খারাপ দিয়ে খারাপ দূর করা যায় না

আমরা যখন মানুষকে তার কোনো ভুল সংশোধন করতে বলি, সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করতে মানা করি, দীর্ঘদিনের পাপ উপলব্ধি করিয়ে পাপ করা বন্ধ করতে বলি — আমরা সাধারণত সেটা করি একধরনের আক্রমণ করে। আমাদের ভাষা হয় কঠিন, বলার ভঙ্গি হয় মারমুখী। আমরা ধরে নেই যে, আমাদের কঠিন ভাষা শুনে তার আত্মা কেঁপে যাবে। আমাদের গালিগালাজ, আক্রমণ শুনে সে ভয় পেয়ে পাপ করা বন্ধ করে দেবে। কালকে থেকেই খারাপ কাজ করা বন্ধ করে টুপি পরে মসজিদে নিয়মিত মুসল্লি হয়ে যাবে।

আপনি নিজে থেকেই একবার চিন্তা করে দেখুন: যদি আমরা তাদের মতো হতাম, এবং আমাদেরকে কেউ মারমুখী হয়ে, কঠিন ভাষায় ফেইসবুক পোস্ট লিখে, হাজারটা খোঁচা দিয়ে বলত যে, আমি কত খারাপ, আমার চৌদ্দগুষ্টি কত খারাপ, আমার পরিণতি কী ভয়ঙ্কর হতে যাচ্ছে, আমার আর কোনো আশা নেই ইত্যাদি —তাহলে কি আমরা তা শুনতাম?

কোনো অন্যায়কারীকে, যে কিনা সারাজীবন অন্যায় করে এসেছে এবং সে বুঝতেই পারে না যে সে অন্যায় করছে, তাকে তার ভুল কীভাবে বোঝাতে হয়, তার উদাহরণ হচ্ছে নবী মুসা ﷺ এর ফিরাউনকে বোঝানোর কাহিনী। আল্লাহ ﷻ যখন নবী মুসাকে ﷺ বললেন ফিরাউনের কাছে যেতে, তিনি যে আদেশ দিলেন তা যে কাউকে চিন্তায় ফেলে দেবে—

“তোমরা দুজনে ফিরাউনের কাছে যাও। সে সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। তোমরা তার সাথে নরম ভাবে কথা বলো। হতে পারে সে শুনবে, ভয় পাবে।” [ত্বাহা ২০:৪৩-৪৪]

beautiful-roseএই আয়াতে আল্লাহ ﷻ বলছেন, قَوْلًا لَّيِّنًا নরমভাবে কথা বলতে। لين হচ্ছে নরম, নমনীয়, কোমল। যেমন, নরম হয়ে যাওয়া খেজুর। আমরা অনেকেই মেয়েদের নাম لِينَة লীনা রাখি কোমনীয়তা অর্থে।

আল্লাহ ﷻ বলছেন ফিরাউনের সাথে নরম ভাবে কথা বলতে! এক সিরিয়াল কিলার, যে কিনা বছরের পর বছর ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম খারাপ কাজ করেছে: শত শত শিশু জবাই করে মেরেছে —সে নরম করে কথা বললে শুনবে? ভয়ও পাবে? —এটা কি সম্ভব?

নবী মুসা ﷺ ফিরাউনের কাছে গেলেন। একবারও তিনি চিল্লাচিল্লি করলেন না, গালি দিলেন না। কোনো ধরনের অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করলেন না। তিনি সুন্দরভাবে যুক্তি দিয়ে তাকে বোঝালেন: ফিরাউনের চিন্তাভাবনায় ভুলগুলো কোথায়, সে কীভাবে ক্রমাগত অন্যায় করে যাচ্ছে, কীভাবে নিজেকে সংশোধন করতে হবে। ফিরাউনের প্রাসাদে, হাজার হাজার মানুষের সামনে সেদিন কী ঘটেছিল, তা সূরা ত্বাহাতে রেকর্ড করা হয়েছে। পড়ে দেখুন, চোখ খুলে যাবে।

