সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর আমাদের করণীয় (অনুবাদ)

উস্তাদ আব্দুল্লাহ আনিক মিসরা প্রদত্ত একটি উত্তর থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত আকারে অনুদিত। 

Newborn-feet-in-Dads-Hands

একটি ছোট্ট শিশু আমাদের ঘর আলোকিত করে যখন এই দুনিয়াতে আসে তখন নিটোল আনন্দে আমাদের বুকটা ভরে যায়। আমাদের সংসারে সদ্য আসা এই সদস্যকে ঘিরে চলতে থাকে নানা রকম আচার-আনুষ্ঠানিকতা। এসব আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি জিনিস ভুলে যাই। অথচ, সেটিই হওয়া উচিৎ ছিলো আমাদের মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু। আর তা হলো, এই পরম আরাধ্য উপহারের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা এবং এজন্য তাঁর প্রতি রাজি ও খুশি থাকা।

আমাদের ঘরে একটি বাচ্চা জন্ম নিলে সবার আগে, বাকী সব কিছুর আগে, অন্তরের অন্তস্থল থেকে কৃতজ্ঞ চিত্তে সেই মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে, যিনি এই অসাধারণ উপহারটি একান্তই অনুগ্রহ করে আমাদেরকে দিলেন। কত কিছুই হতে পারত, কিন্তু সবকিছু সহিসালামতে হয়ে গেল, এজন্য আল্লাহর প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, এই সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুটির মালিক আমরা নই, বরং তাকে একটি আমানত হিসেবে আল্লাহ আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। ফলে, জন্মের পর থেকেই তার ভালোমন্দের দেখভাল করা আমাদের দায়িত্ব। এই দায়িত্বে গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই, কেননা এর জন্য আখিরাতে আমাদেরকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। শিশুটির দুনিয়াবী ভালোমন্দ তো আমরা দেখবই, সেইসাথে তার রূহের খোরাকও আমরা জোগাব।

ছেলে বা মেয়ে বাচ্চা নিয়ে কোনো প্রকার পক্ষপাত থাকা চলবে না। এই পক্ষপাতদুষ্ট মানসিকতাটি আমাদের মধ্যে থেকে থাকলে তাকে ঝেটিয়ে বিদায় করে দিতে হবে। আমাদের ঘর আলো করে মেয়ে শিশু আসলে সন্তুষ্ট থাকতে হবে, ছেলে শিশু আসলেও সন্তুষ্ট থাকতে হবে। ভালোবাসার ক্ষেত্রেও ছেলে বা মেয়ে শিশুর মধ্যে কোনো রকম কমবেশি করা যাবে না। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ছেলে সন্তান যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, ঠিক একইভাবে মেয়ে সন্তানও আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকা কোনো ঈমানদারের পক্ষে শোভা পায় না। ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, যেমনই হোক, এই আনন্দের খবর খুশি মনে মানুষের সাথে ভাগ করে নিতে হবে।

অতএব, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থেকে এবং আল্লাহ প্রদত্ত এই আমানতের প্রতি পূর্ণ দায়িত্বশীল হয়ে আমরা তার প্রতি খেয়াল রাখব, সেইসাথে তাকে ঘিরে যেসব আচার-আনুষ্ঠানিকতা আছে সেগুলোও আমরা যথাসম্ভব পালন করব। আর এসব আচার-আনুষ্ঠানিকতা নিয়েই আমাদের পরবর্তী আলোচনা।

আজানের ধ্বনি …        

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, জন্ম নেওয়ার পর বাচ্চাকে সামনে রেখে তাকে আজান শোনানো একটি উত্তম কাজ। তবে, এটি ওয়াজিব বা সুন্নত পর্যায়ের কোনো আমল নয়। অন্যদিকে, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাব অনুযায়ী, সদ্য ভূমিষ্ঠ বাচ্চাকে আজান শোনানো সুন্নত; বাচ্চার ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দিতে হবে।

বাচ্চাকে আজান [ও ইকামত] শোনানোর পিছনে হিকমত হলো, জন্ম নেওয়ার পর তার কানে প্রথম যে শব্দগুলো যাবে তা হলো: আল্লাহ এবং তাঁর বড়ত্ব। তাকে আজান শোনানোর সময়ে আমরা আশা রাখব যে, বড় হয়ে সে এই আহবানে সাড়া দেবে।

