সূরা কাহফ-এর ছায়াতলে (আয়াত ৫৬-৫৯): ফিরে এসো, বারবার ফিরে এসো

stars in night sky

সূরা কাহফ থেকে পাওয়া কিছু দিকনির্দেশনার ওপর ধারাবাহিক আলোচনার তেইশতম কিস্তি  

৫৬ – আমি রাসুলগণকে এজন্য পাঠাই যে, তারা (মুমিনদেরকে) সুসংবাদ দেবে এবং (কাফিরদেরকে শাস্তি সম্পর্কে) সতর্ক করবে। যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তারা মিথ্যাকে আশ্রয় করে বিতন্ডায় লিপ্ত হয়, যাতে তার দ্বারা সত্যকে টলিয়ে দিতে পারে। তারা আমার আয়াতসমূহ এবং যে সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, তাকে ঠাট্টার বিষয় বানিয়ে নিয়েছে।

৫৭ – সেই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় যালিম আর কে হতে পারে, যাকে তার প্রতিপালকের আয়াতসমূহের মাধ্যমে উপদেশ দেওয়া হলে সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং নিজ কৃতকর্মসমূহ ভুলে যায়? বস্তুত আমি (তাদের কৃতকর্মের কারণে) তাদের অন্তরের উপর পর্দা লাগিয়ে দিয়েছি, যদ্দরুণ তারা এ কুরআন বুঝতে পারে না এবং তাদের কানে ছিপি এঁটে দিয়েছি। সুতরাং তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে ডাকলেও তারা কখনও সৎপথে আসবে না।

আল্লাহ মনোনীত একমাত্র সত্য ধর্ম ও জীবনদর্শন হলো ইসলাম। আমাদের আদি পিতা আদাম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন একজন মুসলিম। সেই থেকে নিয়ে শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত প্রত্যেক নবী ও রাসুল এই ইসলামের দিকেই মানুষকে আহবান করেছেন। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরে আর কোনো নবী আসবেন না, ফলে ইসলাম প্রচারের মহান দায়িত্বটি এখন সামষ্টিকভাবে আমাদের, অর্থাৎ মুসলিমদের ওপর অর্পিত হয়েছে। আমরা যদি এই মহান দায়িত্বের হক যথাযথভাবে আদায় করতে চাই তাহলে আমাদেরকে নবী ও রাসুলদের প্রদর্শিত পন্থা অনুসরণ করতে হবে। তাঁরা সত্য ও মিথ্যাকে মানুষের সামনে তুলে ধরতেন। সুসংবাদ দিতেন। সতর্কও করতেন।

মানুষকে আরবিতে ইনসান বলা হয়। ইনসান শব্দের অর্থ হলো: যে সবকিছু ভুলে যায়। আর ভুলে যায় বলেই আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়ে মানুষকে সতর্ক করেছেন। কিন্তু, এত সতর্ক করার পরেও আমরা ভুল করি, কারণ আমরা ইনসান, আর কোনো ইনসানই ভুলের উর্ধ্বে নয়। আমরা যখন ভুল করি তখন আমাদের সামনে মূলত দু’টি রাস্তা খোলা থাকে। নিজেদের ভুল বুঝতে পারলে আমরা অনেকেই অনুতপ্ত হই এবং ভবিষ্যতে সেই ভুলটি আর না করার জন্য চেষ্টা করি। এই যে আন্তরিক অনুতাপ, এই যে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভালো হয়ে যাওয়ার চেষ্টা – একে ইসলামের ভাষায় বলে তাওবা, অর্থাৎ আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। যারা তাওবার রাস্তা অবলম্বন করছেন, যারা ভালো হয়ে চলতে চেষ্টা করছেন – তাদেরকে আশার বাণী শোনাতে হবে। এরাই আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার যোগ্য। তবে, আমরা সবাই এরকম নই। আমাদের মধ্যে এমন অনেকেও আছেন যারা ভুল করার পরও অনুতপ্ত হন না, বরং দম্ভ ভরে সেই ভুলের ওপরই তাদের জীবন কাটিয়ে দেন। ভুলকে ভুল হিসেবে বুঝতে পারার পরেও মানবিক দুর্বলতার কারণে সংশোধিত হতে না পারা একটি অপরাধ বটে, কিন্তু যেহেতু আমরা ভুলটি বুঝতে পেরেছি এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছা রাখি, তাই আল্লাহ চাইলে আমাদেরকে সেই অন্ধকার থেকে বের করে আনতে পারেন এবং এর জন্য আমাদেরকে মাফও করে দিতে পারেন। কিন্তু, যারা ভুলকে ভুল হিসেবে, বাতিলকে বাতিল হিসেবে, অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে বুঝতে পারার পরেও সেই ভুল, বাতিল ও অন্যায়কে আঁকড়ে পড়ে থাকেন তাদের অন্তরে মরিচা পড়ে গিয়েছে। এদেরকে ভয় দেখাতে হবে। আল্লাহর শাস্তির ভয়, কবরের আযাবের ভয়, জাহান্নামের শাস্তির ভয়।