আমাদের বুঝতে হবে: কোনো খারাপ কিছু কখনো আরও খারাপ দিয়ে দূর করা যায় না। খারাপ দূর করতে হয় ভালো দিয়ে, সুন্দর দিয়ে। একজন মানুষ, যে সারাজীবন বাপদাদার প্রতি সন্মান রেখে তাদের অন্ধ অনুকরণ করে এসেছে, তাকে হঠাৎ করে গিয়ে আক্রমণাত্মক ভাষায় বললে হবে না যে, তার বাপদাদা সব ভুল, সে যা করছে সব ভুল, তার এক পা ইতিমধ্যে জাহান্নামে চলে গেছে, ইত্যাদি।

একইভাবে যে মানুষটা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করে কোনো অশ্লীল কাজ নির্বিকারভাবে দিনের পর দিন করে যাচ্ছে, তাকে একদিন হঠাৎ করে কটু ভাষায় সবার সামনে অপমান করলে হবে না। তাকে ফেইসবুকে গালিগালাজ করে পোস্ট দিলে হবে না। দুর্গন্ধ দূর করতে গিয়ে আমরা নিশ্চয়ই আরও দুর্গন্ধ ছড়াই না? আমরা পারফিউম ব্যবহার করি।

আমাদের একটা বাৎসরিক ক্যালেন্ডার হয়ে গেছে। প্রতিবছর আমরা ভ্যালান্টাইন ডে-তে গালাগালি করি। কয়েকদিন পর হোলি-র দিনে ঝগড়াঝাটি করি। তারপর নারী দিবস নিয়ে কাদা ছোঁড়াছুড়ি। তার কয়েকদিন পর পহেলা বৈশাখে আবারো কিছু চুলাচুলি। তারপর আসে হ্যালোইন। তারপর খ্রিস্টমাস। বছর খতম হয় থার্টি ফার্স্ট নাইট দিয়ে। এরমধ্যে আশুরা, ঈদে মিলাদুন্নবি, শবে বরাত নাহয় বাদই দিলাম। পরের বছর আবারো নতুন উদ্যোগে, আধুনিকতর বাংলা নাটকের শব্দের ভাণ্ডার নিয়ে, নতুন উদ্যমে হাতাহাতি শুরু হয়।

শেষ পর্যন্ত দেখা যায়: মুসলিমদের পক্ষ থেকে প্রত্যেকমাসেই গালাগালি, খোঁচাখুঁচি, কাদা ছোড়াছুড়ির উৎসব লেগেই থাকে। বছর শেষ হয়, আরেক বছর আসে, মানুষ যে যার মতো উৎসবগুলো করতেই থাকে। আর একদল উঠতি দাঈ ফেইসবুকে তাদের কীবোর্ড ‘জিহাদ’ করতেই থাকেন। যাদেরকে নিয়ে তাদের এই ‘জিহাদ’, তারা বেশিরভাগই কোনোদিন ফেইসবুকে তাদের বিরুদ্ধে এই সব কথাবার্তা পড়েও দেখেন না। আগে যতটুকুও পড়তেন, দিনে দিনে ভাষার অবনতি দেখে তারা পড়া ছেড়ে দিয়েছেন।

এইসব ফেইসবুক ‘জিহাদিদেরকে’ কখনো দেখা যায় না কোনো পার্টিতে গিয়ে আত্মীয়কে নিয়ে বসে বোঝাতে: এভাবে লক্ষ টাকা না উড়িয়ে একটা গরিব লোকের জীবন পাল্টে দেওয়া যায় না? এই জিহাদিরা বিয়েতে গেলে কখনো মুসলিম বোনদেরকে ডেকে সন্মানের সাথে বোঝান না: এভাবে অশ্লীল কাপড় পরে এসে কার কী লাভ হচ্ছে? এই পণ্ডিতরা কখনো কনফারেন্স ডেকে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভাষণ দেন না। সাংবাদিক ডেকে এনে ছাপানোর মতো কিছু করেন না। খবরের কাগজে গাঁটের পয়সা খরচ করে একটা কলাম কিনে নিয়ে আর্টিকেল লেখেন না। বিদআহ ভরা বইয়ের দোকানে গিয়ে বিক্রেতাকে দলিল দিয়ে বোঝান না যে, তিনি মুসলিমদের কী পরিমাণের ক্ষতি করছেন। এরা কখনো মাসের পর মাস গভীর অধ্যবসায় করে কোনো বই লেখেন না।