প্রথম খাবার …

আমাদের প্রিয় নবীর (ﷺ) সামনে যখন সদ্য ভূমিষ্ঠ কোনো বাচ্চাকে নিয়ে আসা হতো তখন তিনি খেজুরের ছোট্ট একটি টুকরো প্রথমে তাঁর পবিত্র মুখে নিয়ে চুষতেন, এরপর তা বাচ্চাটির মুখে দিতেন। এই কাজটিকে ‘তাহনীক’ বলে। এটি একটি সুন্নত আমল। কেউ এটি করতে না চাইলে তাতেও কোনো আপত্তি নেই। খেজুর দিয়ে বাচ্চাকে ‘তাহনীক’ করতে পারলে ভালো, আর খেজুর পাওয়া না গেলে মিষ্টি স্বাদের যে কোনো প্রাকৃতিক খাবার দিয়েই ‘তাহনীক’ করা যেতে পারে।

আমরা নিজেরাই আমাদের বাচ্চাদের ‘তাহনীক’ করতে পারি। আবার, চাইলে কোনো পরহেজগার ব্যক্তি বা আলিমকে দিয়েও আমরা তা করাতে পারি। তাঁদেরকে দিয়ে ‘তাহনীক’ করালে আমরা আশা রাখব যে, এই বাচ্চাটি বড় হয়ে তাঁদের মতোই সৎকর্মশীল হবে এবং তাঁদের বরকত থেকে কিছু বরকত হাসিল করবে।

বাবুর নাম হলো …

জন্মের সাথে সাথেই বাচ্চার নাম রাখা যেতে পারে, জন্মের সপ্তম দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেতে পারে, অথবা অন্য যে কোনো সময়েও তার নাম রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। তবে, নামটি যাই হোক না কেন, তা সুন্দর অর্থবহ হওয়া উচিৎ।

আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান ইত্যাদি হলো সবচেয়ে উত্তম নাম। আল্লাহ আমাদের রব্ব এবং আমরা তাঁর গোলাম – এই নামগুলোর মাধ্যমে বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। এরপরে উত্তম হলো নবীদের নাম, যেমন মুহাম্মাদ, আহমাদ, ইবরাহিম ইত্যাদি। আর তার পরে উত্তম হলো অতীতের সৎকর্মশীল মুসলিমদের – যেমন সাহাবীদের – নাম।

খৎনা …

ছেলে বাচ্চাদের খৎনা করানো ইসলামের একটি প্রতীক এবং মানুষের ফিতরত বা স্বভাবজাত প্রকৃতির একটি অংশ। বাচ্চার জন্মের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে খৎনা করানো যেতে পারে। আবার, পরেও তা করা যেতে পারে। তবে, বাচ্চা বড় হয়ে যাওয়ার আগেই তার খৎনা করানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, ছেলে বাচ্চাদের খৎনা করানো সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। অন্যদিকে, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাব অনুযায়ী এটি ওয়াজিব।

চুল ফেলা …

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, জন্মের সপ্তম দিনে বাচ্চার চুল ফেলে দেওয়া ওয়াজিব বা সুন্নত কিছুই নয়। তবে, এটি করার অনুমতি আছে। কেউ চাইলে এই দিনে বাচ্চার চুল ফেলতে পারে, আবার কেউ চাইলে তা নাও ফেলতে পারে।

অন্যান্য মাযহাব অনুযায়ী, বাচ্চার জন্মের সপ্তম দিনে তার চুল ফেলে দেওয়া উত্তম। বাচ্চার চুল ফেলে দেওয়ার পর তা ওজন করতে হবে এবং এর সমপরিমাণ সোনা বা রুপো (অথবা সোনা বা রুপোর মূল্যমান) সদকা করতে হবে। আর চুলগুলো মাটিতে পুতে ফেলতে হবে। সেইসাথে, এই একই দিনে, অর্থাৎ বাচ্চার জন্মের সপ্তম দিনে তার নামা রাখা ও আকিকা করা উত্তম।

আকিকা …

সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চার জন্য শুকরিয়াস্বরূপ পশু জবাই করা এবং সেই পশুর গোশত অন্য মানুষের সাথে ভাগ করে নেওয়াকে আকিকা বলে। কেউ চাইলে বাচ্চার নাম রাখা, চুল ফেলা এবং আকিকা – এই তিনটি আনুষ্ঠানিকতা একইসাথে সেরে ফেলতে পারেন।