আবার, পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে একই ব্যক্তিকে কখনো আশার বাণী শোনাতে হবে, কখনো আবার ভয় দেখাতে হবে। আমাদের সবার অন্তরই পরিবর্তিত হয়। কখনও আমাদের ঈমান চাঙা থাকে, কখনও দুর্বল থাকে। তাই ভয় ও আশার এই সমন্বয়টি আমাদের সবার জন্যই জরুরী। আমরা যাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করছি তাদের জন্য যেমন জরুরী, তেমনই আমাদের নিজেদের জন্যও তা জরুরী।

মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করতে গিয়ে সময়ে সময়ে আমরা হতোদ্যম হয়ে পড়ি। সবাই আমাদের কথাকে গুরুত্ব দেয় না। অনেকেই আমাদেরকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে। আল্লাহ, নবী, কুরআন – কোনো কিছুই তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের তালিকা থেকে বাদ পড়ে না। এসব ঠাট্টা-তামাশা মূলত অহংকার থেকে আসে। অহংকারী মানুষ মনে করে যে, সে যা বুঝেছে সেটিই ঠিক, আর বাকী সবই বাকওয়াস। কেউ নিজেকে মহা পন্ডিত, বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি মনে করলে এই অহংকার আসতে পারে। ক্ষমতার কারণে অহংকার আসতে পারে। সম্পদশালী হওয়ার কারণে অহংকার আসতে পারে। প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে অহংকার আসতে পারে। বংশ মর্যাদার কারণে অহংকার আসতে পারে। কোনো বিষয়ে ভিন্নমত থাকা এক জিনিস, আর তাকে হাসি-তামাশার বিষয় বানানো আরেক জিনিস। যিনি প্রকৃত অর্থেই বিনয়ী তিনি তাঁর ভিন্নমতের বিষয়টি সুন্দর করে বুঝিয়ে বলবেন, কিন্তু তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবেন না। কিন্তু, অহংকারী মানুষরা যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ পোষণ – এসবে বিশ্বাস করে না। গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল – এই গোয়াড় মানসিকতা নিয়ে এরা ভিন্নমতকে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিতে চায়। ইসলাম যদি এদের ভিন্নমতের বিষয় হয় তাহলে ইসলামকেও এরা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিতে চায়। এদের এসব কথা শুনে মানুষকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়া বন্ধ করে দিলে চলবে না। নবী-রাসুলদের সাথেও ঠাট্টা-মশকরা করা হয়েছিল। এই শ্রেণীর মানুষ সব যুগেই ছিলো, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এরা ইসলামের কোনো ক্ষতি করতে পারে না, বরং চুড়ান্ত বিচারে তারা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৫৮ – তোমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, দয়াময়। তিনি যদি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য পাকড়াও করতে চাইতেন, তবে তাদেরকে অচিরেই শাস্তি দিতেন, কিন্তু তাদের জন্য রয়েছে এক স্থিরীকৃত সময়, যা থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য তারা কোনো আশ্রয়স্থল পাবে না।

৫৯ – ওইসব জনপদ তো (তোমাদের সামনে) রয়েছে। তারা যখন যুলুমের নীতি অবলম্বন করল, তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম। তাদের ধ্বংসের জন্যও আমি একটি সময় স্থির করেছিলাম।

যারা আল্লাহ, নবী, কুরআন, ইসলাম ইত্যাদি নিয়ে ঠাট্টা-তামাশায় লিপ্ত থাকে, আল্লাহ চাইলে তাদেরকে নিমেষেই এর জন্য শেষ করে দিতে পারেন। আমাদের হাতে ক্ষমতা থাকলে আমরা হয়ত এমনটিই করতাম। কিন্তু, আল্লাহ তেমনটি করেন না। তিনি আমাদের সবাইকে সময় দেন, বারবার তাঁর দিকে ফিরে আসার সুযোগ দেন। আমরা যদি তাঁর দিকে ফিরে আসি তাহলে তিনি কেন আমাদেরকে শাস্তি দেবেন? আমাদের নিজেদের কথাই ধরা যাক। আমাদের জীবনে এমন একটি সময় কি ছিলো না যখন আমরা আল্লাহ থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিলাম? সেই অবস্থায় আল্লাহ যদি আমাদেরকে পাকড়াও করতেন তাহলে আমরা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যেতাম। কিন্তু, তিনি আমাদেরকে সুযোগ দিয়েছেন, বারবার তাঁর দিকে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছেন। আমরা যদি এতবার এত অন্যায় করার পরেও এত সুযোগ পেতে পারি, তাহলে অন্যরাও কেন সেই সুযোগটি পেতে পারে না?

তবে, এই সুযোগেরও একটি সীমা আছে। একজন মানুষ বা একটি সমাজ কোন পর্যায়ে গেলে আর সুযোগ পাওয়ার যোগ্য থাকে না, তা আল্লাহই ভালো জানেন। সেই সীমা অতিক্রান্ত হয়ে গেলে তিনি আমাদেরকে পাকড়াও করেন। এটি হলো এই দুনিয়ার শাস্তি। অতীতে অনেক জনপদকে এভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সেসব ধ্বংসস্তুপ আজও আমাদের সামনে নিদর্শন হিসেবে রয়েছে। আর আখিরাতের বেদনাদায়ক শাস্তি তো রয়েছেই।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহায্য করুন, যেন আমরা অনুতপ্ত হয়ে আমাদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভালোবাসা, ভক্তি, ভয় ও আশা সহকারে তাঁরই দিকে বারবার ফিরে আসতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় শাস্তি ও অকল্যাণ থেকে রক্ষা করুন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close