ইতিহাস সংরক্ষণের বিজ্ঞান এবং অপরিবর্তিত কুর’আন – তৃতীয় খন্ড (অনুবাদ)

প্রথম খন্ড | দ্বিতীয় খন্ড

Dome-of-the-Rock-Mosaic

কুরআনের পাণ্ডুলিপি

Orientalist-দের করা আরেকটি অভিযোগ হলো, উসমানের সংকলিত মুসহাফের পাণ্ডুলিপিতে আরবী বর্ণগুলোর সাথে কোনো ‘নোকতা’ ব্যবহার করা হয়নি। আর তাই উসমানের এই পাণ্ডুলিপিতে যেসব বর্ণ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো শুধুমাত্র আরবী বর্ণগুলোর মূল (skeletal base) কিংবা ভিত্তি। উদাহরণস্বরূপ, আরবী শব্দ “তিনি বললেন”-এর সাথে যদি নোকতা না থাকে তাহলে orientalist-দের দাবী অনুযায়ী, সেই শব্দটিকে পাঠক তার ইচ্ছেমত ‘হাতী’, ‘পূর্বে’, কিংবা ‘সে চুম্বন করলো’ – এর যেকোনোটি ধরে নিতে পারে। নিশ্চিতভাবে, এভাবে যদি একই শব্দকে এতগুলো ভিন্ন শব্দের যেকোনো একটি হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তাহলে কুরআনের একেকটি আয়াতের অনেকগুলো অর্থই হতে পারে। Orientalist-দের মধ্যে অন্যতম আর্থার জেফরী, যিনি ছিলেন একজন অস্ট্রেলিয়ান প্রফেসর, বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে দাবী করেন যে উসমানের সংকলিত কুরআনে নোকতা না থাকার কারণে সেটিকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পড়ার সম্ভাবনা তৈরী করে, যার ফলে এর অনেক ধরনের অর্থ থাকাও খুবই সম্ভব। আর সেকারণেই বর্তমান কুরআনকে অপরিবর্তিত এবং নির্ভুল বলে স্বীকার করে নেওয়াও সম্ভব নয়।

এই যুক্তির ভুল অনেক:

প্রথমত, উসমান যে শুধু কুরআনের সংকলিত কপিটি পাঠিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন তা নয়, বরং তিনি প্রত্যেক কপির সাথে সেই প্রদেশের সবার সঠিক কুরআন শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কুরআন স্মৃতিতে ধারণ করে রাখা একজন বিশেষজ্ঞ শিক্ষকও প্রেরণ করেন। আমাদেরকে এটা সবসময়ই মনে রাখতে হবে যে, প্রধানত মৌখিকভাবে মানুষের স্মৃতিতে ধারণ করার মাধ্যমে কুরআন সংরক্ষিত হয়ে আসছিল এবং এখনও পর্যন্ত, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও, এটাই কুরআন সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম। লিখিত কপিগুলো, যা উসমান সংকলন করেছিলেন, সেগুলো শুধুমাত্র মুখে এবং স্মৃতিতে থাকা কুরআনের supplement কিংবা backup হিসেবে গণ্য করা হয়েছিলো। কেউ যদি আগে থেকেই কুরআনের কোনো একটি আয়াত মুখস্ত করে রাখে, অর্থাৎ সেটি যদি তার স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে, তাহলে উসমানের সংকলিত লিপিবদ্ধ মুসহাফ কুরআনের পাণ্ডুলিপিতে রক্ষিত skeletal বর্ণগুলো শুধুমাত্র একটি দৃশ্যমান সহায়ক (visual aid) হিসেবে কাজ করে। এই উদাহরণটির একটি ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখানোর জন্য আমরা নিচের ছবিতে দেখানো জেরুজালেমের Dome of the Rock-এ খোদাই করে রাখা লেখাটি নিয়ে একটু গবেষণা করতে পারি:

