরিবেশের জন্য বড় ধরণের বিপর্যয় বয়ে নিয়ে আসছে।

যুদ্ধ কেন্দ্রিক অর্থনীতি: ২০১২ সালের হিসাব অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে আনুমানিক ১৭,০০০ কোটি ডলার (অর্থাৎ ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার) সামরিক খাতে খরচ করা হয়েছে, যা বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) সমষ্টির ২.৫০ শতাংশ। সেই হিসেবে, সারা বিশ্বে সামরিক খাতে মাথাপিছু ব্যয় হলো ২৪৯ ডলার। এই ১৭,০০০ কোটি ডলারের মধ্যে ৩৯% খরচ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাই। এর পরেই আছে চীন (৯.৫%), রাশিয়া (৫.২%), যুক্তরাজ্য (৩.৫%) এবং জাপান (৩.৪%)।

বড় কিছু অস্ত্র কোম্পানি এবং ঠিকাদারদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার খাতিরে সাধারণ মানুষের করের টাকা এভাবে খরচ করা হচ্ছে। অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলো তাদের নিজেদের যুদ্ধ কেন্দ্রিক অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে গিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশে তাবেদার সরকার বসিয়ে রেখেছে। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অস্ত্রের রমরমা ব্যবসা চলছে। অনেক দেশে বিদ্রোহী ও জঙ্গি সংগঠণকে উষ্কে দিয়ে সেখানকার পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা হচ্ছে। একদিকে এসব সংগঠণের কাছে কালো বাজারে বেশি দামে অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে, অন্যদিকে এদেরকে দমন করার নামে সেখানকার সরকারকেও বেশি করে অস্ত্র কিনতে পরোক্ষভাবে বাধ্য করা হচ্ছে।

বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর এই নোংরা খেলার মাশুল দিয়ে যাচ্ছে একেবারেই সাধারণ মানুষ। শুধুমাত্র সিরিয়ার চলমান যুদ্ধেই দশ লক্ষের বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ মানবেতর শরণার্থীর জীবন কাটাচ্ছে। ফিলিস্তিন থেকে ফিলিপাইন, সিরিয়া থেকে সুদান, কাশ্মির থেকে কেনিয়া, ইউক্রেন থেকে ইয়েমেন – বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর দাপটে দুনিয়া জুড়ে মানবতা আজ ভূলুন্ঠিত।

০০০

বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানবজাতির মধ্যেও। স্বাস্থ্য, সম্মান বা নিরাপত্তা – সবদিক দিয়েই বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ঝুকির মধ্যে আছে। এখন আমরা তার কিছু নমুনা দেখব।

অটিজম: কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৮৮ জন শিশুর মধ্যে একজন অটিস্টিক হিসেবে বেড়ে উঠছে। অটিস্টিক বাচ্চারা বহির্বিমুখিতা নিয়ে বেড়ে ওঠে। অন্য মানুষের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, ভাষার ওপর দক্ষতা ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে এসব শিশু বড় হতে থাকে।

তবে, এমন অনেক মানুষও আছে যারা বাহ্যিকভাবে সুস্থ্য, কিন্তু অনেকটা অটিস্টিক স্বভাবের। যারা আসলেই অটিস্টিক তাদের কথা এখানে বলা হচ্ছে না। এই মানুষগুলো চরম আত্মকেন্দ্রীক স্বভাবের হয়ে থাকে। পরিবার, সমাজ ইত্যাদি নিয়ে এরা ভাবে না, বরং এরা এদের নিজেদের ক্ষুদ্র জগত নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এরা স্বাভাবিকভাবে মানুষের সাথে কথা বলতে পারে না। বিশেষত শহুরে পরিবেশে অনেক শিশু-কিশোরই এভাবে বেড়ে উঠছে। বড় হয়ে গেলেও এই বদ স্বভাবটি এরা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারছে না। আমাদের সমাজে এমন সামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।

মেদভুড়ি: ২০০৮ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী সারা বিশ্বের ১৪০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওজন ছিলো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এদের মধ্যে ৫০ কোটি মানুষ ছিলো স্থূলকায় (obese)। তথাকথিত ‘ফাস্ট ফুড’, ‘রিচ ফুড’ ইত্যাদি ক্রমাগত খেতে খেতে এবং শরীরচর্চা বা কষ্টসাধ্য কাজ না করার ফলে আমাদের সমাজের অনেক মানুষ মুটিয়ে যাচ্ছে। হয়ত আমি বা আপনিও এদের কাতারে পড়ি। একদিকে বেশি খেয়ে আমাদের শরীরে চর্বির আস্তর পড়েছে, অন্যদিকে এরই ফলে আমাদের শরীরে বাসা বেধেছে নানাবিধ রোগবালাই। একদিকে আমরা খাবারের পিছনে বেহিসাব টাকা খরচ করছি, অন্যদিকে ডাক্তার ও ওষুধের পিছনেও আমাদেরকে অঢেল টাকা ঢালতে হচ্ছে।