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, ইসলাম পূর্ব আরবের জাহিলিয়াতের যুগে কোনো বাচ্চা জন্ম নিলে সেই উপলক্ষে পশু জবাই করা হতো এবং মানুষের সাথে সেই পশুর গোশত ভাগ করে নেওয়া হতো। ইসলাম আসার পরেও এই প্রথাটি জারি ছিলো। কিন্তু, ঈদুল আযহায় পশু কুরবানির বিধান নাযিল হওয়ার সাথে সাথে পশু উৎসর্গের সাথে সম্পর্কিত আগেকার যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা রহিত হয়ে যায়। এজন্য, হানাফি মাযহাবে আকিকাকে সুন্নত আমল বলে গণ্য করা হয় না; কেউ চাইলে তাঁর বাচ্চার আকিকা করতে পারেন, এর বেশি কিছু নয়। তবে, বাকী তিন মাযহাব অনুযায়ী, সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চার জন্য আকিকা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।

কিন্তু, মুশকিল হলো …

ধরা যাক, আপনি হানাফি মাযহাব অনুযায়ী কুরআন ও সুন্নাহ মেনে চলছেন। আপনার মাযহাবের মূল রায় অনুযায়ী বাচ্চার আকিকা করা বা না করা একান্তই আপনার এখতিয়ার। আপনি চাইলে তা করবেন, না চাইলে করবেন না। কিন্তু, আপনি যদি বাচ্চার আকিকা না করেন তাহলে সমাজে আপনার মান থাকবে না, কেননা মানুষ একে ওয়াজিবের পর্যায়ে বসিয়ে দিয়েছে। আপনার পকেটে পয়সা আছে কি নেই তা কেউ দেখবে না। এই পরিস্থিতিতে আপনি কী করবেন? আপনি কি আপনার নিজের ধর্মীয় জ্ঞানের ওপর অটল থাকবেন, নাকি সমাজে নিজের মুখরক্ষা করবেন? শুধু তাই নয়, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও তো রয়েছে অনেক প্রথা। সেক্ষেত্রেও বা আপনি কী করবেন?

ফরয বা ওয়াজিব নয় এমন কোনো কাজকে সামর্থ না থাকা সত্ত্বেও কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া একেবারেই অনুচিত। তাছাড়া, সুন্নত বা মুস্তাহাব কোনো আমলকে গায়ের জোরে ওয়াজিবের পর্যায়ে উন্নীত করে মানুষকে তা মানতে বাধ্য করা একটি বিদআত। অতএব, পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে থাকলে আমাদের আশেপাশের মানুষকে বিষয়টি সুন্দর করে বোঝাতে হবে এবং কৌশলে সমাজের এই বাড়াবাড়ির বিরোধিতা করতে হবে। আর আমাদের প্রতি সমাজের চাপ যদি খুবই বেশি হয় এবং সমাজের বিরোধিতা করতে গেলে যদি লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয় তাহলে আপনি না হয় একটু পিছিয়েই গেলেন। আপনার মাযহাবের বাইরে অন্য কোনো মাযহাবে যদি কাজটি করার জন্য বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়ে থাকে, [আর সেটি যদি আপনার সামর্থে কুলোয়,] তাহলে না হয় আপনি আপনার সমাজের কথাই শুনলেন। আপনার নিয়ত ঠিক থাকলে সেটিও আপনার জন্য ভালো।

সবশেষে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছি, এই আনুষ্ঠানিকতাগুলো পালন করতে গিয়ে আমরা যেন আসল বিষয়টি ভুলে না যাই। মহান আল্লাহ আমাদেরকে যে এত সুন্দর একটি নিয়ামত দিলেন, এত বড় একটি আমানতের দায়িত্ব আমাদেরকে দিলেন – এজন্য কৃতজ্ঞচিত্তে শুকরিয়াস্বরূপ এই আনুষ্ঠানিকতাগুলো পালন করতে হবে। আমাদের অন্তরের এই অবস্থাটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সন্তানদেরকে তাকওয়াবান ও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

ইংরেজিতে মূল প্রশ্নোত্তরটি পড়ুন এখানে: http://seekershub.org/ans-blog/2011/05/10/what-acts-are-recommended-after-giving-birth-to-a-child/ 

Advertisements

2 thoughts on “সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর আমাদের করণীয় (অনুবাদ)

    • ওয়াআলাইকুমুসসালাম।

      আমি অনুবাদ করেছি মাত্র, তাই মূল লেখায় যা এসেছে তার বাইরে নিজে থেকে বাড়তি কোনো টপিক যোগ করিনি।

      আপনি যে দুটো প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন তার উত্তর এখানে দেখা যেতে পারে:
      ১। Shaving the head of a baby girl: http://islamqa.org/hanafi/darululoomtt/52156
      ২। How many sheep: http://islamqa.org/hanafi/muftionline/94437

      ভবিষ্যতে কোনো লেখা অনুবাদ করার আগে তা সেই বিষয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র দেয় কি না তা আগে দেখে নেওয়ার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

      আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s