Ayats of Quran without dot signs

এই ভবনটি সপ্তম শতাব্দীর শেষ দিকে তৈরী করা হয়েছিল। এর ভেতরের দিকের দেয়ালগুলোতে উসমানের মুসহাফে ব্যবহৃত ‘কুফি’ (Kufic) পাণ্ডুলিপির আদলে নকশা খচিত করা আছে। কেউ যদি আরবীর সাথে পরিচিত হয়ে থাকে এবং আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্যের ব্যাপারে তার প্রাথমিক কিছু জ্ঞান থেকে থাকে, তাহলে খোদাই করা কুর’আনের এই calligraphic পাণ্ডুলিপি কী বলছে সেটা বুঝতে পারা মোটেই কঠিন কিছু নয়:

Dotted inscription of the Quran

এই খোদাই করে রাখা বাণীটির[৪] মতোই উসমানের মুসহাফও যে কেউ খুব সহজেই নির্ভুলভাবে পড়তে পারতো যদি তার আরবী ভাষা এবং কুরআনের বাণী সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু ধরনা থেকে থাকে। আর সেজন্যই Orientalist-দের করা সেই দাবী যেখানে তারা বলতে চায় যে নোকতার ব্যবহার ছাড়া কুরআনের বাণীতে ব্যবহৃত শব্দটি আসলে কী সেটা বোঝা সম্ভব নয় – এর কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

দ্বিতীয় সমস্যা যেটি Orientalist-দের দাবীতে পাওয়া যায়, বিশেষ করে জেফরী সাহেব যে দাবী করেছিলেন, সেটা হলো: একটি নির্দিষ্ট শব্দের অক্ষরগুলোতে যদি নোকতা না দেওয়া থাকে তাহলে সেটিকে পাঠক অন্য সম্ভাব্য শব্দগুলোর যেকোনো একটি হিসেবে পড়তে পারে যদি সে ইচ্ছা করে। তর্কের খাতিরে আমরা ধরে নেই যে পাঠকের আশেপাশে কুরআনের কোনো মুখস্তকারী কিংবা শিক্ষক সেই মূহুর্তে নেই যে তাকে বলতে পারবে কোনো একটি নির্দিষ্ট কুরআনের বাণী উসমানের মুসহাফ থেকে কিভাবে পড়তে হবে। আর সেই সময়ে সেই পাঠক ‘তিনি বললেন’ শব্দটির সামনে এলেন (এই শব্দটিই আর্থার জেফরী’র উদাহরণে ব্যবহৃত হয়েছিল); আমরা আগেই ব্যাখ্যা করেছি এই শব্দটি নোকতার ব্যবহার ছাড়া বেশ কয়েকটি পৃথক শব্দ হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব। কিন্তু, পাঠক যখন কুরআনের একটি সূরার মধ্যে একটার পর একটা আয়াত পড়তে পড়তে কোনো একটি বাক্যের কোথাও এই শব্দটি পাচ্ছেন, তখন তার কাছে এই শব্দটি সম্ভাব্য শব্দগুলোর মধ্যে কোনটি নির্দেশ করছে সেটি বুঝতে পারা খুবই স্বাভাবিক। কারণ, পাঠক তখন বাণীর একটি প্রবাহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন যেখানে তার কাছে পটভূমি বা context-এর সাহায্য নেবার সুযোগ থাকে। তাই ‘তিনি বললেন’-এর পরিবর্তে ‘হাতী’ কিংবা ‘তিনি চুম্বন করলেন’ পড়ে ফেলা কোনো একজন শিক্ষিত পাঠকের জন্য বলতে গেলে অসম্ভব। আর তিনি যদি অন্য শব্দগুলোর যেকোনো একটি পড়েও থাকেন, ওই বাক্যের কোনো গ্রহণযোগ্য অর্থই তিনি দাঁড় করাতে পারবেন না। আর তখন তিনি সাথে সাথেই নিজেকে শুধরে নেবেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যদিও একটি অর্থের পরিবর্তে অন্য অর্থটি ব্যবহার করেও বাক্যের একটি অর্থ দাঁড় করানো সম্ভব, তবে আরবী ভাষার গঠণ এবং বিন্যাস পদ্ধতির কারণে তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। আমরা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছি – এই সব সম্ভাবনার কথা আমরা শুধুমাত্র তর্কের খাতিরেই টেনে আনলাম এটা মনে করে যে পাঠককে কুরআন শেখানোর জন্য কোথাও কোনো কুরআনের হাফিজ (memorizer) কিংবা উস্তাদ (teacher) নেই। আর এটা শুধুমাত্র মনে করে নেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, কারণ বাস্তবে কুরআনের অগুনতি হাফিজ এবং শিক্ষকেরা সবসময়ই পুরো মুসলিম বিশ্বের সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন সবাইকে সঠিক কুরআন শিক্ষা দেবার জন্য, এবং আজও আছেন।