নরম চেয়ারে বসে কফির কাপে চুমুক দিয়ে কীবোর্ডে জ্ঞান কপচানো, একে অন্যকে ‘মাদখালি’, ‘খারিজি’, ‘কাফির’, ‘মুনাফিক’, ‘আহলে কুরআন’, ‘সালাফি’, ‘ওয়াহাবি’ ইত্যাদি লেবেল দিয়ে নিজের বিদ্যার সমুদ্র জাহির করা; হাজারো আরবি, ইংরেজি টেকনিকাল শব্দ ব্যবহার করে জ্ঞানের ঝকমা লাগিয়ে দেওয়া —তাদের দৌড় এই পর্যন্তই। নিজের কষ্টে আয় করা টাকা খরচ করে সমাজের সংস্কারে ভালো কিছু করা, মাসের পর মাস রাত জেগে পড়াশুনা, কাজ করে কোনো স্থায়ী কৃতিত্ব রেখে যাওয়া —এসবের মধ্যে এরা নেই।

আসুন আমরা খারাপ কাজ বন্ধ করতে গিয়ে আরও খারাপ কাজ না করি। সমাজে দুর্গন্ধ দূর করতে দিয়ে আরও দুর্গন্ধ না ছড়াই। দিনে দিনে ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্কগুলো জোড়া লাগাতে গিয়ে কাদাছোড়াছুড়ি না করি। মানুষের মধ্যে একে অন্যের প্রতি হারিয়ে যাওয়া সন্মান, সৌজন্যবোধ ফিরিয়ে আনতে গিয়ে আরও অসন্মান না করি, আরও অসৌজন্যমূলক আচরণ না করি।

নিজেকে জিজ্ঞেস করি: আমরা যাদেরকে সংশোধন করার চেষ্টা করছি, সেই ভাই, বোন, ছেলে, মেয়ে, বন্ধু কি ফিরাউনের চাইতেও খারাপ? আমরা কি সুন্দর কথা বলে, সুন্দর আচরণ করে, মানুষকে ইসলামের সুন্দর শিক্ষার প্রতি মুগ্ধ করে কাছে ডাকতে পারি না?

আসুন আমরা ফেইসবুক, পত্রিকা, টিভি —এগুলো সব ভরিয়ে ফেলি ইসলামের আলোর বন্যায়। মানুষ যেন ফেইসবুক খুললে ময়লা না দেখে সুন্দর আর্টিকেল, বাণী, ছবি, লেকচারে ডুবে যায়। প্রতিদিন একটু একটু করে আলো ঢোকালে, একদিন অন্ধকার অন্তর আলোর বন্যায় ভেসে যাবেই, ইন শাআ আল্লাহ। ﷻ

সূত্র: https://www.facebook.com/omar.al.zabir/posts/10152537759281910 

Advertisements

4 thoughts on “খারাপ দিয়ে খারাপ দূর করা যায় না

  1. পিংব্যাকঃ জিহাদ ও ক্বিতাল সম্পর্কে যে বিষয়গুলো আমাদের জানা থাকা উচিৎ | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ ইসলামের দিকে মানুষকে ডাকার ক্ষেত্রে আমাদের কর্মপন্থা যেমনটি হওয়া উচিত | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (৩): সহ্য করুন, ক্ষমা করে দিন | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ এ সময়ের ফিতনাহ: ভোগ, চারিত্রিক স্খলন এবং চরমপন্থার হাতছানি (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s