আমরা ক্রমাগত বেশি খেয়ে ‘সুখের অসুখে’ ভুগছি, আর এদিকে আমাদেরই প্রতিবেশী অনেক মানুষ দিনের পর দিন না খেয়ে থাকছে। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই কথাটিকে আমরা ভুলতে বসেছি: “ওই ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন নয় যে পেট পুরে খায় আর তার পাশেই তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে।” [বায়হাকি ও তাবারানি]

ডায়াবেটিস: আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফাউন্ডেশনের একটি হিসাব অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে মোট ৩০ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বিশ্বের স্বাস্থ্য খাতের মোট খরচের ১১.৬% ব্যয় হয় ডায়াবেটিসের পিছনে। একটি গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি তিনজন মানুষের একজন হবে ডায়াবেটিস রোগী।

মানব পাচার: একটি হিসাব অনুযায়ী ২০০৫ সালে বিশ্বে মোট ১ কোটি ২৩ লক্ষ মানুষ পাচারের শিকার হয়, যার মধ্যে অর্ধেকই ছিলো শিশু বা কিশোর। এই পাচার হওয়া মানুষদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়, আর অনেককে আটকে রেখে জোর করে কাজ করিয়ে নেওয়া হয়। এটি হলো আধুনিক দাস প্রথা।

০০০

এতক্ষণ ধরে আমরা যে কথাগুলো শুনলাম তাতে বোঝা যাচ্ছে যে, পৃথিবী জুড়ে পড়ন্ত বেলার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। একটু কান পাতলেই বিদায়ের সুর আমাদের সামনে পরিস্কার হয়ে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে এই পৃথিবী আর মানুষের বসবাসের উপযোগী থাকবে না।

০০০

এসবের পাশাপাশি, দুনিয়া জুড়ে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশেষত মুসলিমদের জন্য খারাপের দিকে গড়াচ্ছে। যেসব অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ধারণা করছেন যে আমরা দাজ্জালের আগমণ, ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর পুনরার্বিভাব ইত্যাদির কাছাকাছি সময়ে চলে এসেছি তাদের ধারণা সঠিক হয়ে থাকলে সামনের দিনগুলোতে খুনোখুনি অনেক বেড়ে যাবে। সেদিকে ইঙ্গিত করেই হয়ত মানব সৃষ্টির আগে ফেরেশতারা আল্লাহকে বলেছিলেন, “আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে সেখানে অশান্তি বিস্তার করবে ও খুনখারাবি করবে …?” [কুরআন, ২:৩০]

এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ বলেছিলেন, “আমি এমন বিষয় জানি যা তোমরা জানো না।” [২:৩০] অতএব, সব মানুষ অমানুষ হবে না। সব মানুষ খুনখারাবিতে লিপ্ত হবে না। এই দুনিয়াতে এমন অনেক মানুষও থাকবেন, যারা আল্লাহর ইবাদাতে সদা মশগুল থাকবেন। এঁরা আল্লাহর অবাধ্য হবেন না। এঁরা মানুষের কোনো ক্ষতি করবেন না। এঁরাই হলেন যমিনের বুকে আল্লাহর প্রকৃত খলিফা। এঁরা সব যুগেই থাকবেন। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি বক্তব্য থেকেও এর সাক্ষ্য মেলে। তিনি বলেছেন, “আমার উম্মত হচ্ছে বৃষ্টির মতো, বলা যায় না তার প্রথমাংশ ভালো, না শেষাংশ ভালো।” [তিরমিযি]

অতএব, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ভীত হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ যা নির্ধারণ করে রেখেছেন তা হবেই। সাগরে সুনামি শুরু হলে তা কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। তবে, যারা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারবে তারা নিরাপদে থাকবে, আর যারা পারবে না তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শেষ যমানার কঠিন ফিতনা কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। নিজে থেকে এই ফিতনার মুখোমুখি হতে চাইলে আমরা বিপদে পড়ে যাব। ফিতনার সময়ে আমাদেরকে সেখান থেকে সরে পড়তে হবে। প্রকৃত আল্লাহওয়ালা মানুষের সাহচর্য অবলম্বন করতে হবে। তাঁদের নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হবে। আশা করা যায় যে, এর ফলে আমরা ফিতনা থেকে বেঁচে থাকতে সক্ষম হবো। আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করুন।

اللّهُـمَّ إِنِّـي أَعـوذُ بِكَ مِـنْ عَذابِ القَـبْر، وَمِـنْ عَذابِ جَهَـنَّم، وَمِـنْ فِتْـنَةِ المَحْـيا وَالمَمـات، وَمِـنْ شَـرِّ فِتْـنَةِ المَسيحِ الدَّجّال

মূল লেকচারটি দেখুন এখানে:

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close