সময়ের সাথে সাথে অষ্টম এবং নবম শতাব্দীর দিকে পুরো মুসলিম বিশ্ব জুড়েই ধীরে ধীরে কুরআনের মুসহাফগুলোতে নোকতা যুক্ত করা শুরু হয়। ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষী কোটি কোটি মানুষ যখন কুরআন পড়া শুরু করলেন তখন শুধুমাত্র স্মৃতি থেকে পড়ার পাশাপাশি একটি বই থেকেও কুরআন পড়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই নতুন মুসলিমদের ভাষা আরবী ছিলো না, আর তাদের অনেকের পক্ষেই রাতারাতি কুরআন মুখস্ত করে ফেলাও সম্ভব ছিলো না। যেহেতু তাদের জন্য মুখস্ত না করেই কুরআন পড়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল, তাই মুসহাফে নোকতা যুক্ত করা হয়ে পড়েছিল সময়ের দাবী। তখন সেটি না করলে নতুন মুসলিম সমাজগুলোর মধ্যে কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন তিলাওয়াত (recitation) করার একটি সম্ভাবনা ছিলো। আজকের দিনে তাই প্রায় প্রতিটি আধুনিক মুসহাফেই নোকতা এবং স্বরবর্ণ নির্দেশক প্রতীকগুলো (অর্থাৎ, যবর, যের, পেশ ইত্যাদি) ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

‘ইসনাদ’ ব্যবস্থা

কুরআনকে অপরিবর্তিত রাখার ব্যাপারটি নিশ্চিত করা প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের চোখে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিলো। কারণ কুরআনের অনেকগুলো আয়াতে আল্লাহ বারবার বলেছেন কিভাবে এর আগে প্রেরিত বাণীগুলোকে ইহুদি এবং খ্রিস্টানরা নিজেদের পছন্দমতো পরিবর্তিত করেছিলো। আর যার কারণে সরাসরি স্রষ্টার কাছ থেকে কোন অংশটুকু এসেছে আর কোন অংশটা মানুষের বানানো, সেটা নিয়ে তারা নিজেরাও আর নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না। ফলশ্রুতিতে, প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা একটি বিশেষ ব্যবস্থা তৈরী করেছিলেন, এটা নিশ্চিত করতে যে কুরআন এবং হাদিস মানুষের ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে পরিবর্তিত হবে না।

এই বিশেষ ব্যবস্থার নাম ‘ইসনাদ’ ব্যবস্থা। ইসনাদ ব্যবস্থায় কোনো একটি narration কিংবা উদ্ধৃত বর্ণনার ক্ষেত্রে ‘সনদ’-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল । যেমন, বুখারিতে সংরক্ষিত প্রতিটি হাদিসের জন্যই বর্ণনাকারীদের একটি সিড়ি বা পরম্পরা রয়েছে (ইংরেজিতে যাকে বলে chain of narrators), যেটার শুরু হয়েছে ইমাম বুখারি থেকে এবং শেষ হয়েছে নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কাছে গিয়ে। এই পরম্পরা বা সিড়িটিকেই বলা হয় ‘সনদ’। কোনো একটি হাদিসকে তখনই কেবল গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা হয় যখন এই সনদের প্রতিটি বর্ণনাকারীই ইতিহাসে সুপরিচিত এবং নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত, এবং এই বর্ণনাকারীদের বিশ্বাসযোগ্য হবার গুণাবলীর জন্যও সুপরিচিত হতে হয়।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে গুরুত্বপূর্ন পদে অধীষ্ট সকলেই এই ইসনাদ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছিলেন এবং এই ব্যবস্থাই সবসময়ে প্রয়োগ করেছিলেন কোনো একটি হাদিস কিংবা কুরআনের বাণীর সত্যতা এবং নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে। যদি কেউ এমন কোনো কুরআনের আয়াত বা বাক্যের অংশবিশেষ নিয়ে এসে দাবী করে যে এটি কুরআনের অংশ কিন্তু উসমানের মুসহাফে বাদ পড়ে গেছে, তাহলে ইসলামিক স্কলাররা সবাই মিলে সেটি যাচাই করে দেখবেন ইসনাদ ব্যবস্থা ব্যবহার করে, আসলেই সেই বাণীটির বর্ণনাকারীদের পরম্পরা শেষ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ভাবে নবীর (ﷺ) কাছে পৌছায় কি না। অতএব, কেউ যদি কোনো মনগড়া বাণী কুরআনের অংশ হিসেবে দাবী করে থাকে তাহলেও ইসনাদ ব্যবস্থায় সেটি ধরা পড়ে যাবে এবং সেই দাবী সর্বসম্মতিক্রমে বাতিল করে দেয়া হবে। এটা খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে, এত কঠিন একটি বর্ণনাকারীদের পরম্পরা থাকার শর্ত (সনদ) যে ব্যবস্থায় রয়েছে সেটিকে ফাঁকি দিয়ে নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত কোনো মনগড়া বাণীর পরম্পরা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণ করা কারো পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

আর তাই ইসনাদ ব্যবস্থা কুরআন এবং হাদিসের সত্যতা এবং নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণে সফলভাবে কাজ করেছে এবং করে আসছে, যেহেতু এটি মানুষকে মনগড়া বাণী কিংবা বাক্যের অংশ বা ঘটনাকে কুরআন অথবা হাদিসের অংশ হিসেবে বর্ণনা করে পার পেয়ে যাওয়া সবসময়ই সফলভাবে প্রতিহত করেছে, এবং এখনো তা করতে পুরোপুরিই সক্ষম। ইসনাদ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত সনদের নির্ভরযোগ্যতার দিকে তাকিয়ে সহজেই কোনো একটি কুরআনের বাণী কিংবা হাদিসের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব। ইসনাদ ব্যবস্থার মতোই একটি ব্যবস্থা যায়েদ ইবনে ছাবিতও ব্যবহার করেছিলেন, যখন তিনি প্রথমবারের মতো খলিফা আবু বকরের সময়ে লিখিত লিপিগুলোর থেকে যাচাই করে কুরআনের প্রথম সম্পূর্ণ লিখিত পাণ্ডুলিপি বানানোর কাজে হাত দিয়েছিলেন। আর ইসনাদ ব্যবস্থার বৃদ্ধি এবং এর প্রয়োগের যথার্থতা তার পরবর্তী সময়ে আরও বেড়ে যাওয়ায় কুরআনের বাণীগুলোর পরিবর্তিত হবার সম্ভাবনা দিনের পর দিন শুধু কমিয়েই এনেছে, যে সম্ভাবনা আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

শেষ কথা

কুরআনের ইতিহাসের সম্পূর্ণ বর্ণনা উপস্থাপন করা এই আর্টিকেলের উদ্দেশ্য ছিলো না, আর এত বড় একটি বিষয়ের বিস্তারিত একটি মাত্র আর্টিকেলের মধ্যে নিয়ে আসাও সম্ভব নয়। ইসলামের ইতিহাসের শত শত হাজার হাজার স্কলারদের গবেষণার সব ফলাফল কয়েক হাজার শব্দের মধ্যে বর্ণনা করাও রীতিমতো অসম্ভব। যদিও এই আর্টিকেলের বিষয়বস্তু এবং উপস্থাপিত প্রমাণ এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ রাখে না যে কুরআন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত হয়নি। কুরআনের বাণীগুলো তাঁর জীবিত থাকা অবস্থাতেই এত বেশি মানুষের মধ্যে এবং এত বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলো যে পরবর্তীতে কুরআনের কোনো অংশের পরিবর্তন আনা কিংবা নতুন কিছু কোথাও প্রবেশ করিয়ে দেয়াকে অসম্ভব করে তুলেছিলো। আর তার সাথে রয়েছে আবু বকর এবং উসমানের শাসনামলে কুরআনের নির্ভুল এবং সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য সংকলন দু’টি, যার একটি অন্যটিকে সম্পূর্ণভাবে সত্যায়িত করে। তদুপরি, কুরআনের মূল সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছিলো অগুনতি মুসলমানের স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে রাখা (memorization), যেটি একটি মৌখিক ব্যবস্থাও বটে। এর সাথে সেই সংকলিত কুরআনের কপিগুলো backup ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করেছিলো, যা এখনো করে এবং এই মৌখিক স্মৃতিধারণ ব্যবস্থাই মূলত কুরআনকে অপরিবর্তিত রেখে এসেছে, এবং এখনো রাখছে। সব শেষে, ইসনাদ ব্যবস্থা সব ধরনের সন্দেহের বুকে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়ার কাজ করেছে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে। ইসনাদ ব্যবস্থা যে শুধু হাদিস কিংবা কুরআনের সত্যতা যাচাই করার একটি ব্যবস্থা তা নয়, বরং এটি একটি academic এবং scholarly ব্যবস্থা, যেটি ইসলামের ভিতকেও মুসলিম বিশ্বের কাছে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে।

Orientalist-দের সেইসব দাবীর ব্যাপারে উপসংহার টানতে গিয়ে বলতে হয়, কুরআন এর আগের বাণীগুলোর সংকলনের মতোই মানুষ দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে বলে যে দাবী তারা করে আসছে, সেটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং যেকোনো যোগ্য ইতিহাসবিদই, হোক সে মুসলিম কিংবা অমুসলিম, কুরআন সংরক্ষণের বিজ্ঞান পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তই দেবেন যে, কুরআন এখনো পর্যন্ত অপরিবর্তিত। কুরআন পরিবর্তিত হয়নি – এই দাবীর পেছনে যেমন সর্বজনস্বীকৃত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, সেরকম কোনো প্রমাণ Orientalist-দের কুরআন পরিবর্তিত হয়েছে বলে যে দাবী সেটির সমর্থনে কেউ কখনো দিতে পারেনি। দিন শেষে সবাই যে যার ইচ্ছেমতো বিশ্বাস করতে পারে, তবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দেয়া আর নিজের মনগড়া তত্ত্ব বিশ্বাস করে বসে থাকা দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কুরআনের বাণী কিভাবে প্রথম থেকে এখনো পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়ে আসছে সেটি নিয়ে academic কোনো পড়াশোনা না করেই কেবলমাত্র এধরনের দাবী করা সম্ভব। কারণ, আমাদের এই আর্টিকেলই প্রমাণ করে কুরআন সংরক্ষণের বিজ্ঞান নির্ভরযোগ্য, আর তাই কুরআন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সময় থেকে এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবিকৃত, এবং অপরিবর্তিত।

গ্রন্থপঞ্জি:

৪. ইবনে হাজার, ফাতহুল-বারী

মূল আর্টিকেল: How Do We Know the Quran is Unchanged?

অনুবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে: Power Pens by Lifestyle is Islam

Advertisements

2 thoughts on “ইতিহাস সংরক্ষণের বিজ্ঞান এবং অপরিবর্তিত কুর’আন – তৃতীয় খন্ড (অনুবাদ)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close